আমার টুসু

ইন্দ্রনীল বক্সী



চাল ধোয়া জলের রঙে আকাশ মাথায় নিয়ে তেমাথায় দাঁড়ালে বাবলা গাছের সারি বাঁয়ে নিয়ে বয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রী সড়ক যোজনার কালো পিচের রাস্তা । আগে মোরাম বিছানো ছিলো , লাল মাটির সে রাস্তা যেন বড় বেশি খাপ খেতো দু ধারের উষর প্রান্তরের সাথে । এখন তো ভোঁ ভোঁ চার চাকা , বড় বড় খাদানের টেরাক আর কুকুরে হেগে রাখে বিছ রাস্তায়! সুফল, মানে সুফল টুডু , গ্রাম শিমডাল , থানা খানপুর ,পোস্ট দর্জিপাড়া , কপালে হাত দিয়ে রোদ আটকে লেবেল ক্রশিং এর দিকে চেয়ে ঠায় বসে আছে তা ঘন্টা দুয়েক হলো !
“আমরা পোষ পরবে টুসু পাতিব...তিরিশটি দিন রইবে টুসু তিরিষটি ফুল পাইবে গো,
রাইখতে লাইরবো আর টুসুরে... মকর আইসবে লিতে গো... “
সংক্রান্তিতে বেশ কটা তুষুর ঝাঁকা নিয়ে মেয়ে বউ কয়েকদল চলে গেল, সুফল হাঁ করে সেদিকে চেয়ে থাকে...মেয়ে বউ গুলোও সুফলকে দেখে নিজেদের মধ্যে ঢলাঢলি করে হেসে হেসে কি যেন বলা বলা করে । সুফল একটু লজ্জা পেয়ে অন্য দিকে তাকায় । এমন নয় যে সে একবারে ডবরু জোয়ান ! কিন্তু একবারে বুড়োটে মেরে গেছে এমন কথা এ তল্লাটে কেউ বলবে না , কিন্তু মেইয়ে গুলানের হাসি ... সুফলের চিরকালের কেমন ধারা লাগে! যেন বেশীক্ষন শুনলে বা তাকিয়ে থাকলে অবশ হয়ে যাবে ! আস্ত খড়িশ এক একজন।
ঘটাং করে আওয়াজ হতেই সুফল সচকিত হয়ে তাকায় রেল লাইনের দিকে , ইস্টিশানের দিক থেকে এলো কি আওয়াজটা ! নাঃ ...সুফল উঠে দাঁড়ায় ...রোদ আড়াল করে দূরে ইস্টিশান সিগনালবাবুকে পতাকা নাড়তে দেখে লাল বাড়িটার জানালা দিয়ে। কিন্তু কৈ ! কিছুই তো নজরে আসছে না ... ঘড় ঘড় আওয়াজটা এগিয়ে আসে আরও কিছুটা । ও বাবা ! এতো সেই লাইন দেখা ছাতা লাগানো ট্রলি গাড়ি! দু দিকে মুখ করে চারজন বসে , দেখতে দেখতে সুফলকে পেরিয়ে চলে যায় ট্রলিটা । “ এই সুফল ! ...যা বাড়ি যা ... আবার কাল আসবি ...” ট্রলিতে জনাই মন্ডল রয়েছে, কন্ট্রাকটরের সুপার ভাইজার ।
আবার বসে পড়ে সুফল , পেটে টান ধরছে, গামছায় চাট্টি মুড়ি বেঁধে এনেছে , রোজই আনে ...না আনলে ইস্টিশানের চায়ের দোকানের বিশুর কাছে দুটো খাস্তা বিস্কুট আর চা খেয়ে নেয় , বিশু এক নয়া পয়াসাও নেয় না ওর কাছে তবু রোজ রোজ তো আর... সুফলের এসবে বেশ লজ্জা লাগে। শুধু এই রেল গেটে রোজ ঠায় ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে তার মোটেও লজ্জা করে না ! সে যে যাই বলুক ...কত মানুষ কত কথা বলেছে! বলে বলে থকে গিয়ে আর বলে না। এই রেল গেটের পাশে বুড়ো নিম গাছটা, গেটের ফাঁকা গার্ড রুমটার মতোই সবাই এখানে সুফলের উবু হয়ে লাইনের দিকে তাকিয়ে বসে থাকাতেও অভ্যস্থ হয়ে গেছে।
বেলা পড়ে আসছে , রোদ্দুরও ঝিম ধরা । ঠান্ডা বাতাস বইছে উত্তুরে ,সুফল উঠে দাঁড়ায় এবার । নাঃ এক ঠায় বসে থাকলে জার লাগে ! একটু নড়াচড়া দরকার মাঝে মধ্যে। মাথার উপর সেই থেকে একটা মাছরাঙা চক্কর দিচ্ছে , আকাশের দিকে সুফল তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষন, পাখিটাও কি কাউকে খুঁজছে ! কারও জন্যে হন্যে হয়ে আসমানে চক্কর দিচ্ছে ! কে জানে ...
ভারী ধাতব শব্দে চমকে ওঠে সুফল! এবার নির্ঘাৎ ... ঠিক ভেবেছে ও ! প্রচন্ড ভোঁ দিয়ে একটা মালগাড়ি ঢুকছে ইস্টিশানে , ধীর গতিতে । এমনিতে এখানে তেমন কোনো ট্রেন দাঁড়ায় না , সকালের দিকে একটা লোকাল আর বিকেলের দিকে ওটাই ফিরতি , দুচার জন নামে যারা শহরে কাজে যায় বা মুনিষ খাটতে । মাল গাড়ি এমনই মাঝে মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ে... এরকমই এক গাড়িতে তো ...!
সুফল আর সময় নষ্ট করে না, ছুট লাগায় প্ল্যাটফর্মের দিকে । মাল গাড়ি অনেক লম্বা হয় , প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে এগিয়ে থাকে তার মাথা প্রকান্ড ইঞ্জিন নিয়ে ,আর লেজটাও ইস্টিশান ছাড়িয়ে । সুফল এক এক করে যে বগি গুলোর দরজা খোলা সেগুলো দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে থাকে ...এক ...দুই...তিন এভাবে বারোখানা খোলা বগি ভালো করে দেখে ছুটতে ছুটতে ... নাঃ সব ফাঁকা , একদম ফাঁকাও নয় সব গুলো ,কোনো কোনোটায় গরু রয়েছে , সঙ্গে তাদের বাঘাল । কিছুক্ষন পর প্রচন্ডজোরে ভোঁ দিয়ে ওঠে একসময় ইঞ্জিনটা , প্রকান্ড সরীসৃপের মতো নড়ে ওঠে মালগাড়িটা , ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এগোতে থাকে ...সুফল হাফিয়ে ওঠে , একসময় পা ছড়িয়ে ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে বসে পড়ে প্ল্যাটফর্মে । ধীরে ধীরে শেষ বগিটার পিছনে যে কাটাকুটি দাগটা থাকে সেটাও আধো অন্ধকারে দূরে হারিয়ে যায়। স্টেশান মাস্টার ব্রজবাবু ফ্ল্যাগ নাড়া থামিয়ে হেলতে দুলতে স্টেশানের একমাত্র ঘরটির দিকে এগিয়ে যায় । এরপর কি হবে জানে সুফল ,ব্রজবাবু তার তিনবাটির টিফিন কৌট নিয়ে বেড়িয়ে আসবেন । তারপর হেলতে দুলতে বিশুর দোকানের পাশে রাখা সাইকেল্টা নিয়ে রওনা দেবেন বাড়ির দিকে ।
কালো কোটটা পরে হেলতে দুলতে বেড়িয়ে এলেন ব্রজ বাবু । কি মনে করে প্ল্যাটফর্মের এক প্রান্তে বসে থাকা সুফলের সামনে এসে দাঁড়ালেন । “সুফল ...এবার বাড়ি যা বাবা ! ... আর গাড়ি নেই আজ ...বিকেলের এই মালগাড়িটারই খবর ছিলো ,এবার তুই যা ...আবার বরং কাল আসিস!”
সুফল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে ব্রজ বাবুর দিকে । এরকম যে প্রথমবার হচ্ছে বা ব্রজবাবু যে এই প্রথম ওকে বাড়ি যেতে বলছে এমন নয় , গত তিন বছর ধরে কতবারই তো বলেছেন । প্রথম প্রথম তো দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতেন , ভাবতেন কয়লা চুরি করতে এসেছে ... তারপর জানতে পারলেন এরকমই এক সংক্রান্তির দিন সুফলের চোদ্দো বছরের মা মরা মেয়ে ফড়েদের হাতে পড়ে । তারা ইটভাটায় কাজ দেবে বলে সুফলকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে চলে যায় মেয়েকে । সুফল নিজেই মেয়েটাকে এরকম এক মাল গাড়ির কামরায় তুলে দিয়েছিলো সেদিন ফোড়েদের সাথে । তারপর থেকে মেয়ের আর কোনো খোঁজ নেই , গ্রামের লোকে বলে সেই থেকে সুফল নাকি বেবাগী হয়ে গেছে! রোজ এসে বসে থাকে রেলগেটে ...
“ আর গাড়ি নেই মাস্টার! ...তু ঠিক বলছিস ?”
“হ্যাঁ রে ...”
“ আজ যে আরও একটা ছক্রান্তি চইলে গেলো! আমার টুসু তো এলোই না !”
“ আসবে আসবে ...ঠিক আসবে একদিন ...যা বাড়ি যা” বলেই অন্য দিকে তাকিয়ে রইলেন ব্রজবাবু , একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেলতে দুলতে বিশুর চায়ের দোকানের দিকে এগিয়ে গেলেন ।
সুফলও উঠে পড়ে প্ল্যাটফর্ম থেকে , গায়ের ধুলো ঝেড়ে হাঁটা দেয়ে । কালো সুঠাম শরীর নিয়ে অল্প ঝুঁকে হাঁটতে থাকে গ্রামের দিকে, মাথার উপর চক্কর মারতে থাকা মাছরাঙাটাকে আর দেখতে পেলো না আকাশপানে তাকিয়ে , আকাশটা আবছা অন্ধকারে যেন চুমকি বসানো চাঁদোয়া । আপন মনে গুনগুন করতে থাকে
“ আমার টুসু হলুদ বরন ... নীল কাপড়ে রানী গো
আমার টুসু মিষ্টি বড় ... মনের বড় ধনী গো...”
চোয়াল ক্রমশ শক্ত হয়ে আসে সুফলের । কাল আবার সক্কাল সক্কাল আসতে হবে রেলগেটে । অন্ধকারে ধীরে ধীরে সুফলের কালো পাথরের মতো শরীরটা মিলিয়ে যায় ।