বিষাদের ডাকনাম

মাহরীন ফেরদৌস





বাড়িটি একতলা। দু পাশের দেয়ালে শ্যাওলার পুরু আস্তরণ। রঙ পিচ্ছিল সবুজ। মরচে পরা টিনের চালের একটি অংশ হেলে পড়ে আছে। যেন চোখে রোদ লাগবে বলে কেউ মাথার টুপিখানা বাঁকা করে পরেছে। সম্মুখের পুরানো দরজায় অতিকায় তালা ঝুলছে। উঠানের পাশে অবহেলায় বেড়ে উঠেছে গোলাপের ঝাড়। তাতে লাল রঙের গোলাপ ফুটেছে তারার মত।

আজকাল সে ভীষণ ব্যস্ত। নতুন আরেকটি ব্যবসা শুরু করেছে । অফিস সাজাচ্ছে। তার সাথে দু’মিনিট কথা বলার জন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হল প্রায় মাসখানেক। মাঝরাতে জেগে উসখুস মন ভাবতে থাকল সে না হয় ব্যস্ত আছে, তবে অন্যজন কেন আজও কোন খবর দিলো না? অন্যজন চলে গেছে বরফের দেশে। যেটুকু নীরবতা জমিয়ে রেখেছিলাম হাতের মুঠোয় সব খুলে দিলাম।

একদিন ছাইরঙা সন্ধ্যায় শহরময় হেঁটে বেড়ালাম অল্প কিছু টাকার খোঁজে। ঘরভাড়া বাকি পড়েছে, মুঠোফোন হারিয়েছে। চাকরি নেই। তারা আমার সাথে যোগাযোগ করে না। জঙধরা শরীর নিয়ে আমি বেঁচে আছি। আর দুঃখগুলো বৃষ্টির মত আমাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। হাঁটছি, হাঁটছি। এভাবে হেঁটে যেতে থাকলে চাঁদের দেখা পাওয়া। তারার সাথে গল্প হয়। গল্পে গল্পে আমার দম ফাটিয়ে হাসতে ইচ্ছে করে, কিন্তু আমি পারি না। হাসির গন্ধে আমি প্রবেশ করতে পারি না। পারি না অনেক কিছুই। যেমন তার সাথে কথা বলতে পারি না। অন্যজনের সাথে দেখা করতে পারি না।

সে মহোৎসবে নতুন ব্যবসার উদ্বোধন করে। অন্যজন বরফের দেশে কেনে একটা লাল-সাদা বাড়ি। এলাকার টান, অতীতের টান, মায়ার টান, সম্পর্কের টান ছেড়ে ওরা আজ কতদূরে। আমি শুধু চোখের মাঝে গল্প নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। হাঁটছি হাঁটছি। মুক্ত মনের ব্যস্ত স্মৃতি চষে বেড়াচ্ছি। লাল নীল হলুদ সবুজ।


আমাদের শোবার ঘর ছিল দুটো। বড় ঘরে আব্বা-আম্মা ঘুমাতেন আর অন্যঘরে আমরা তিনজন। ওরা দুজন খাটে আর আমি মেঝেতে তোষক বিছিয়ে। জানালা খোলা রেখে ঘুমালে মাঝে মাঝে আগন্তুকের মত জোনাকি পোকা ঢুকে পড়তো। জ্যোৎস্না গলে ঝরতে থাকত মেঝেতে। আমরা তখন নানান রকম গল্প করতাম। কিংবা বলা যায় আমি তখন নানা রকম গল্প শুনতাম। কারণ, ওরাই বেশি বলতো। আমি ছিলাম শ্রোতা। এই যে ঘুমানোর সময় ওদের দুজনের মাঝের নৈকট্য আর আমার সাথে ওদের দূরত্ব আঁকা ছিল। সেটা কি তবে পূর্ব নির্ধারিত ছিল? সে কারণেই কি আজও ওরা একে অন্যের কাছাকাছি আর আমিই শুধু অচেনা দূরত্বে বাসা বেঁধেছি? তারপরেও প্রলেপের পর প্রলেপ ফেলে নির্লজ্জের মত ফিরে ফিরে যাচ্ছি?

আমার খুব রাগ হয়। খুব রাগ। তাই এক রাতে হাঁটতে হাঁটতে আমি থেমে দাঁড়াই। সময় স্রোত দেখি। মনে মনে আব্বাকে গালি দেই। আম্মা কে গালি দেই। ওদের দুজনকেও গালি দেই। থমকে দাঁড়িয়ে থেকে জীবনের গতিময়তা দেখতে চাই আমি। মৃদু তর্ক জুড়ে দেই নিজের সাথেই। ডানে-বামে, সামনে-পেছনে দাঁড়িয়ে থেকে কোরাসে গালি দেই সবাইকে। তারপর থেমে থেমে আবার নিজের সাথেই তর্ক করি। একটা কুকুর বিকট শব্দে ডেকে উঠে হঠাৎ। কুকুরটা কি তবে গালি দিচ্ছে আমাকে? কুকুর চিৎকার করে গালি দিলে কেউ বুঝে না, মানুষ গালি দিলে হইচই পড়ে যায়। মানুষ কে তবে কেন শ্রেষ্ঠ প্রাণী বলে? আমি উত্তর খুঁজি। পাই না। অনেক ভেবেও কিছু পাই না। ব্যস্ত শহরে আমি আলোহীন রাতবাতির মত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি।

লাও বলেছিলেন-

“Become totally empty
Quiet the restlessness of the mind
Only then will you witness everything unfolding from emptiness”


সময় শূন্যতা, হৃদয় শূন্যতার পাশ কাটিয়ে আমি আবার হাঁটতে থাকি। রাস্তার এক প্রান্তের দেয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমি হাঁটতে থাকি সেই ছোটবেলার মত। দেয়ালের পর দেয়াল চলে আসে। আমি ছুঁয়ে দেই। ছুঁয়ে দেই। শব্দহীন কিছু আর্তনাদ আমাকে ধাওয়া করতে থাকে। আমি হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেই। আরও বাড়িয়ে দেই। এরপর আমি দৌড়াতে শুরু করি। যেন আমাকে ধাওয়া করছে নেড়ি কুকুরের দল। বড় বড় দম নেই। পেটের বাঁ দিক ব্যাথা করতে থাকে। তাও আমি দৌড়াতে থাকি। দৌড়াতে দৌড়াতে আমি এদিক সেদিক তাকাই। আমাকে অবাক করে দিয়ে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়। আমি থমকে যাই। তারপর আশ্রয়ের খোঁজে এলোমেলো পায়ে এগিয়ে যাই একটি অন্ধকার বাড়ির দিকে। কুকুরের পাল হারিয়ে গেছে। এখন শুধু পিছু নিয়েছে বৃষ্টি। বাড়িটি পরিত্যাক্ত, সেখানে কেউ নেই। পুরানো অতিকায় একটা তালা ঝুলছে। আমি হাঁপাতে হাঁপাতে ভেজা ইট দিয়ে বাড়ি মেরে মেরে সেটা ভেঙ্গে ফেলি। তারপর চোরের মত ঢুকে পড়ি বাড়িতে। বাতি নেই তবু ঘরে কেমন যেন মৃদু মরা আলো। দেয়ালগুলো নির্জীব। কান্নার মত ভেজা মেঝে। কে জানে কতদিন ধরে এই বাসাটি খালি পড়ে আছে। ইটের খাঁজে লুকিয়ে রেখেছে পঁচে যাওয়া হলুদ স্মৃতি। আমার খুব ক্লান্ত লাগে। আমি আশ্রয়ের জন্য ইঁদুরের মত গর্ত খুঁজি। কিছুই পাই না। একটা বড় ঘর পেরিয়ে আমি পাশের মাঝারি ঘরে চলে যাই। তারপর ভেজা মেঝেতে লম্বা হয়ে শুয়ে একটু একটু করে গুটিয়ে নেই নিজেকে।

হালকা বৃষ্টিতে বেরসিকের মত ডাকতে ডাকতে উড়ে যায় এক অজানা রাতপাখি। উঠানের পাশের গুল্ম থেকে ভেজা বাতাসে অল্প ঘ্রাণ ছড়ায় থোকা থোকা লাল গোলাপ। আমি মেঝেতে শুয়ে থাকি।

মরচে পড়া টিনের চাল বেয়ে দেয়ালে বেয়ে বৃষ্টির মত কান্না ঝরতে থাকে। বহু বছর পর এবার তার অপেক্ষা ফুরিয়েছে। আমি জানতে পারি না, বাড়িটি কাঁদছে। তার ইচ্ছে করছে আমার গায়ে মমতার উষ্ণ চাদর টেনে দিতে। তার ইচ্ছে করছে বাকি দুজনের কথা জিজ্ঞেস করতে। পাখির কলকাকলির মত এতদিনের জমানো গল্প বলা শুরু করতে। আমি জানতে পারি না, আমার চেয়েও দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প রয়েছে অন্য কারো।

যে আমাদের খুব ভালোবাসে...