পথ চাওয়াতেই আনন্দ

অলোকপর্ণা




আমি কখনো অন্য কোনো রঙের পাগল দেখিনি। রাস্তার সমস্ত পাগলের রঙ ধূসর। তাদের থালা, বাটি, মগ ও তোষকের নিজস্ব যে পরিবার, সে-ও ধূসর । নিউটাউন সিটি সেন্টার পেরিয়ে বাস আরো একটু চলতে শুরু করলে প্রথম যে বাস স্টপ আসে, তার গায়ের সাদাকালো ছবিতে মুখোমুখি রবীন্দ্রনাথ এবং আইনস্টাইন বসে থাকেন। আইনস্টাইনের ছবির উপর লেখা থাকে, E= mC^2 আর রবীন্দ্রনাথের ছবিতে সেই সমীকরণের বঙ্গানুবাদ তাঁর নিজের সোনার হাতে লেখা,- “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে।”
অফিস থেকে ফেরার পথে সিগনালে বাস দাঁড়িয়ে গেলে দেখতাম, সাদাকালো রবীন্দ্রনাথ আর আইনস্টাইনের ছবির নীচে একই রকম ধূসর এক পাগল ফাঁকা বাস স্টপের বেঞ্চে শুয়ে আছে, জুলাইয়ের গরমেও তার গায়ে মোটা এক ধূসর জীর্ণ কোট। আর কানে কোথাকার এক হেডফোন ( যা কি না তার থালা, বাটি, মগ, তোষক, ক্রিকেট বল, মদের বোতলের ছিপি আর ড্যাম্প পড়ে যাওয়া এক প্যাকেট দেশলাইয়ের একান্নবর্তী পরিবারের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ) লাগানো। একটু খুঁজতে দেখতে পেতাম হেডফোনের জ্যাক বেঞ্চ থেকে নেমে মাটির কাছাকাছি শূন্যে ঝুলে আছে। বুঝতাম কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্ঠে “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে” বাজছে তার কানে। গান শুনতে শুনতে কখন যেন পাগলটা শান্ত হয়ে মুখোমুখি রবীন্দ্রনাথ আর আইনস্টাইনের নিচে ফাঁকা বেঞ্চে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
বাস এরপর চলতে শুরু করত রোজই। পাগলটা জেগে উঠলে তাকে কেমন দেখায় তাই আর দেখা হয়নি আমার। কিন্তু চোখ বুজলে আমি দেখতে পেতাম মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে পাগলটা রবীন্দ্রনাথ আর আইনস্টাইনের মাঝে ইন্টারপ্রেটরের কাজ করছে।
তারপর ঠিক যেমন হয়, সিগনালে বাস এসে দাঁড়াতে পর পর তিনদিন দেখলাম বেঞ্চটা ফাঁকা। ধূসর পাগলটা আর নেই। বুঝলাম, এতদিন ধরে যে বাসটার জন্য ও অপেক্ষা করছিল, সে এসে ওকে নিয়ে গেছে।


মেয়েটাকে ফেলে রেখে বারবার ট্রেন, বাস, ট্রাম, অটো, মানুষেরা চলে যায়। মেয়েটা চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরের বাস, ট্রেন, ট্রাম, অটো বা মানুষের জন্য প্রতীক্ষা করে। একটা সময় পর ট্রেন, বাস, ট্রাম, অটো বা মানুষ গৌন হয়ে যায়। মেয়েটা শুধু অপেক্ষা করার অপেক্ষায় থাকে।