এত অ-পর কেন ভাবো

অনিন্দ্য রায়



এত অপর
কেন ভাবো
"মায়াবী হাশিস" -এর চতুর্থ প্রচ্ছদ, লেখা আছে এই শব্দক'টি।
কেন?
আলাপের প্রথমদিকে আমাকে ' ‘আপনি'’ সম্বোধন করতেন,বারীনদা, একটা সময়, নব্বইয়ে, কেন? কে জানে! !
চিঠিতে লিখতেন," প্রিয়বরেষু"।
লিখতেন," এখনো আপনাকে জানানোই হয়নি কেন আপনার কবিতা আমার ভালো লাগে । অনেকেরই লাগে। মনে হয় আপনার জানা জরুরী নয়।"
( আমাকে লেখা বারীনদার চিঠি, ৩১/৮/৯৩ )
অনেক অনেক পরে '’তুই’'। আমি ‘আপনি, ছাড়তে পারিনি । আমার অনেক বন্ধুর সঙ্গে তাঁর যে অন্তরঙ্গতা আমি কি তা থেকে সামান্য দূরত্বে ছিলাম ? সামান্য পর? অ-পর ? সে ত্রুটি আমার ? স্নেহ করতেন, প্রশ্রয় দিতেন; আমিও তাঁকে শ্রদ্ধা, ভালবাসার পাসওয়ার্ড কি আমাদের ভেতরে ছিল না ? অথবা প্রয়োজনই হয়নি, কবিতা ছাড়া আর কোনো যোগসাজশ ছিল না আমাদের, গোপনীয়তাও ছিল না যা খুলতে পাওয়ার্ড লাগবে ।
বাঁকুড়া বইমেলায় এলেন একবার। ছিলেন যেখানে আমি পৌঁছতে দেরী করছি। তো, আমার শহরের এক অগ্রজ কবি আগে সেখানে পৌঁছে, আমার খোঁজ নিতে তাঁকে বলেন,”আপনার চ্যালা আসেনি?”
কিন্তু হয়ে উঠতে পারলাম কই বারীন ঘোষালের চ্যালা! শার্গিদ?
হায়, গুরু হয়ে উঠতে চাননি কখনো, অথচ লোকে বল্ল,”ছেলেধরা।“
নিজেকে বললেন,” বাংলা কবিতার ভিলেন।“
হিরো হতে চাননি কখনো।
বললেন,”আমি মেইনস্ট্রিম (মূলধারা) কবিতায় আগ্রহ রাখি না। প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতায় আবহমান বাংলা কবিতার রিমেক রিমিক্স নকলনবিশীর পথ ত্যাগ করে মৌলিক কবিতার সন্ধান করেছি।” তিনি তো ‘কৌরব’।
ধরতে চেহেছি তাঁর কবিতার চিহ্নগুলিতে এবং নিজের লেখালেখি থেকে বাদ দিয়েছি সেইসব।
আমি বারীন ঘোষাল হতে চাইনি। কোনোদিন যাইনি টেলকো কলোনি বা সোনারি।
প্রথম দেখা, মুখোমুখি বাঁকুড়ায় পূর্ণেন্দু শেখর মিত্র-র বাড়িতে, এক সরস্বতী পুজোয়। প্রায় প্রতি বিষয়েই আমাদের অমিল।
অনেক তর্ক; অদ্ভুতভাবে উস্কানি দিতেন, প্রশ্রয় দিতেন, মজা করতেন, সতর্ক করতেন কবিতার ট্র্যাপগুলির বিষয়ে।
ম্যাসেঞ্জার খুলে দেখছি তাঁর সাথে কথোপখনের বেশীরভাগটাই তর্ক।
কক্ষনো রেগে যাননি অর্বাচীনের অসম্মতিতে ।
একটা কনফিডেন্স ছিল তাঁর বিশ্বাসে।
হ্যাঁ, সেই কনফিডেন্সটাই আজ আরও বেশি করে টের পাই, যখন তাঁক নিয়ে ভাবিত হয়ে ওঠে জগদ্দল প্রাতিষ্ঠানিকতা, তাঁকে আক্রমণ করতে বাধ্য হয়।
তিনি তো অপর, দ্য আদার। কেউ কি তাঁকে ‘আত্ম’ করেনি? তরুণ কবির দল, বিরোধী প্রৌঢ় ?
তিনি তো বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ভালবাসার হাত। না দেননি, একেবারে এক অন্য কবিতাবোধ ও ভাষায় তিনি আমাদের ‘অপর’। একেবারে একা। একেবারে বারীন ঘোষাল।
হারাতে হারাতে একা।

এত অপর কেন ভাবো, বারীনদা, আজও ?