এবং অপেক্ষা ফোটে মনে

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়



অপেক্ষা শব্দটির পাশে বসে দীর্ঘক্ষণ ভাবি।এই যে সময় বয়ে যাচ্ছে তার মাঝে অন্তর্বতী আমির নিঃশব্দ স্থিতি।বসে আছি একলা দুপুর কাঁধে নিয়ে। কেন ? কোন নির্বাক ঘোষণা তো নেই। ছিল না কখনও । আমি কি কারও জন্য এলিয়ে দিয়েছি এই প্রসারিত সময়ের প্রলম্বিত ছায়া ? অথবা কেউ আমার জন্য। সেরকম কোন জমাটবদ্ধ স্পর্শের সম্ভাবনা বা সংযুক্তি কিছুই নেই। তবু বসে থাকি। সাদা পাতার সামনে আমার দুনিয়া। সঙ্গোপন ধ্যানমগ্নতার ভেতর গুটি গুটি পায়ে কেউ এগিয়ে আসবে। উন্মীলিত চোখের পাশে এখনই হয়তো খুলে যাবে আকাঙ্ক্ষিত জানালা। অর্জিত মুদ্রাদোষে তাকাই বারবার। আক্রান্ত ঈশারাগুলি চুরমার হয়ে যায়। সীমাবদ্ধতার ছবিঘরে সাজানো দৃশ্যের বাইরে কোন ঘুঙুর বেজে ওঠেনা। নিখোঁজ রিফ্লেকটিভ টিউনের ভেতর কখন শব্দের প্রসব যন্ত্রণা আমূল শিহরিত করবে চৈতন্যের গিরিকন্দর। তারই উদগ্রীব চিত্র ভাসে চোখের নীচে । সিমেন্টের ভাঙা চাতাল জানে এই অপেক্ষাতুর কৈশোর ।কৃষ্ণচূড়া গাছের নিস্তব্ধ প্রহর লিখে রেখেছে সেই সংরাগ। আমরা ক্রমাগত অপেক্ষা করি সুসময়ের। কখনও বিদ্যুৎচমকের মতো তার দেখা পাই আবার কখনও পাইনা। তবু অপেক্ষার কোন কমা নেই, হাইফেন নেই পুর্ণচ্ছেদ নেই।

“আমি এসে পাতি হাত, জলভারে নতদেহ আর
চোখের সামগ্রী নিয়ে ফিরি ঘরে , অথবা ফিরি না ঘরে
তোমার চতুর্দিকে শূন্যতাকে ভরে থেকে যাই
তুমি যেখানেই হাত রাখো , যেখানেই কান থেকে
খুলে রাখো দুল, কণ্ঠ থেকে খুলে রাখো হার
সেখানেই শরীর আমার হয়ে ওঠে রক্তজবা ফুল
তুমি যেখানেই ঠোঁট রাখো আমার চুম্বন
তোমার শরীর থেকে প্রবল অযত্নে ঝরে যায়
আমি পোকা হয়ে পিচুটির মতো
তোমার ঐ চোখের ছায়ায় প্রতিদিন খেলা করে যাই
ভালোবেসে নিজেকে কাঁদাই
তুমি শাড়ির আঁচল দিয়ে আমাকে তাড়িয়ে দিলে
আমি রথ রেখে পথে এস তোমারই দ্বৈরথে বসে থাকি
তোমার আশায়। তুমি যেখানেই হাত রাখো
আমার উদগ্রীব চিত্র থাকে সেখানেই। আমি যেখানেই
হাত পাতি সেখানেই অসীম শূন্যতা , তুমি নেই ।“

না। একদম শূন্যতা নয়। অসীম শূন্যতা নয় । কিছু আছে। কিছু তো আছেই। টের পেয়েছিল আমার মণিমাসি। পাঁচ মাসের একটি গর্ভস্থ ভ্রূণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল তার। ডাক্তার বলেছিলেন – আর কোনদিন মা হতে পারবেন না আপনি। মণিমাসি তাচ্ছিল্যে উড়িয়ে দিয়েছিল সে কথা । আল্ট্রাসোনোগ্রাফি প্লেটের উপর অনাগত সেই বাচ্চার ছবি দেখতে দেখতে বলত – একবার মা বলে ডাক আমায়। আমি যুগ যুগ অপেক্ষা করে আছি শুধু তোর জন্য । চারদিকে হু হু নৈঃশব্দ্য । অস্পষ্ট হাহাকারের ভেতর কেউ কিছুই দেখতে পেতনা । মণিমাসি বলত- তোরা কেউ ওকে দেখতে পাবি না , কিন্তু আমি পাই। সে অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য। ওই দেখ গাছে গাছে তার ছায়া। পাতার দোলনায় বাতাস হয়ে সে দুলছে।

‘’A feeling , rushes up to chest
up the throat
hydrating the eyes,
sometimes falling , sometimes waiting

when will you come my home ?’’

কোন বন্ধ দরোজার পাশে নয় এক মুক্ত দিগন্তের মাঝে আমি বা আমরা অপেক্ষা শব্দটির খোঁজ করি।এই শব্দের গায়ে মায়া লেগে আছে। তুমুল ভালোবাসার ছোঁয়া পল্লবিত করেছে তার জন্মপথ। অপেক্ষা খরচ করতে করতে তুমুল সেই জলভার উঠে আসে জলের প্লাবনে । অন্তর্গত জ্যোৎস্নায় নিবিড় তার ছায়া কখনও কখনও কেউ তার ছায়া দেখতে পায় , কেউ বা পায় না। তবু অপেক্ষা শব্দের গায়ে লেগে আছে অপ্রকল্পিত জীবনের দ্যোতনা । তুলোট পাতার মধ্যে শব্দযাপনের এই অপেক্ষা ফুরিয়ে যাবার নয়।
একদিন হাজার হাজার সংখ্যাতীত মানুষ উঠে আসবে আমারই সাথে। আমার চলনের শাব্দিক ছন্দে তাদের পদধ্বনি। এক অপেক্ষার ভেতর শাশ্বত জীবনের মর্মরিত গান বেজে উঠবে । এই প্রতীক্ষা। এইদিকেই মুখ ফিরিয়ে বসে আছে কেউ। আলুলায়িত স্পন্দনের ভেতর সুর খুঁজছে ভাঙা একতারা। নির্জন জানে এই অপেক্ষার গৈরিক বরাভয়।

‘’Come with a man
On your shoulders,
Come with a hundred men in your hair
Come with a thousand men between your breasts
And your feet
Come like river
Full of drowned men
Which flows down the wild sea,
To the eternal surf, to time
Bring them all
To where I am waiting for you.
We shall always be alone,
We shall always be you and i
Alone on earth
To start our life . ‘’
জীবন। এক আশ্চর্য আলোকবিন্দু। রাত্রি নিয়ে সে বসে আছে ধূসর দিগন্তের মাঝে। অপেক্ষার বাড়ি খুঁজছে । মধুময় সময়চিত্রের দ্যোতনায় আলোপথের ধারণা। অন্ধকারের ভেতর আঁকশি বাড়িয়ে জীবনের আর্জি সন্ধান করতে করতে কেবলই অপেক্ষা ফোটে মনে। হিরন্ময় প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির যোগফলে ভরে ওঠে চলাচল।
‘’ আমি একা
দেখেছি ফুলের জন্ম মৃতের শয্যার পাশে বসে,
জন্মান্ধ মেয়েকে আমি জ্যোৎস্নার ধারণা দেব ব’লে
এখনো রাত্রির এই মরুভুমি জাগিয়ে রেখেছি।‘’