একটি রেপ সিনারিও

বারীন ঘোষাল

শেষের জন আর থাকতে পারে না। হাত থেকে আপনা-আপনি খসে পড়া জাম যীশুর অনন্ত হৃদয়ে গাঁথা পেরেকের দিকে অচেতন ছুটে যায় ভার হয়ে। জলতরঙ্গ বাজিয়ে মদনমুখো ফোয়ারা ফুটলে সে দেখে তার ফুলটুল রিপু হয়ে পাপড়ি মেলেছে রক্তজলায়। উত্তেজনায় টলায়মান দু-পা এগিয়ে হাতের নাগালে পায় একমুঠো চুল। এক হ্যাঁচকায় উপড়ে আসে শেষের আগের জন, লিঙ্গখোলা (মনে পড়ল, সিকিম যাবার পথে একবার ডালখোলা স্টেশনে নেমেছিলাম রঞ্জনের সাথে দেখা করার জন্য, রঞ্জন কি এই গল্পটা পড়বে ? হেসে, লিঙ্গখোলা কেটে লিখলাম খোলিঙ্গ - কলিঙ্গ – সলিঙ্গ -– যে কোন একটা।)। ঘেন্নায় তার ঘর্মাক্ত মুখে একতাল থুথু ছিটিয়ে প্রচন্ড ধাক্কায় ছুঁড়ে ফেলে দেয় শেষের জন। ঘুরে তাকিয়ে কি করবে বুঝতে না পেরে হতভম্ব দঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। (ছবি আর লেখাকে ম্যাচিং করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছি মনে হল। এক রাউন্ড চোখ বুলিয়ে পরের সিনে গেলাম)।
দুইহাত প্রসারিত ওলটানো সরল হয়ে শুয়ে আছে হাসিনা। ঈষৎ রক্তাভ একটা ঢেউয়ের স্টিল আটকে আছে সমস্ত পট, পশ্চাদ্দেশ (এখানে পশ্চাদপট লিখলে কেমন হয় ভেবেছিলাম একটু) জুড়ে। ষড়দল রিপুফুল সেই ঢেউ ঘিরে আরতি করছে সমুদ্র ফেরত শংখচিলের ডানার মুডে। স্লোলি সে হাঁটু নামাতে থাকে, কানের ডেসিবেলে বাড়ে শংখচিলের স্বর, ঘনিয়ে উঠতে থাকে স্টিল ছবিটা, এবং কী বিস্ময়, সেই তীব্র স্বর ক্রমশ কাছে দূরে দোলাচলে তাকে গ্রাস করতে থাকে তরঙ্গনে। আমি ব্রাশ চালাতে থাকি গোল গোল ঘুর্ণির মতো, আলো জ্বেলে ফোকাস ক’রে তরঙ্গকেন্দ্রে দেখি সেই প্রকটিত স্টিল যেখানে রক্তাক্ত নিঃশব্দে ডুবে যাচ্ছে তার রিপুফুল, তেজ। ক্রমশ ক্লান্তিতে আত্মহারা হয়ে পড়তে থাকে শেষের জন এবং তরঙ্গাঘাতে বাঁধ ভেঙে যাবার আগে একবার শেষ বাজির মতো হঠাৎ সবলে সেই বিপরীত শায়িত দেহ সোজা করে দেয় একটানে – হে ভগবান – মুখ দিয়ে ভগবান বেরিয়ে তার সারাশরীর ঝেঁকে দিল। নিদারুণ ভয়ে দুপা পিছিয়ে একহাত বুকে একহাত আড়ে মুখের ওপর চেপে ধরে জোরে, গলার স্বর গিলতে গিয়ে চোখ ফেটে আতঙ্কে হিম ঘাম ছুটে যায় (এখানে থেমে দেখি – কর্তা, কর্ম ও ক্রিয়াবদল যথেষ্ট কনফিউশন পাঞ্চ করছে কিনা গল্পটাতে)। এখন খোলামেলা লাশ পড়ে আছে আকাশমুখী। এখন স্পষ্ট দিনের আলোয় কোন মেঘ নেই, হালকা শীতের হাওয়া।, ট্যানিং রোদ হলুদকে হলুদ সবুজকে সবুজ দিচ্ছে। দুটো প্রজাপতি জোড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। দূরে ডিলাক্স মোটরের হর্ন শোনা গেল। এবং এইসব সমাহারে হাসিনার মৃতদেহ পড়ে আছে মাটি দেখা যাওয়া ঘাসের ওপর।
জটে যাওয়া চুল মাথার দুপাশে অবিন্যস্ত উড়ছে। শেষ ট্রেন চলে গেলে তন্দ্রাচ্ছন্ন মহালিমরূপ স্টেশনের মতো তার বোজা চোখ, অধরোষ্ঠের দৃঢ় পার্টিশনে কল্পনায় উড়ে আসে দুকলাম যুদ্ধংদেহি সৈন্যের মাঝে কারগিল শূন্যতা, ঝড়তুষার শেষে সাইবেরিয়ার দুই বন্দী শিবিরের মতো এলানো দুই স্তনে দৃষ্টি পড়তেই – উঃ, ভীষণ ঠান্ডায় কেঁপে ওঠে শরীর ! তারপর ঐ তাকলামাকানের ঢাল, ঐ নিরোম কর্দমাক্ত নষ্ট মেঝের মধ্যে নির্বসনে কুপ এবং আরো যা আছে সেখানে চোখ পড়তেই গা ঘুলোতে থাকে শেষের জনের। ভগ্ন জানুতে হাত রেখে নতশির দুর্যোধনের দুইপাশে বিস্তৃত দ্বৈপায়ন হৃদের দুই তীর নয়, বরং দুই-পা যেন দুইদেশ বেয়ে আসা প্রাচীন দুই রাজপথ এক বিদেশের যুদ্ধশেষের প্রান্তে মিলিত যেখানে পুতিগন্ধময় মহামাংসে ঘ্রাণে ঘৃণায় একাকার নরক ফলিত, বিদ্ধস্ত যোনি নয় – একটা ওলটানো ডাস্টবিন – তীব্র বমনোদ্রেক হল তার। কারও সম্বর্ধনায় তার স্বাগত ভাষণ হয়ে যোনির সেই চৌচির রক্তলালে বহুরূপাইয়া রিপুফুল ছিঁড়ে তন্নতন্ন ঘৃণা বেরিয়ে আলিঙ্গ কামের গলা টিপে বিগলিত বমন করাতে থাকে – এই মাগী হেই মাগী এই আনন্দশালা কষ্টশালা একা আমার রে বোকাচোদারা এই তোদের বাঁড়ায় লাথি মারি ল্যাওড়া – ইত্যাকার ব্যাঞ্জনে বমনবেগে হুমড়ি খেয়ে পড়লে ঝোপ কাঁপিয়ে ঝমাঝম হেসে ওঠে শয়ান ছয় লিঙ্গধারী ছয় ম্যান। এত বীভৎস যে তার নেশা লিক করে ভয় ঢুকতে থাকে ওতপ্রোত শিরায়। -- কিরে, এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল তোর ? শালা ডাক্তার দেখাস না কেন – ইত্যাকার উচ্চার তাকে দৃশ্যমান মৃতদেহের দিকে টানতে থাকে। একে বমনিক দুর্বলতা, দুইয়ে বেয়নেট চার্জের উপমায় নারীদেহের পরিচ্ছেদ, তিনে তাকে বিপন্ন করে তোলে অতঃকিম। ভয়জারণ সর্বাঙ্গ কাঁপিয়ে দেয় এমন যে হু হু দৃষ্টিতে খিল ধরে যায়। দন্ডবৎ বিস্ফারে রোমরাজি আকুল হয়ে পড়লে, লাগামপোড়া দীর্ঘশ্বাসে অন্তরীণ মেধা মর্মর করে উঠলে সমস্ত সেন্টিমেন্টের বিরুদ্ধে সতর্ক হয়ে ওঠে শেষের সে। মন কাঁপিয়ে চিৎকার ওঠে – না না আমি দায়ী না আমি কিছু করিনি, এই খুন যদি পাপ তো আমার পাপ না, আমি শুধু ওদের সঙ্গে লাইন দিয়েছিলাম। কিছুই করিনি। ওদের কসুর আমার গায়ে লাগবে কেন বে মাদারচোদ – অথচ পাপ তাকে স্পর্শ করতে থাকে এবং তাই ছটফট করে সে। নিঃসাড়ে শুয়ে থাকা ছজনের ছয়হাত দূরে শেষের সে ফ্ল্যাশব্যাকে দেখতে পায় ঘন্টা দুই আগের সেই উদ্দাম মহরৎ। সাতজোড়া চোখ হাত পা ঘেরা বাহান্ন ফণা সাপের সেই পারদরিয়া ছোবল ছুঁয়ে, হাসিনার শরীর যেন আগুন, নেচে যাচ্ছে নিবাসহীন নেচে যাচ্ছে বাসহীন নেচে যাচ্ছে ট্রান্সপারেন্ট নাচ। এসময়ে কি ক্রোধ হয় ক্ষোভ হয় কষ্ট মনে পড়ে, এসময় কি কান্নার ? এসময় শূধুই বাহুর একাদি প্রক্ষেপে লিঙ্গমান পুরুষের হাতে নারীমাংসের স্বাদ চলে আসছে অঙ্গভেদে আর উলঙ্গ সে মেয়েটির সামনে ঈষৎ ঝুঁকে পাহাড়ায় ব্যর্থ শরীর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার ইচ্ছা – এসব মনে পড়তে থাকল আবার – আমিও ইচ্ছা করেছিলাম, ইচ্ছাই আমাকে পাপে টেনেছে, আমি পাপী আমি পাপী ওঃ হো হো হো ওঃ ওঃ -- ইত্যাকার যাবতীয় বিলাপ তার কন্ঠে ভাসে কেননা সতর্কে দরজা বন্ধ নেশা তখন দীর্ঘ হেঁটে যাওয়া ক্লান্ত, অথচ অসহ্য এই মাটি ছোঁয়া সুখ দুঃখ ভার। হঠাৎ মনে হল তার পাপের কথা –- পাপ পপা পাপ পপা – একটু আরাম হল।
এই পর্যন্ত টাইপ করে প্যালেটটাকে পাশের টুলে আর ব্রাশ মগের জলে ডুবিয়ে রেখে উঠে একটা সিগারেট ধরালাম। গা আড়মোড়া দিয়ে ব্যালকনিতে এসে রেলিঙে আয়েশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকলাম আমি কি রং তুলি দিয়ে ছবি আঁকছি না টাইপ করে গল্প লিখছি ? সামনে কি ক্যানভাস ছিল না কম্পুটার ? লোকে কি ভাবছে ? আচ্ছা, ভাষাটা ক্লাসিক্যাল হয়ে পড়ছে কেন ? ছবিটা তো ঠিক রেপ না, একটা রেপ-এর আভাস। ফিল্ম তো নয় যে চলচ্চিত্র হবে, দুমাত্রার পেইন্টিং-এ দুঘন্টার অ্যাকশন আর মানসিক বিকার কি দেখাতে পারব ? একটাই তো ছবি, ধীরে ধীরে গড়ে উঠুক না। সঙ্গে আমারই মনের ওঠাপড়া আবেগ তো ফুটবেই। রেমব্রান্ট কি করতেন, ভ্যান ঘখ, দালি কি করতেন জানিনা, অবনীন্দ্রনাথ-রবীন্দ্ নাথ তো ব্রাহ্ম ছিলেন। পারতেন হুসেন আর রামকিঙ্কর। রেপসিন না, রেপের সিনারিও একটা ক্যানভাসে ধরানো চাট্টিখানি কথা ? ভাষা তো ক্লাসিক্যাল হবেই। রেপ ব্যাপারটাই তো ক্লাসিক্যাল, সেই আদ্দিকালের। চরিত্রগুলো তো আজকের সাধারণ মুখের ভাষায় কথা বলছে, ভাবছে। সেখানে না গন্ডগোল হয়ে যার আবার, সতর্ক থাকতে হচ্ছে। খুব ভাল লাগছে ভাবতে আমি যখন ব্রাশের স্ট্রোক দিচ্ছি হলুদ সবুজ আশমানী রং-এ তখন ভাষা আর মুড হালকা হয়ে যাচ্ছে, আবার যখন গাঢ় লাল ভায়োলেট কালো বা মিশ্র রং-এ ছড় টানছি ভাষা প্রাচীন হয়ে যাচ্ছে। এই আপ ডাউন ভাষা আর মুডের মেলামেশা ছবিতে ফুটছে কিনা, ছবির কথা বেরিয়ে আসছে কিনা অক্ষরে, চিন্তার বিষয়। এককাপ চা পেলে ভাল হতো যখন ভাবছি তখন ধরো কেউ এগিয়ে দিল মদের গ্লাস – সেই ফিলিংটা –
ইতস্তত সন্ধান করে একটা বাংলা বোতল আবিষ্কার করে তুলে নেয় সে। দাঁত দিয়ে ছিপি খুলে ফেলে নির্ঝামেলায়। তারপর অন্যান্যদের শয়নচালে দৃষ্টি রেখে ভাবে ওদের বলা যাক ব্যাপারটা কী দাঁড়িয়েছে। ওরা জানে না তাই – কী তাই – তাই কী – তাই কীইইইই ! ওরা জানলে এই যে ছয়জন পরেপ্পর ফুলদুপিঠ কামাম করে গেল, তা ফিরতো ? যেখানকার জল সেখানে, যে দেহ সেই দেহ হবে আর ? – কিন্তু আমি একলা কেন একলা কেন – বলতে বলতে দেহ ও জলের শব্দে তার হাতের বোতল মুখে ওঠে। কিছুটা মুখে ঢালতেই আলজিভে ঝাঁঝ লাগল, সঙ্গে বমির গন্ধ নাকের ভেতরে। খানিকটা গলায় নেড়েচেড়ে ফেলে দিয়ে পরপর দু-ঢোঁক গিলে ফেলল হিক্কারের সাথে। আবার একঢোঁক, আবার। ধীরে ধীরে তার মন-শরীর সূক্ষ্ম হতে থাকে।
-- আচ্ছা আমি যদি সাত নং না হয়ে চারে হতাম তবে কি ওই ঢালে শুয়ে থাকতাম এখন, না কি করেটরে বাড়ি চলে যেতাম আর আমার বদলে বিন্দা এখানে বসে ভয় পেতো ? একবার বিন্দার মুখ দেখার চেষ্টা করল শেষের জন। দেখা গেল না, কিন্তু দৃষ্টি ঘুরে গিয়ে পড়ল হাসিনার মুখে। না, চেয়ে থাকা যাচ্ছে না। চোখ ফেরা চোখ ফেরা করতে করতে সে মার্চ করতে করতে পালিয়ে যেতে চায় ঝোপের আড়ালে। এভাবে মাতামাতির এক খেলায় পৌঁছোয় বোতলের বেতালে যেন কাছে কোথাও ব্যান্ড বাজছে আর তার পা আপনাআপনি তালে মিলে যাচ্ছে, চেষ্টা করেও তালছাড়া হাঁটতে পারছে না – কেবলই মনে হচ্ছে আশেপাশের মানুষজন আমাকে লক্ষ্য করছে যেন আমি ইচ্ছে করেই তালমেলানোর ছেলেমানুষি করছি – এজন্য প্রাণপণ বেতাল পদক্ষেপে সে ঝোপের আড়ালে চলে আসে। নিঃশব্দ এক আচম্বিৎ বিস্ফোরণের ক্রমশ বেড়ে ওঠা নৈশব্দ তার মেরুদন্ডের অতল কাঁপিয়ে দেয় এবং অচেতন রিফ্লেক্সে বসে পড়ে সে। পশ্চাদ্দেশ ভুমি স্পর্শ করা মাত্র মেরুদন্ড বেয়ে লিকলিক করে ভয় ঢুকতে থাকে মাথায়। সমস্ত চুল দাঁড়িয়ে হাওয়ায় দুলতে থাকে। এবার যদি সে এখানে ধরা পড়ে তাহলে প্রমাণ করতে পারবে তো যে সে ওসব করেটরেনি, ওই রমনশালী মৃত্যুমুহুর্তগুলো সে শুধু মদে গুলজার চরিত্রহীন ছিল ? কেউ ওরা সাক্ষী দেবে ? – ইত্যাদি ভয়ে কখনো এপাশ কখনো ওপাশ ক্যালিডোস্কোপিক ফ্রেমে ফুটতে থাকে একে একে দূর্শয়ান প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় বৃন্দা পাঁচ ছয় সবাই একনাগাড় ঘুম কি জাগরণে স্থির এবং সে দেখে একটা গড়ানো লালবলের পিছনে একটি শিশুর টলমলানো অগ্রসর যা এখন ঝোপের কেন্দ্রমুখী।
এতক্ষণে মনে হল ছবিতে আবেগ মুহুর্ত বারিত হয়ে এসেছে, পরিবেশে যুক্তি জমছে, ভাষা অতিপ্রাচীন থেকে প্রাচীনতায়। নতুন চরিত্র তৈরি হচ্ছে। এখন লাইট কালার চলবে, কখনো হাফটোনে কখনো শেডে, ফ্রেঞ্জি ডেকোরেশন, বিযুক্তি, জানি না এই চিত্রকে বিচিত্র করার খেলা ক্যানভাসে খুব চললেও গল্পে কতদূর মানাবে ? দেখাই যাক না। আমি তো ক্যামেরা দিয়ে রেপ দেখাচ্ছি না, আর অ্যাকচুয়াল ঘটনার চরিত্রগুলোকে জীবন্ত আঁকছি না। একটা ছবিতে -- রেপ হয়েছিল -– তারই আভাস ফোটাতে চাইছি কেবল। গল্পের যে টান থাকে বয়নে সেটা আদ্দিকালের গল্পরীতি। সংলাপ কি করে থাকবে এই ছবিতে ?
যে কোন বহির্প্রভাবে শরীর ও মন যদি একই সঙ্গে তাড়িত ও অবস্থিত হতে থাকে তবে সেই গতিপ্রবাহে যে কোন তাৎক্ষণিক ভাবনাই যেমন চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করে, তেমনিই প্রবাহিত স্থিতিশীলতা ও চৈতন্যমোচন করে সুস্থির ভাবনার, এবং শেষের সে তাতে নিবদ্ধ হয়ে পড়ে কেননা গড়ানো লালবলটি এখন ওই শাড়ির ওপর এসে আধলেপনে স্থির এক তটস্থতা। শিশুটি এসে হাত নামিয়ে তুলতে গেলে শাড়িসুদ্দ উঠে আসে লালবুটিদার সবুজানি পটে লাল টকটকে গোলাকার বল। দেখামাত্র হাত হতে বল পড়ে যায় শাড়িস্তুপে, ডানহাতের তিনটি আঙুল চলে যায় মুখে এবং কিছুক্ষণ পরে এগোতে থাকে দেহটার দিকে ধীরে। পায়ের পাশে এসে একটু দাঁড়িয়ে নির্ভরতা খোঁজে, তারপর উপুড় হয়ে বসতে গিয়ে কোল পেতে বসে পড়ে। মুখ থেকে বার করে হাত রাখে হাঁটুর ওপর। একটু নাড়ে, একটু বোলায়। সাড়া না পেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে মুখের কাছে চলে আসে শিশুটি। একবার বন্ধ মুখ একবার খোলা বুকের দিকে চায়, তারপর চিবুকের নিচে হাত বোলাতে থাকে। কাঁধের ওপর একটা অচেনা পোকা দেখতে পেয়ে হাত দিয়ে সরিয়ে দেয়। মুখে কোন আওয়াজ করে না। যেহেতু দেহটি তার অপরিচিত, সে খেলাচ্ছলে দেহবেষ্টন করে হামাগূড়ি দিতে থাকে। শেষের জন স্পষ্ট দেখতে পায় নিঃসাড় চতুষ্পার্শ ক্রমশ ঘিরে ফেলছে কেন্দ্রবর্তী অজ্ঞান শিশুটিকে অথচ সেই অনবহিত স্তব্ধতা উপেক্ষা করে অনায়াসে হামাগুড়ি দিতে থাকে শিশু। এখন স্তব্ধতা ভীষণ, না কি শিশুর পরিক্রমণ সুন্দর ? সব মিলিয়ে এমন চাঞ্চল্যকর ভীষণ সহজ অথচ সৌন্দর্যে জটিল ডুবরহস্যে অনুপ্রাণিত তার হাতের জাম শেষ ফুরালে কিছুক্ষণের মধ্যেই কেন্দ্রহীন শূন্যে ভাসে সে। প্রাণহীন দেহ ঘিরে শিশুটির প্রাণোচ্ছল ঘুরপাক এই মুহুর্তে তাকে মৃত্যুর চেয়ে জীবনের দিকে বেশী টানে। অপূর্ব সেই বিমোহনে আপ্লুত সে চমৎকার উদ্ভাসনের আলো দেখতে পায় দেহটির চারপাশে, তার ভাসমান অস্তিত্বের চারপাশে। তীব্র আলোকচ্ছটায় সে দেখে রোদ্দুর, রোদের ঘাট যেখানে সন্তরিত একটি শিশুর স্নানে খুশি বিচিত্র সিনারি হয়ে আহ্বান জানাচ্ছে তাকে অনবরত। কিন্তু সে তার নিজস্ব অস্তিত্বে ভাসমান বলে ইচ্ছা সত্বেও তার রৌদ্র ছোঁয়া হল না। ইচ্ছা থাকলেও হাত বাড়ালে হাতে ঠেকে শূন্যতা যেখানে তার অস্তিত্বপাতন হয়ে যায়।
আরো একবার হাত বাড়িয়ে মাটি ছোঁয় সে এবং সম্মুখে তাকানোমাত্র স্তব্ধ হয়ে যায় তার শূন্যচারী বোধ। সে দেখে শিশুটি এখন পরিক্রমণ বন্ধ রেখে মৃতদেহের মাঝামাঝি এসে কর্দমাক্ত তাকলামাকানের ঢালের নিচে কোন বিদ্ধস্ত মন্দিরের ভগ্নস্তুপের পাদদেশে নির্বোধ তাকিয়ে আছে কারণ, শিশুটির কাছে নিশ্চিত এই নতুন অভিজ্ঞতা অপ্রীতিকর বলে অনুভুতি প্রকাশে বাধা হয়। বিমূঢ় শিশুটি অনিশ্চিতিতে বসে পড়ে সেখানে। তারপর আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল তার জন্য। শিশুটি একটি স্তন নিয়ে খেলা করতে করতে মুখ নামিয়ে দেয় স্তনে আর পরের মুহুর্তেই মুখ তুলে তাকায়। তখনই কী ভয়ঙ্করভাবে সমস্ত রোদ পালটে গেল আমূল নৈশব্দে, একের পর এক সব মিলে তখন সিনারিও গভীর শূন্যতার – এমনই তার নিজের অস্তিত্ব। শিশুটি স্তব্ধ হতে আবার মৃতদেহটি প্রধান হয়ে ওঠে কেন্দ্রে। কিছুকাল আগের সেই জীবনের জিৎ এখন মৃত্যুগ্রাসে, মৃত্যু ও ধ্বংসে। সৌন্দর্য উধাও এখন। হালকা কালো রঙের অসুন্দর স্ট্রোকে রিপুফুলের ছয় পাপড়ির ভস্ম পড়ে আছে দেখে সুরা ও হৃদয়জনিত উদ্বেগে শেষের জন কেঁপে ওঠে। এখানে জীবনের উৎসজীবন সামঞ্জস্যহীন মন্থনে তছনছ, আর ওখানে নিরালম্ব বিশ্রামের অভ্যাসে স্তরিয় আছে ছয় কামদ জীব – প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, বিন্দা, পঞ্চম, ষষ্ঠ জনেরা। এখনো ওরা জানে না যে এখানে মেয়েটার লাশ পড়ে আছে, নির্মোক সেই দেহে বলাৎকারের চিহ্ন, হাসিনাকে তারা খুন করেছে – এসব। আমিও জানতাম না যদি আমি হতাম চতুর্থজন, বিন্দা। বিন্দা কি তাহলে আমার জায়গায় বসে আমারই মতো ভাবতো ? নাকি আমি সেই ভীমরতিতে না ভিড়তে পেয়ে দুঃখিত ? অ্যাঁ ? আমি চতুর্থ হলে কি এমন মৃত্যু হত না ? শিশুটি এসে দেখতো – একজন তার শাড়ি-সায়া-ব্লাউজের স্তুপ ভিজিয়ে তনতন করে কাঁদছে হাঁটুতে মুখ গুঁজে পিঠ বেঁকিয়ে – শিশুটি ভয় পেয়ে ফিরে যেত – ফেরার শব্দে চোখ মেলে হাসিনা কাউকে দেখতে পেতো না – চট করে উঠতে না পেরে বসে পড়তো আবার – উত্থানরহিত যন্ত্রনায় পাংশু ঠোঁট কামড়ে ধরতো – কিছুক্ষণ পর আবার উঠে কোনক্রমে কাপড়গুলো গায়ে জড়িয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে নদী কিংবা বাড়ির দিকে চলে যেত কে জানে কোন মরণ তাকে টানতো বেশি। কিন্তু যেদিকেই যাক চোখের কোণে যে শুকনো জলের দাগ ছিল তা একইরকম থাকতো যেমন এখনও হয়তো আছে। আলগা দৃষ্টিতে লক্ষ্য করার চেষ্টা করল শেষের জন। না, তেমন কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
কিন্তু শিশুটি এখন চলে যাবে। উঠে দাঁড়াবে। একবিন্দু অপরিচিতি এসে তার সমস্ত চেনাজানা মুছে দিয়েছে। সে এবার ভুলে যেতে চায় এই দেহময় সময়, তার লাল বলের কথা মনে পড়ে। এক হাতের তিনটে আঙুল মুখের ভিতর রেখে এগিয়ে গিয়ে বসে আর এক হাতে লাল বলটা তোলার চেষ্টা করে,পারে না, দাঁড়িয়ে ছোট্ট লাথি মারতেই কাপড়ের ঢেউ ছাপিয়ে লাল বলটা গড়িয়ে গেল বাইরের দিকে — পিছনে পিছনে দুই হাত সামনে মেলে শিশুটিও উধাও।
চিত্রের ভাষা আর গল্পের ভাষার মিক্সচার করতে গিয়ে ভারি বিপদে পড়লাম দেখি ! বিষয়টা এত সিরিয়াস যে কথায় কথায় হিউমারের স্থান নেই। চরিত্ররা বর্তমানে অচল, ঘটনার ঘনঘটা উত্তরিত, মাত্র একজন সবাইকে রিপ্রেজেন্ট করছে। পেইন্টিংটা গড়ে উঠছে একটু একটু করে, আলো রঙ ধীরে ধীরে বিমুর্ত করছে গল্পটাকে, ফোকাস পালটাচ্ছে – মাঝে মাঝে রিলিফ দিতে হবে তো। পাঠকের গল্পপাঠের বদভ্যাসের দিকে তাকিয়ে ছবি আঁকা চলবে নাকি ? না, দর্শকের এক নজরের সুখের জন্য গল্পরচনা ?
এবার দৃষ্টি মধ্যখানে ফিরে আসতেই খুব নিঃসঙ্গ মনে হতে থাকল নিজেকে, খুব একা একা যেন, আর হালকা বাতাসের সাথে ভয় এসে পড়ল রোদ ছাপিয়ে আর রোদের রঙ আর ক্রমশ রঙমহালে আন্দোলিত ভয় একা তীব্র হতে থাকল। এমন তীব্র অনুচ্চারণে ব্যাপৃত বোধ তার ইচ্ছার আর পাপের ধ্বজা সম্বলিত প্রতীক্ষা করায় যে সময়, অধৈর্য সে হাসিনার বিপরীতশয়ান দেহ থেকে ষষ্ঠজনকে উৎপাটিত করেছিল কিসের আকাঙ্খায়, কোন আকাঙ্খায়, হ্যাঁ, আমিও চেয়েছিলাম, আমিও চেয়েছিলাম – ইত্যাকার নিচুস্বরে শ্লথ উচ্চারণে সে নিরালম্ব উঠে দাঁড়ায়। টলমলানো ভঙ্গী তখন মাঝসমুদ্রে জাহাজের মতো বেপথু, যে জাহাজ বন্দরের আলোকস্তম্ভে শেলিং করে পালাতে গিয়ে নিজেরই গালুই ফাটিয়েছে, ঐ ধূলিসাৎ বন্দরগাহে ফেরা ছাড়া কোন পথ আর খোলা নেই। ক্রমবাহ অনন্তর ঢেউপার হয়ে কেন্দ্রাভিমুখী শেষের সে ধীরে অগ্রসর হয়, অবচেতনে উন্মোচিত হতে থাকে আরক্ত অন্ধকার যা এক বিপরীত ক্রিয়ায় তার চারপাশে ক্রমশ ভাস্বর হতে থাকে। সে দেখে তাকে ঘিরে এক সঞ্চারমান অন্ধকার প্রাকার দূর দিগন্ত হয়ে যাচ্ছে, যার কার্নিস দেখা যায়, দেখা যায় কার্নিসে বসা সমুদ্রফেরত পাখি, পাখির কর্কশস্বর ক্রমশ মুহ্যমান – এইভাবে এক অন্ধকার উৎস ধীরে মৃতদেহের দিকে অগ্রসর শূন্যের দিকে অগ্রসর সম্পূর্ণ অকর্মন্যতার দিকে অগ্রসর অথচ নিজের ভেতর সে এক দেদীপ্যমান জ্যোতি যেমন সে এই মুহুর্তে দেখে আকাশের গায়ে। শুধু সে নিজেকে দেখে না, শুধু তার বোধ এখন জাগ্রত। মৃতদেহের পাশে পৌঁছে সে দাঁড়ায়, তারপর হাঁটু রেখে বসে। মৃতদেহের দিকে তাকালে অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখা যায় না। অবস্থান মতো অন্ধকার একটু ঘনই। উদ্দেশ্যহীন কিছুক্ষণ এইভাবে থাকার পর সে মুখ তুলে যে কোন একটি নক্ষত্রের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি রাখে এবং তৎক্ষণাৎ তার শরীরের প্রত্যন্ত প্রদেশ একযোগে বিদ্যুতষ্পৃষ্ট হয়। প্রবল সেই তাড়নায় ক্রোধে ক্রন্দনে উল্কাপাতের মতো তার শরীরপাত হয় মৃতদেহের উপর। বিশ্বব্রহ্মান্ডের সমস্ত নক্ষত্র একযোগে যেমন নিরর্থ উপস্থিত, যেমন নিরর্থক সেসবের ক্ষয়, তেমনি নিজস্ব আলোকব্যয়ে তার অপাঙ্গ রোদন নিঃশব্দে ঝরে পড়তে থাকে মৃতদেহের ওপর। নির্গলিত হয় সে।
হৃদয়াবেগ বাহুল্যে তার কার্য আর কারণ অজান্তে জর্জরিত হতে থাকে। তার পতনজনিত হিৎকারে বিমূঢ় জাগর বা তন্দ্রা থেকে পাশাপাশি উঠে বসে প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় বিন্দা পঞ্চম এবং ষষ্ঠজন। একজন আর একজনকে দেখে, গোণবার চেষ্টা করে তারপর একে একে উঠে দাঁড়ায় অন্ধকারে শিলুট হয়ে। ছয় শিলুট না হয়ে অন্ধকারে ঝোপের মতো একটা স্তুপ হয়ে দাঁড়ায়। যখন তারা অকুস্থলে এতক্ষণ থেকে গেল কেন ভেবে বিস্মিত হবার কথা, তার বদলে একত্রে উৎকর্ণ কামদ রক্ত তাদের ভয়জারণে পাখসাট মেরে স্থির ছুরিকার ফলা নাচিয়ে দেয় প্রথমজনের হাতে। বিন্দা কেড়ে নেয় ছুরির সাহস নিজের মুঠোয়। উদ্যত সে ফলা ঝিকোয় অন্ধকারে। অন্ধকারের ঝিমুনি কাটে যেভাবে ঝিমুনি এসেছিল হাসিনার রক্তে। সে আত্মরক্ষার তাগিদ হারিয়ে ফেলেছিল ছুরিকা দর্শনমাত্র।
বিন্দা এগোয় ঘেরা ঝোপের কেন্দ্রে। তাকে অনুসরণ ক’রে পরস্পর পাঁচজন ক্রমশ ঘিরে দাঁড়ায় মৃতদেহ আর তার পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকা শেষের জনকে। অন্ধকার সয়ে এলে তারা আবদ্ধ দেহটিকে আবিষ্কার ক’রে সকৌতুকে হেসে অঠে। একসঙ্গে বলে – কিরে, এখনো স্বাদ মেটেনি ? নে। চালিয়ে দে। -- বলে বিন্দা হাতের ছুরি এগিয়ে দেয় শেষের জনকে। সেই মুহুর্তে ভস্মাধারে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয় রিপুফুলের, ক্রোধ ও ঘৃণার তেজে লাল হয়ে যায় সেই ফুল। শেষের সে, যেমন এতক্ষণ এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো লাভা উদ্গীরণ করছিল, তেমনি এবার উল্কার জ্বলন্ত আগুনের মতো উঠে দাঁড়িয়ে বিন্দার হাত থেকে ছুরি নিয়ে সবলে চালিয়ে দেয় বিন্দার বুকেই। ‘ইয়া আ আ আ আ’ ---- শব্দে শব্দে তুলকালাম নাভিশ্বাস মুখিয়ে বিন্দার হাঁটু নামে নরম মাটিতে স্লোলি যেমন মাটি উঠে আসে উপরে। রিলেটিভ শব্দপতনের মধ্যে বিন্দা প্রথমে দুই হাঁটু পেতে তারপর সর্বাঙ্গে মৃতদেহের পাশে আর একটি মৃতদেহ হয়ে শুয়ে পড়ে বিছিয়ে। হতচকিত আর সবাইয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে শেষের সে নিঃশব্দে ঘৃণামুক্ত হতে হতে বিড়বিড় করতে থাকে থাকে – এতক্ষণে ফোর্থ হয়েছি ফোর্থ হয়েছি ফোর্থ ----
----------