লেসবিয়ানস

বারীন ঘোষাল

কাছাকাছি ছিলাম। দরজায় নক হতে খুলেই বুঝলাম ভুল হল। আই হোল দিয়ে দেখে নেয়া উচিত ছিল। একটা মিসাইল ঢিল লাগলো ঠোঁটে, একটা কানের পাশ দিয়ে শো কেসের কাচে। বাইরে চেঁচামেচি – মার শালা বাঞ্চোতকে। দরজা বন্ধ করে ফিরে তাকাই। মুখে রক্ত, টলছি, ছড়ানো কাচে আলো চিকমিক। প্রজাপতি পুতুল, হাতি পুতুল সবাই অবিচল। সুমনা ‘ইস’ বলে দৌড়ে এল। মনোরমাও আসতে নিয়েছিল, পায়ে কাচ ফোটায় এগোতে না পেরে একচোখে ঈর্ষা আর একচোখ করুণ হয়ে গেল। এর বেশি ডিটেল দেখার অবসর কোথায় ? আমি সুমনার হাতে সঁপে গেলাম।
অতি সাবধানে রক্তপাত সারালো সে। ডেটল তুলোর জন্য ছোটাছুটি না করে সোফায় বসে কোলে আমার মাথাটা তুলে তার আঘাত সারাবার প্রয়াস আমি মেনে নিলাম। বাইরের শোরগোল ততক্ষণে বিদায় হয়েছে আরো কয়েকটা ঢিল ছুঁড়ে আমি আহত জ্ঞানে। এবং আমার ঠোঁট ফুলে ঢোল। আমার সমীক্ষক সন্ধ্যা হতে না হতেই ঘুমোচ্ছে। সে সরকারি কর্মচারি। কর্মসংস্কৃতি পালন করা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা যাবে না। সরকারের মাইনে বাদে আমার এখানেই খায় দায় এবং আমার নারী নিকেতনের পক্ষে মুর্তিমান অন্তরায়।
বয়সকালে আমার কোন যৌন সমস্যা ছিল না। বয়স ঝুঁকলে ফিল করি, অন্যরাও বলে – তোর হাত এত নরম, তুলতুলে, শিশুপ্রায়। নরম আর গরম। বয়সকালে অনেকে শক্ত ঝাঁকুনি পছন্দ করতো। আজ অন্যেরা। এই পরিবর্তন সবার জীবনে হয় কিনা জানি না।
বইমেলায় সোনাগাছি, কালীঘাট, হাড়কাটার গণিকা ইউনিয়নের ‘সাম্পান’ নামের কাগজ কিনে দেখেছি অভিযোগ ছাড়া কিছু নেই। অথচ ‘স্যাফো’ পরিচালিত লেসবিয়ানদের পত্রিকা “স্বকন্ঠে” কিনে দেখেছি – এরা অভিযোগ না করে নিজেদের সহানুভূতিকে সংগঠিত করার কথা বলে। আইনের দাবি করে। কেন রে ? দাবি করিস কেন ? কিছু পাবার জন্য ? যা পেয়েছিস তাই নিয়ে থাক না। সরকার কেন দেখবে তোদের ? তোরা সরকারকে দেখ। তা না।
গণিকাদের ইউনিয়ন হয়েছে। শহরে, জেলায়, রাজ্যে, রাস্ট্রে। সরকার না মানলেও এন. জি. ও.-রা মেনেছে। বিল গেটস্-এর বউ এসেছিল কোটি টাকা নিয়ে। খবর। তাদের ছেলেমেয়েদের পুনর্বাসন, মেডিকাল হেলপ ক্লিনিক খুলে গেছে অনেক। ‘দুর্বার’ নাম-এ সংস্থা খুলে কত ছেলেমেয়ে সোনাগাছি কালীঘাটে অফিস খুলে দেখাশোনা করছে তাদের। শুধু বৃত্তির অধিকারে হাত দেয়নি। অনেকে সন্তান নিয়ে চলে যাচ্ছে বাড়িতে মানুষ করবে বলে। সেদিন পথ আটকে দুর্গাপূজার প্যান্ডাল করার দাবির পক্ষে রায় পেলো আদালতের। ঈর্ষা হয়।
হিজড়াদের ইউনিয়ন হয়েছে। রাজ্যে, দেশে। সারা পৃথিবীর হিজড়ারা প্রতিনিধি পাঠিয়ে যুবভারতী ময়দানে সেমিনার করলো। মন্ত্রী এসে ভাষণ দিলো। হিজড়া এম এল এ হয়ে গেল। রাজনৈতিক পার্টিদের আপত্তি নেই। আইনের দাবি উঠেছে কাজে ভোটে মানুষের সমান অধিকারের। ঈর্ষা হয়।
পৃথিবীর নানা জায়গায় সমকামী পুরুষদের ইউনিয়ন আছে। আইনত এবং চার্চের মাধ্যমে বিয়ে হচ্ছে তাদের। সবাই পথে নেমে কার্নিভাল করছে। সাধারণ মানুষ সমর্থন করছে। ধীরে ধীরে সরকার মেনে নিচ্ছে। ঈর্ষা হয়।
এদের মত লেসবিয়ানদের, এখন সংক্ষেপে লেসি বলব, লেসিদের সামাজিক পরিচয় থাকবে না কেন? যারা সারাক্ষণ মাথায় যৌনতা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় তারা রোগী। যারা যৌনতা নিয়ে ব্যবসা করে তারা বদমাশ। শুধু যৌনতার কারণে যারা লেসিদের একঘরে করতে চায় তারা খচ্চর। মানুষ দেখলেই তাদের ফুটো খোঁজার অভ্যাস। এমনকি সাহিত্য নিয়ে। তসলিমা নাসরিন রগরগে যৌনকেচ্ছা লিখতে পারে, তাকে ডেকে দু-দুবার আনন্দ পুরস্কার দেয়া হল কেবল বই ব্যাচার জন্য। ‘শহর’ নামের একটা লিটল ম্যাগের যৌনতা সংখ্যা মেলায় পুরো বিক্রি হয়ে যাওয়ায় সম্পাদকের কী পুলক। সে ওই সংখ্যাটা আবার ছাপছে। অথচ, চন্দননগর বইমেলায় লেসিরা ‘আমিতিয়ে’ নামে স্টল দিয়ে “স্বকন্ঠে”, আর কিছু বই, আর সামাজিক্ক সচেতনার প্রচারপত্র সাজালে সচেতন সমাজ স্টল ভেঙ্গে লেসিদের মেরে বার করে দিয়েছিল। এই সুমনাই তো রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাড়ি ঢুকেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিল। তার মাথায় হাত বুলিয়ে সোফায় বসিয়ে টের পেলাম ব্লাউজের পেছনটা কড়া। দেখি রক্ত শুকিয়ে আছে। শিখা বলল -- ওরা লাঠিপেটা করেছে। আমাকেও চড় মেরেছে। কানটা ব্যথা করছে। তখন রাত আটটা। সবাই কাজ থেকে ফিরে এসেছে। একসাথে বসে শিখার মুখে ঘটনা শুনল। আমি সুমনার পিঠে স্যাভলন দিয়ে ধুয়ে নেবাসালফ্‌ আর ব্যান্ড-এড লাগিয়ে দিলাম। সুমনা আজ আমার ঠোঁট পরিষ্কার করে দিলো। মনোরমার পা পরিষ্কার করল। রমা ঝাঁটা দিয়ে কাচের টুকরো সরালো।
আমি লেসি বিষয়ে রিসার্চ বা গল্প লিখতে বসিনি কিন্তু। গল্প আমি লিখব না। স্বাধীনতার আগে বিপ্লবীদের ছায়া মাড়াতো না কেউ শাসকের ভয়ে। পরে বড় বড় গল্প লিখে উপভোগ করেছে সমাজ। নক্সালদেরই দেখলাম। কেউ ঢুকতে দিচ্ছে না। মেরে পাট করে দিলো ওদের। সবাই চোখ ফিরিয়ে নিলো। পরে বই লিখে হাততালি পেলো সমাজ। এখন জনযুদ্ধের ছোঁয়া দেখছি না ? শুধু কি শাসকের ভয়ে ? আমিও নক্সালদের নিয়ে গল্প লিখেছি। কুষ্ঠরোগীদের বস্তিতে গিয়ে বাস করে গল্প লিখলাম – ‘জগন্নাথের রথ’। লোকে হইচই করল। পাশের বাড়ির একটা মেয়ে, প্রায় যুবতী, হিজড়া হয়ে বাড়ি থেকে চলে গেল। আমি হিজড়াদের বস্তিতে যাতায়াত করতে করতে গল্প লিখলাম – ‘রূপান্তর’। লোকে বলল সিনেমা করব। কমল হিজড়াদের নিয়ে উপন্যাস লিখল – ‘ব্রহ্মভার্গব পুরাণ’। দ্বিতীয় সংস্করণ ফুরিয়ে গেল। কারা কিনলো ? কার হিজড়া আত্মীয়টি তার বাড়িতে থাকতে পেরেছে ? কার কুষ্ঠরোগী ভাইবোন তার বাড়িতে থাকে ? কার বাড়িতে পি ডব্লিউ জি’র ক্যাডার থাকে ? সত্তর দশকে সি পি এমের লোকরা বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল কেন ? ওসব সমাজ অনেক দেখা আছে। লেসিদের নিয়ে আমি গল্প লিখছি না। বাড়িতে তাদের রেখেছি বলেই না রাতের পাথর খেলাম। রাতের বেলায় কোন ভদ্রলোকরা মুখ খিস্তি করে পরের বাড়িতে পাথর মারে ? সামনের আর পাশের বাড়ি থেকে জানালা ফাঁক করে মজা দেখে কারা ? কে প্রতিবাদ করতে এগিয়েছে ? সবাই চায় আমি হোস্টেল তুলে দিয়ে পাড়া ছেড়ে চলে যাই। লেসিদের নিয়ে গল্প লিখে তাদের আর অপকার করতে পারব না।
আমার অবস্থাটা অবশ্য অরূপদার মত নয়। টাকাপয়সা যথেষ্ট আছে। ভাইবোনদের ক্যাশ দিয়েছি। তারা অন্যত্র ফ্ল্যাট করে নিয়েছে। এখন বাড়িটা আমার নামে। বাজারের কাগজে লেখার দরকার নেই। দরকার অরূপরতন ঘোষেরও ছিল না। পরোয়া করতো না অরূপদা। কেবল লিটল ম্যাগাজিনেই লিখেছে। তার ‘লেখার খেলা’ বইটা আমার ব্লু বুক। চিঠি দিয়ে জানালে পাত্তাই দিলো না। মুখে মৃদু হাসি, নরম চেহারা। কি হল ? শুকিয়ে গেল। সংসারে পরিত্যক্ত, জীবনে পরিত্যক্ত, স্ত্রী-পুত্র বই-পত্রসহ ঘরের বাইরে বার করে বারান্দায় ঠাঁই দিল। দেখে মনে মনে বললাম – ‘ঠাকুর, তুলে নাও, তুলে নাও’। গেল সপ্তাহে মারা গেল। বই দিয়ে তাকে পোড়ানো হল। কাঠের খরচ বাঁচলো। আমার হিরো লেখক জিরো হয়ে গেল। আমি তা হতে দেব না। লেসিদের নিয়ে লিখলে বই হু-হু করে বিক্রি হয়ে যেত। সিনেমা হতো। দেখলাম তো – ফায়ার, উষ্ণতার জন্য -- -- --

একদিন বইমেলায় রমার সঙ্গে পরিচয় হল। ‘স্বকন্ঠে’ বিক্রি করছে। পাঁচ টাকা দিয়ে কিনলাম। পড়ে ফেলে পরদিন আবার রমার সাথে দেখা করলাম। বললাম – চলুন, চা খাই।
--দশ মিনিট কিন্তু, বেশি না – রমা বলল। চায়ের লাইন দিয়ে দেখছি রমা ওর মধ্যেই দু কপি বিক্রি করল। মেয়েরা মেয়েদের দিলে সহজে বিক্রি হয়। চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম – আপনি কি লেসি ?
--মানে ?
--লেসবিয়ান ?
--এই প্রথম শুনলাম ওই শিট শব্দটা। রমা ঘৃণার চোখে তাকালো। গরম চা-টা ফেলতে পারছে না ছিটের ভয়ে।
--নামে কি আসে যায় ? আর কি দিয়ে রেফার করলে বেটার হতো ? জীবনের প্রশ্নগুলো তো শুভ অশুভ হয় না। বললাম – ইংরিজি কাব্যে তো আগে ল্যাসই বলা হতো। কেউ আপত্তি করেনি। হোমোদের হোমো বললে আপত্তি করে না। সমগোত্রীয় হলেই তো শক্তি বাড়ে। রাগ করবেন না।
--আপনাকে গান্ডু বললে খুশি হবেন ? সব পুরুষরাই তো অন্ডধারী। সমগোত্রীয়।
--আই অ্যাম সরি। হার্ট করতে চাইনি। কাজ করেন নিশ্চয়ই ? কোথায় থাকেন ?
--বলা নিষেধ।
--কে নিষেধ করেছে ?
--তাও বলা নিষেধ। এত প্রশ্ন করছেন, লেখাটেখার অভ্যাস আছে নাকি ?
--হ্যাঁ, আছে। তবে আপনাদের নিয়ে লিখব না। জ্বালাতন বেড়ে যাবে। অফিসে পুরুষদের সহ্য করেন কি করে ? আর আমার বয়সটা দেখুন। রমার চোখমুখ শান্ত হয়ে এল। সুন্দর শরীর। সুন্দর মুখ। কম বয়সে এরকম মেয়ে দেখলেই প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করতো।
--আপনাকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে। বলে হাত বাড়ালাম।
--শুরু হয়ে গেল তো ? রমা আমার বাড়ানো হাতটা অমান্য করতে পারলো না। হ্যান্ডশেকে হাতে হাত মিলিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। তাকিয়ে থাকল আমার মুখের দিকে। অনেকক্ষণ। তার অনুভূতি আমি বুঝতে পারলাম না। মনে হল, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় ঐ অবস্থায় আছি। হাত ছাড়াতে গিয়ে মনে হল রমা হাতটা ছাড়ছে না। জিজ্ঞেস করল,
--কোথায় থাকেন আপনি ?
--আমার নিষেধ নেই। বসন্ত রায় রোডে। বললাম। হেসে।
--বাড়িতে আর কে আছে ? রমার পাল্টা কৌতুহলে অবাক হলাম।
--কেউ নেই। একা।
--কেউ নেই ?
--কেউ নেই।
--মেলাশেষে পরের রবিবার সময় হবে ? যাবো।
--হবে। আসুন।
টেলিফোন নং নিয়ে বন্ধুর মত মুখ করে ‘স্বকন্ঠে বিক্রি করতে চলে গেল।

কত রকমের মানুষ আছে পৃথিবীতে। কত রকমের হরমোন। মানুষের ইচ্ছা, আলস্য, কর্ম, কাম, ভ্রমণ, ভালবাসা রুচিগত কত তফাৎ তাদের চরিত্রে। হোমোজিনিয়াস বসবাস সবচেয়ে ভাল। পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনলে মানুষ আরো সুখে থাকবে। সব হোমোরা, লেসিরা, বেশ্যারা, হিজড়ারা, পাগলরা একত্র থাকাই তো ভাল। এর মধ্যে লেসিদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার থেকে ঢের ভাল আগে সরে পড়া। আশীষ ডাক্তার সেদিন রসিয়ে রসিয়ে গল্প শোনাচ্ছিল। একটা মেয়ে বারেবারে রেকটাম সারাবার লজ্জায় নানা ডাক্তারের কাছে যেতে পারছে না। শেষে ওষুধ লিখে দিয়েছিল আশীষ, আর যাতে না আসতে হয়। বর হারামজাদা ছিল হোমো, কিন্তু হোমো সমাজে মিশতে যাবার সামাজিক রিস্ক নিতে পারে না। বউটাকে টরচার করে। বেচারির বাচ্চাই হবে না কোনদিন। এদিকে অন্য হোমোরা এটার পাশে ছোঁকছোঁক করে। মারধোর দিয়ে তাড়াতেও পারে না। শুনে আমরা তো বেজায় হাসলাম।
ভেবে ঠিক করলাম, আমার বাড়িটায় লেসিদের হোস্টেল চালাবো। ওপরে চারটে ঘর আছে। আটজন থাকতে পারবে। থাকা খাওয়া পার হেড পাঁচ হাজার মাসে। হোস্টেলের নাম – থাক, নাম দিতে হবে না।
রমা এল, সঙ্গে শিখা। -- আসুন আসুন।
--এর নাম শিখা। আমার বন্ধু।
--বসুন। একটু চা করি। একতলায় মাঝখানে বড় হলঘর, বসার আর খাবার জায়গা। একদিকে দুটো শোবার ঘর, লাইব্রেরি, লেখার জায়গা, আর বাথরুম। অন্যদিকে কিচেন ইত্যাদি। চা করছি, রমা বলল
--আমাদের আপনি বলবেন না।
--একটা কথা জিজ্ঞেস করব রমা ? তোমাদের মধ্যে বয়স্ক মহিলারা নেই কেন ? প্রৌঢ়া, বৃদ্ধা – তারা কোথায় চলে যায় ?
--তারা আপনাদের সমাজেই ভয়ে লুকিয়ে আছে। আমাদের জেনারেশনে আমরা বুক ফুলিয়ে সামনে চলতে চাই। মেনে নিতে হবে আমাদেরকে।
ভাবি, বুক এমনিই যথেষ্ট ফোলা, বেশি ফোলালে সমাজ মুচড়ে দেবে। চা খেতে খেতে আরো কথা হল। রমা বলছিল – আপনাকে খুব ফ্রেন্ডলি মনে হয়েছে, বেশ সিম্প্যাথেটিক। হেটারোজেনিক তো বটেই, আমরা হোমোদেরও অ্যাভয়েড করি। আমাদের মিটিং অ্যাক্সিডেন্টাল নয়। ফ্রম লুক উই ক্যান রিকগনাইজ অ্যানাদার লেসবিয়ান। বাট উই হ্যাভ চয়েস। সবার সঙ্গে থাকি না। উই সিলেক্ট আওয়ার লিভিং পার্টনার—
বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলাম। রমা কথা বলছিল। নিচে বসে বললাম,
--আমি ভেবেছি ওপরের ঘরগুলোতে তোমাদের হোস্টেল করে দেব। থাকা খাওয়া। একটা রুমে একা একজন থাকতে পারো অথবা একটা লেসি পরিবার। ----- সেই থেকে শুরু। সাতদিনের মাথায়, সকালে বাজার সেরে ফিরছি, দেখি একটা লোক লম্বা সিড়ি লাগিয়ে দোতলার দেয়ালে একটা বোর্ড লাগাচ্ছে। ধমক দিয়ে তাকে নামালাম। দেখি একটা এক মিটার লম্বা বোর্ডে লেখা আছে –‘লেসবিয়ানস’।
--বিনে পয়সায় করছিস ?
--না স্যার।
--পয়সা পেয়েছিস ? কে দেবে ?
--রাজেনদা।
--একদম না। আমি পয়সা দেবো। যা, ঠিক করে লাগা। বেঁকাস না যেন। রাজেনের কাছে পয়সা নিতে যাবি না কিন্তু, বলে দিলাম।
--আজ্ঞে।
বোর্ড লাগিয়ে সে চলে যেতে একবার দেখে নিলাম উল্টো ফুটের বাড়িগুলো থেকে কারা লক্ষ্য করছে। বোর্ডের ওপর একটা লাইট লাগাতে হবে। রাঁধুনী ঢুকতে ঢুকতে আমার দৃষ্টি লক্ষ্য করে বলল,
--ওটা কি দাদা ?
--লেসবিয়ানস।
--সেটা কি দাদা ?
--যা পাব্লিক জানে না। খচ্চররা জানে।
-- তাহলে আপনি কি খচ্চর ?
--যা, রাঁধতে যা। গলাটা একটু জোরে হয়েছিল। সন্ধ্যার মুখে মেয়েরা ঢুকছে, মনোরমা বলল,
--এটা কি হল ?
--কি ?
--ওই বোর্ডটা ?
--কেন ? সত্যি কথাই তো ।
--শান্তিতে থাকতে দেবেন না দেখছি।
--তোমরাই তো বলেছো, লুকিয়ে থাকবে না। নিউ জেনারেশন বুক ফুলিয়ে সামনে দাঁড়াবে।
--ও সব সভা সমিতির গা গরম করা লেকচার। রোজের ডালভাত নয়। এখানকার বাসও উঠল। তখন ওরা মিটিং-এ বসলো। যে কোন সমাজে হেটারো হোমো ক্লীব বা বন্ধুদের মধ্যে, অফিসে কারখানায়, নাটকের দলে অ্যাগ্রেসিভ, সাবমিসিভ, লিডার-ফলোয়ার লোকরা বন্ধুত্ব, পারিবারিক বা কর্মসম্পর্ক তৈরি করে। লেসিদের পরিবারও সেরকম। মনোরমা স্ত্রী-চরিত্রের। তার বাবুটি হল, বা প্রেমিক, অনুভা। সবাই আলোচনা করে ঠিক করল, বাড়ির সামনে থেকে বোর্ডসুদ্দ ছবি তুলবে। স্যাফোকে জানাবে। মুম্বাইতে অর্গানাইজেশনের হেড অফিসে খবর দেবে। যাতে মানবাধিকার কমিশন, এ-আই-ডব্লিউ-সি-তে জানানো হয় আর ওয়েবসাইটে ছবিটা রাইট-আপ সহ তোলা যায়। রমা লিডারী করল।

সকালে খবর পেয়ে থানার বড়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। বড়বাবু বললেন,
--শুনলাম ব্রথেল খুলেছেন বাড়িতে ?
--কে বলেছে ?
--আমাদের চোখ কান আছে।
--কিন্তু প্রমাণ নেই।
--কেস আছে। এফ-আর-আই হয়েছে। অ্যারেস্টেবল নয় বলে আপনাকে হাজতে পোরা হল না। সমন যাবে। কোর্টে আসবেন। না এলে অ্যারেস্ট হবেন।
--কেসটা কি বলুন তো ?
--পাগলের। আপনি পাগল। বিদায় হলে পাড়া বাঁচবে। যান। চাপা দেবার জন্য খরচ করতে পারেন।
--নাঃ। বলে উঠে এলাম। তাহলে রাজেনই এটা করল। বন্ধুত্ব রাখলে দশটা ভোট পেতো। যাবো নাকি অপোজিশনে ? না, রাজনৈতিকভাবে না। নৈতিকভাবেই দেখা যাক। অভিজ্ঞতার ভাগী হওয়া যাক। এতদিন ম্যাগাজিন করে, এত বই লিখে, জন্মাবধি এক পাড়ায় বাস করে আমার পাগলামির মালিক আমিই ছিলাম। এবার তা ছড়াবে। শুরুটার কথা মনে পড়ল। রমা আমার হাত ধরে মুখে কি দেখেছিল ? সে না এলে হোস্টেল করার জন্য আমি বিজ্ঞাপন দিতাম না। ভেতরে ভেতরে ভাবতে থাকলাম। জিজ্ঞেস করা হল না রমাকে। খানিকটা অজানা থাকাই ভাল।
কোর্ট এই মহিলা সমীক্ষক মীরাকে ফিট করল দু’ মাসের জন্য। চব্বিশ ঘন্টা এখানেই থাকবে। আট ঘন্টা লক্ষ্য রাখার কাজ। বাকি খাবে দাবে ঘুমাবে আর টি-ভি দেখবে। এখন ঘুমাচ্ছে। উঠে বসে বললাম,
--সুমনা, গিয়ে মীরার রেকর্ড বুকটা নিয়ে আয় তো । দেখিস, বেটির ঘুম না ভাঙে। মীরার খাতা খুলে দেখা গেল তারিখ দিয়ে প্রত্যেক পাতায় লেখা আছে --- ‘কিচ্ছু হয়নি। এরা খুব ভাল লোক’।
কোর্টে যা হয়েছিল তা হল লেসিদের আর খবর কাগজের খাদ্য। আমার পোঁদে যা ফিট করা হয়েছিল তা হল মলম। সেটাকে বাঁশ ভেবেছি। এখনো অনেক চেনা বাকি আছে আর কি। যা হবার হবে। রগরগে গল্প না হলেই হল। পাড়ার মহিলারা উপোষ করেই থাকুক না হয়।
------------------