ডাকপিয়ন

নুরেন দূর্দানী



হিম হাওয়ার দুপুরে কাঁপুনি দেয় কবিতার ডাক। প্রশ্ন দিয়ে ঝিমোয় কবি। অক্ষরের পর অক্ষর উত্তর দিয়ে যাই। ইনবক্স তখনো ফাঁকা! শুভ্র চিবুক উন্মুক্ত করে কালো মখমল ডানায় লালচে ঠোঁটের শঙ্খচিল ভেসে বেড়ায়। একটা গাছ ঠাই দাঁড়িয়ে থাকে ভালোবাসার শহরে। সানমুন বালিকার কথা মনে আছে? রোজ স্নাস ক্লাউড শহরতলি থেকে কাঁধেচাপা কিপিং-ব্যাগ লেটারবক্স নিয়ে যে এই শহরে আসে। আপন মনে মেট্রোলাইফের চিঠিগুলো নীলকন্ঠ সুরে পাঠ করে বালিকা।

প্রেরক মার্কো, চিঠিতে লেখা থাকে এমন:

‘পায়ের নখ দিয়ে মাটি খুঁড়ে যাই। বেশ কিছুদিন ঘুমহীন। সকালে সময় পেরোতে শুকনো টোস্ট কুড়মুড় শব্দ তুলে ব্ল্যাক কফির সাথে পেটে পুরছি। ভাবনায় থাকে দুপুরে আয়োজন করে খেয়ে নেওয়ার। অথচ রাস্তায় বেরিয়ে পড়লে হাটছি তো হাটছি। মনের ভেতর জমছে পাহাড়ি হিমবাহ। চারপাশের আবহে মধ্যস্রোত নিভে যাচ্ছে। যদি পুরোন বন্ধুর খোঁজ মিলতো! জানতে চাইতো আজ খেয়েছি কিনা কিংবা মুখ দেখে টের পেয়ে বলতো; ‘’তোর মতো আমারও মুখ ফুটে চাইবার জোর টুকু নেই। তবুও জানতে চাই, কেমন আছিস?’’ প্রশ্নটা বিব্রতকর হলেও, ইচ্ছে করে তবুও কেউ একজন বলুক! কেউ একজন জিজ্ঞেস করুক!’

সানমুন উড়োজাহাজ বানিয়ে মার্কোর চিঠি ঝুলিয়ে দেয় গাছের শাখায়। নতুন সুর তুলে প্রবীণ পার্থের চিঠির উপর হাত বুলিয়ে পড়ে যায়;

‘ট্রেনের অপেক্ষায়। এতো প্রযুক্তি এলো অথচ মিনিট পাঁচেক সময় হয়না কারো সাথে কথা বলার। সেই রকম সঙ্গও নেই। অবসর খুঁজে পাওয়া দায়। ইদানীং অতীতের দৃশ্য চোখে ভাসে, মায়ের কথা মনে পড়ে খুব। দূর বন্দর থেকে পাশের বাসার ল্যান্ডফোনে বাবার ফোন আসতো। মা’কে দেখতাম বিড়বিড় করে কথা বলতো, হু-হা বলেই ছেড়ে দিতো। খুব বেশিদিন ব্যবস্থাটা রইলো না। তখন সংসারে টানাপোড়ন লেগে থাকতো। তারই মাঝে মাসখানের মধ্যে ‘মা’ কিছু অর্থ জমা করে ল্যান্ডফোনের লাইন নেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে। আমলাতন্ত্রের ঝুট-ঝামেলা পেরিয়ে ছয় মাসের মাথায় বন্দবস্ত হলো ডিমান্ডনোট। বাড়িতে যেদিন ল্যান্ডফোনের লাইন সংযোগ হলো, সেকি আনন্দের দিন! আমাদের ল্যান্ডফোনের রঙ ছিলো র্ডাক-রেড। মায়ের আনন্দ খোঁজ নিতে পারবে স্বজনদের আর রোজ ফোন করবে বাবা। আমার আনন্দ ছিলো বাড়িতে ল্যান্ডফোন বাজবে, ক্রিং ক্রিং। লাইনম্যান সব বুঝিয়ে দিচ্ছে। আমি মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। লাইনম্যান চলে যাওয়ার পর ডার্ক-রেড ল্যান্ডফোনের প্রথম ফোনকলের রিং শুনতে আমিও মায়ের সাথে অপেক্ষায় থাকলাম। সেই রিং ক্রমাগত বেজেই চলছে ক্রিং ক্রিং… ক্রিং ক্রিং…’

অতন্দ্র সময়ের ভাষ্যে ফুল-পাখি বানিয়ে পার্থের চিঠিকে রেখে দেয়। আরো একটা চিঠি তুলে নেয় বালিকা। প্রেরকের নাম মিকা:

‘ভালোবাসি! ভালোবাসি তোদের! ভালোবেসেছিই তোদের!
পনেরো বছর পর শেষবারের মতো একটা চিঠি লিখছি। জানি না এই চিঠি পৌঁছাবে কিনা। রাতের আলোয় রিক্ত শীতের আকাশে নীলচে সবুজ বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, যদিও এতে বৃষ্টি হওয়ার কোন আশংকা নেই। ভালোবেসেছিস অফুরন্ত। বিনিময়ে তোদের বুকে গেঁথেছি অবজ্ঞা-মনঃক্ষুণ্ণ ব্যবহার্য শব্দ। প্রতিনিয়ত কতো কিনা করেছিস অথচ সবকিছু ফিরিয়ে দিয়েছি। সহৃদয় প্রপাতে এক অজানার প্রান্ত ধরে দাগ কেটে যায় নিরব ক্রন্দন। দিনকে দিন বেড়েছে তর্ক, ভুল বোঝাবুঝির রেশ। নিরবে মেনে নিয়ে এড়িয়ে যেতে হয়। সেইদিন বুঝিনি সময়ের সন্ধিতে ছাড় দিতে হয়। অতিরিক্ত ভালোবাসা মানুষকে পুড়িয়ে মারে। জ্বলেছি সে দহনে একদিন! ভেবে অবাক হই তিন জীবনের সূর্য ভিন্ন যাত্রা মেপে অস্ত দিচ্ছে। পনেরোটা বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। শেষ আলিঙ্গন হবে কি কোথাও ফের?’

স্ব-যত্নে মিকার চিঠিকে তারামাছ বানিয়ে নীলকন্ঠ সুরে গান গেয়ে যায় সানমুন। লালচে ঠোঁটের শঙ্খচিল ভেসে বেড়ায়। রোজ স্নাস ক্লাউড শহর থেকে ভালোবাসার শহরে চিঠি নিয়ে আসে বালিকা। সভ্যতা গড়ে ওঠে তবুও হোয়াংহোর আদিতে দু’কূলের দুঃখ আছড়ে পড়ে। ইনবক্স তখনো ফাঁকা! পারি থেকে আমাতে চলে যাচ্ছি, সেই সাথে এ-ঘর ছাড়চ্ছি। রজনীগন্ধার ঘ্রাণ কবির ঝিমুনি ভাঙ্গায়। নিজ্ব ঠিকানাই বড় স্বস্তির। তবুও বেখেয়ালি আমি, নৈঃশব্দে হাত রাখি তোমার কপালে। ডাকপিয়নের খোঁজ পেলে বলে দিও; ভালো লাগে নীল অপরাজিতা, ভাষামুকুট, কাগজের দোল আর ঐ কমলা পালকের বৃথিকা ফুল!