রবিবাসরীয় গল্প

শতাব্দী দাশ



ঘর ঝাড়তে গিয়ে ঈশানী লক্ষ্য করল, বই-এর আলমারির পিছন দিকটায় ড্যাম্প। রোজ ঘর ঝাড়ামোছা হয় না। ছুটির দিন ছাড়া ভালো লাগে না। ছুটির দিনেও ভালো লাগে না আসলে। কিছুই ভালো লাগেনা।
ঈশানীর শাশুড়ি দময়ন্তী রোজই নিখুঁত পরিষ্কার করে নিজের ঘরের প্রতি কোণা। ভোর ছটায় বিছানা চাদর ঝেড়ে শুরুওয়াত। বেডশিটে আলগা ঝাড়ন বোলানো নয়। চাদরটাকে সম্পূর্ণ তুলে ফ্যালে সে।তোষক বালিশ দমাদম পেটায় ছোটোঝাঁটা দিয়ে। তারপর ম্যাজিশিয়ানের মতো বেডশিটটার দু’প্রান্ত ধরে ঘোরায় বার কয়েক। যেন তার থেকে বেরোবে কোনো অতিকায় জন্তু । উত্তর-ঝাড়াঝুড়ি সময়ে সেই নিভাঁজ বিছানায় বসতে ভয় লাগে। মহান কোনো মানুষ মরে যাওয়ার পর তার বিছানা বালিশ যেভাবে অব্যবহৃত অবস্থায় সংরক্ষিত হয়, সেই অবস্থায় সে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেই নিজের বিছানাকে, প্রতি সকালে। দময়ন্তীর স্বামী অতুল্য বারান্দার চেয়ারে ব’সে কাগজ পড়ে। বিছানায় বসে না ভুল করেও। সকাল সকাল বিছানা ভাঁজ খেলে অশান্তি বাঁধা। অতুল্য বাধ্য সারমেয়র মতো দময়ন্তীকে ভালোবাসে। একরকম অসহায় মোটাবুদ্ধি ভালোবাসা, যা ঈশ্বরবিশ্বাসের সমতুল। দময়ন্তী যা যা বলে, করে, সব সংসারের মঙ্গলের জন্য- এই বিশ্বাস তার জীবনকে নিরুপদ্রব করেছে। দময়ন্তীর বেড়ে দেওয়া ভাত খেয়ে আপিসে যাওয়ার নিশ্চিন্দি দিয়েছে।
মণির মা এসে ঘর ঝাঁট দিয়ে মেঝে মুছে গেছে ভোরবেলায়। তার পরেও, রান্নার ফাঁকে ফাঁকে, দময়ন্তী নিজে এসে আবার ঝাড়ু লাগায় মেঝেতে । ঈশানী অবাক হয়ে দেখে- কেমন ঠং করে খুন্তির এক ঘায়ে কড়াই-এর মুখ থেকে ঢাকা খুলে ফ্যালে তার করিৎকর্মা শাশুড়ি ! খুন্তির কোণায় তোলা ক’ফোঁটা ঝোল চেখে বিরক্ত চোখে গর্ব ঝিলিক দেয়। ঝিলিক মেলাতে না মেলাতেই আবার দৌড়ে শোবার ঘর। দময়ন্তী মধ্য পঞ্চাশ। দুঁদে গৃহিনী। দশহাতের আটটিতে ঝাঁটা, খুন্তি,বড়ি দেওয়ার বিউলি-বাটা, আচার শুকোনোর বয়াম, টিভির রিমোট ইত্যাদি কল্পনা করে ঈশানী। বাকিদুটিতে স্বামী-পুত্রের ঘেঁটি ধরা। এই মুহুর্তে গুনিনের ক্ষিপ্রতায় ঝাড়ু চালাচ্ছে দময়ন্তী । যেন আণুবীক্ষণিক ধূলিকণা নয়, অদৃশ্য ভূত খ্যাদাচ্ছে। ঈশানীর ঘোর লাগে , দু’পা নড়বড় করে, মনে হয় দেহ থেকে আত্মা বেরিয়ে এসে ধুলোয় ভর করে উড়ে যাবে।
ঈশানী সংসার করতে এসে প্রথম কদিন খুব চেষ্টা করেছিল, ঝেড়েঝুড়ে ঘর পরিষ্কার রাখতে। বিয়ের উপহার, নতুন জামাকাপড়, যৌথ বইপত্র। তারপর কী যে বিষম এক অনিচ্ছে ভর করল! বস্তুত ঘর গোছাতে নয় শুধু, ঈশানীর কোনোকিছুতেই মতি নেই। সংসারে না, বইপত্রে না, চাকরিতে না, রান্নাঘরে না, উদ্ভাসেও না। ঈশানীর উদ্ভাস ছিল ফর্সা,রোগা চেহারার, এইমাত্র কান্না ফেলে উঠে আসা এক যুবক। খুব মায়া মায়া বিকেলে হেঁটে এসেছিল তার জানালা-জীবনে। এমনিতে আশৈশব সে জানালার পাশে একলা হওয়া অভ্যেস করেছিল, একলা হয়ে অনির্দিষ্ট কিছুর জন্য অপেক্ষা অভ্যেস করেছিল । সে বয়সে মায়া পড়ে যেত মানুষের প্রতি, জিনিসের প্রতি, বই-এর তাক, একুইরিয়ামের মাছ, চায়ের সুবাস সবার প্রতি। তাই উদ্ভাসের উপরেও মায়া পড়ে গেল। বিয়ে হল। তারপর তুলতুলে খরগোশের মতো এক উদ্ভাস কোনো ম্যাজিক কালো টুপির মধ্যে ঢুকে পড়ল। আর সেই টুপির ভিতর থেকে আরেক উদ্ভাসের হিসহিসে সরিসৃপ শব্দ শুনে চোখ বুজে ফেলল ঈশানী। একটা গোটা জীবন চোখ বুজে কাটানো যায় না?
এ’সব কী যে ভাবছে সে ছুটির সকালে! সবকিছুই তার মনগড়া নয় কি? হয়ত। আসলে কি সে ভালো আছে? আসলে কি বাকিটা দু:খবিলাস? উদ্ভাস তো তাই বলে। ভালো থাকলে,সুখ ঘটমান হলে তো সুখের অপেক্ষা থাকেনা। ঈশানীরও আর কোনো অপেক্ষা নেই। কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে নিদেনপক্ষে একটা জানালা লাগে। যেমন মালবিকা বা মার্কেজের গল্পের কলেরার সময়ের সেই লোকটি,যারা ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করত। সেসব অপেক্ষা শেষ হয়েছে। তার শোবার ঘরের জানলা খুললে পাশের বাড়ির দেওয়াল ছাড়া কিছুই দেখা যায় না।
-----------------------------
ঈশানীরা থাকে নিচের তলায়। বিয়ের সময় উদ্ভাসদের ছিল একতলা বাড়ি,সেই বাড়িতে ওদের শোবার ঘরের জানলার ঠিক পাশে পিন্টুদের রান্নাঘরের দেওয়াল। পিন্টুর মায়ের গোঙানিতে রাতে ঘুম ভেঙে যায় ঈশানীর। পিন্টুর বাবা বড় কেরানি। সরকারি আপিসে পাঁচটার পর কাজ হয়না। পিন্টুর বাবা বাড়ি ফেরে রাত দশটায়। তারপর খানিক মত্ত চিৎকার, পাল্টা চিৎকার। ঈশানীর মাথা যন্ত্রণা করে। অথচ ওদের বাড়ি যাওয়া বারণ। অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো বারণ। ‘বেশ, আমি যাব না, তুমি যাও’-উদ্ভাসকে বলেছিল ঈশানী। উদ্ভাস তখন ক্লান্ত শ্রমিকের মতো গায়ের সব ঘাম মুছছিল ঈশানীর বুকে পেটে । সে মুখ না তুলে বলল , ‘দোতলা হয়ে গেলে আমরা অন্যদিকে ঘর নেব। পুব দিকেরটা। ওখানে এসব শুনতে পাবেনা।’
দোতলায় ঘর উঠছে বটে । মিস্ত্রীরা চুনসুরকি মাথায় সিঁড়ি বেয়ে নামা-ওঠা করে। দোতলা হয়ে গেলে ঈশানী একটা মনের মতো জানালা পাবে। ঈশানী কি তবে দোতলাটার অপেক্ষা করবে? জানালাটার? পুবদিকের জানলা দিয়ে কালোজাম গাছ দেখা যাবে, পুকুর, স্টেশনের দিকের পথ। কোথাও কেউ দাঁড়িয়ে নেই তার জন্য। থাকুক না থাকুক, অন্তত একটা জানালা থাকবে।
একতলার এই জানালা-থেকেও-নেই ঘরটা অনেকটা জেলখানার সেলের মতো।
ঈশানীর গ্রাম্য ইস্কুলের দুটো ছেলেকে ওরা জেলে দিল। ওইটুকু পুচকে ছেলে,রাজনৈতিক বন্দী নাকি! ‘জলজমি বাঁচাও’ আন্দোলনে জড়িয়েছিল। লিয়াকত মাধ্যমিক দিত এ বছর। মসিবুর ইলেভেন। ছোটবেলা থেকে দেখেছে ওদের। গরীব,কালো,রোগা ছেলেরা যেমন হয়। ইংরিজি পারে না আর ফুটবল খ্যালে ভালো। কে জানত আগুন ছিল এত? পক্সো আইনে যাতে বাঁচে ওরা, সেটা দেখছেন মানবাধিকার কমিশনের দেবযানীদি। ঈশানী ফোনে খোঁজখবর নেয়। কিন্তু যাওয়া মানা তার এখানে ওখানে। ঘরের বউ চাকরি শেষে ঘর সামলাবে, রাজনীতি নয়। উদ্ভাস যেতে পারে বরং। সক্রিয় রাজনীতি করা বাগ্মী মানুষ। ফিরে এসে ঈশানীকে গুছিয়ে বলবে সব। চলবে না তাতে?
একবার দেবযানীদির সাথে তাও গেছিল আদালতে। স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হয়েছিল, লুকিয়েই গেছিল একরকম। দু দুজন ডাকাতে ছাত্র তার- গর্ব হয়েছিল ঈশানীর। লিয়াকত প্রিজন ভ্যানে ওঠার আগে বলেছিল, সেলে জানালা থাকে না। ‘মাধ্যমিকের আর কতদিন বাকি দিদিমণি?’ জানালা না থাকলে সময়ের হিসেব গুলিয়ে যায়। সময়ের হিসেব গুলিয়ে গেলে কি অপেক্ষা মরে যায়? যদি গতকাল-কে আজকের থেকে, আজ-কে আগামীর থেকে আলাদা না করা যায়, তবে কিসের অপেক্ষা? কিংবা হয়ত কয়েদীরও মেয়াদ ফুরোনোর অপেক্ষা থাকে। বা ফাঁসির।
-------------------
আপাতত নিজস্ব সেলে বই-এ ঠাসা কাঠের আলমারির লাগোয়া দেওয়ালে ড্যাম্প দেখে ঘাবড়ে গেল ঈশানী। ড্যাম্প ধরলে উই-এর উপদ্রব হয়। বইগুলো ঠিক আছে তো? সরু চোখে ঈশানী তাকায় বন্ধ কাঁচের দরজার দিকে। কান পাতে কাঁচে। উদ্ভাসকে ডাকে। উদ্ভাস এসে চাবি খোলে। উপরের তাক থেকে অশোক মিত্রর গ্রাম্ভারি বইটা নামিয়ে ঝাড়তেই ধূলীকৃত প্যাপিরাস ঝরে পড়ে। চারু মজুমদারের রোগা মুখ বেয়ে উই-রা অশ্রুধারার মতো বাদামী এক পথ খুঁড়েছে। উদ্ভাস হাউ মাউ করে ওঠে। কপাল চাপড়ায়। অদৃশ্য পোকারা বিবেকানন্দ ও রামমোহনের মতো বিপ্রতীপের প্রতি ব্যবহারে সমতা রেখেছে দেখা যাচ্ছে । সবচেয়ে লক্ষণীয় , প্রথম পাতায় ওরা যে লিখে রাখত জোড়ায় দুজনের নাম, সেগুলো মন দিয়ে খেয়েছে। ঈশানী পরের তাকে হাত গলায়। খান কয়েক বই নিয়ে নাড়াচাড়া করে । ইতস্তত ছড়ানো কলন্তাই, অমিতাভ ঘোষ, উল্ফ, বুদ্ধুদেব গুহ। একসময় সাজানো হয়েছিল জঁর অনুযায়ী। এখন এলোমেলো সবকিছু। সত্যি তার মতি নেই গোছগাছে। এই তাকে উই-রা সবে নেমেছে। খেয়েছে শুধু বই-এর মাথার দিকগুলি।
শাশুড়ি উদ্ভাসের কপাল চাপড়ানো শুনে ছুটে আসে। শরীর ঝাঁকিয়ে চীৎকৃত ‘হায় হায়’ করে। দময়ন্তীর হাসি কান্না রাগ অপছন্দ বিরক্তি সবেতেই খুব ঝংকার আছে। নৈশব্দ্যের অতল থেকে গলা বাড়িয়ে ঈশানী মাঝে মাঝে ভাবে, এত চিৎকার, এত সদর্পে নিজেকে ঘোষণা করার ধরণটিকে ভালোবেসে ফেলবে কিনা। ঈশানী নিজের নাভিমূল থেকে উঠে আসা একটা চিৎকারের অপেক্ষা করে, যা আজও গলা পর্যন্ত এসে থমকে গেছে।
মায়ে-ছেলেতে কথাবার্তা চলছে। ঈশানী কথা বলে না ওদের মধ্যে। পেস্ট কন্ট্রোল লাগবে, ঈশানী স্থির করে, সব নষ্ট হওয়ার আগে। শাশুড়ি যথারীতি দুষছে ঈশানীকে। ‘ও রোজ ঘর ঝাড়বে না, আলমারি ঝাড়বে না।’ ঈশানীর মনে পড়ে, দেওয়ালে দেওয়ালে কাদের যেন ফ্লুরসেন্ট বিজ্ঞাপন দেখেছে- ‘যত্নসহকারে উই তাড়ানো হয়’। উদ্ভাস কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছে মাকে। ঈশানীর কানের দেওয়াল ঘেঁষে বেরিয়ে যায় আধশোনা শব্দরা। কি আশ্চর্য,তার পক্ষ নিয়েই আমতা আমতা করে কিছু বোঝাচ্ছে উদ্ভাস! সত্যি নাকি? ‘উপরতলায় কাজ হচ্ছে, ছাত থেকে জল চুঁয়ে পড়ছে না আলমারির পিছনের দেওয়াল বেয়ে দীর্ঘদিন? তাই হয়ত ড্যাম্প, তাই উই…’ দময়ন্তী ততোধিক রেগে যায়।
সব দোষ তার- এ মেনে নিলেই চুকে যায়। বাকি সব তার উন্মাদ কল্পনা- উদ্ভাস নিজেও তো তাই বলে সময়ে সময়ে। উদ্ভাসকে বুঝতে পারে না ঈশানী। এই মুহূর্তের ভীষণ সহানুভূতিশীল উদ্ভাসকে দেখতে দেখতে ঈশানী নিচের ঠোঁটের ফোলা জায়গাটায় জিভ বোলায়। আছে। চারদিক অন্ধকার করে দেওয়া ঘুষিটাও সত্যিই ছিল। বুকে এখনো চিনচিনে জ্বালা। আছে। আঁচড়গুলোও মিথ্যে নয়। সব তার অলস মাথার ষড় নয় তবে? ঈশানী ভারি দোটানায় পড়ে। উদ্ভাস বোধের অতীত হয়ে গেলে ঈশানীর মতো আধপাগল,অলক্ষ্মী মেয়েমানুষের সাতসকালে ঘুম পায়। ঈশানী কি সত্যি পাগল হয়ে যাচ্ছে? পাগল হওয়ার অপেক্ষা করবে কি?
‘সব নষ্ট হয়ে গেল’- বারবার বলছে দময়ন্তী। সব নষ্ট হয়ে গেল,তার জন্যই হয়ত বা-ঈশানী বদ্ধ জানলার দিকে তাকিয়ে ভাবে। চলাচলের পথের সব বিজ্ঞাপন হাতড়ায় মগজের কুঠুরিতে। সব নষ্ট হওয়ার আগে ফ্লুরোসেন্ট কালিতে লেখা পেস্ট কন্ট্রোলের লোকের দশ ডিজিটের ফোননম্বর পাওয়া যাবেনা? পাগল হওয়ার আগে বা মরবার আগে একটা জানলা পাওয়া যাবে কি? উদ্ভাস শরীরে নেমে এলে ওর চোখ জানলা দিয়ে পালাতে চেয়ে পাশের বাড়ির দেওয়ালে আটকে যায়। দোতলা হয়ে গেলে জানলা হবে। দোতলা হতে গিয়ে অথচ দুএক তাক মহামূল্য বই নষ্ট হল । দোতলা-জানালা-পাগল হয়ে যাওয়ার দিন- পেস্ট কন্ট্রোল- জামগাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকা কেউ, কার যে অপেক্ষা করে সে! জীবনটা কাটিয়ে ফেলতে চাইলে কোনোকিছুর অপেক্ষা করতেই হয়। ওই জামগাছ থেকে পড়ে মরে গেছিল উদ্ভাসের ভাগ্নে, ছোটন। ছোটন ঈশানীর ভারি আদরের ছিল। জানালা পেলে ছোটনকে গাছের তলায় জাম কুড়োতে দেখতে পাবে সে নিশ্চয়। স্বপ্নে তাই দেখা যায় আজকাল।
-------------------
সেদিন দুপুরে যুৎসই মধ্যাহ্নভোজন হল। দময়ন্তীর রান্না তারিফ হল, যেমন হয়। দময়ন্তী যখন রাঁধেন, ঈশানীর রান্নাঘরে ঢোকা বারণ। ঈশানীর সব কাজেই ভুল, ছিরিছাঁদ নেই। মেলা ব্যস্ততার মধ্যে সাহায্যের নামে এইসব বাড়তি আপদ কে চায়! বাধ্য হয়ে একাই সব সামলান দময়ন্তী । ‘মাছের মুড়ো দিয়ে ডালটা...আহা!’ ‘তেল কই মায়ের চেয়ে ভালো কে আর পারে!’ উদ্ভাস প্রগলভ হয়ে পড়ে মায়ের রান্না খেলেই। অতুল্য নির্বাক খায়। দময়ন্তী চোখ গিয়ে গর্ব আর স্নেহ ঝরে। কিন্তু অতুল্যকে দেখেই ঝাঁঝিয়ে ওঠে সে। ‘এই এক মানুষের সাথে ঘর করছি! খাবার পেলেই হামলে খাবে! ভালো খারাপ কিচ্ছুটি বলবে না।’ আবার ঝংকারে ঈশানী সামান্য কেঁপে ওঠে জৈষ্ঠ্য মাসেও। তা দেখে আশ্বস্ত হয়ে দময়ন্তী বলেন, ‘কাপড় কটা তুলে আন দেখি ছাত থেকে। তারপর খেতে বসি চল।’
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ঘরে এসে ঈশানী দেখে, রবিবারের একগাদা খবরকাগজ ছড়িয়ে মাথা চেপে বসে আছে উদ্ভাস। সেই পুরোনো অনুভূতিটা ফিরে আসে ঈশানীর- যেন কাঁচের উপর দিয়ে হাঁটছে। আসলে কাঁচের একটা ব্রিজ। তার তলায় খাদ। ঈশানী সারাক্ষণ সেই কাঁচসেতুতে হেঁটে চলেছে। ভঙ্গুর সেই সেতু উদ্ভাসের এক ঘুষিতে বা দময়ন্তীর চিৎকারে ভেঙে পড়ে মাঝে মাঝে। ঈশানীর শরীরটা ঘুরতে ঘুরতে খাদের দিকে ধেয়ে যায় অভিকর্ষ-টানে। ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো তাকে অনুসরণ করে। ওরা ওর হাত পা গলা কপাল ফালা ফালা করে নামার পথে।
প্রতিবার খাদে প’ড়ে ঈশানী মৃত্যুর অপেক্ষা করে। কিন্তু মরে না। বুকে বেয়ে কোনো সরিসৃপ নেমে আসে। দ্বিধাবিভক্ত জিভ দিয়ে চেটে চেটে পরিষ্কার করে তার গায়ের রক্ত,ধুলোবালি। ঈশানী দেখতে পায় সরিসৃপের মুখ অনেকটা উদ্ভাসের মতো। ভাঙা মাজা, কোমর নিয়ে সে সরিসৃপেরই পিঠে চড়ে খাদ ফেলে উপরে উঠে আসে। সরিসৃপ তাকে ছেড়ে দেয় আবার নতুন কাঁচের সেতুর মুখে। আবার অপেক্ষা সেতু ভেঙে পড়ার। ঘুরতে ঘুরতে খাদে পড়ে যাওয়ার।
তার গোটা জীবনকেই এখন এই অপেক্ষা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায়।
--------------------------------
এই মুহূর্তে ঈশানী বোঝে, সেতু ভাঙার সময় হয়েছে। ‘মাথা ধরেছে?’ -সে জিজ্ঞেস করে তাও। জিজ্ঞাসাটা ব্রিজের পাশের ম্যাপল গাছের পাতার মতো ভেসে ভেসে খাদের অতলে নামে। উদ্ভাস বাঁকা হাসি হাসে। ঈশানী ভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে ঝাঁ ঝাঁ রোদে ছাতে গিয়ে বসবে কিনা। বদ্ধ জানলাটার দিকে পিছন ফিরে বসে আছে উদ্ভাস। ওর চোখদুটো স্থির সবুজ মার্বেলের মতো। দরদর করে ঘামছে ও পাখার তলায়। উদ্ভাস উঠে দাঁড়ায়। হেঁটে আসে ঈশানীর দিকে। সে আসা ঈশানীর অপেক্ষা-জানালার তলা দিয়ে প্রথমবার হেঁটে আসার থেকে কত আলাদা! ঈশানী প্রতিবর্তে সিঁটিয়ে যায় এক কোণে। উদ্ভাস ওকে পেরিয়ে দরজার দিকে যায়। দরজা বন্ধ করে শব্দহীন। ফিরে আসে। মুখোমুখি হয়। তার একান্ত শিকার। ঈশানীকে সরিসৃপ পেঁচিয়ে ধরে এবার কোমরে। হ্যাঁচকা টান মারে। আদর না চড়চাপড় -কী অপেক্ষা করছে, ঈশানী বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু মাথা বিবশ হয়ে আসে। সরিসৃপের অপর হাত তার গলা জড়িয়ে ধরে । কানের কাছে মুখ এনে হিসহিসিয়ে বলে- ‘যেতে বারণ করেছিলাম কোর্টে, জড়াতে বারণ করেছিলাম থানা পুলিশে। তাই না? কেন গেলে?’ ঈশানীর গলা বুজে আসে। আজ সকালেও অপ্রত্যাশিত ওকালতি করছিল বৌ-এর হয়ে এই লোকটা। বুঝিয়ে বললে বুঝবে না? সেই যে কান্না ফেলে উঠে আসা ছেলেটা,সেই ছেলেটাই মাঝে মাঝে গভীর অসুখে সরিসৃপ হয়ে যায়, কিন্তু আর একবার বুঝিয়ে বললে বুঝবে না কি? গলা ঝেড়ে সে বলতে যায়-’ওই বাচ্চা ছেলেদুটো আমার ইস্কুলে পড়ত।’ গলার বেড়ি শক্ত হয়। ‘আর? আর কে ছিল? ওই যে পার্টির দাড়িওয়ালা ছেলেটা যাকে ইউনিভার্সিটির সময় থেকে চিনতিস?’
ঈশানী জানে, এর পর কী কী হতে চলেছে। ওর চোখ বদ্ধ জানালায় আটকে গেছে। শরীরটাকে আপাতত ছেড়ে দেয় সে। শরীর ছেড়ে বাইরে এসে দ্যাখে , তার গালের উপর এক প্রকাণ্ড ওজনের থাপ্পড় নেমে এল। সে ছিটকে পড়ল বিছানার উপর। চুল ধরে তার শরীরকে টেনে তুলল উদ্ভাস। তারপর আবার কিল চড়। দূরে দাঁড়িয়ে নিজের সাময়িকভাবে ফেলে আসা শরীরটার জন্য মায়া হয় ঈশানীর। আহা, মেয়েটার হাত মুচড়ে দিল! এক খাবলা চুল উঠে এল সরিসৃপের হাতে। নির্যাতনের মজা সরিসৃপকে উষ্ণতা দেয়। তার ঠান্ডা শোনিতধারাকে চনমনে করে।
মেরে মেরে ক্লান্ত হয়ে ঘর ছেড়ে চলে যায় উদ্ভাস। ওর রোগা অবয়ব কাঁপছিল তখনও উত্তেজনায়। ঈশানী তার অপাংক্তেয়, অনাদরের শরীরের পাশে এসে বসে। ঈশানী জানে উদ্ভাস ফিরে আসবে। তারপর ক্ষমা চাইবে। ভালোবাসবে। আবার শুরু করবে তারা কপোত-কপোতী জীবন। আবার ব্রিজপতনের অপেক্ষা।
একান্ত জল জমি দখল হয়ে গেল। পোকায় কেটেছে বই-এর শরীর। জানালা নেই। পুবদিক নেই। বদ্ধ দেওয়ালের ওপারে গোঙানি। ধুপ করে একটা শব্দ আর ছোটন মরে গেল। চুল খুবলে নেওয়ার পর মাথাটা জ্বালা করে। ক্ষতবিক্ষত আধোজাগরণে শরীর মুচড়ে ওঠে। নিজের শরীরের পাশে বসে ঈশানী ভাবে, ছোটন বেঁচে থাকলে লিয়াকতের বয়সী হত। মসিবুর লিয়াকতদের সে কি আগুন ! ওদের বাপদাদার গাঁয়ে গুলি চলেছে আজও।পরের বছর মাধ্যমিকটা হতেই হবে লিয়াকতের। নিজের শরীরের কপালে আগুন লেপে দেয় ঈশানী। প্রিজন ভ্যানে ওঠার পর লিয়াকতের হাত ছুঁয়ে পাওয়া আগুন। ঈশানী আর তার শরীর বিক্ষিপ্ত সব অপেক্ষা ছেড়ে একমাত্র আগুনের অপেক্ষায় লীন হয়।
----------------------------