অপেক্ষাতেই রইল আমার

অনির্বাণ ভট্টাচার্য



ধরো দুজন দুজনের দিকে চেয়ে বসে আছি, অথচ, দুজনেই দৃষ্টিহীন। অপেক্ষা। অভ্যেস। যেকোনো নামেই ডাকতে পারো। দৃষ্টি ফিরবে? জানতে পারবে, চোখের সমান্তরাল কোনও হ্রদের ভেতর অসম্ভব শান্ত এক কুবলয় খেলা করে বেড়ায়। ‘সামহওয়্যার সামটাইমস অ্যান ইনসেনসিব্ল ইস ওয়েটিং টু বি নোন’। তুমি শাড়ী মুঠো করছ আবার খুলছ। আঙ্গুলের অভ্যেস। আমি ওই অভ্যেসের নাম দিয়েছি স্বমেহন। শার্টের কোণায় ছিটকে লাগছে সিঁথির ধুলো। সিঁদুরের অপেক্ষমাণ পরিচর্যা। ‘কেমন আছ? কেমন চলছে সংসার?’ ইত্যাদি। আপনি থেকে তুমিতে আসতে কতক্ষন সময় লাগে? এক জন্ম? ছেলেটি ভালবেসেছিল মেয়েটিকে। একশটা দিন মেয়েটির বাড়ির নিচে বসে থাকার কথা ছিল তার। একদিন সে জানলা খুলবে। কথার খেলাপ করেনি সে। নিরানব্বইটা রাত ঠায় বসে ছিল। শেষ দিন সকালে উঠে চলে গেছিল ছেলেটি। মুখ তুলে দেখেনি মেয়েটির জানলা খুলল কিনা। এটাই অপেক্ষা। সিনেমা প্যারাডাইসো। আলফ্রেডো। জীবনে এক একটা সময় আসে, যখন আপত্তিকর অংশগুলো ছাড়া আর বিশেষ কিছু জমানোর থাকেনা। একটা অসম্ভব ঠাণ্ডা দেয়ালের ভেতর রিটা হেওয়ারথ। দেয়ালের ওদিকে বাড়তে থাকা মিরাক্ল। বাজ পড়ার আওয়াজের জন্য অপেক্ষা করা এক একটা মেটালিক সাউন্ড। মুক্তি। শশ্যাঙ্ক রিডেম্পশন। একটা সময়ে আশা ছাড়া আর কিছু পড়ে থাকেনা হয়ত। তাকে তুমি প্যান্ডোরা বলো কিংবা প্যান্টোমাইম। মূকাভিনয়। অথবা সলিলকি। দর্শক থাকলেও কথাহীন শব্দহীন এক নদীর ভেতর কিছু অনিঃশেষ পাল তোলা। সেই আশাই তোমাকে পাড়ে নিয়ে যাবার কথা বলেছিল। অপেক্ষারা ডেকে এসে বলেছিল, ‘চিয়ার্স ক্যাপ্টেন। সার্ডিন ধরেছি, বিয়ার। চলবে?’ একদিন, একেকদিন জীবন উল্টোদিকে ঘোরে। তুমি যখন ঘুমোচ্ছিলে তখন বাকিরা কাতরাচ্ছিল। যন্ত্রণায়। চল জীবন। একসঙ্গে ঝুলে পড়ি। গোদো আজ সন্ধেয় আসবে না। তবে কাল নিশ্চয়ই আসবে। কালকে আমাদের মহুয়া খাওয়ার কথা আছে। ওদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেখার কথা আছে। ঠাণ্ডা ঘরের মজলিশে খেলনার পিস্তল হলেও তা রেখে আসার কথা আছে। চা ঠাণ্ডা হয়ে যাক। আমি তার অবস্থানেই নেশা ছাড়াব। নির্মলেন্দু গুণ। আমি ভালবাসতে বলছিনা। শুধু কেউ একজন থাকুক, জিজ্ঞেস করুক, তোমার চোখ এত লাল কেন? সারারাত ঘুমোতে পারিনা। বেঁচে থাকার কথা শুনলে হিংসে হয়। মৃত্যু আরও প্যাথেটিক। আত্মহত্যায় আমার বিশ্বাস ছিল না কোনোদিন। অবশ্য উদ্বন্ধনের ওপর একটা দুর্বলতা ছিল বহুদিনই। মাটির ইঞ্চিখানেক ওপরে ঝুলে থাকা শরীর। ছুঁতে যাচ্ছে অথচ, ছুঁচ্ছে না। অ্যাসিম্পটোট। চায়ের কাপ আর ঠোঁটের ভেতর ব্যবধান। এ দূরত্ব মেটার না। একটা বরফঘেরা রেলস্টেশন। লু ইয়ানশি, ফেং আর মিষ্টি মেয়ে ডান্ডানের গল্প। রেড ডিট্যাচমেন্ট অফ ওমেন। হেরে যাওয়া এক ব্যালেরিনার গল্প। দেখা না হওয়া এক অন্তহীন অপেক্ষার গল্প। অপেক্ষা, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার ‘কামিং হোম’। আমার আর বাড়ি ফেরা হল না। পাড়ার রোয়াকে একপাল নেকড়ে। রেবিস। তেলচিটচিটে এক পাড়ার ভেতর আমাদের একান্নজন। আলাদা হওয়ার ট্র্যাডিশন। মৃত্যুচেতনা। সন্তানস্নেহ। আপোষ। অপেক্ষার রঙ এক একজনের কাছে এক একরকম। দাদু যে ঘরে বসে জীবনের শেষ সেরিব্রাল সময়টা কাটাল, মাথার পেছনের দিকে লেগে একটা তেলের দাগ জমে আছে সেই ঘরের দেয়ালে। ঠাকুমার শাড়ীর গন্ধ, কাজললতা, সিন্দুকে। ছাদের কোণায় খরগোশ পোষার খাঁচাটা। লাল চোখ ছিল। দেখা হলে তাড়া করত বাকিদের, আমাকে মায়ার মতো করে দেখত। অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছ। একটার পর একটা, ভেসে উঠল। ভেঙ্গে যাওয়ার ছায়া জলের ভেতরেও পড়ে। ওরা বোঝে। চাঙ্গর ভাঙ্গে। মাটি থেকে মাধ্যাকর্ষণ আছে জেনেও নিরুত্তাপে বাড়ে দেয়াল। পার্টিশন। দেশের। ঘরের। মনের ভেতর। আমার অপেক্ষারা বাংলা ছবির কথা হয়ে হাওয়ায় ঘোরে। ‘দেখিস, একদিন ঠিক হয়ে যাবে সব’। গেরস্থালি, ভালোবাসা, ছোটবেলা, বন্ধুত্ব সব সবকিছুরই কিছু না কিছু হয়। শুধু ‘ঠিক’টুকু হয়না। আমি বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করি। অফিস। বন্ধু। বাইশ বছরের। দেখা করে এক আলো-অন্ধকার অফিসঘরের সোফায়। বিষাদের মানচিত্র আঁকতে আঁকতে। কোথায় গুলাগ, কোথায় কাতিন, কোথায় অসউইতজ-বারকনিউ। ‘চলি রে, খুব শীত’। তারপর থেকে ক্রমাগত শীত কমার অপেক্ষায় আছি .....