কমলের বারীন

কমল চক্রবর্তী


লোকে বলে আমরা কৌরবের কারণে বন্ধু। না, এ আমাদের ৬৫বছরের সম্পর্ক। একই স্কুল; এমনকি হাই স্কুলেও আমরা একই স্কুলে পড়েছি। বারীন ক্লাস ফোর আর আমি থ্রী। কাছাকাছি পাড়ায় বাস। ওকে অবাক হয়ে দেখতাম। ওর বিভিন্ন বিষয়ে ভালো দখল ছিল, পাথর ভাঙত,ব্যায়াম করত, খেলাধুলা করত। ইঞ্জিনিয়ারিন পাশ করে ও ফিরলো,আমিও। সুভাষ বলল ,কবিতা লেখে। সেদিন ব্যায়াম করছিলো ক্লাবে,আমি ডাকলে বেরিয়ে এলো ঘাম মুছতে মুছতে। ‘হ্যা,লিখি তো কবিতা’। আর মাঝে মাঝে বন্ধুদের খুব জ্ঞান দিত। আমি আবার ওর মতো এতো কিছুতে ছিলাম না। দু’জনেই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করলাম। ’৬৮তে সুভাষ কবিতা লেখার পরামর্শ দেওয়ায় আমার লেখালিখির শুরু। একদিন বারীন ক্লাবে ব্যায়াম করছে, আমি গিয়ে ডাকলাম। খালি গায়ে, তোয়ালেতে ঘাম মুছে সে এলো। বললাম- ‘কবিতা লিখবি?’ ‘লিখি তো’ –বলল বারীন। ৬৮’তে সুভাষ বলল,চল নাটক করব। নাটক কে লিখবে? আমিই লিখলাম ‘সুর্যের বুকে ফসিলের নীল’। আমি নায়ক,মৃত কবি। বারীন হল পেইন্টার, সুভাষ নাট্যকার। তা নাটক তো হবে দলের নাম কী? কেউ বলল পাঞ্চজন্য,কেউ সেঁজুতি। আমি বললাম কৌরব। সকাল হলে আমরা বসতাম গঙ্গার চায়ের দোকানে। যাই হোক নাটক হল। কিছু পয়সা বেঁচে গেল। বললাম চল তরুণ কবির মহোৎসব করি। ১৯৬৯ - সে উৎসব হল। সুনীল এলো,শক্তি এলো,দুম করে চলে এলো নরেশ গুহ।
ডিসেম্বর, ১৯৬৮তে শুরু হয়েছিল কৌরবের যাত্রা। তা সেই নাটকের পর দেখা গেল আমাদের হাতে বেশ কিছু টাকা (আন্দাজ, ৪০০ মতো) রয়েছে। আমরা ঠিক করি যে সেই টাকা দিয়েই একটা কবিতাসভা করা হবে। ‘৬৯এ কৌরবের পক্ষ থেকে প্রথম কবিতা সভা আয়োজিত হয়। নাম দেওয়া হয়েছিল, ‘তরুণ কবি মহোৎসব।’ তাতে আশ্চর্যভাবেই উপস্থিত ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নরেশ গুহ, সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তিত্ব।
এরপর জামশেদপুরে শুরু হল মাওবাদী এবং নকশাল আন্দোলন। দলে দলে যুবারা মারা গেল। দেওয়ালে দেওয়ালে স্লোগান, কবিতা। এই সময় আমার আর বারীনের কবিতায় বদল শুরু হল। আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অথবা জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে বর্জন করে ‘নতুন ধরণের কবিতা লেখায় ব্রতী হলাম। কবিতাসভার আয়োজন করা হয়, সেখানে তুষার রায় এবং বহু বিশিষ্ট খ্যাতিমান কবিরা বিভিন্ন সময়ে উপস্থিত থাকতেন।
তখন আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। ‘৭০এর দুর্গাপুজোয় বারীন আর আমি চা, ঘুঘনি, মিষ্টির স্টল করে কিছু টাকা আয় করি। সেই টাকার সাথে ব্যক্তিগত কিছু টাকা দিয়েই কৌরবের প্রথম কবিতা সঙ্কলন প্রকাশিত হয়। কৃষ্ণগোপাল মল্লিকের প্রেস থেকে তা ছেপে বেরোয়ে। এরপর সুভাষ পুরুলিয়ায় এক ছাপাখানার সন্ধান পায় এবং সেখান থেকেই পরবর্তী ক্ষেত্রে নিয়মিত ‘কৌরব’ পত্রিকা প্রকাশিত হতে শুরু করে। বারীন এই কাজে প্রচুর সাহায্য করেছিল। আমিও বারীনকে যথাসম্ভব সাহায্য করতাম। বছরে ৪বার কৌরব প্রকাশ পেত। আমি প্রতিবারই লিখতাম। কৌরবের প্রথম সংখ্যার নাম হল মহিষ। পরে - ‘গুড বাই মিলি’ আরও অনেক অদ্ভুত রকম নাম দেওয়া হত। সুভাষ,অরুণ,আমি বারীন শুরু করলাম। প্রায়শই কবিতার সভা হত। সুভাষ মুখোপাধ্যায়,তুষার রায়, তারপদ রায় প্রমুখ আসত,আরো অনেকেই। কয়েক বছর পর অর্থাভাবে ক্রাউন সাইজের কৌরব বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ২বছর পর, যখন বারীন ভালো পোস্টে চাকরি পেয়ে গেল, আমি বারীনকে কাগজটা আবার শুরু করার জন্য বললাম। তখন ‘৭৫। ততদিনে আমার ২টি বই প্রকাশিত হয়েছে,’চার নম্বর ফার্নেস চার্জড’ আর ‘জল’ প্রকাশ পেল। বারীনকে বললাম,- ‘বই বের কর।’ তখন প্রকাশিত হল ‘সুখের কালক্রম ও সমুজ্জল দুঃখ’। প্রকাশক কমল। ১৯৭৩-৭৪ সাল। বারীনের বিয়ে ঠিক হল। আমার খুব অভিমান হল। আমি বারণ করলাম। করিস না বিয়ে। ও শুনলো না। বিয়ে করবে কেন বারীন। আমি আর বারীন এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াবো। মদ,গাঁজা খাবো। বারীনের বিয়েতে চলেছি। আমি খড়গপুরে নেমে গেলাম। যাবো না। আমি যাইনি ওর বিয়েতে। খুব অভিমান তখন আমার। আমি তখন বাঁকুড়ার এক প্রত্যন্তে চলে গিয়ে বসেছিলাম। এত অভিমান হয়েছিলো ওর প্রতি আমার। আমার বন্ধুকে আমার থেকে কেউ সরিয়ে নিতে পারবে না।
আমি ’৬৮ থেকেই প্রচুর কবিতা লিখতাম। বারীনও প্রচুর লেখা শুরু করে। তবে প্রথমদিকে বারীনের খুব বেশি বই বেরোয়নি। বারীন খুব ভালো গল্প এবং গদ্য লিখত। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে বারীনই বেস্ট গল্প লিখত। কবি বারীন ঘোষাল এক বিস্ময়। আমিই ওকে চাকরি ছাড়তে পরামর্শ দিই। ততদিনে ভালোপাহাড় হয়ে গেছে। কিন্তু বারীনকে তার অফিস ছাড়ছিল না। রিটায়ারমেন্টের দু’বছর আগে ও চাকরি ছাড়ল। সেইদিন সন্ধ্যেবেলা আমার বাড়ি এসে বলল,- ‘কমল, তোর কথাই সত্যি হল। আজ ওরা আমাকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে। এবার দু’জনে মিলে কাজ করব।’ এরপর ও কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেল। হাসত না, কোথাও বেড়াতে যেত না। শুধু বিভিন্ন বই পড়ত,দেশের বিদেশের। ওর মধ্যে এক ঋজু চরিত্রের জন্ম হয়েছিল। হয়ত অজান্তেই,ব্যায়াম করত বলেই কি’না জানিনা,ওর চরিত্রও ছিল পেশী বহুল।
কবি বারীন ঘোষাল। কবি বারীন এক বিস্ময়। অপার বিস্ময়। এরপরই বারীন এক অদ্ভুত ভাষা, অদ্ভুত মাত্রা,লয় ও কবিতার সৃষ্টি করল। আমি তখন কৌরব ছেড়ে পুরোপুরি ভালোপাহাড়ে মন দিয়েছি। গদ্য লিখতাম শুধু,কমার্শিয়াল গদ্য। বারীন কবিতা ছাড়াও আমার জোরাজুরিতে কয়েকটা উপন্যাসও লিখেছিল। এবার ও সম্পূর্ণ কবিতায় নিয়োজিত করল নিজেকে। শুরু করল মাধুকরী। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত ভ্রমণ,উত্তরপূর্ব,দিল্ ি,মুম্বাই... এবং নিজের কবিতা, কবিতার ভাষাকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করল। তরুণরা সম্পূর্ণ নতুন কবিত লিখবে বলে এসে ওর পাশে জমতে শুরু করেছে। নতুন কবি ও নতুন কবিতার যাত্রা শুরু সে সময়েই। ও একটা কবিতার ভাষা পেয়ে গেল। আসলে ওর কবিতা ভাবনা ছিলো খুব কঠিন। কবিতায় কিচ্ছু থাকবে না। শব্দের ভেতর থেকেই জন্ম নেবে শব্দের গন্ধ,শব্দের ব্যঞ্জনা,শব্দের আত্মার কবিতা। এ কবিতা ভাবনা ছিলো একদমই পৃথক। বুঝতে গ্রহণ করতে সময় লাগবে। কিন্তু এ কবিতাই পরবর্তীতে হয়ে উঠবে অসীম,অনন্তের শাশ্বত কবিতা। আমি ওকে বলেছিলাম,- ‘বারীন, একদিন তোর এই নতুন কবিতার জন্যই অজস্র তরুণ দেখিস তোর কাছে প্রণিপাত হবে ।’ আর,আমার কাছে আসবে এক আশ্চর্য গদ্য ভাষার জন্য।
বহু লোক চেষ্টা করেছে আমাদের আলাদা করার। ভালোপাহাড়, কৌরব সব ক্ষেত্রেই। কিন্তু আমার ওপর ছিল অগাধ, আন্তরিক বিশ্বাস। কবিতাকে ও কিছুতেই হারতে দিত না। ও স্বপ্ন দেখত যে কবিতা সব গণ্ডি ছেড়ে নতুনভাবে ইভল্‌ভ করবে।
বন্ধু হিসেবে মানুষ হিসেবে বারীন অসাধারণ। টাকা দিয়ে মানুষ চেনা যায়। অন্তত আজকের সমাজে তো যায়ই। বারীন কখনও আমাকে অবহেলা অথবা তাচ্ছিল্য করেনি। সাহিত্য অ্যাকাডেমী ওকে প্রেমচন্দের বই অনুবাদ করার জন্য ৫০,০০০ টাকা দিয়েছিল। বারীন পুরো টাকাটাই ভালোপাহাড়কে দিয়ে দেয়। বারীন বই অনুবাদ করে যতটুকু টাকা আয় করেছে। তার সিংহভাগই সে ভালোপাহাড়কে দান করে গেছে। বন্ধু হিসেবে যে কোনও সমস্যায় বারীন আগে আমায় ডাকত। ডাক্তার, হাসপাতাল যে কোনও সমস্যায়। ২০০৬ এ বারীন আই টি ইউ তে। আমায় সকলে ফোন করছে। আমি গোমুখে তখন। ফিরছি। ফিরেই সেই রাতে বৃষ্টিস্নাত সিক্ত অবস্থায় ওর কাছে গেছিলাম। হাসপাতালের যিনি সুপারিন্টেন্ডেন্ট আমার বন্ধু। আমি অনুরোধ করে ভেতরে ঢুকলাম,ডাক্তারদের মত এপ্রন পরিহিত অবস্থায়। বারীনের মুখে গোমুখের জল লাগিয়ে দিলাম। তাকালো। বারীন ‘আমি কমল। তুই ভালো হয়ে যাবি’। ভালো ও হয়ে গেলও। হাসপাতাল থেকে বেরনোর পর ওর সাথে দেখা করতে গেছিলাম। আমাকে ১,০০,০০০ টাকার চেক দিয়ে বলল,- ‘ভালোপাহাড়ের জন্য।’ আমার হাজারও আপত্তি সত্ত্বেও সেই চেক আমার হাতে তুলে দিল বারীন।
বছর তিন পরে একদিন কে যেন ভোর পাঁচটায় ফোন করেছে । কমলদা বারীনদার অবস্থা খুব খারাপ। তুমি এসো। ৬০ কিমি দূর থেকে আমার তিরিশ বছরের ভাঙা স্কুটার নিয়ে বেরুলাম। পৌঁছে বারীনকে আমার স্কুটারের পেছনে বসিয়ে নিয়ে চললাম ১২ কিমি দূরের টেলকো হাসপাতালে। বারীন পড়ে যেতে পারতো। মরে যেতে পারতো। কিচ্ছুটি হয়নি। ঐ যে বিশ্বাস। বারীনের কমল যদি পাশে থাকে সে সুস্থ হয়ে উঠবেই। উঠলোও।
এই শেষ বার। মৃত্যুর আগের দিন আমি পৌঁছে ছিলাম। কি করে যেন অজান্তেই। গায়ে হাত দিয়ে বললাম বারীন আমি কমল। চোখ খুলে তাকালো। হাসলো। আমি গালে গাল ঘষলাম। চোখে মুখে আঙুল ঘষলাম। বুকে বুক রাখলাম। ও অস্ফুটে বললো – ‘কমল’। ‘বারীন তুই ভালো হয়ে যাবি দেখিস’। হল না। আমি বলেছি,জয়িতাও। কলকাতার সব থেকে বড় কার্ডিয়াক স্পেশালিস্ট এর সাথে কথা বলে রেখেছিলাম। আনতে পারিনি। কেন কি জন্য সে কথা থাক। আনলে হয়ত ও বেঁচে যেত।
আমাদের দুজনের ছিলো পরস্পরের প্রতি অদ্ভুত এক শ্রদ্ধা বোধ। আমি ওকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলাম জল কাব্যগ্রন্থে। কোনো জীবিত বন্ধু কবিকে নিয়ে কেউ কবিতা লিখেছে কখনও? না নেই। যেমন বারীনও লিখেছে আমায় নিয়ে। আমার বন্ধু দীর্ঘ ৬৫ বছরের বন্ধু আজ নেই। এর থেকে নির্মম সত্য আর হয় না। আজ বলছি,যেমন ভারতবর্ষের বুকে কৌরবের মত পত্রিকা আর হবে না। আর কেউ কনসিভই আর কেউ করতে পারবে না। যেমন ভালোপাহাড় আর নেই,হবেও না কোথাও। তেমন এই বন্ধুত্বও আর কোথাও কোনোদিন কেউ দেখবে না। বারীনের কবিতা কমলের গদ্য এক হয়ে,এক অন্য ভুবনের জন্ম দিয়েছিল। সে ভুবন আর কোথাও কেউ দেখবে না কোনোদিন। আমার শৈশব,কৈশোর,তারুণ্যের,স াহিত্যের,সৃজনের, মদ্যপানের, সুখ দুঃখের সঙ্গি...আর নেই। অবশ্য বারীন নেই,আমি বিশ্বাস করিনা । সে আছে। বারীন শুধু আমার। কমলের বারীন। আর কারও না। তমালের ও না।

অনুলিখন - অনিন্দ্য