মঙ্গলে নেই কিন্নর দল প্রতীক্ষা তবুও

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়



বিভূতিভূষণের ‘কিন্নর দল’ গল্পটা পড়ে অতনুর মনটা যেরকম দুঃখে ভেঙে, মুচড়ে, টুকরো হয়ে যেতো, তার কোনো যথেষ্ট কারণ কেবল ওই কাহিনীর ভিতরকার করুণতা ও ট্রাজেডিতে মজুত ছিল না। তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু বিষাদ খুঁজে পেতো তার মন, আর আত্মীকরণ বা স্বীয়বোধ। হবেই! তাদের নিজেদেরই একটা ছোটোখাটো কিন্নর দল ছিল যে! ছোটোরেলের গরিব ইস্টিশান মাস্টারের দুঘরা কোয়ার্টারে। সতেরো বছরের বড়দি চলে গেছেন শ্বশুরবাড়িতে। বাপের বাড়ি আসতে পারেন না। বিভূতিভূষণেরই ‘খুঁটিগাছ’ গল্পের বউটির মতই মাবাপ, ছোটো ভাইবোনদের তত্ত্বতালাস পেতে আকুল। খুব অনেকদিন পর পর মা চলেন মেয়ের বাড়ি, অতনুর সঙ্গে আর এক হাতে ছোটটিকে আর এক হাতে আটটা রসগোল্লা আর আটটা পানতুয়া নিয়ে। ইস্কুলের বাংলা বইতে দক্ষযজ্ঞের গল্পে সতীর কথা যতবার পড়ে অতনু ততবার বড়দির কথা মনে পড়ে। ইস্কুল থেকে ফেরার সময় ঘুরে কেদোর মাঠের দিকে চলে গেলে মাঠের মাঝে মাঝে দূরে উঁচুডাঙার চাষাগাঁর ধারে লালপেড়ে শাড়ি পরা মেয়েমানুষকে দেখে তার বুক ধক ক’রে ওঠে; মনে হয় বড়দি নয়তো! মেজদির বিয়ের সময় পাঁচছয় বছর পরে প্রথম বড়দি বাপের বাড়ি আসার সুযোগ পেলে, একতলার ছাদে একবছরের বড় খুড়তুতো দিদির সঙ্গে মাটির খুরি ধুতে ধুতে অতনু শোনে বড়দি এসেছেন। কাত্যানি এক দৌড়ে দিদির কাছে। অতনু স্থাণু, যতক্ষণ না বড়দি এসে মিঠে গলায় ডাকে — কি প্রফেসর! ছাদে দাঁড়িয়ে একা কাঁদছিস নাকি! কাছে এলিনা বড়! পিছন থেকে কি করে শোনে দিদি নীরব চোখের জলের শব্দ? সেই দিদি একেবার দূরে চলে গেছেন তাঁর পঞ্চান্ন আর অতনুর আটত্রিশে। দাদা তাঁর সাঁইত্রিশ আর অতনুর তেইশে। ও হ্যাঁ, অতনুর জন্ম ১৯৫০-এ। এখনও ব্যাটিং!

তখনও অবশ্য বাড়িতে মোতায়েন ছয় জনা। চোদ্দবছরের বড় জাহাজি বড়দাদা বছরের অধিকাংশ সময়ই বাড়িছাড়া। বিড়লাদের ইন্ডিয়া স্টিমশিপ কোম্পানির জাহাজে ফিফ্‌থ অফিসার। বাড়ি এলে রাজসূয়। কিন্তু বাকি সময় কি করে যে আঁটত ছোটো রেলের ইস্টিশান মাস্টারের দুঘরা কোয়ার্টারে বাবামাঠাকুমার সঙ্গে তিনদিদির ছোট তিন ভাইয়ের? দিদিদের দাপে তো ‘ঘরে জমিন ভেঙে ফেটে প’ড়ে উদধিমেখলা’। মেজদি কবিতা লেখেন, গান গান সব ধরণের, ছবি আঁকেন, মূর্তি গড়েন। জাহাজি দাদার আনা চকোলেটের মোড়ক জমিয়ে নৃত্যপরা মেয়েদের কাট আউট সাজান। অতনুকে গড়ে দ্যান মাটির সাবিত্রী-সত্যবান। রোগা, সব চে ফর্সা, খাওয়ায় মিরিকচিরে সেজদি রবীন্দ্রসঙ্গীতই গায় নিখুঁত সুর আর হাওয়া ভরা গলায়। আর ছোড়দি, অতনুর জীবনের ধ্রুবক, মিষ্টি আধুনিক গান, আর দাপুটে অভিনয়ে ইস্টিশান গঞ্জের লোক্যাল হিরোইন। নিচের তিন ভাইও কেবল মুগ্ধ দর্শক, শ্রোতা নয়। অতনু গাইতো, অভিনয় করতো বেশি। ছোটোটা দুধুভাতু। আবৃত্তির অর্ধেক পথে ভুলে যেতো। মেজদা ছিল কোরাসে, স্টেজ বানানোয়। বাড়ির জলসায় গমগম করতো ইস্টিশান মাস্টারের দুঘরা কোয়ার্টারের ছাদ। লাইন্‌সম্যান, পয়েণ্টসম্যানরাই কেবল শুধু নয়, ধারেকাছের অনেক লোকই দেখতে আসতো। কিন্তু মেজদি গেলেন তাঁর চব্বিশ আর অতনুর বারোয়, বাচ্চা হতে গিয়ে। আর ছোড়দি তাঁর চল্লিশ আর অতনুর চৌত্রিশে, জরায়ুর ক্যান্সারে। তিন ভাই আর রুগ্ন এক দিদিকে নিয়ে তাদের সেই কিন্নর দল কবে থেকেই ডানাভাঙা! ‘যে বাঁশি ভেঙে গেছে তারে কেন গাইতে বলো’।

অপেক্ষায় অপেক্ষায় কেটেছে কতকাল! ল্যাম্বের কবিতার সন্তাপে তার প্রতিধ্বনি খুঁজেছে অতনু। ‘I have had playmates, I have had companions,/In my days of childhood, in my joyful school-days,/ All, all are gone, the old familiar faces’।১ কতবার কত শোকের কবিতা নিজস্ব হয়ে গেছে! ব্লেক পড়ে তার শৈশবের ছুটে বেড়ানোর হারানো ঘাসজমিকে চ্যাপেল কিম্বা সমাধিস্তম্ভ ভাবতে শিখেছে সে; মৃত্যুকে ভেবেছে আলখাল্লা পরা পাদ্রী, কাঁটায় কাঁটায় তার আশা আর আনন্দের ফুলগুলিকে বোকেয় বেঁধে ফেলছে, সেই যখন থেকে পড়ে ফেলেছে এরকম ব্লেকীয় লাইন—

I went to the Garden of Love,
And saw what I never had seen:
A Chapel was built in the midst,
Where I used to play on the green.

And the gates of this Chapel were shut,
And Thou shalt not. writ over the door;
So I turn'd to the Garden of Love,
That so many sweet flowers bore.

And I saw it was filled with graves,
And tomb-stones where flowers should be:
And Priests in black gowns, were walking their rounds,
And binding with briars, my joys & desires.২


বারো, আট আর ছয় বছরের তিন দিদির মাতৃক লালনেপালনে শৈশব পেরোন অতনু রিভ্‌স- এর ‘The Little Brother’ নামের সেই তিন দিদির অমর কবিতার প্রথমাংশটি নিজের জীবনে বোঝেনি। —

God! How they plague his life, the three damned sisters
Throwing stones at him out of the cherry trees,
Pulling his hair, smudging his exercises,
Whispering. How passionately he sees
His spilt minnows flounder in the grass.

কিন্তু যখন James Reeves লিখলেন—

There will be sisters far subtler than these
Baleful and dark, with slender, cared for hands,
Who will not smirk and babble in the trees,
But feed him with sweet words and provocations,
And in the sleep practise their sorceries,
Appearing in the form of ragged clouds,
And at the corners of malignant seas.
As with his wounded life he goes alone,
To the world’s end, where even tears freeze,
He will in bitter memory and remorse,
Hear the lost sisters innocently tease.
৩ —

তখন সেই সূক্ষ্ণ, মোহময়ীদের সঙ্গেআসঙ্গেছলেকৌশলে বিপর্যস্ত অতনুর তার মরা গেঁয়ো দিদিদের অগাধ, অহেতুক ভালোবাসার মত, অন্যায় শাসন, অকারণ তর্জনও আর কিছুই ফিরে পাবে না ভেবে দুঃখ প্রবোধ মানতো না। জোকা-র ক্যানসার হাসপাতালে মৃত্যুর দুদিন আগে নিঃস্পৃহভাবে নাক খুঁটতে থাকা ছবছরের বড় ছোড়দির সঙ্গে এরকম কথোপকথন হতে পেরেছিলো—
— তুই তো এবার দ্বিতীয়বার মাতৃহীন হবি!
— জানি।
— ঠিক মতো থাকবি তো? করবী আর মেয়ের সঙ্গে?
— থাকবো!
— বেশি ভাববি না তো আমাকে? অপেক্ষা কর। আবার দেখা হবে।
— হ্যাঁ।

সে দেখা হয়নি আজ সাড়ে তেত্রিশ বছর। কতবার স্বপ্নে এসেছে কিন্নর দল। মৃত প্রিয়জনরা রাতস্বপ্নে এসেছে। অতনু দেখেছে একটা বড় মাদুরে সবাই আলস্যে শুয়ে বসে। আর অতনু তার সামনে দাঁড়িয়ে হৃদয়ে মনে অদ্ভুত শান্তি পেতে পেতেও মাদুরে উঠে পড়তে পারেনি। ভেবেছে বসতে পারবে না মাদুরে এখনই। টেনেছে পিছনে যারা, সন্তানরা, নাতিনাতকুড়, তারাও তো অপেক্ষাই করবে সে চলে গেলে। এই অপেক্ষাই তো চলছে যুগযুগান্তর ধরে। সেই অপেক্ষা আর তার বিরহ ধরে থাকে ধরা। ধরা কাঁদে অধরার জন্যে। মাদুরে তাই ওঠা যাবে না। মার্কেজের একশো বছরের নিঃসঙ্গতা গল্পের সেই জিপসি মেলকিয়াদিস (Melquíades)-এর উড়ন্ত কার্পেটের মত মাদুর চলে গেছে স্বর্গে। স্বপ্নেও কিন্তু অতনু পিছু নিতে পারেনি তার। বরং একটা অনির্দেশ্য ভয় জেগেছিল মনে। অপেক্ষামোচনের এই যাত্রা কি বিপজ্জনক? কতটা?
যায়নি কেন না স্বপ্নে ফিরে এসেছিল ‘Mars is Heaven’ নামের রে ব্র্যাডবেরি-র একটি গল্প, যেটি সত্যজিৎ অনুবাদ করেছিলেন ‘মঙ্গলই স্বর্গ’ নামে। মঙ্গলে সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পৃথিবী থেকে পাঠানো, সতেরো অভিযাত্রী, অ্যাটমিক বন্দুকে সশস্ত্র একটি ব্যোমযান মঙ্গলে নেমে সেখানে মঙ্গলীদের বদলে নিজেদের শৈশবের ছোটো অ্যামেরিকান শহর, তার মধ্যে নিজেদের শৈশবের বাড়ি, আর তাদের মধ্যে নিজেদের গান, ছবি, আসবাব, আর শেষে নিজেদের বহুকাল ধরে মরা প্রিয়জনদের তাদের মরার আগের চেহারায় দেখে আত্মহারা আর পাগল হয়েছিলো। স্পেসশিপের ন্যাভিগেটর রাস্টিগ দেখেছিল নিজের মৃত দাদু আর দিদাকে। প্রত্নতাত্ত্বিক হিঙ্কস্টন ... স্পেসশিপে পাহারায় রেখে আসা অ্যাটমিক বন্দুকধারীরা জাহাজের চারদিকে টুবা, ট্রাম্পেট, ব্যান্ড বাজানো অভ্যর্থনাকারীদের ভিড়ে নিজেদের মৃত মা, বাবা, ভাই, বোন ইত্যাদিদের দেখে আকুল হয়ে স্পেসশিপ থেকে নেমে এসেছিল। এমনকি ক্যাপ্টেন জন ব্ল্যাক নিজের মৃত মা-বাবা আর দাদা এডকে নিজেদের দেখে, নিজের Oak Knoll Avenue-এর পুরনো বাড়িতে ফিরে গিয়ে সাময়িক ভাবে বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছিল। তারা কেউ আর স্পেসশিপে ফিরতে পারেনি। পরদিন সকালে সতেরোটি কফিন মাটির গর্তে ঢোকানোর পর সমবেত মা, বাবা, ভাই, বোন ইত্যাদিদের সামনেই স্পেসশিপে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। রাস্টিগের ঠাকুর মা যখন তাকে বলেন— ‘Here we are. What’s life, anyways? Who does what for why and where? All we know is here we are, alive again, and no questions asked. A second chance’. কিম্বা এটাই স্বর্গ কিনা হিঙ্কস্টনের এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন — “Nonsense, no. It’s a world and we get a second chance. Nobody told us why. But then nobody told us why we were on Earth, either. That other Earth, I mean. The one you came from. How do we know there wasn’t another before that one?” — তখন ক্যাপ্টেনও সেটাকে ভেবেছিল ভালো প্রশ্ন। বাকিরাও কিছুটা বিশ্বাসও করেছিল। তাই আর ফিরতে পারেনি। আসলে নিজেদের শান্তিরক্ষায় মঙ্গলীরা পার্থিবদের স্বর্গ, ভালোত্ব, পারিবারিক মূল্যবোধ আর বিশেষ করে তাদের মৃতদের জন্যে অপেক্ষাকে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে আত্মসাৎ করে তাদের ঠকিয়েছিল আর ধ্বংস করেছিল।৩ ওরা ঠকেছিল, কারণ ওদের ওখানে চার্বাক আসেন নি। চাঁচা গলায় বলে যান নি — ‘ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ?’

তবু অতনু স্বপ্নে দেখে শরৎকালের সকালে আলোর ঢেউ বীণার তারে কাঁপন তুলছে। আমতায় বোসবাগানের মাঝখানে কাঁচা সরু রাস্তার শেষে বাড়ির সামনে মাঠে নওলা বাছুরটা খামোখা ছুটছে। দন্ডির মার মেটে ঘরের পিছনে শিউলিগাছটার নিচে পা রাখা যাচ্ছে না। দূরে কাকিমার ঘরে তাদের সেই প্রাক্-ট্রানজিস্টর যুগের মেঘমন্দ্র ‘সাগো’ রেডিওয় বাজছে ‘কে ফুটালে আলোর অমল কমলখানি’। আর তখনো শিশিরে ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে খালি পায়ে আসতে আসতে রোগা, লম্বা, শ্যামলা দিদি একগাল হেসে তাকে বলছে — কি রে পাগলা, একবার বেরিয়েছি। তাতেই খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিস? তোর আবার জ্বর আসবে না? কিম্বা তাদের দমদমের ফ্ল্যাটে নিজের মেয়েকে খাওয়াতে খাওয়াতে আর অতনুর মেয়ের গালে চুমকুড়ি দিতে দিতে অনেক উপরোধের পর ছোড়দি গাইছে — ‘শুধু কটি দিন ছায়া হয়ে ছিলে কাছে।/ সবই ভুলে গেছি তবু এইটুকু স্মৃতি আজো মনে আছে’।সামনে রাখা ফিলিপ্‌সের মনো টেপে উঠে যাচ্ছে ছোড়দির গলা। কতদিন ক্যাসেটের থেকে সে গলা খোলেনি অতনু। ক্যাসেটের দিনই নেই। কিন্তু মনের ক্লাউডে তোলা আছে ওই গান। এই মানুষের সঙ্গে আরেকবার কোথাও দেখা করার অপেক্ষা না করতে পারলে বাঁচা যাবে কী নিয়ে, অতনুর ছেলেমেয়েনাতিস্ত্রীকে নিয়ে ভরা জীবনে? সে দিন একবার দিদি তার অসুস্থ ভাইকে তার রান্না করা খাবারের একটা দানাও জোর করে খাইয়ে বলবে— আয় না বাবলু, একবার গান গাই। সেদিন কিন্নর দল একটু হলেও বেঁচে উঠবে। হোক না তা মঙ্গলের টেলিপ্যাথি!
সূত্র-ইশারা
১। https://www.poetryfoundation.org/poems/44519/the-old-familia r-faces, ১৪ই জানুয়ারি, ২০১৮ অভিগত।
২। William Blake, ‘Poems from the Notebook, V, in W.H. Stevenson (ed.) Blake: The Complete Poems, Third Edition (London and New York: Routledge, 2007), p. 152.
৩। James Reeves, Selected Poems (London: Allison & Busby Ltd., 1967, p. 23.
৪। Ray Bradbury, ‘April 2000: The Third Expedition’, in Bradbury, The Marxian Chronicles (New York and London: Simon and Schuster, 1945/1977) pp. 41-63; Best Science Fiction Stories 1949-এ সঙ্কলিত হওয়ার জন্য Bradbury এটিকে ‘Mars is Heaven’ নাম দিয়েছিলেন আর কিছু অদলবদল করেছিলেন, দ্রঃ Jonathan R. Eller, William F. Touponce (eds.), ‘Introduction’, in Ray Bradbury: The Life of Fiction (Kent (Ohio); London: The Kent State University Press, 2004), p. 20, এবং Appendix A, p. 455.