ঠিক বলতে পারব না

চিত্রালী ভট্টাচার্য



রাকা মাইন্স। ঝাড়খান্ডের এক শীর্ণ ষ্টেশন, শুধু আপ আর ডাউনে দুজোড়া লাইন । এবড়ো- খেবড়ো স্টোনচিপস্‌ ছড়ানো এক উদাসী প্লাটফর্ম, সেখানেই এসে দাঁড়াল বিকেলের ট্রেনটা। রোদ তখন ম্লান। কমলা রঙের একটা শ্যাডো শুধু কংক্রীটের স্লাব ছুঁইয়ে। ট্রেনটা থামতেই নামল দু-তিনজন। আর কতই বা লোক নামবে এই রাকা মাইন্সে। প্রতিদিনই অভ্রখনির দু- চারজন শ্রমিক ওঠে নামে, টেনের আসা- যাওয়ার আওয়াজ হয়, পোর্টার দিখুর দৌড়ঝাপ চোখে পড়ে, বাদবাকি সময় সব চুপ। প্লাটফর্মে জমে থাকা কেন্দুপাতার ওপর চুপ করে শুয়ে থাকে দু-চারটে বেওয়ারিশ কুকুর। প্লাটফর্মের সম্পত্তি বলতে আছে একটা ভাঙ্গাচোরা সিমেন্টের বেঞ্চ ,সেখানেই বসি আমি রোজ। ট্রেন আসে, দাঁড়ায় মিনিটখানেক।আমি ব্যস্তভাবে কামরা গুনি তখন। কতজন নামল, তাদের চেহারা, পোষাক, কথাবলা, হাসা—চোখের লেন্সে ধরে রাখি।
আজও সেই কাজেই ব্যস্ত ছিলাম।গোমড়া মুখের ইলেকট্রিক ইঞ্জিন এসে দাঁড়ানো থেকে প্রতিটা কামরায় নজর ঘুরে ঘুরে যাচ্ছিল। রোগা মতন একটা মুখ তিন নম্বর কামরাটা থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখল কি যেন! চার নম্বর কামরায় একটা বাচ্চা কেঁদে উঠল মায়ের কোলে, তাকে শান্ত করতেই বোধহয় বাবা ,ফাঁকা জলের বোতল হাতে নেমে পড়ল । দিখুর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল- পানি কা নল কাঁহা ?
-ও উস্‌তরফ। জলদি যাইয়ে, ট্রেন ছুট্‌ জায়েগি।
বাবার উর্দ্ধশ্বাস দৌড় লেন্সে তুলতে গিয়ে থমকে গেলাম, মুখটা যেন কথাও ----! অমনি চোখ দৌড় লাগালো ওঁর পেছন পেছন- শুনছেন--- শুনছেন---, আপনাকে কোথায় যেন----!
উনি তখন জোরে টিপে ধরেছেন কলের বোতাম, দ্রুত জল উঠে আসছে বোতলে, ছিটকে ওঠা জলে ভিজে উঠেছে জামা। কোনোমতে জল ভরে ফিরতেই ভুল ভাঙ্গল,না এ সে নয়, মুখের আদলটা খুব চেনা কারুর মত,কিন্তু সে না।
ট্রেন ছেড়ে দিল হুউসল দিয়ে। একটার পর একটা কামরা অদৃশ্য হয়ে গেল চোখের সামনে থেকে। ষ্টেশনমাষ্টার পাণ্ডেজী জোরে হেঁকে বলল—দিখু---, এ দিখু----, জল্‌দি সে আগ জ্বালা দে ,বহত ঠন্ড হ্যায় আজ, অর চায় লে আ।
টিকিটবাবু বিকাশ গুপ্তা টিকিট-ঘর থেকে বেরিয়ে দু হাতের চেটো ঘষে নিজেকে উষ্ণ রাখার চেষ্টা করতে করতে চেঁচিয়ে বলল-মেরে লিয়ে ভি---দিখু--, বলেই আমার মুখের দিকে তাকাতেই আমি দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকালাম অন্য দিকে, কি জানি চোখাচোখি হলে আবার কী প্রশ্ন করে বসে! ওরা তো কথা বলতেই চায় আমার সঙ্গে। কত যে প্রশ্ন জমে আছে ওদের মনের মধ্যে,কত যে কৌতুহল। মাঝে মাঝে ওরা খুব আগ্রহী হয়ে ওঠে এখানকার একমাত্র মিশনারী স্কুলের এই দিদিমনিটাকে জানতে। কেন আমি এত বছর ধরে এই রাকা মাইন্স-এ একা একা এভাবে----। কার অপেক্ষায় ? কার খোঁজে প্রতিদিন সকাল- বিকেল এই প্লাটফর্মে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকি! মুখে অবশ্য কিছু বলে না ওরা। মাঝে মাঝে মুখোমুখি হলে পাণ্ডেজী শুধোয়- দিদি, তবিয়ৎ ঠিক হ্যায় না?
-জী হাঁ, বিলকুল ঠিক হু ম্যায়।
-কুছ চাহিয়ে তো বাতাইয়ে গা।
-জী জরুর ।
মাঝে মাঝে টিকিটবাবু সৌজন্য- চা পাঠায় দিখু মারফত। দেখা হলে প্রশ্ন করে- ভালো তো?
-হু,
-ফাদার ডিসুজা বলছিলেন আপনার কথা।
-আমার কথা? কি বলছিলেন? আমি কৌতুকে তাকাই।
-বলছিলেন খুব ভালো পড়ান আপনি ,ওনার স্কুলের বাচ্চারা নাকি খুব পছন্দ করে আপনাকে।
-তাই নাকি? আমি শব্দ করে হাসি, ভেতরে ভেতরেও হাসি ওদের কৌতুহল দেখে। ওরা যা জানতে চায় তার জন্য কত না কথার অবতারনা !
ওদের দোষ দিইনা । মানুষ তো এরকমই, কৌতুহলপ্রবণ। তাছাড়া আমাকে ওরা বুঝবে কি করে, আমি তো ওদের মত নই । ওরা কি করে জানবে যে আমার গভীরে একটা অতল আছে যে কেবলই আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে ,কেবলই বলে –তুমি থেমে যাও, চুপ করে থাকো, সরে এসো ভিড় থেকে, একা হও, অপেক্ষা শেখো ।
-অপেক্ষা? আমি প্রশ্ন রাখি।
-হ্যাঁ, অপেক্ষা। অনন্ত অপেক্ষা।
-কেন?
--কারণ অপেক্ষাই তো একমাত্র উপায় কাঙ্ক্ষিতকে পাওয়ার।
-কিন্তু কি চাই আমি?
অমনি সে অতল ডুবে যায় গভীরে।

অন্ধকার নেমে এসেছে ষ্টেশনে। দেখি এতক্ষণে চাঁদ নেমে এসে জড়িয়ে গেছে হাইটেনশন তারের জালে। সেদিকে চুপ করে চেয়ে থাকতে থাকতে আজ গান পায়। গেয়ে উঠি- আমি আপন করিয়া চাহিনি তবু তুমি তো আপন হয়েছো/ জীবনের পথে চাহিনি তোমায়-------।
দেখি গান শুনে দিখু এসে বসেছে পায়ের কাছটাতে। আগুন ভর্তি ভাঙ্গা কড়াইটা বাঁশের লগি দিয়ে ঠেলে নিয়ে এসেছে কাছে, যাতে দুজনেই ওম পাই। দিখুর এই এক গুণ। যারা একা থাকতে চায় তাদের ও একা থাকতে দেয়, বিরক্ত করে না। ও নিজেও তো কম একা নয়। শীতের মধ্যে এই খোলা প্লাটফর্মে একা একা প্রায়ই নিজের সঙ্গে কথা বলে ও।
গান থামিয়ে আমি ডাকি-দিখু—দিখু---
-ও গাঁজা খাওয়া চোখ তুলে তাকায়।
আমি জিগ্যেস করি- অপেক্ষা জানিস তুই? অপেক্ষা—অপেক্ষা—বুঝল ি না? ইন্তেজার রে ইন্তেজার, জানিস?
ও হাসে, বলে- সমঝা, সমঝা। জনম ভোর তো ওহি কর রাহা হু ম্যায়, দিদিমণি । ক্যা জানে কিসকে লিয়ে ।সুরতিয়া তো কব কা মর গয়া, ফিরভি হাম--- না জানে কিউ- এ কম্‌বক্ত ইন্তেজার---?
-ইন্তেজার খুব ভালো রে দিখু। দেখিস না আমি কেমন অপেক্ষা করি? লোকে কত কিছু ভাবে। কত কথা হয় আমাকে নিয়ে।
--হাঁ, হাঁ, সবনে আপকে বারে মে কুছ না কুছ সোচতা রহতা হ্যায়। মগর আপ তো কুছ অর হি টাইপ কা---, ইন্তেজার--- ইন্তেজার--, আদত সে মজবুর--- হা—হা—হা—
-কিন্তু অপেক্ষা কোথায় নেই বলত? দেখ, এই প্লাটফর্মটাকেই দেখ, অন্ধকারে পড়ে থেকে ও কি অপেক্ষা করছে না ভোরের ট্রেনের? কখন ট্রেন আসবে? কখন শব্দে শব্দে ভরে উঠবে এ চত্তর। পাণ্ডেজী হেঁকে বলবে—দিখু চা লে আ।
প্লাটফর্মে কুঁকরে শুয়ে থাকা কুকুরগুলোও তো অপেক্ষা করছে একটু ওমের । কখন ভোর হবে, সূর্য উঠবে, উষ্ণতায় ভরে যাবে ওদের শরীর। এমনকি গোটা রাকা মাইনসও অপেক্ষা করছে একটা সুদিনের।
কিন্তু আমি? আমি কি জন্য ? কার জন্য অপেক্ষা করছি? ভাবতে ভাবতেই দেখি অন্ধকার থেকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সুন্দরী অপেক্ষা। গায়ে তার ঘন নীল রঙা মাখলা, মুখে উন্মাদনা, চোখের তারায় অন্তহীন খোঁজ। ঠিক যেন স্বপ্ন।
তাহলে কি অপেক্ষা স্বপ্নেরই মত অন্তহীন? ঠিক জানা নেই আমার। তাইতো রোজ আসি এখানে। প্রত্যেক যাত্রীর মুখের দিকে চেয়ে প্রশ্ন রাখি বলুন না? বলুন না?----