শো পিস ও একটি মদ্যপ রাত্রি

সীতানাথ মুহুরি

‘ কলকাতা বলে কোন জেলা আসলে নেই । ’
বেঁটে বুদ্ধিজীব দুটো আমার দিকে চোখ সরু করে তাকাল । ব্যাপারটা বিস্তার করার আগে দীর্ঘ পজ নিলাম। রনিকে বললাম একটু চানা ঢাল তো ... রনি মিচকে শয়তানের মতো হাসল । বলল -
‘ বিলো দা বেল্ট ঝাড়াটা একেবারে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছ দেখছি ! ... এই জন্য তোমাকে আমি বিল্বরানী বলি বুঝলে ক্যাপ্টেন ! ’
‘ আহ চানাটা ঢাল ... ! ’
আমি বুদ্ধিজীব দুটোকে লক্ষ্য করছি ... মাল দুটো একটু ট্যান খেয়ে গেছে ...সরু চোখদুটো আরও সরু হয়ে গেছে । মনে হচ্ছে এবার ঘুমিয়ে পড়বে । বারোটা বাজে অলরেডি ঘুমোলে বাঁচা যায় । বাকি মালটা একটু আয়েশ করে গেলা যাবে । এই হারামি দুটোর জন্য ঘরটা একেবারে মাছের বাজার হয়ে গেছে। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা থেকে কলকাতা শহরটার মুড়ো , পেটি , গাদা , লেজা সব কেটে কেটে ডিসেকশন করে দেখছে । নিজেরাই কাটছে , নিজেরাই জুড়ছে , নিজেরাই চ্যাঁচাচ্ছে ...আমি রনিকে বলেছিলাম
... ‘ মালদুটোকে বেশি হাওয়া দিস না ’ রনির সফট হার্টেড ... ‘ না ওরা ক্যান্টিন থেকে তুলতে
পারবে , দামে কম , জিনিস ভাল ওদের বারণ করলে চাপ । আমিও স্কচ হুইস্কি শুনে চেপে গেছিলাম । কিন্তু এখন দেখছি বাংলা খেলে ভালো ছিল ... এই হারামি দুটোকে এলাও করা একদম ঠিক হয়নি । আসবি তো আয় , ডেলিভারিটা দে , দিয়ে কেটে পর ? তা না এখনেই গ্যাঁট হয়ে গিলছিস ? ব্যারাকপুর থেকে ফড়িয়াপুকুর এসেছে শুধু মাল খেতে ! ভাবা যায় ? কাল আবার গিয়ে কলেজ করবে ...প্রায় বোজা চোখ একটু ফাঁক হল । হয়ে আবার বন্ধ । যাক ... ’ রনি আমার গ্লাসটাতে ধাল ’ ... বললাম । রনি ঢালবে ঢালবে করছে সেই সময় একটা ‘ধপাস’ !!! দেখি একটা চারঅক্ষর খাট থেকে নীচে ।
আরে আরে ... তুলতে গেলাম হঠাৎ চীৎকার এবার খাটের ওপর থেকে ...
- ’ হতেই পারে না ! ! ! ’
আরে কি হতে পারে না ? আবার একবার
- ‘ হতেই পারে না ! ! ! ’
- কি রে বাবা কি হতে পারে না ?
- আরে ওওও চারঅক্ষর ... তোমার বন্ধু পড়ে গেলো তো গো খাট থেকে ? ? ?
- যাআআআআআআক ! হতেই পারে না ! ! !
-কেন কি হতে পারে না ? ? ?
- কলকাতা । একটা জেলা । আর কিছু হতেই পারে না । কি নেই কলকাতায় ? সব আছে । একি তোমাদের হুগলী ? ? ? ধু ধু করছে মাঠ? কলকাতায় জেলা আছে । আলবাত আছে । এই এতবড়
শহর । ইংরেজ ছিল ইংরেজ ! পৃথিবীর সবচে সভ্য জাত । ছিল হুগলী তে ? হুগলীকে গাল পাড়ছে শুনে আমার তো নেশা ফেশা ছুটে গেছে । দাঁড়াও বাছাধন...
তিনঅক্ষর কে ইতিমধ্যে তোলা হয়েছে , তিনি উঠে বসে রনিকে বোঝাচ্ছেন যে তিনি কলকাতা যে জেলা নয় , এই কথা শুনে গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে পড়ে খাট থেকে পড়ে গেছিলেন । অন্য ‘ কারন ’ এর জন্য দায়ী নয়।
_ শোন চার , কঅক্ষরের মত কথা বোল না । কলকাতা জেলা হবে কোথা থেকে ? জেলা হতে গেলে তো একটা জেলা সদর লাগে সেটা কলকাতায় কোথায় ?
- কেন ? কলকাতাই তো সদর ...
- কলকাতাই যদি সদর হবে ... তাহলে জেলাটা কোথায় ? কি হে চার ? বল এবার ?
তিন আবার চিন্তামগ্ন হয়ে পড়েছে । চার চোকফোক বড় করে ফেলেছে।
- মানে ? দেশের সবচে পুরনো মহানগর কলকাতা এটা কি জানো ?
- আরে রাখো তোমার নগর ! এতদিন ধরে ভুগোল বইয়ে যে পড়লে কলকাতা একটা জেলা ,
সেটা কোথায় ? হিসেবটা দাও তো ?
- নগর না । মহানগর ! চোখ বন্ধ অবস্থায় তিন বলল ।
- হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিকাছে ঠিকাছে ।
- এই যে হুগলী জেলা ? বি বি ডি বাগ বলে একটা জায়গা আছে জান ? যেখানে সব অফিস আদালত। এরম জায়গা আচে নাকি হুগলীতে ? বাওয়া?
খুব রাগ হল । এই হল টিপিক্যাল কলকাতার ছেলেদের মেনটালিটি। সব নাকি এখানে আছে । আবার জেলা তুলে ? গুছিয়ে দিচ্ছি দাঁড়াও।
- জান আমারিকায় একটা সার্ভে হয়েছিল হাইস্কুলের স্টুডেন্টদের ভেতর ? আর সেটাতে দেখা গেছে যে এইটটি পার্সেনট ছেলে মেয়ে জানে না ইউরোপ বলে একটা জায়গাটা কোথায় ... আর ফিফটি পার্সেনট এই মনে করে যে সারা ওয়ার্ল্ড একটাই একটাই দেশ । আমেরিকা ? তেমনি তোমাদের অবস্থা। মানে কলকাতাইয়াদের । তোমরা এটুকু জান না যে কোন একটা জায়গা কে জেলা হতে গেলে একটা জজ কোর্ট থাকতেই হবে । আর তোমাদের কলকাতায় নেই । হা হা হা।
ইচ্ছে করে মজা মারলাম । যাতে একটু জ্বলে । কাজ হল, কিন্তু তিনের ওপর...হঠাৎ চিন্তা ভাবনা থেকে জেগে উঠল সে ! বলল
- আছেএএএএএএএএ!
- কোথায়?
- ঐ তো বি বি ডি বাগে একটা ...
- ওটা ব্যাঙ্কশাল কোর্ট। সিটি সিভিল।
উত্তরে তিন চুপ। চার তখনও চেষ্টা করে যাচ্ছে ।
- জজ কোর্ট না হলে জেলা হবে না ?
- আজ্ঞে না । ওটা মাস্ট ।
- ধুর এসব কি বাজে ফানডা দিচ্ছ গুরু ...
- তুমি কোন কেলাসে পড় ভাই ? কলেজে না ?...কোন ইয়ার?
- ফাইনাল ।
- এবার আর পার্ট টু টা দিও না ।
- কেন ? ? ?
চারের চোখ মাঝখানে নর্মাল হয়েছিল পরীক্ষা তুলে বলাতে আবার বড় বড় হয়ে গেছে । কিছু আগে কলকাতা নিয়ে লেকচার মারতে গিয়ে বানিজ্যপোত ফোত কত কিছু বলল । এখন পুরোটাই
‘ চক – পেন্সিল ’ । তিন আবার তখন আবলুস কাঠের ভিক্টোরিয়ান এজের একটা ফটো ফ্রেমের মত গম্ভীর গলা করে ‘ লর্ড ওয়েলেসলি ’ শব্দটা বলতে গিয়ে কেস খাচ্ছিল ।
- না না বলছিলাম যে এটুকু জানা না থাকলে আর পরীক্ষা দিও না । দিয়ে লাভ নেই । দেওয়া না দেওয়া ব্যাপারটা একই ...
‘আমার যেমনি গাধা তেমনি রবে । কিচ্ছু হবে না । ’ দুঃখে বা আনন্দে বাঁ নেশায় জানি না হঠাৎ রনি গেয়ে উঠল । এতে চার আরও গম্ভীর হয়ে গেল । দেখে করুণা হল । বললাম
- আমাদের বাড়ির পিন কত বলত ?
- সিঁথি তো ?
- আর কলকাতার কত নাম্বার ওয়ার্ড ?
- কোন সাযুজ্য নেই। পাবেও না ।
- শোন পিকলুদা , তুমি দেখ ভাল করে দেখ , কলকাতা নিশ্চয়ই একটা জেলা ।
- তুই বল না আমি মেনে নেব । বল কলকাতার ম্যাজিস্ট্রেট কে ? তার অফিস কোথায় ?
- সত্যিই নেই ?
- তাহলে আর বলছি কি বাবুসোনা ? তোমাদের কলকাতা এক শোপিস জেলা । যার ব্যাবহারিক উপযোগিতা শূন্য ।
- তাহলে ?
- তাহলে ? ফুটু ডুম । গতবছর আমাদের পত্রিকাটার রেজিসট্রেশন করতে গিয়ে আমাদের কালঘাম ছুটে যাবার জোগাড়। সিঁথি নর্মালি উত্তর ২৪ পরগনায় পড়বে এই ভেবে বারাসাত কোর্টে যাবার সব প্রস্তুতি সারা, জানা গেল আসলে আলিপুর কোর্ট এ ব্যাপারটা করাতে হবে। আমি তো ভেবেই অবাক...আরে আলিপুর তো ‘সাউথ ২৪’ এর কোর্ট...পরে জানলাম তথা কথিত জেলা কলকাতার কোর্ট ও নাকি ওটাই। ভাব একবার ‘সাউথ ২৪’ এর কোর্ট ও সদর হল আলিপুর। আর যেখানে ভাগাভাগি করে কলকাতার কাজ চলে। আরও জানলাম যে কলকাতার ম্যাজিস্ট্রেট নাকি কলকাতার সিপি অর্থাৎ কমিশনার অফ পুলিশ। ভাব একবার।

চার তো এসব শুনে স্তম্ভিত।
- পিকলুদা? ও পিকলুদা?
- বল।
- আচ্ছা এমন কেন হয় বলত, আমাদের এত কাছের একটা শহর এত ভুলে ভরা?
- কেন আবার? ইংরেজ আমল থেকে একই মাল মানে বহু ভুল রয়ে গেছে...চান্স পে ডান্স কেউ করেনি। তাই আইন গুলো না বদলে একই রকম।
- ইংরেজ শালা ...
তিন কিছু একটা গালাগালি দিতে যাচ্ছিল থামালাম
- ইংরেজকে বলে কি হবে ? ওরা তো শহরটাকে দাঁড় করিয়ে গেছে আর আমরা ** মেরে ছেড়ে দিয়েছি । সিস্টেম বলে কিছু নেই । দেখবে যে কলকাতা ১ যদি হয় ধর্মতলা , ২ হবে কোন এক তেপান্তরে ... সেখানে হয় তো এখনো কপি চাষ হচ্ছে ... আবার ৩ হবে ...
- এসব বলে কি হবে ... একটা শহর , এত পুরনো , সেখানে পিন নাম্বার এত ভেবে চিন্তে করা অসম্ভব । তবে এই যে জেলা কেসটা একটা ‘ভৌগলিক ভুল ’
হঠাৎ তিন হা হা করে হাসতে আরম্ভ করে দিল ...রনি এতক্ষন বসে আমার কথা শুনছিল । বিরক্ত হয়ে তিনকে দাবড়ে দিল। তিন শুধু বলল ...’ জ্যোতি বোস ’...’ আরেরে সে তো
ঐতিহাসিক ভুল ’... রনি আরও চেঁচাতে আরম্ভ করল । আর তিনের সঙ্গে কথা কাটাকাটি
শুরু হল । আমি ঘড়ি দেখলাম । প্রায় তিনটে ।
- এই সব গোটা অনেক হয়েছে ।
রনি চমকে থামল । বলল পিকলুদা , কলকাতা জেলাটা কি সত্যিই নেই ?
- ওফফফফফফফ...