কবির খোলশ

বারীন ঘোষাল

‘ অতিরিক্ত ’ একটা অসুখের অর্ধনাম । যে কোনো ব্যাপারের সাথে জুড়ে দিলে অসুখই
বোঝায় । টাকা যৌনতা লোভ মদ ক্ষমতা এমনকি কবিতাও , অতিরিক্তে অরুচি জন্মায় । রোজ অনবরত লিখে গেলে বা পড়লে একসময় মাথাটা ফাঁকা বোধ হয় । নসিয়াটিক , বমি পায় । মনে হয় কলম তুলে রাখি । কোথাও বেড়িয়ে আসি , ছুটি নিই । চলে যাই ভালোপাহাড়ে । কলকাতায় একজন কবিকে আমি জানি যে কলম খুললেই দশটা কবিতা বেজে ওঠে । তার প্রায়ই এই দশা হয় । আমার সঙ্গে ভালোপাহাড়ে গিয়ে চুপ করে শুয়ে থাকে । আমার হয় পড়ার অরুচি ।
ছোটবেলা মানে কিশোর বয়সের কথা মনে পড়ে । ভোল পাল্টে একজন কবির
গল্প শোনাই । গল্পের শুরুতে একটি কিশোর ক্লাসে বসে শিক্ষকের আবৃত্তি করা বাংলা কবিতা এবং তারপরে তার ব্যাখ্যা শুনছে । শহরেও হতে পারে , গ্রামেও হতে পারে । তবে গ্রামের অ্যাডভান্টেজ বেশি । প্রায় কোলের কাছে নিসর্গ এবং অচঞ্চল জীবনে কিশোরের বিস্ময় জাগানিয়া । তুলনায় শহুরে কিশোরের দুঃখ বেশি । চারদিকে লোহা , কাঠ , কংক্রিট এবং অসভ্য মানুষের সভ্য মুখোশ । এসব পেরিয়ে সে স্বপ্ন দেখে শান্ত নদীটির , পটে আঁকা ছবিটির আর মেলাতে চায় । দুজনেই কবিতা ভাবনায় । শিক্ষকের হাতে হাজার হাজার ছাত্র পেরিয়ে গেলেও ঐ দু-একজন মাত্র কবিতায় । প্রতিটি মানুষের মতোই কিশোরটির স্পন্দন প্রাথমিক ভাবে ছন্দে রণিত হয় । বাংলার জলবায়ুতে কী যে আছে কিশোরটি টের পায় – সেও ছন্দ মিলিয়ে কথা লিখতে পারে । লিখে দেখালে শিক্ষক , কখনো কখনো সহপাঠী এবং অভিভাবকও মুগ্ধ হয়ে উৎসাহ দেয় । সীমাজ্ঞানহীন কিশোরের অতিরিক্ত উৎসাহে সহপাঠী এবং অভিভাবকরা বিরক্ত হলে গোপনে কাজটি চলতে থাকে । সাধারণ মানুষের কাছে
কবি-পরিচয়টি গোপন করে এবং বাইরে তাকিয়ে সহমর্মী খুঁজতে থাকে । বই পড়ে ,
লেখে , নানা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় শুনতে পায় , স্বপ্ন দ্যাখে একদিন বিখ্যাত কবি হয়ে ওঠার । তার এই নির্দোষ আকাঙ্ক্ষায় কোনো পাপ ছিল না । সে তিলফুল নিয়ে ,
শিশির নিয়ে , নিমগাছটা নিয়ে কবিতা লিখল । তার কবিতায় এলো ধানের ক্ষেত , কাশ , চাষী , গরু , টিয়াপাখি , বাঁশবন , বেড়া , বাসন্তীদিদি , বাংলা শিক্ষক , পুলিশ , পুলিশের মেয়ে – তার বিষয়ের অভাব হয় না । একটু ফাঁকা হয়ে গেলেই রামায়ন ,
মহাভারত খুলে ধরে ।
কিশোর কাছের শহরে কলেজে ভর্তি হল । বাবা বিজ্ঞান নিতে বললেও সে লড়াই করে বাংলা ক্লাসে ভর্তি হল । মনে হল , গ্রামের কবিতার পুকুরটা হঠাৎ শহুরে সমুদ্র হয়ে উঠেছে । কত বই , কত কবি , কত পত্রিকা আর কবিতা । তার বদহজম হবার উপক্রম । এমন সময়ে দেখা হল অরুণদার সঙ্গে । দু-বছরের সিনিয়ার । কলেজের পত্রিকার সম্পাদক । একদিন টেনে নিয়ে গেল গঙ্গার চায়ের দোকানে । গ্রামে মনে হত সব কবিই মৃত , যাদের নাম শুনেছে বা পড়েছে স্কুলের বইয়ে । গঙ্গার দোকানে একদল জ্যান্ত কবি দেখে সে বিমূঢ় হয়ে পড়ল । অরুণদা বলল – কই , কী কবিতা লেখো সবাইকে শোনাও । সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল অরুণদা ।
কিশোর ইতস্তত করে দুটি কবিতা শোনালো । কোনো মন্তব্য না করে অন্যরাও কবিতা পড়ল । চা সিগারেট আড্ডা । এসব হয়ে যাবার পর অন্যরা বিদায় নিলে অরুণদা কিশোরকে আটক করল ।
অরুণদা – তুমি কবিতা লিখছ না কবিতার ভাষায় গল্প প্রবন্ধ ?
কিশোর – সেরকম তো ভাবি নি ।
অরুণদা – তোমার হবে , বুঝলে , তবে কিছু জ্ঞান দেবো , টিচাররা দেবে না ।
কিশোর – তাই দিন । আমি শুনব ।
অরুণদা – সিগারেট আনো এক প্যাকেট । নেই ? তবে বিড়িই আনো । গঙ্গা – চা । আচ্ছা বলো , কবিতা কাকে বলে ?
কিশোর – এই যা লিখছি । আর তো জানিনা ।
অরুণদা – কেন লিখছো ? ফুটবল খেলো , প্রেম কর , মাস্তানি । এসব না করে ...
কিশোর – না কোন ফায়দার জন্য না । ইচ্ছে হয় তাই । মনে হয় এটাই পারি ।
অরুণদা – কচু । বিশ্বে , বাংলায়ও , প্রথম পদ্যে ছন্দ মিলিয়ে ঈশ্বর-পুজো , স্তব , বাণী , ধর্ম , রাজার স্তুতি , সমাজ-ইতিহাস , পুরাণকথা , নাটক , উপন্যাস , গল্প-কাহিনী লেখা হয়েছে । বাংলা গদ্য দাঁড়িয়ে যাবার পর গল্পগাছা পদ্য থেকে বিদায় নিলে বাকিটুকুই কবিতা হয়ে রয়েছে । তুমি তাই কবিতা থেকে গল্পগাছা ভাগাও ।
কিশোর – তাহলে থাকবে কী ?
অরুণদা – গল্প ছাড়া জীবনে কিছু নেই নাকি ? সিনিয়ার কবিদের বই পড়ো , সমানে পড়ো , ইংরিজিও পড়ো । রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ পড়ো । প্রবোধচন্দ্র সেনের বই পড়ো । বুদ্ধদেব , জীবনানন্দ , সব পড়ো , আধুনিক কবিতা পড়ো ।
কিশোর – এত সব পাবো কোথায় ?
অরুণদা – লাইব্রেরী । কিছু মানুষের প্রাইভেট কালেকশান । তাদের বাড়িতে বসে ।
কিশোর – অরুণদা , আপনি আমাকে পথ দেখান ।
অরুণদা – সব পড়ো । আর নিজে রপ্ত কর ছন্দ । সমস্ত ছন্দ । কবিতার ব্যকরণের সমস্ত অংশগুলো ব্যবহার করা শেখো । প্রবোধচন্দ্র পড়ো আর বড় কবিদের সঙ্গে মেলাও । লেখো আর ফেলে দাও । লেখো আর ফেলে দাও ।
কিশোর কবি তখন তরুণ । দু-চার বছরের লড়াইয়ে সে বেশ নাম করেছে কবিতায় । তার অনবরত পরিশ্রমে প্রয়োগের ক্ষেত্রে উপমা , প্রতীক , রূপক , চিত্রকল্প , অলঙ্কার , বিশেষণ , ছন্দ , লিরিকে বেশ দক্ষতা অর্জন করেছে । সেও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে । তার একটি দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে । নানা পত্রিকায় তার কবিতা ছাপা হচ্ছে আর প্রশংসা হচ্ছে । সে নিজের ভূমিকাটি সমর্থনের জন্য সমস্ত যুক্তি , তর্ক , আয়ত্ব করে ফেলেছে । এমন এক সুদিনে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল এক সাধুর । পাড়ার দোকানে চা খেতে খেতে এইসব কথা হল ।
সাধক জিজ্ঞেস করলেন – তুমি কি কর বাবা ?
কবি বলল – আমি কবিতা লিখি । রচনা করি ।
সা – তুমি কবিতা দেখেছো ? শুনেছো ?
ক – না । আমি কবিতা সৃষ্টি করি ।
সা – তোমার আত্মবিশ্বাস আমাকে মুগ্ধ করেছে । আমাকে তোমার কবিতা দেখাতে পারো ? কবে থেকে আমি দেখার জন্য পাগল । সাধনা করে চলেছি পথে পথে ।
ক – সে কী ? সন্দিগ্ধ মনে কবি একতারা কাগজ বের করে ধরল সাধকের সামনে । এই দেখুন ।
সা – এ তো কিছু আঁক মনে হচ্ছে । না ?
ক – হ্যাঁ । পড়ি ?
সা – দাঁড়াও দাঁড়াও , রোসো । নানা কাগজের আঁক দেখে মানসিকভাবে একটা বাড়ির বা অট্টালিকার আয়তন বোঝা যেতে পারে , বা স্বপ্নের বাড়িটাকে আঁকে নামানো যেতে পারে । কিন্তু বাড়িটা পড়া তো যাবে না । বাড়িটাই তাহলে পড়ে যাবে ।
ক – বুঝতে পেরেছি । ( স্বান্তনার স্বরে ) আপনার দোষ নেই । আমি পড়লেই আপনি টের পাবেন বিমূর্ত মূর্তিটি । ধৈর্য ধরুন ।
সা – মূর্তি ! সে তো কুমোররা বানায় ভগবানের । ভাস্কররা বিমূর্তি করেন । ভাস্কররা কল্পনা থেকেই বিমূর্তি করেন । তুমি কি কবিতা কল্পনা করে বিমূর্তি করেছো ? তোমার সৃষ্টি কি কাল্পনিক ?
ক – না , সাধক বাবাজী । আপনি বেশ হার্ডনাট মশাই । একটু নরম হোন । পড়ি । একেই কবিতা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ থেকে জয় গোস্বামী ।
সা – জয় হোক , জয় হোক । নিরাকার ঈশ্বর আকার পেলেন , নিরাকার কবিতা আকার পেলো – এজন্যই কবিকে ঈশ্বরের বরপুত্র বলা হয় । আমার জীবন সার্থক হল বাবা । পড়ুন , পড়ুন । আপনার কবিতা পড়ুন । আমি চোখ বুঁজে শুনি আর কবিতা দর্শন হোক । মা , মাগো !
সাধক চোখ বুঁজলে আমাদের তরুণ কবি পাগল সঙ্গ ত্যাগ করে তক্ষুণি পাততাড়ি গোটালো । কিন্তু তার ঘুম চলে গেল । রবীন্দ্রনাথ , বুদ্ধদেব , জীবনানন্দ , নীরেন্দ্রনাথ , মণীন্দ্র , বারীন , মলয় , সমীর , প্রভাত সবার গদ্য বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে বিভ্রান্ত কবি টের পেল তার আত্মবিশ্বাস চলে যাচ্ছে । সে তার নিজের কবিতার দিকে ফিরে পড়ে যুক্তিযুক্ত শব্দাবলী দিয়ে গভীর উপলব্ধি সিদ্ধান্ত আর উপদেশ ছাড়া কিছু পেল না । অথবা , দৃশ্যবর্ণনা , প্রেম ও বঞ্চনার ব্যথা ছাড়া আর কিছু । কবি দেখলো এই প্রথম সে তাড়িত হচ্ছে । সে উদভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াতে লাগল , অস্থির , প্রেমে অসন্তুষ্ট হল , মঞ্চলাভের দাম দেখে রেগে গেল । দেখতে পেল , কৃষ্ণনগরের মূর্তির মত একই ছাঁচে হাজার হাজার কবিতা হাজারটা পত্রিকার পাতায় পাতায় ছড়ানো । সব কিছুর , সব শব্দেরই মানে আছে , সব কবিতাই ব্যাখ্যা করা যায় , সমস্ত ব্যাখ্যাই যুক্তিযুক্ত । কিন্তু হাজার হাজার আজকের বা পঞ্চাশ বছরের আগেকার বা একশ বছরের ব্যাখ্যা এক হয়ে যাচ্ছে । ব্যাখ্যার মধ্যে কবির শিল্পবোধ আর মননশীলতা সমাধি পাচ্ছে । ব্যাখ্যা করা হচ্ছে গদ্যে আর সেসব একাকার হয়ে যাচ্ছে । তা রাজনীতিকের না মাফিয়ার না সাংবাদিকের না যুদ্ধবাজের তা পৃথক করা যাচ্ছে না । কবি শংকিত চিত্তে চেয়ে থাকল তার কবিতার দিকে । কোনটা জীবনানন্দের রিমেক , কোনটা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের , কোনটা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের । আর কোনটা যেন কবিতার রিমিক্স । অন্য মুখে খিচুড়ি কবিতা । চারপাশে কান পেতে কবি গানের রিমিক্স , নাচের , অঙ্কনের , বক্তৃতার , রাজনীতির , সিনেমার , বঞ্চনার , অপমানের , সেক্সের - এইসব দেখতে পায় । মাথা খারাপ হবার জোগাড় । তার কবিতা লেখা মাথায় উঠলো । সিনিক হয়ে পড়ল সে । তরুণতর এক কবির সাথে দেখা হতে বলল – কি হে , ওসব লিখছ নাকি এখনো ?
তরুণ কবি – হ্যাঁ দাদা । ওই । তবে একটু অন্যরকম । আপনার মত না ।
ক – মানে? কি রকম ?
ত ক – মানে তো নেই দাদা । কবিতায় মানে-ফানের চল উঠে গেছে । কবিতার কোন মানে হয় না । বোঝার কোন ব্যাপার নেই বলে সহজ হয়ে গেল না ?
ক – কই , দেখি দেখি , শোনাও তো ।
ত ক – দাঁড়ান , আগে গোটা কয় কথা পরিষ্কার হোক । আপনি কোন দলে ? আপনি কবিতাকে সাকার ভাবেন না নিরাকার ? আপনি কবিতার মূর্তিকে মানেন ?
ক – সে কী হে ! তুমি তো বেহ্মদের মত কথা বলছ । আমি তো হিঁদু । কিন্তু এক সাধক আমার টেড়া ঘাড় সোজা করে দিয়েছে । এখন আমি বিভ্রান্ত ।
ত ক – সমাজের অবস্থার কতকগুলো চিহ্ন বা ইন্ডিকেটর আছে । যেখানে দেখবেন জনযুদ্ধ গোষ্ঠী থানা গেড়েছে , বুঝবেন সে অঞ্চল দারিদ্রপীড়িত , সেখানে উন্নয়ন দরকার । যখনই দেখবেন বাংলা কবিতার রিমেক , রিমিক্স হচ্ছে , বুঝবেন কবিতা দ’য়ে পড়েছে । একটা নতুন পরিসর দরকার যেখান থেকে আবার নতুন ধারা তৈরি হবে । বাংলা কবিতা এবং বিশ্বকবিতার ইতিহাসে তা-ই হয়েছে বারবার । এখন সেই সময় । এটা আপনি মানেন কি না ?
ক – কার বই থেকে ঝাড়ছ বল তো ? বেশ বলেছ । আমারও তাই মনে হচ্ছিল ।
ত ক – তাহলে একেবারেই অন্য কিছু লিখতে হবে । তাই না ?
ক – কী দরকার ? লিখে কী হয় ?
ত ক – ওই তো , আপনি সিনিক হয়ে গেছেন । দু-চারটে পুরষ্কার পেলে আর এমন বলতে পারতেন না । আত্মবিশ্বাস ফিরে আসতো ।
ক – ফাজলামো হচ্ছে ? আমাকে সিনিয়ার মানো না দেখছি । বরং কবিতা শোনাও ।
ত ক – ( গলা খাঁকড়ে ) পড়ছি । কবিতাটার নাম – সিকিমিদিনি ।
মিষ্টি কু-কার
আশানল ছড়িয়ে পড়েছে
সঙ্গে টগবগ রোদপালার হিমাই
কুয়াশায়নের ট্রেকিং আজ পদ্য পায়ে ভার্সে ভার
পাহাড়ের হিলে পাহাড়ের চুলে চোরাগোপ্তায় পা - ইন
মে-বেলা
সিকিমিদিনি ......
ক – ( চোখ গোল গোল করে ) হয়েছে ?
ত ক – আজ্ঞে ?
ক – বলছি কি , হয়েছে , না আরো আছে ? এসব কী পড়ছ তুমি ? এসব কী কবিতা ?
ত ক – হ্যাঁ দাদা । এই তো আজকের কবিতা । পুরোটা শুনলেন কোথায় ?
ক – থামো । এর কী মানে ? কোন কিছুই বোঝা যাচ্ছে না । এটা অনুবাদ করতে পারবে ?
ত ক – অনুবাদযোগ্যতাই কি কবিতার প্রমাণ ? প্রাথমিকভাবে যে কোন ভাষায় লেখা কবিতাই কি অনুদিত নয় ? কবিতা তো একটাই । একশ ভাষায় তার একশ প্রাথমিক অনুবাদ হয় । তারপর অন্যভাষায় তার দ্বিতীয়বার বা তৃতীয়বার অনুবাদ হয় । যেমন কবিতা একবার ফরাসী ভাষায় অনুবাদ হয়ে শরীর পেলো । তা থেকে ইংরিজিতে , তা থেকে বাংলায় - তা পড়ে বোৎলার নিয়ে আপনি ‘ খাসা খাসা ! ‘ বলে উঠলেন । কবিতা একবার হলে দ্বিতীয়বারও অনুবাদ হতে পারে ......
কবি তার কিশোর বয়সের নিষ্পাপ জগৎটা দেখতে পাচ্ছে । কিছুই জানা ছিল না – সেই অবস্থার স্বপ্ন আর আজকের বাচস্পতি তরুণের সবজান্তা অবস্থায় কত পার্থক্য ! এই তরুণের আত্মবিশ্বাস কত তুঙ্গে । হয়তো ঠিকই বলেছে । তবু এক অস্পষ্ট ধোঁয়ার মধ্যে আড়াল চায় মন । বাকবিতন্ডায় সময়ক্ষেপের চাইতে অনেক মধুর সেই হারিয়ে যাওয়া উদাসী রাজপাটের জলাঞ্জলি ।
ত ক – কি হল দাদা , শুনছেন ? ঘুমোলেন নাকি ?
ক – অ্যাঁ ? না চোখটা লেগে এসেছিল । তো , কবিতাটা কী নিয়ে ? মানে কী ? সিকিমিদিনি কাকে বলে ?
ত ক – যাচ্চলে ! এই যে কথা হল , কবিতার বিষয় হয় না , মানে হয় না , বোঝার ব্যাপার নয় , কবিতা কোন বাণী না , সিদ্ধান্ত না , মন্তব্য না , উপলব্ধি না ......
ক – সবই নেগেটিভ ? শূন্যতা ? তাই ঢং ঢং করে বাজছে । শূন্যকুম্ভ । এটা কোন ভাষার কবিতা শোনালে হে ?
ত ক – সেকি ! একটু আগেই তো আপনি মানলেন যে কবিতার মানে হয় না ।
ক – ও , তাই নাকি ? ওটা অভ্যেস । তর্কে একরকম , অভ্যেসে অন্য । যার মানে বুঝতে পারি সেসব কবিতা আর কবিকে পছন্দ হয় । সেসব আমাকে ছোঁয় স্পর্শ করে ......
ত ক – কোথায় ? কোথায় ছোঁয় ?
ক- এখানে ( বুকে হাত দিয়ে ) ।
ত ক – হতেই পারে না । কান আর চোখ দিয়ে কবিতা ঢোকে । ছুঁতে হলে মাথায় ছোঁবে । হার্টে তো ইন্দ্রিয় দারোয়ান নেই । অনেকে বলে বুকের রক্ত দিয়ে কবিতা লেখা হয় - তারা ভাট বলে । অনেকে আবার পেন্ডুলাম কবিতা শুনতে শুনতে শরীর কাঁপন থামাতেই পারে না । তাদের ই সি জি করানো উচিৎ ।
ক – পেন্ডুলাম কবিতা আবার কি ? কত নতুন শব্দ শুনছি !
ত ক – সে কি ! শোনেন নি আগে ? মধ্যবিত্তের বাম দশা আর ডান দশার মধ্যে দোদুল্যমান কলম - বিপ্লবীও মনে হবে , বুর্জোয়াও মনে হবে , আবার মধ্যখানের ক্রসওভারের সময় আপনার যৌনতাও ছুঁয়ে যাবে । সবই তো তাই হচ্ছে ।
চেয়ে দেখুন না ।
ক – তোমার সিকিমিদিনিকে তুলে ধরার জন্য অন্যকে খাটো করছ কেন ? তোমরা আসলে ব্যকরণটাই জানো না । ছন্দজ্ঞান নেই , ভাষাজ্ঞান তো দূরের কথা । আবোল তাবোল লিখে পাঠক ভাগাচ্ছো ।
ত ক – আপনার তো এসব শিক্ষা দক্ষতা আছে । আপনি কবিতার ওপর বীতশ্রদ্ধ কেন দাদা ?
ক – জানিনা । কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে । সব পণ্ডশ্রম মনে হয় । কবিদের জগতে সেঁটে থাকাটা একটা নেশার মত , জানো ? নেশাটা কেটে গ্যাছে । দূরে দাঁড়িয়ে ওই ইঁদুর-দৌড় দেখে হাসি পায় । আবেগপ্রবণ উদাসী মধ্যবিত্ত বাঙালির কান্নাকাটি জীবনানন্দ করে গেছেন , তাতেই মজে থাকতে ভালো লাগে । আপন মনে হয় । কেরিয়ার নিয়ে তো ভাবিনি । ভুল করেছি না ঠিক করেছি , বুঝতে পারি না । বিভ্রান্ত এখন । যা সব জানতাম তা-ই আর ভালো লাগে না । নতুনে মন দেব কি করে ? কেন কষ্ট করব ? সিকিমিদিনি সিকিম-দিন-মেদিনী – সিকিমের রোজনামচা – এসব মিশে তৈরি ?
ত ক – ( উদ্দীপিত হয়ে ) হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক ভাবছেন । আর একটু ভাবুন । এগোন ।
ক – দেখো আমার রক্ষণশীল ভঙ্গীটা সরিয়ে নিলে আমিও পারি । কিন্তু কেন কষ্ট করবো ! অ্যাভারেজ মধ্যমেধার মানুষ আমরা । আমাদের সমাজ তার প্রাচীন অভ্যাস ছাড়বে কেন ? এত বছর ধরে একটা ভাষায় স্থির শব্দে কমুনিকেট করছি ...
ত ক – তাই কি ? এর মর্ম এই না কি যে , শাসকই সাকসেসফুল ! প্রতিষ্ঠানেরই ক্ষমতা আর অধিকার আছে ভাষা বলবৎ করার , অভিধান লেখার , ক্রিয়াভিত্তিক বাংলা ভাষা থেকে বানান সংহার করে ‘ এক ভাষা এক জাতি ‘ তত্ত্বে দাঁড় করাবার ?
ক – বানান সংহার না , সংস্কার ।
ত ক – না সংহার । তাই সিকিমিদিনির মানে হয় না । অথচ আপনার মতো রক্ষণশীল কবিও ধ্বনি সাযুজ্যে শব্দটার কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন । ইচ্ছা থাকলেই পারেন ।
ক – কি হবে এটা কালচার করে ? এছাড়াই তো বেশ আছি । তুমি বেকার হাল ধরে আছো ।
ত ক – নয়তো ভেসে যাবেন । কবিতা না লিখে কষ্ট পাচ্ছেন , অথচ একটা নতুন আবিষ্কারের আনন্দে ভেসে পড়লে ভালোই লাগত ।
ক – একজনকে নিয়ে এতটা সময় দিলে তোমার সারা জীবন লেকচার দিয়েই কেটে যাবে । আচ্ছা নাছোড়বান্দা তুমি ! অবশ্য কথাগুলো তোমার ভালো লাগছে বলেই শুনছি । নয়তো কবেই কেটে পড়তাম । ঐ কবিতার যতটুকু শোনালে তার প্রতিটি শব্দই অনির্দিষ্ট । একটি কুয়াশা পাহাড়ের পথে হাঁটছে - টের পাবার অসুবিধে নেই । মানে কী , অভিধানে নেই কেন , কোন ভাষা – এসব গা জোয়াড়ি প্রশ্ন তোমাকে করছিলাম উস্কে দিতে , নিবৃত্ত হয়ে যাতে পালাও । তোমার ধৈর্য দেখে আমি মুগ্ধ । আমি জানি অনুবাদ হবে , কেন হবে না – মিষ্টি কোয়েলিং কবিতাটি কনসিভ করতে পারলেই হবে । তবে এইসব বাধা আর প্রশ্নের সম্মুখীন না হলে তোমার ট্রেকিংও স্বচ্ছন্দ হবে না ।
ত ক – পারেনও মশাই ! এই সোজা কথাটায় এত ঘুরিয়ে পৌঁছলেন যে , হতাশ হচ্ছিলাম । তাহলে পুরো কবিতাটা শোনাই ?
ক – দাঁড়াও দাঁড়াও , যেটুকু দিয়েছো এক সপ্তাহের জন্য ওই ক’টা দাগই যথেষ্ট । তারপরেও মাথা পুরোপুরি সুস্থ থাকলে তোমাকে ডাকবো খন । চলি ভাই – আশানল দাবানল আশানল দাবানল কুয়াশা আশা আগুন অনল – গুলিয়ে না যায় ...