তবু কী ছিলো না তার

রুমা মোদক



সকালটা একটওু অন্যরকম ছিলো না, একটা ক্লান্ত দিনে ঢুকে পড়ার আয়োজন। ঘুম থেকে জাগা-কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুল যাওয়া, একঘেয়ে ক্লাস আর বাড়ি ফেরা,একটুকরো হুট করে ফুরিয়ে যাওয়া বিকেল আর কী বিরক্তিকর হোমওয়ার্ক করতে বসা সন্ধ্যা! কোন অপেক্ষা ছিলো না, কিচ্ছু না, কোনকিছু বদলে যাবার অপেক্ষা, কিংবা হঠাৎ কিছু একটা ঘটে পুরো দিনের আগাম সব রুটিন উল্টে পালটে দেয়ার অপেক্ষা।
যেমন হয় অপেক্ষাহীন শ্রান্তজীবন,চারদিকে বাঁশের বেড়ায় একটা রঙীন প্রজাপতি কিংবা ঘরের পাশে ব্যাঙের ছাতার সীমিত ছায়ার নিচে শৈশব খুঁজে ফেরা জীবনে আমার কোন অপেক্ষা ছিলো না।
একান্নবর্তী পরিবারে একমাত্র বাবার রোজগারে ৯ জনের পরিবারে বাবা সকালে বাজারের জন্য যে টাকা দিয়ে যেতেন, সস্তা মাছের পুনরাবৃত্তি ছাড়া কোন ব্যতিক্রম ঘটে না। অপেক্ষাহীন ম্যাড়মেড়ে এক শুরু........।
জীবনে প্রথম অপেক্ষার সাথে দেখা হওয়া এক শীতের কুয়াশামোড়া ভোরে। ১২ এর ঘর পেরিয়েছি কী পার হই নি, হাফপ্যান্ট পরা এক কিশোর রাজপুত্র সামনে দাঁড়িয়ে বললো তুমি না একদম শাবানার মতো। আমার শীত কাঁপানো শরীরে হঠাৎ অচেনা অদ্ভুত এক কীসের কাঁপন ছুঁয়ে গেলো......।মনের ঘর-দুয়ার-উঠান কাঁপিয়ে কেবলই শাবানা সেতার নিয়ে গাইতে থাকে 'সন্ধ্যার ছায়া নামে, এলোমেলো হাওয়া......।' আমি জানালায় উঁকি দেই কোথাও কী দেখা যায় তার একটুখানি পড়ে থাকা ছায়া, আমি পুকুরঘাটে রোদ পোহাই অনন্তকাল, সে কী এলো? শহরের উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী আর সে পড়া ফাঁকি দিয়ে সিনেমা হলে ঢুকে পড়া অবাধ্য কিশোর। যোজন যোজন দূরত্বে আমি পাক খেতে থাকি অপেক্ষায়....অপেক্ষায়..... প্রথম শিহরণে সব সম্ভব অসম্ভবের সীমানা ডিঙিয়ে।
সেই যে একজোড়া চোখের পতিত মোহে আধোঘুম আধো জাগরণের শিহরিত কাল যাপন তারপর আরো কতোকাল......। কতোবার.......।
ছোট্ট মফস্বল শহরটাতে রিক্সা চেপে স্কুলে যাই প্রতিদিন কেবল পিছনে তার সাইকেলের টুংটাং শোনার অপেক্ষায়। বিকেলে পাড়ার মাঠে তাকিয়ে থাকি বেহায়ার মতো তার র্যাকেট নিয়ে খেলতে খেলতে আড়চোখটা একবার দেখবো বলে। একবার কর্কটি তোলার অজুহাতে সিংহের মতো কেশর ফুলিয়ে তাকাবে সেই এক পলকেই বিনিময় হয়ে যাবে আমাদের সহস্র কথা। মা এসে চুল ধরে টেনে ঘরে নিয়ে যাবে, বসিয়ে দেবে পড়ার টেবিলে আর আমার এলজাব্রা, সুদকষা, শতকরা সব ভুল হয়ে যাবে একটি পলকের ইশারায়......।
অপেক্ষা ফুরোয় না আসলে,কক্ষনো না। কোনদিন না। যুবতী বেলায় সকাল না হতেই যে যুবক এসে দাঁড়িয়ে রইতো হলগেটের গ্রিল ধরে, গেস্টরুমে চোখের জলে ভাসতো আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না বলে, সেও দেখি দিব্যি সব ভুলে যায় সময়ের তালে। আমার জন্য আকণ্ঠ অপেক্ষায় থাকা মানুষটির জন্য অপেক্ষা ফুরায় না আমার।
আজ এই চুলে পাক ধরা বেলায় প্রত্যাশার আগুন উচকে দিয়ে যে হাত বাড়ায়, আমি আবিষ্কার করি কিছু সময় না যেতেই সে সময় খুঁজে লাভালাভ, হারিয়ে যায় হিসাব নিকাশের পাঁকে। 'শিশু ছিল, বধুটিও পাশে ছিলো তবু কী ছিলো না তার......' বারবার অপেক্ষার চোরাগলিতে পথ হারিয়ে নিঃস্ব ঘরে ফিরি, তবু কেনো পোড়া মনের অপেক্ষা ফুরায় না?
অভাগা সেই মানুষ,হারিয়ে ফেলা প্রেমিকাকে একনজর দেখার অপেক্ষা যার অন্তরে বেঁচে নেই কিংবা ভাণ করা জীবনের মালিক সেই মানুষ, যে বেমালুম অস্বীকার করে যৌবনের স্বর্ণালী অপেক্ষার সময়........। আমি জানি অর্থ নয় বিত্ত নয় অপেক্ষার অন্য নাম বেঁচে থাকা। আমি বাঁচি তাই অপেক্ষাতেই বাঁচি.....।