স্বীকারোক্তি

মেঘ অদিতি


বহু আগে বজ্রযোগিনী গ্রামে যে আলোটি এসে পড়েছিল তার যাত্রা শুরু হয়েছিল বিচ্ছুরণে সাত রঙা হয়ে। সময় গড়িয়েছে। বীজ থেকে চারা। চারা থেকে সতেজ গাছ। জল হাওয়া পেয়ে ছড়িয়ে দিয়েছে সে ডাল পালা সমেত সবুজ পাতার তারুণ্য।

সেই শুরু। তারপর পেরিয়েছে কত সময়। আমরা ভালোপাহাড়ে যেতে চেয়েছি। কেউ গেছি। কেউ কেউ আজও সেখানে গিয়ে উঠতে পারিনি। কখনও হয়তো যাওয়া হবে সে ভালোপাহাড়ে। কিন্তু ভালো সেই মানুষটি সেদিন সাথে থাকবেন না। না কি থাকবেন তখনও তিনি, যেভাবে ছায়া হয়ে সাথে সাথে থাকে আমার বাবা! হয়তো যাওয়া হবেই না।
সবাই সব পারে না কি.. সবাই কি হয়ে উঠতে পারেন লেজেন্ড, যেমনটা পেরেছিলেন বারীন ঘোষাল!

পেশায় আমি গ্রাফিক ডিজাইনার তবে ফাইন আর্টস থেকে আসিনি। যা কিছু কাজ আমি ডিজিটালে করি। টুকটাক আঁকি কখনও কম্পিউটারে, কখনও কাগজে। মিক্স মিডিয়ায় সেটা প্রকাশ করি। আর কী এক অজানা রহস্যে আমার সেই আঁকাগুলো বারীন দার পছন্দের হয়ে যায় । বারীন দা একদিন লিখলেন, “তোমার আঁকা ছবি আমার ভাল লাগে। তোমার কবিতা ভাল লাগে। মানেই হল তোমাকেই ভাল লাগে। এক একজনের সাথে এরকম হয়।“ বারীন দার এ কথায় আমি তখন আবারও আবেগের পাল তুলছি হাওয়ায়। উত্তরে কী বলি বুঝে না পেয়ে শেষে লিখলাম, বারীন দা আপনার মতো ব্যক্তিত্ব যখন এত ছোট কাউকে তার কাজের প্রশংসা করেন আমি কথা হারাই। তিনি লিখেছিলেন, “আমি কেউ না। কিছু না। তোমরা সবাই মিলে এই আমি। তোমাদের সম্মিলিত প্রয়াসে আমি তৈরি হয়ে উঠি মাত্র।“

২০১৪ র সেপ্টেম্বর মাসে অনলাইন একটি পত্রিকার জন্য বারীনদার কাছে কবিতা চাই। বারীন দা কবিতা নিয়ে কথা বলার আগে আমাকে প্রশ্ন করেন, ‘কেমন আছো? কী হয়েছে? তোমার আঁকা কেন দেখছি না?’ সেবার কবিতা তিনি দিয়েছিলেন। যাদের পত্রিকা তাদেরকে সে কবিতা আমি পৌঁছে দিই। কিন্তু সেটা প্রকাশ পাবার পর দিব্যি ভুলেও যাই বারীন দাকে তা জানানোর কথা। ২০১৫ র জুলাইতে বারীন দা আমাকে লিখলেন, মেঘ, ভাল আছো ? গত সেপ্টেম্বর মাসে আমার একটা কবিতা নিয়েছিলে কোনো পত্রিকার জন্য। সেটার কিছু হল ? আমি স্রেফ আকাশ থেকে পড়লাম। ভুলেও গেছি সে কথা। বারীন দাকে উল্টে জিগ্যেস করলাম, কবে নিলাম? নিইনি তো! তিনি আমার এ কথার কোনো উত্তর করেননি। ঠিক দুদিন পর খেয়াল হলো সত্যি তো কিছু একটা যেন নিয়েছিলাম। এবার শুরু ইনবক্সের কনভারসেশন স্ক্রোলিং। পেয়েও গেলাম। লজ্জার শেষ নেই তখন। বারীনদাকে লিঙ্ক দিয়ে লিখলাম, দাদা এই কবিতাটা নিয়েছিলাম। কবেই পাবলিশ হয়েছে। যাদের পত্রিকা তারাও আপনাকে লিঙ্ক দেননি, আমিও ভুলে গেছি।

বারীনদার উত্তরটা ছিলো, “হ্যাঁ, এটাই। যাক গে। তাহলে লেখা নিয়ে ভুলেও যাও ? এই ভুলোমন শিল্পিকেই মানায়। সুপ্রভাত মেঘ।“

প্রিয় বারীন দা, যে কথাটা কোনোদিন আপনাকে জানানো হয়ে ওঠেনি, বইমেলায় কৌরবের স্টলের বাইরেটায় যে চেয়ারে আপনি বসে থাকতেন, সেখানে গিয়ে দাঁড়ালে আপনি যখন হাত ধরে পাশে বসতে বলতেন তখন বাবা আর আপনার মধ্যে কোনো তফাৎ পেতাম না। পাশাপাশি বসে, অত কলরবের ভেতরও আপনি আমি দু’জন স্বল্পবাক মানুষ নৈঃশব্দ্যের ভেতর দিয়ে কখন যেন পিতা-পুত্রী হয়ে উঠেছিলাম। আসছে বইমেলা বা তার পরের যত বইমেলা হবে, কৌরবের স্টলের বাইরেটায় সেই চেয়ার আপনার জন্যই রাখা থাকবে। সেই চেয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়ালে, ছায়ার মায়া মেখে আপনি কি আমাকে আবারও সেদিন পাশে বসতে বলবেন?

আত্মবিস্মৃতির দিকে পাথুরে জমিন। আত্মবিস্মৃতির দিকে আলোর ধুম। খুলে যায় ঝুমঝুম পাতার নির্জন। পাহাড় জঙ্গল, জঙ্গল পাহাড়; বেপথু ও কার ছায়া ভাসে?
এলো হেমন্তের রাত। গেলো হেমন্তের রাত। হাওয়া পেরিয়ে গেছে খেয়াযান। বাজে ডাক হু হু ঋইইণ... রীন.. জল বাড়তে বাড়তে এখন সবুজে মিনার। ঘুম যেন আর ফুরোবে না..
ধর্মাবতার
অদ্যাবধি তবু আমি কবিতাকেই জান্নাত জেনেছি..
---------------