অপেক্ষা, নিরবধি

প্রশান্ত গুহমজুমদার




অপেক্ষা। তার নানান রকম। আবহেই এক অস্পষ্টতা। ফিরে আসতে পারে, না-ও পারে। হতে পারে, না-ও পারে। বেধে যেতে পারে, না-ও পারে। তবু। আশা, আশঙ্কা, ভয়, ভগবান। সব মিলিয়ে সে এক বিদিকিচ্ছিরি ব্যাপার। সে কাঁঠালের আঠা। ছাড়া যায় না, ছাড়েও না। কেবল মনে হয়, যদি আসে, যদি হয়, যদি বেধে যায়। অপেক্ষা যে রকম অস্পষ্টতার কম্বল নির্লজ্বভাবে জড়িয়ে রাখে সর্বক্ষণ সমস্ত অবয়বে, তেমন বোধহয় আর কোন শব্দই নয়।
এতগুলো ঘন্টা, দিন, বছর পার করে আজো বুক ঠুকে বলতেই পারি, এই শব্দের মত জব্দ কেউ করে নি আমাকে। বোধহয় এমন নিম্নমেধার বস্তু পেয়েছে বলেই। হলুদ পদার্থ নেই বললেই চলে, কেবল স্পর্শযোগ্য হয়ত স্বাদু অথবা তাও নেই, অগাধ সময় ধরে এর সবটুকু বাধাহীন আহার করে চলেছে সর্বক্ষণ। সামান্যতম ঐহিক কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার তার ন্যূনতম কোন তাগিদ আমার চোখে পড়ে নি।
যেহেতু বোদা, তার চক্করে সহজেই পড়েছি বারবার, নানান সময়ে বা অসময়ে। শিক্ষা হয় নি। এই যে এখন লিখছি, চা এড়িয়ে, নেশা সরিয়ে, এখানেও সম্পাদকের দুটো কথা শোনার প্রতীক্ষা। ছাগল আমি, কিছুতেই বোঝাতে পারি না, ওরে নির্বোধ, দৌড়ে যা বা লেদ্‌রে থাক, কোন কিছুতেই কিছু এসে যায় না। বাংলা ভাষার নয়, সম্পাদকের পিতৃপুরুষেরও নয়। তবু আমি বলব। ন্যাকারা যেমন করে, চোখের জল নাকের জল মিশিয়ে কালো কিছু শব্দ সাদা পাতায় সাজায়। তেমনই বলব, যেহেতু শুধু মূর্খ নই, অপেক্ষাও সামনে গাজর ধরে আছে নিয়ম মেনেই। জয়তু অপেক্ষা।
এবার পিছনের কথা একটু বলা যাক। অন্য কিছু না, বহু দূরের হারিয়ে যাওয়া কথা। কোনো এক অমাবস্যার রাতে এক ভুলো মনের দেবদূত আমাকে শক্ত মাটিতে নামিয়ে বেমালুম উড়ে গেল অসীমে। ক্ষিধে পেয়েছিল বোধহয়। অথচ আমি জানতাম, এক ঝালরশোভিত ঝলমলে পাথরমিলানো প্রাসাদে আমাকে পৌছে দেওয়ার কথা ছিল ওর। ওটাই আমার আগামী আবাস। তার এক পাশে থাকবে জঙ্গল পাহাড়, অন্য পাশে চমৎকার এক বিশাল জল, পাখি থাকবে ধর্মনির্বিশেষে। কিন্তু কোথায় কি! সুতরাং অপেক্ষার শুরু।
এক নগণ্য ইটকাঠছোটইত্যাদি ঘরে শুরু হল দিন। প্রথামত মা এল, বাবা এলেন আর একজন বুড়ি। এই তিনের ঝিক-এ ধিকধিকে উষ্ণতায় বড় হওয়ার অপেক্ষা। অতই সহজ! অপেক্ষা কি ঈর্ষাবর্ধক কমলা রঙের কমলা! এক হইচই দিন ফুরোলে হলুদ বাতাবি লেবু ঘরে নিয়ে আসতে আসতে দেখি সব অন্ধকার। কেবল নৈঃশব্দ সাঁতার কাটছে চরাচরে। শূন্য খাট। নামিয়ে রাখলাম সেই বড় যত্নের লেবু। কোথাও শূন্যতা কি বেজে উঠে ছিল? জানি না। পরের দিন সকালে টেনিস বল পেটাতে পেটাতে কিন্তু আবার অপেক্ষা, এক্ষুনি ডাক আসবে, বেলা গেল, ঘরে আয়। সে ডাক আসে না। আমার অপেক্ষাও আর শেষ হয় না। ডাক আসবে ঠিক। কিন্তু সে কণ্ঠস্বর কই? ক্রমে নিভে এল প্রাচীন আখা। ফলত কি হল! কেবল সামান্য বিচ্ছিন্নতা আর শুন্যতাবোধ। সময়ে মেনে নিলাম, ঐ ডাক আর কোনদিনই আসবে না।
ফলত বিচ্ছিন্নতা এলো। সময়ের সঙ্গে এলো যৌনবোধ। অপেক্ষার আবার নানান তন্তু। কোনটাতে যে কখন জড়িয়েমড়িয়ে হাহুতাশ, বুঝতেই পারি নি। আজও নয়। তাই একা ঘরে, দুপুরমেশানো ছাদে, রোদ্দুরের সিঁড়িতে, রাত্রে কামিনীর সুগন্ধিত অন্ধকারে, পায়ে পায়ে পথে, আধখানা জানালায় আমাকে ঝুলিয়ে রাখল অপেক্ষা। কি লাভ হল তার! কেবল দিন গেল, রাত্রি গেল, বাথরুমকে সবাই বলল, কেন যে এটা এত সয়েল্ড থাকে সব সময়ে। আর তখন আমি মারফি রেডিওর উচ্চ স্বরে অনুরোধের আসর শুনি, পঙ্কজ মল্লিকের কাছে রবীন্দ্র সঙ্গীতের ক্লাশের একবগগা শ্রোতা আমি কিংবা রাত্রির নাটক। মারফি রেডিওই একমাত্র পরিত্রাতা সেই সব অশ্লীল সন্দেহের তখন। অসহনীয়, কিন্তু এর দায় তো আমার নয়! ওই অপেক্ষার। আসবে কি আসবে না, কতটকু দেবে সময়, নগ্ননির্জনতা শব্দটা কি তারপর রাত্রে কোলবালিশে রাখতে পারব, এত সবের অপেক্ষা। এ সব নিয়ে বহু জন অসীম অভিজ্ঞতা আর বৈদগ্ধ সম্বল করে কত কিছু বলেছেন! Shauna Niequist ‘Cold Tangerines’ শীর্ষক বইয়ের একটি নিবন্ধে বলছেন, we dont arrive. but we can become.and that’s the most hopeful thing i can think of. আবার বলছেন, For me, life is what was happening while I was busy waiting for my big moment. I was ready for it and believed that the rest of my life would fade into the background, and that my big moment would carry me through life like a lifeboat. এই যে স্বপ্ন, এই যে অপেক্ষা, এর কোন অবসান আছে? আর নেই বলেই পোড়াধরা জীবনটাও আছে। ফ্লাইওভারের পাশে বসে থাকা মানুষটিও ভাবে, একটা ছেঁড়াখোঁড়া কম্বলও কি মাঘ মাসের রাত্রে তাকে দেবে না কেউ। সে ফুরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারে না। ভাবে, কখন সময়টা একটু উষ্ণ হবে। সে উঠে দাঁড়াবে আবার।
‘কন্‌ফার্মড্‌ বেকার’ শব্দটা আমাদের সময়ে চালু ছিল বেশ। বিশেষ করে নিম্নমেধার ছেলেদের কাছে। মেয়েরা তখনও চালু চাকরির লাইনে সংখ্যায় খুব বেশি নয়। কিন্তু আমাদের তো তাগিদ ছিল। তাই অপেক্ষাও ছিল। এই অপেক্ষা শব্দ কি যে জ্বালিয়েছে এ সময়ে, কহতব্য নয়। তার উপর বন্ধুজনের কারো কপালে যদি অপেক্ষা এঁকে দিল চন্দনের স্নিগ্ধতা, তা হলে তো হয়েই গেল। তখন আবার তেড়েফুড়ে দমবন্ধ প্রতীক্ষা, আবার নির্ঘুম স্বপ্ন। আর গলায় হেমন্ত, অখিলবন্ধু, ধনঞ্জয়, জটিলেশ্বর, পান্নালাল,সতিনাথ।
অপেক্ষা নিরপেক্ষ কিছুতেই নয়। বিষম আচরণে সে সর্বক্ষণ উজ্জ্বল। থানে, অস্থানে হত্যা দিয়েও সেই অপেক্ষাই আবার শেষ শব্দ কিছু মানুষের কাছে। কেউ আবার ইচ্ছে করতেই, ‘জো হুজুর’ সেলামসহ থালা নিয়ে হাজির আলাদিনের জিন। অপেক্ষা কি, তারা জানলোই না। অথচ আমাদের ব্যালকনির থেকে ডান দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে যে ছোট্ট বারান্দা, সেখানে দেখি রোদশীত নির্বিশেষে একজন চূড়ান্ত বৃদ্ধা দিবাকর পাটে না যাওয়া অবধি বসে থাকেন মানে বসিয়ে রাখা হয়। তিনি জলখাবারের জন্য অপেক্ষা করেন, স্নানের জন্য অপেক্ষা করেন, দুটো ভাতের জন্য অপেক্ষা করেন, মিহি সুরে ডাকতে থাকেন, কাকে, জানি না, কিন্তু সেই ডাক বাথরুমে চিলের কান্না-র মত মনে হয়। একজন সুন্দরী মাঝেমধ্যে আসেন। নাইটি ইত্যাদি মেলে দেন তারে এবং চলে যান। শাড়ি মেলতে দেখি নি তাকে। একজন দিব্যোন্মাদ গোছের যুবক তোয়ালে জাঙিয়া এবং হরেকৃষ্ণ ইত্যাদি মেলে ঢুকে পড়েন অন্দরে। ঐ বৃদ্ধা অপেক্ষা করেন। কিসের জন্য! নিছক ক্ষুধায়! একাকীত্বে নয়? উনি কি তাঁর ঠাকুরের কাছে কিছু প্রত্যাশা করতে করতে অপেক্ষাই করে চলেন!
একজন পেনসনারকে তো দেখলাম, অবসরভাতা এবং অন্যান্য পাওনার জন্য অপেক্ষা করতে করতে সপরিবারে বিদায় নিলেন ইহলোক থেকে। তাঁর বোধহয় ভয়, বিশ্বাস, কোনটাই তেমন ছিল না। ক্রোধ ছিল। কিন্তু তাঁরা গেলেন তো গেলেন, কার কি এসে গেল এই হাচিকাশিটিকটিকিভুতকি ম্ভুতের পৃথিবীতে!
এই জন্যই বলেছিলাম, অপেক্ষার চক্ষুকর্ণ এমন কোন ইন্দ্রিয়ই নেই। আছে কেবল অশেষ কৌতুকবোধ আর অসভ্য লম্বা নাসিকা।
রোদ পড়ে এলে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে যাচ্ছে গাছের দিকে, বাসার দিকে, ডিমের দিকে, ছানার দিকে। সারাদিন খাবার খেতে খেতে, খাবার সংগ্রহ করতে করতে সে অপেক্ষা করেছে। কিন্তু গিয়ে সে সব ঠিকঠাক পাবে তো? এই প্রত্যাশাগুলোর কিছু সরিয়ে দেয় নি তো অপেক্ষা,অপার কৌতুকে!
আমার এক প্রিয় কবি তাঁর ছেড়ে আসা দেশের বাড়ি চোখেই আর দেখতে পেলেন না। অপেক্ষা তাঁকে কেবল অস্থির করে রাখল সারাটা জীবন। এখনো তাঁর সেই অস্থিরতা, ব্যাকুল তাঁর সারাটা সময়। অপেক্ষা তাঁর সামনে যে কোন্‌ এক সাহেবকৃত দাগ ধরে কাঁটাতার টাঙিয়ে দিয়েছে, সেটা এখনো আমার কবির পেরোনো হল না। এই তো অপেক্ষার অসীম কৌতুক।
অদ্যাবধি চাকরগিরিতে একজন রাম নিদেন পক্ষে ভরতকে চেয়েছিলাম। হল কই! অপেক্ষাই সার। ঘাড় আর আমার সোজা করা হল না। নীতিদুর্নীতিসময়অসময় সব একাকার হল। অপেক্ষা, তুমি স্বস্তির বার্তা নিয়ে কতদূরে? অথচ মানুষের দিন যে শেষ হয়ে আসে দিনের নিয়মেই! আর আশা আকাঙ্ক্ষা ভয় আশঙ্কা ভালবাসা, এমন নানাবিধ অস্পষ্ট অবয়বে সারাক্ষণ যে ঝুলে আছো তুমি, অপেক্ষা, নাকের ডগায়, সে কেমন ভব্যতাসভ্যতা! একেক সময়ে মনে হয়, তোমার এই নির্বিকার অথচ অপার কৌতুকবোধ নিয়ে অপেক্ষা তুমি আমাদের সঙ্গে আজন্ম ধিকধিক করছ বলেই না আমরা আছি। তা না হয়ে যদি যখন যা চাইছি, তাই খপাৎ করে হাতে চলে আসছে, এক সময়ে নিশ্চয়ই ব্যপারটা বড় বিরক্তিকর হয়ে উঠত। আমরা অন্ধ কুঞ্জবিহারীকে চিনি। একতারা বাজিয়ে গান শেষ হলে অপেক্ষার সুতোও শেষ হয় তার। সঞ্জয় সেন ক্ষুধার অন্ন পাঠান তার কাছে। কিন্তু এর মধ্যে কোন থ্রিল নেই। আর ক’জনকেই বা অপেক্ষা এমন রেয়াৎ করে! বরঞ্চ, পাই নি ডিজিটাল রেশন কার্ড এখনো, কিন্তু ঠিক পাবো একদিন। সবার জন্য যখন বাড়ি সব্বময় কত্তা দিচ্ছেন, আমিও এমনই দয়াধম্মে ঠিক পাবো সময়ে। এই যে পাবো পাবো-র অপেক্ষা, ছুটোছুটি, এই কায়ক্লেশের মধ্যেই তো জীবন। সেই যে জল থইথই জমির আলের ধারে বসে বিড়ি খেতে খেতে আধবুড়ো মানুষটা বলেছিল না একদিন, ‘কি আর কমু কত্তা, বোঝলেন কি না, আশায় বাঁচে চাষা’! আর আমরা তো জেনেই গিয়েছি, আশার উল্টো দিকেই অপেক্ষা, শেই দীপ্তিময় আলো অথবা অন্ধকার, বসে আছে নির্বিকার।
এ প্রসঙ্গে সসঙ্কোচে একটা কথা জানাই। যদিও বাহুল্য হবে। ওই দেবদূতের অপেক্ষা কিন্তু এখনো ছাড়ি নি আমিও। সে কি বারবার ভুল করবে! আসবেই সে। ঠিক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। গ্রামদেশে মানুষের ঘরে নবান্ন আর মৃদু আলপনা, তুলসির পাতা বেয়ে নেমে আসছে শিশির, চরাচর জুড়ে অপার প্রশান্তিতে যখন কেবল মধু বাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ, সেই ফুরন্ত পূর্ণিমায় আমার জন্য সে আসবে। এই অপেক্ষায় হয়ত নির্বোধ আশা আছে, কিন্তু ভালবাসা-ও কি কিয়ৎপরিমাণে মিশে নেই তার সঙ্গে!

----------------