সেইসব অপেক্ষারা

প্রবুদ্ধ ঘোষ



অপেক্ষা করে ছিল কেউ? যেমন সব প্রেমের গল্পে আপেক্ষা করে থাকে আবহসঙ্গীত। ছেলেটি প্রেমের জন্যে অপেক্ষা করে নায়েক গলির মুখে, কাঁধের ব্যাগে কোচিং ক্লাসের নোট্‌স। অসহিষ্ণু সাইকেল বেল বাজিয়ে সরে যেতে বলে। অফিসফেরত ব্যানার্জ্জীকাকু বেপাড়ার ছেলেটিকে অভিজ্ঞ চোখে মেপে নেন। কয়েকদিন ধরেই ব্যাপারটা খেয়াল করছেন, একটা ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও যে ভাবেননি তা নয়। পানের পিক্‌ ফেলতে গিয়ে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ‘এই এখন এক ন্যাকামি হয়েছে’ বলে ওঠেন ন’বৌদি। হিমের সময়। তাই স্ট্রিটলাইটগুলোকে মুড়ে রাখে হিম। গলির অন্য দিকের আলো যেহেতু কানা, তাই আবছায়া বেশি। আজ তাড়াহুড়োতে মোবাইল আনতে ভুলে গেছে, মাধ্যমিকের পর গিফ্‌ট পাওয়া ঘড়িটাই সময় দিচ্ছে এখন। আর কতক্ষণ? বাবুদা’র চায়ের দোকানে ভিড় পাতলা হতে শুরু করেছে। শেষবারের চা ফোটাচ্ছে বাবু’দা। গেঞ্জি কারখানার লেট্‌ শিফ্‌টে আসা তিনজনকে চা দিয়ে ঝাঁপ ফেলবে। হালদার বাড়ির দোরে অপেক্ষা করছে রেডি, ল্যাজ নাড়ছে মাঝে মাঝে। নায়েক গলির বাঁ দিকে একতলা বড় বাড়িতে ভাড়াটেদের হইহল্লা গুনগুন কমছে বাড়ছে। ওখানের কোনও একটা ঘর থেকে ভাঙা গলায় ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ ভেসে আসছে, সাথে ভারি গলার সঙ্গত। আর কতক্ষণ? আজই তো মেয়েটির উত্তর দেওয়ার দিন। এসএমএসে নয়, সামনাসামনি উত্তর পেতে চেয়ে অপেক্ষা। একটা অন্য অপেক্ষাও আছে... পুজোসংখ্যার প্রেমের গল্পে যেমন পিপারমিন্ট স্বাদের চুমুর অক্ষর থাকে... তেমন কি আজও হতে পারে? এতক্ষণে মামণিদির ইংলিশ ক্লাস শেষ হয়েছে বোধহয়। ওকে বলা আছে নায়েক গলিতে আসার কথা। আসবে তো? নাকি আরও কয়েক ডিগ্রী তাপমাত্রা নেমে যাবে আজ, এক্ষুনি? তবে কি, ‘না’? প্রত্যাখ্যান বড়ো ভয় পায় ছেলেটি। ফাটা ঠোঁটের পাতলা চামড়া নোনতা লাগছে। আর কতক্ষণ?

#
“But wait for me,/ Keep for me your sweetness./ I will give you too/ A rose.”- Absence, Pablo Neruda
মেয়েটি অপেক্ষা করে ছিল অনেকক্ষণ। একটা খবরও আসেনি। জুটমিলে লড়াই চলছিল মাসখানেক। আজই হেস্তনেস্ত হওয়ার কথা ছিল। মেয়েটির আব্বা ওই জুটমিলেরই লেবার। তাই আগের রাত থেকেই জেগে ছিল বাকিদের সাথে। ঝামেলা নাকি মিটে এসেছিল অনেকটাই, ইউনিয়ন কম্প্রোমাইজ করতে রাজি হয়েছিল। বহুদিন অপেক্ষার পর স্বস্তি... কিন্তু শেষরাতে মালিক বদল হয়ে গেছে। লোক্যাল এমএলএ-র হাত ধরে নতুন মালিক কিনে নিয়েছে জুটমিল। তাই, আবার ছাঁটাই সিদ্ধান্ত বলবৎ। আবার লড়াই পাল্টা দাবি। গতরাত থেকে আব্বুর খবর পায়নি মেয়েটি। অপেক্ষা করে ছিল। সকালে ট্যুইশন পড়াতে গিয়েও মেয়েটি মন দিতে পারেনি। স্কুল নেই, মাধ্যমিকের টেস্ট চলছে বলে ওদের ক্লাসের ছুটি ছিল। বিকেলে আবার একটা ক্লাস ফাইভকে পড়িয়ে মামণিদি’র ইংলিশ কোচিং যেতে হবে। তারপরে ওর সাথে দেখা। উত্তর তো জানাই আছে, তবু... অপেক্ষা করে থাকবে ছেলেটি, উত্তরের জন্যেই। সারাক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে মামণিদির নোট্‌স নেওয়া শেষ করে বেরোতেই যাচ্ছিল, হঠাৎ বেজে উঠেছিল মোবাইল, মাধ্যমিকের পর ট্যুইশনের টাকায় আর আম্মির জোরাজুরিতে কিনেছিল ছোট্ট সেট্‌। ছেলেটি কি? না, বাড়ির পাশের এসটিডি কাকু। আব্বুর খবর এসেছে। আব্বুদের খবর। রক্ত। ওদের মহল্লায় ঢুকে পড়েছে এমএলএ-র মস্তানরা। বস্তি জ্বালানোর টায়ার, তেল জড়ো করছে। এক্ষুনি ফিরে যেতে হবে। তা’লে? নায়েক গলিতে যে অপেক্ষা করে আছে? মনে যার নিত্য আনাগোনা? পরনে হাফশার্ট... দ্রুত ডায়াল করেছিল মেয়েটি। বেজে গেছে ছেলেটির মোবাইল। অপেক্ষার রিং বদলে গেছে যান্ত্রিক স্বরে, ‘দ্য নাম্বার ইউ হ্যাভ ডায়াল্‌ড...’। কেউ কি অপেক্ষায় নেই তা’লে? সবই কাল্পনিক কবিতা আর কথার কথা? হিমের শেষসন্ধ্যে গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছিল। এত হিম এ শহরে জমেছিল? বড় রাস্তার মোড়ে আসতেই বাস সঙ্গে সঙ্গে। ছেলেটি? উত্তর?

#
“ভোলেনি একটা কথাও পার্থ তোমার/ যদিও ভান করে সে নানান ছলে/ তবুও দিবসরাত্রি যন্ত্রণা তার/ এখনও ছিটকে ওঠে হৃৎকমলে... এবারে বাজবে ঠিকই যুদ্ধের শাঁখ/ তুমিও রক্ত দিয়ে বাঁধবে বেণী/ প্রবাসের দ্বাদশবর্ষ ফুরিয়ে যাক/ ততদিন ধৈর্য ধরো, যাজ্ঞসেনী।“- প্রবাসে দ্বাদশবর্ষ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
ছেলেটি জেনেছে পিপারমিন্টের তুষারপাত পুজোসংখ্যার নভেলাতেই হয়, বাস্তবে শীতকাল একটু গরম কমায় মাত্র, তার বেশি নয়। কখনও প্রবল তাপে পুড়ে যায় রাফখাতার শেষ পাতায় লেখা নাম। ক্রমশঃ চাপ বাড়তে থাকলে রোম্যান্টিক শব্দরা কমে আসতে থাকে। পরীক্ষা বাড়ে। পুরনো পাড়ায় প্রোমোটার বেড়ে গেলে নতুন পাড়া খুঁজে নিতে হয়। বিএল-ফাইভসি ব্যাটারি ফুলে উঠলে বেশি এমএএইচ-র ব্যাটারি প্রয়োজন। মাইনে বাড়লে অবসর কমবেই। পুরনো বন্ধুদের মোবাইল নম্বর হারিয়ে গেলে ওয়াট্‌সঅ্যাপে একঘেয়ে জোক, রিপিটেড জিফ্‌ ফাইল আর বিরক্তির গুড মর্নিং বেড়ে যায়।
মেয়েটি জেনে গেছে অনেক যুদ্ধজয়ের পরিশ্রম। অপেক্ষার রঙ বদলে যায়, পাতা ঝরে পাতা জন্মায় নতুন। অনেক উত্তর অপেক্ষা করে করে শীতঘুমে চলে যায় দীর্ঘ সময়। সব প্রশ্নেরই উত্তর হয়, কিন্তু সময়মতো দেওয়া হয়ে ওঠে না। পরীক্ষার নম্বর কমে-বাড়ে। সিঁড়ির ওপর বাঁধা সিঁড়ি। প্রথম মোবাইল ছিটকে পড়ে গেছিল বসতি ছেড়ে আসার আগুনলাগা মুহূর্তেই। এসএমএসগুলো হারিয়ে গেছিল। এসএমএস টোন্‌টা মনে আছে অবশ্য। আর, একটা সেই নম্বরের মেসেজের অপেক্ষা। প্রিয় ডায়েরির পাতায় লেখা ছিল বিশেষ মেসেজগুলো। তলায় ছোট্ট ছোট্ট কমেন্ট, স্বগতোক্তির মতো।
আজ নায়েক গলিটা অপেক্ষা করে আছে। ব্যানার্জ্জীকাকুরা অনেকদিনই গলফ্‌গ্রীনে চলে গেছে। রংচটা পুরনো বাড়ির ন’বৌদি গলায় দড়ি দিয়েছিল একদিন ভরদুপুরে। ওই স্ট্রিটলাইট কারণটা জানত, বলেনি কাউকে। কানা আলোটার জায়গায় ত্রিফলা বসে গেছিল কয়েক বছর আগে, তবে তার দু’টো বাল্‌ব আপাততঃ নেই। বাবুদার বয়েস বেড়েছে। পাশের গেঞ্জিকলে নতুন দু’টো ছেলে এসেছে, ব্যবসাও মন্দা। ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ গান শেখানোর মাস্টারমশাই কোনও এক ছাত্রীকে বিয়ে করে নিয়েছিলেন, নায়েক গলিতে আসেননি আর। তবু নায়েক গলি অপেক্ষা করে আছে। এখানেই আজ মিছিলের জমায়েত। গলির পিছনের বড়ো মাঠটায়। সদ্য ঘটে যাওয়া গণহত্যার বিরুদ্ধে মিছিল, ধর্মের নামে প্রেমিক-প্রেমিকাকে খুন করার বিরুদ্ধে মিছিল- এখানেই জড়ো হবে সবাই। ধর্ম যে মানুষকে ভাগ করতে পারেনি এখনও এ শহরে অন্ততঃ সেটা দেখিয়ে দেওয়ার বিকেল। ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষক অধ্যাপক আসবে, ওই গেঞ্জি কারখানার শ্রমিকেরা থাকবে, অন্যরাও, চাকুরিফেরত লোকজন, পেশা-ধর্ম-লিঙ্গ-শ্রেণি নির্বিশেষে জমায়েত- এমনটাই অন্ততঃ লেখা পোস্টারে। গলির মুখ থেকে বড় রাস্তায় যাবে মিছিল। অন্য আরেকটা মিছিল আসবে, তার সাথে মিলবে। বড় হবে আরও। সেই ছেলেটিও আসবে। গলিটা জানে। মেয়েটিকেও আসতেই হবে। কেন আসবে? হয়তো তারা প্রেমের পক্ষে বলেই। দেখা নিশ্চয়ই হবে? অথবা অত মানুষের ভিড়ে এক দশক আগের মুখগুলো না-চেনাও যেতে পারে। তবু অপেক্ষা তো করতে হবেই। আর, যদি চিনে ফেলে সেই এক দশক আগের অপেক্ষার প্রত্যুত্তর চায়? সেসব অন্য গল্প হবে। এক বসন্তে প্রেম যায় নাকি?