বসে আছি হে

রঞ্জন মৈত্র



হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে। যখন দ্বিতীয় সেতুর গায়ে দাঁড়িয়ে নিজের হাপরটিকে একটু বিশ্রাম দেওয়ার চেষ্টা করছি, চারপাশ ঘিরে ধরেছে সবুজ, মাঝখান দিয়ে রীতিমতো ছড়ানো আলপনা এঁকে নেমে আসছে এক বিপুল ঝর্ণা, নিজের হিয়ার আয়তনটি নিয়ে একটু ভাবতে বসি। জানি না, সত্যিই তো জানি না। এ জীবনে কতকিছু হারিয়ে গেল আর কতকিছু স্থির হয়ে রয়েছে পথের বাঁকে বাঁকে, আমারই জন্য। আর এই সমস্ত কিছু ধরে রেখেছে হিয়া নামের নরম আর ছোট্ট পেটিকাটি। আমিও তো কান পেতে থাকি ভিতরে ভিতরে, চলায় দৌড়ে, ঘুমে নির্ঘুমে, খাটনি আর আলসেমিতে। দিন রাত্রি, ভোর প্রদোষ, সবই কেবল আলোক প্রক্ষেপণের মতো মাত্রাভেদ। আমার আলোটি জ্বলতেই থাকে। দিয়া। কোমল আর চিরন্তন। নতুন ক’রে পা’টি ফেলার আগে মনে হল

এলে বহিয়া
আমি এক পিদ্দিম দু’ পিদ্দিম
যা আলো ভাবছি, কাঁপছে
তাকে স্থির দেখার মনে
দাঁড় করাই চোখকে
আর ভোর করাই, মাঝরাত, বরফ ও বসন্ত
কি যেন কানে লাগে
কি যেন নাছোড় উড্ডীয় শিশির
যখন গিলে ফেলছে গাছপালা বোল্ডার
আমার পা পড়ে, স্নানে, নাহিয়ায়

হাট বসেছে বনবাদাড়ে। বার এখানে অলীক শব্দ। তারিখ বাড়তি ওজন, কেবল হাটুরে তাঁবু। তার জোড়া দরজা। ফিসফাস, গুনগুন, হইহই আর শুনশান। তাঁবু ছড়িয়ে আছে। ঘিরে রয়েছে জঙ্গল। তাকেও ঘিরে দাঁড়ানো সব অতিকায় সাদাছাদের ইমারত। যুগান্তের। অন্দর তো চাইই। মহল এক সংস্কারমাত্র। সীমানাও সংস্কার। ঠেসাঠেসি স্লিপিং ব্যাগ। তার ঘুমিয়ে থাকা শেষ হলে, আমাদের চোখ ভারি হয়ে আসে। থালাবাটির সিম্ফনি অবাস্তব। মহল শব্দটিকে খারাপ লাগে না। তার চেন টেনে দিই। আর ঠেসাঠেসি সব মুখ কথা দিনের অভিজ্ঞতা রাতের হিয়াময়, শান্ত হয়ে আসে। নতুন আলোর জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এক অন্ধকার, সুদূর ঝর্ণার মত আলপনা করে ছড়িয়ে ছড়িয়ে

মাঘমিনারের আজান তুমি জানো
বৈশাখে পত্রপল্লব সাকি
বোনা মেদুর পাতা হয়েছে
মেঝের বুনকর তুমি মুয়াজ্জিম হয়ে উঠবে
ঊষায় ফজরে সেই ভোলামন
মোজা দেবে নবীন চারণে
তাঁবুও বহিয়া যায়
জুতো পেতে, পা খুঁজে পেতে

জয়ের একটা মেঘ ছিল। পরাজয়েরও একটা। যখন বাখিম থেকে, তানসিং থেকে, রোদ বেরোচ্ছে ঝকঝকে। একটা ছোট্ট ঝোরা গহীনে, ভাষাহারা সাদায়। তাকে কেউ ঝর্ণা ব’লে ডাকবে না। স্কুলের গেটে সাইকেল, কলেজের গেটে বাইক, অপেক্ষায় থাকবে না। মেঘ কত বলপেনকে কবির করেছে, ঝর্ণা কত তূলিকে ছবিয়ালের। দেহেরও একটা শরীর আছে। সাইকেলের টুংটাং, বাইকের জ্যাজ আর অ্যাম্বুলেন্সের স্যাক্সোফোন সে-ই বাজায়। শরীর নেই, যখন শরীর নেই কোত্থাও, একজন অতনু আমাকে ডাকছে। একজন সুগন্ধ, একজন সৈকত আর একজন ওংকার-ও। পথভোলাকে পথে ফেরানোর প্রেম। হারিয়ে ফেলার মেঘ থেকে দেখা হওয়ার বৃষ্টি পড়ে। আষাঢ় শ্রাবণের জন্য বসে থাকে টুপটাপ, যখন বালিতে পা রাখা যাচ্ছে না। ঘুরে দাঁড়িয়ে ভাবি, কেবল হাঁটার জন্য হাঁটছি কি? কোথাও পৌঁছতেই হবে! কে আমায় ফিরে ডাকে! কে আমায় বাহিরপানে বুঁদ ক’রে দেয়? প্রায় ১৩০০০ ফিটেও সামান্য ঘাম ঝরছে। কাটিয়ে দিচ্ছে পাথর বনস্থলী আর বরফচূড়ার একলাপন। যখন মেঘ করবে, যখন মেঘ করছে জোংরি টপে, আজকের তাঁবুকুঠিতে, চশমার কাচে। মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছে চিনির দানা আর মিলিয়ে যাচ্ছে চায়ের কাপে। যদি আসতে, আসতে পারতে এই সুন্দর দৈত্যদের বাগানে। বৃষ্টিতে আর আলাদা করা যেত না জয় পরাজয়। একটা ফাটলের জন্য তাকিয়ে থাকা, একটা ফাটলকে রুকস্যাকের বাইরে আনা, আলো আসবে ব’লে।

চলে গেছ
যাচ্ছি আমিও
হাসিন মওসমের দিকে
আলোর ফুটকিদের এই ট্রেকিং
অন্ধকারে পায়ের নিচে ধবধবি করঞ্জলি
ছোট ছোট স্টেশন
কখনও পিছলে যায় কখনও ডাকে
পা খুঁজছে কাঞ্চন
মাথা চাইছে অরুণ
চলে গেছ
আর সুহানা সফরের মাথায়
একটু একটু করে লেখা হচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা¬
নামকে আমি ডাকে নিয়ে যাচ্ছি
ক্যামেরাকে ছবির কাছে
হিমমাথা আর তাঁবুর মাঝামাঝি
পথ চেয়ে বসে আছে সেলফোন নাম্বারগুলি

ভাবি মুছে দিই। ডিলিট। আর তো কাজে লাগবে না, কোনও দিন। ডাক আসবে না, যাবে না। পর্দায় নম্বর জাগাই। হাত বরফ হয়ে আছে, যেখানে আছো ভালো থেকো, কি ক’রে বলব! জানি তো নেই, কোত্থাও নেই। দলমায় দিল্লী হাটে রোজের পাড়ায়। হাত বরফ হয়ে থাকে। তার ওপর প্রথম সূর্যের আলো। ক্লিক ক্লিক শব্দ করে দিগন্ত। নম্বরগুলো মেমরিতে। সুইচড অফের খবরগুলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে একচিলতে ভোডাফোনে। মেঘ উড়ছে। কে স্ট্যান্ডে ফোকাস করে একদৃষ্টি, কে প্যান করছে আলোকে আলোকময় করতে! সুর দিয়েছো তুমি, এই কথা ইচ্ছে করে, বলতে ইচ্ছে করে খুব।