অপেক্ষা, আপেক্ষিক অমরতা

সারাজাত সৌম



যেদিন ভাবনায় ছিলো সব পালিয়েছে দূর—তখন অজান্তেই কি তার চোখ জ্বলে উঠেছিলো অদ্ভুত লাল পাথরে। নাকি সে নিয়ত এমনই, চোখের উপর বসে থাকে অনাবিল স্বর আর পাখির মতো উড়ে উড়ে কানাড়ার পাশে ছড়িয়ে পড়ে অজস্র মুখের আভায়আর আমাদের অন্তরগত ছায়ার পাশে পড়ে থাকা একটি পাতার মতো মায়া তার মধুরিমা।বস্তুত যার আসবার কথাছিলো, সে কি আজও আসেনি! নাকি এসে আবার ফিরে গেছে হাওয়ায়...

আসলে কোথাও কি এমন হয় যে, তোমাকে ছুঁয়ে দিলেই প্রকৃতি তার নানা অনুসঙ্গগুলোকে ছড়িয়ে ঝগড়ায় নামে কিংবা করে অস্থির বিলাপ কখনো কখনো কানের কাছে এসে।এমনকি এই খল—পুকুরের কালো মাছ, জলের উজ্জ্বলতা শরীর থেকে বের হয়ে—হয়ে উঠে অন্যমনস্ক নিরাভরণ কেউ।যে এক আকার থেকে বহু আকার নিয়ে প্রসারিত হতে থাকে চারদিক।এই এক ধাঁধা!কাছে বা দূরের যেটুকু আলো তার গভীরে লুকিয়ে থাকে তারই অমরতা যেন ঘুরেফিরে আসে আমাদের প্রিয় অবর্ণনীয় সকল গৃহে।অথচ কেউ কি দেখে সেইসব মেদুর মাধুরীর সৌরভ—কৃর্তী।এখানে ওখানে ছড়ানো ছিটানো অংক—আর অবিরাম বিশাদ—বাহার।সে কতোভাবেই না এসে লীন হয়ে থাকে কতোকিছুর ভেতর-বাহিরে! এমনকি যেখানে যেভাবে রাখা যায় সেখানেই তাকে নিয়ে চলে অপার গুঞ্জণ।বলো, তারপরও কতোটুকু যাওয়া যায় দূর আর কতটুকুই বা পাওয়া যায় কাছে।ভাবনার নিচে ছায়া ফেলে কেউ কেউ চলে যায়, আবার কেউ তো ফিরেও আসে এই চোখের কাছে।এই যেমন—তুমি চলে গেলে কিংবা না যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে এক একটি শব্দের ভেতর দিয়ে বলে গেলে নানাবিধ শব্দের কথা—উপকথার এক অপরিমেয় ভুবন।দ্যাখো, ওই হিম—ঝুলন্ত একা একটি কলিংবেল—যার শব্দ তরঙ্গ পেরিয়ে ওপাড়ে অদ্ভুত শরীর, সে এক আশ্চর্য কাঠামো দিয়ে গড়া!যেন কাছে গেলেই কোথাও সে খুলতে থাকে দরজার পর দরজা আবার কোথাও সে ছোট হয়ে আসে ধীর—একটি অর্ধনগ্ন পেঁপের হলুদাভ ইশারা!সেকি ছোট্ট বল—হাতের ভেতর!নাকি সে অনাম্নী রোগ, তাকে বুঝতে না পারার আনন্দ একদিন আমাদের বুড়ো বানিয়ে ছাড়বে।এবং যেটুকু যাপন—যেটুকু অভাব, তারা মিলেমিশে ক্রমশই কি আমাদের কোথাও ডেকে নিয়ে যাবে আবার।কে জানে। আসলে সব দৃশ্যগুলোই হারিয়ে যাওয়া সোনার। দৃশ্যগুলো বিদ্যুৎ—বৃত্তে প্যাঁচানো মৃণাল।পড়ে থাকা ঘুম—অহল্যার।সে তো অবিরাম সুন্দর, একটুকরো মাটি আমার দেহের কাছেই—আমাদেরই মাটি।যেন গর্ভ থেকে জেগে উঠেই দিয়েছে মৃদু চাল, জীবনের দিকে!অথচ বিরল এই চোখ, কতোকিছুই দেখে—যা দেখার নয়! আবার যা দেখার নয়—তা দেখে তার গূঢ় স্বভাবে।

এই ভাব—যেন দুটি করতাল। তারা বহুদূর একাই বাজে...

আমি দেখিনি—তবু তাকিয়ে থেকেছি দূর, গভীর রেণুর দিকে।একি!মরমী গান—পরস্পর ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে যায় দূর। অথচ তারাও নানাভাবে উৎফুল্ল হয়।কাঁদে—কালোর ভেতর বসে থেকে নিবিড়, এমনকি তারা নিজেরাই নিজেদের ফুটিয়ে তুলতে চায় রাত-দিন।যেন এইসব তোমাকে পাওয়ার ভাষা, অঙ্গ-ভঙ্গি আর মিশ্র প্রণয়ের আভাস।ভাবি, কিভাবে এলে এই মাটি ভেদ করে শরীরের উপর—কতো কতো রাত-দিন পেরিয়ে তুমি নক্সাকাটা হলে মানুষের নামে!হে আমার ইশারা—তোমার ভেতর আমি যেন এক বিকৃত গ্যারেজ।তুমুল জ্বালানী, দুর্গন্ধ—পিচ্ছিল আর নানা যন্ত্রের ব্যবহারিক কাঠামো।ক্ষয়—কখনো কখনো মায়াবী শব্দের ছল, যেন বিয়ারিংয়ের ভেতর ঘুরতে থাকা ছোট্ট ছোট্ট আমরাই—আমাদের বল।ওহ! প্যারানরমাল— প্রতিটি দিনই দেখি ছোট হয়ে আসছে! আর আমার হাতের পাঁচ আঙুল থেকে ছুটে যাচ্ছে পাঁচ রকমের ঘোড়া। পাঁচটি রং। তীব্র পথের দিকে। যেখানে ফুলের পরেই জেগে উঠে আপেল—সেই একমাত্র রূপক! আমার মায়ের কিংবা তার মেয়েদের জন্য বানানো এক একটি সোনার মিথ।অথচ আপেলের কাছে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটির নাম হলো ছুরি। এমনকি মানুষও একটি চকচকে ছুরি—মানুষের শরীরের উপর নেচে বেড়ায় তার সকল ব্যবহার-বিধি নিয়ে। এমনকি এই সুন্দর বেড়ে উঠা—গোল, প্রতিনিয়ত আমার চোখের মণি থেকে উড়ে যায় পাখিদের ব্যাসার্ধ। সেকি দূর...

কতোদূর বলো—সেই দেশ।সেই বাগান ঘেরা আলো আর অন্ধকার।আর তোমার ভেতর আমার না দেখা সেইসব গান।কারা গেয়ে চলে যায় আজ, এমন পাখি আর পাপসে পা ঘঁষে!এই যে, শিশুটি এসে খামচে ধরেছে তোমার দেহ।যেন তোমার রাগ—সংরাগ থেকে ফুটে উঠছে শতশতফুল ও তারামণ্ডলের ক্ষ্যাপা আলো। ওখানে একটি পাগল—তার খাঁচা ছেড়ে বের হয়ে ছুঁটে আসছে তোমার দিকে।অথচ কে বলবে, সে একদিন অন্ধকার থেকে তোমাকে ডেকেছিলো।দিয়েছিলো ফুল—পাতা—ফলের মতো সুন্দর আবহে তোমার চেয়ে অধিক তোমাকে। বস্তুত—অপেক্ষার এই আপেক্ষিকতা ছাড়া পাগলের সৌন্দর্য বলে কিছু নেই, কিছুই থাকে না তার এই ধরাধাম জুড়ে।