ভালোপাহাড়ের মালী

বহতা অংশুমালী


কবিদের চিনে গেলাম তাঁদের কবিতা পড়ার আগে! এ কেমন হলো! আসলে আমি তো বেশিক্ষণ কবিতা পড়তে পারি না। বেশী কবিতা পড়তেও পারি না। পড়িও নি তো! ভাস্কর চক্রবর্তীর নাম শুনলাম ফেসবুকে ঢুকে। তাঁর কবিতা পড়েছি কুড়িয়ে বাড়িয়ে। আমি উপন্যাস পড়তে ভালোবাসি। উপন্যাসে অনেকক্ষন বিছিয়ে জীবন। আর প্রেম পেলে বা কান্না পেলে, কিসব লিখে ফেলি। কবিতাই বলি আমি তাদের! কবিতা হয়ে ওঠে কি তারা? আমার যায় আসে না। তাহলে আমি কেন? তাহলে তমাল রায় আমাকে লিখতে বললেন কেন বারীন ঘোষালকে নিয়ে?


বারীন ঘোষাল মশাইকে চিনেছি আমি নিজের একান্ত এক স্বার্থে, একান্ত এক লোভ চরিতার্থ করতে! (তাঁকে দাদা বলতে পারি না। আমি এঁদের কাছের নই। আমি এঁদের মতন নই। আমি কখনো হাতে মুঠো মুঠো সময় নিয়ে ফাঁকা পকেট নিয়ে পাহাড়ি রাস্তায় ঘুরতে পারি নি যে। আমরা যারা সময়ের রাজা নই, যারা শান্ত হয়ে একটা পুকুরের ধারে খোলামকুচি ফেলতে ফেলতে একে অন্যের হৃদয়ে হাত রাখতে পারি না। নাঃ!)

কী স্বার্থ জানেন? বলবো আজ। ওঃ সে ভারী মজার। ভারী লজ্জার! ভারী একান্ত! ভারী বোকা বোকা। বারীনদা!(দাদা বলে ফেললাম!) আমি আপনার একটা জলজ্যান্ত কবিতার মধ্যে গিয়ে বসতে চেয়েছিলাম! আপনার অনতিদূরে । একটা স্বপ্নের মধ্যে, অসম্ভব সম্ভবের মধ্যে, যা আপনারা তৈরী করে গেছেন। অনেকগুলো মানুষের মধ্যে, যাদের পাঁচতারা হোটেল লাগে না। বাতানুকূল যন্ত্র লাগে না। কিচ্ছু লাগে না। যারা একে অন্যের ভিতর যখন তখন বেড়িয়ে আসে। এক লাখ কুড়ি হাজারের বেশী গাছ? দুলাখ গাছ? ভালো পাহাড়! বারীনদা! ভালো পাহাড়! আমি আপনার থাকা কালীন ভালো পাহাড় যেতে চেয়েছি! কিন্তু কবি ছাড়া সেখানে গিয়ে কবিদের সঙ্গে বসা যায় না যে! আমি কি কবি বারীনদা? আমি চুপিচুপি একবার শুনতে চেয়েছিলাম। অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখলাম, ফেসবুকের এক ছবিতে। ভাল পাহাড় বলে একটা অদ্ভুত জায়গায় বসে আছেন কবিদের সঙ্গে। কি সেই মজলিশ। কি সবুজ! অর্জুনকে মাঝখানে কিছুদিন কবিতা পড়াতাম। ফেসবুকে চ্যাটে। একদিন কি হলো, ফোন করা হলো। অর্জুনের আওয়াজ ঘষা ঘষা, লেখা যত সিরিয়াস ধরণের, কথার ভঙ্গী তত শিশুসুলভ। কিছু বন্ধুতা হলো। কফি হাউসে দেখা হলো। খুব আড্ডা। ভয়ে ভয়ে জিগেস করলাম, ওই যে জায়গাটাতে আপনারা গেছিলেন সেখানে যাওয়া যায় কেমন করে? অর্জুন বললেন, ওটা তো আমাদের নয়। বারীনদা কমলদা, ওনারা বলতে পারেন। জিগেস কোরো। আর দিলেন সেই জায়গার পরিচয়। সে পরিচয় শুনে মাথা ঘুরে গেল বারীনদা! একটা বন্ধ্যা অঞ্চলে দুলাখ গাছ? বারীন ঘোষাল মশাই, আমি ভালোপাহাড় যেতে চেয়েছিলাম! বসতে চেয়েছিলাম আপনার অনতিদূরে। আপনার প্রভার বৃত্তে। পায়ের কাছে।
কফি হাউসে সাজুগুজু করে দেখা করলে বারীনদা পাত্তা দেন না বিশেষ। এই পাত্তা না দেওয়াটায় কি আরাম। আহা। এই পাত্তা না দেওয়ার সবুজ পরিসরে, মুখে রঙ না মেখে, শুধু বুকের ধুকপুক ধুকপুকের সিগন্যালে চুপচাপ এমন মানুষদের কাছে গিয়ে বসা যায়। সুদেষ্ণা মজুমদার সেখানে পান খেতে খেতে হাসেন। কিসের যেন বই কেনা বিক্রির টাকা আর হিসেব টুক করে আদান প্রদান হয়। আহা আপনারা বোর হলে কি করবো! আমি তো জানলার ওধার থেকে রঙ্গিন ঘষাকাঁচের মধ্যে দিয়ে আবছা আবছা দেখলাম এনাদের। বিদ্যুৎলেখা ঘোষ, গোলগাল সুন্দর হাসি নিয়ে বসে থাকেন। বারীনদা কাকে যেন বলেন, "ও বাড়িতে গেলে আম খাওয়ায়"। রান্না। আর খাওয়ার গল্প। কোথায় কোথায় যান বারীনদা। আর কারা কারা তাঁর কাছে আসে। কেউ এক স্টেশনে উঠিয়ে দেয়। কেউ অন্য স্টেশনে নামিয়ে নেয়। এই সুবিশাল পরিবার। সেখানে কবিতা খালি পোড়া কালি মাখা প্যাপিরাস নয়। রান্নায় খাওয়ায়, আসায় যাওয়ায়, জীবনে মৃত্যুতে, কথায় বার্তায় এখানে কবিতা হাঁটছে ফিরছে, বসছে। বইমেলায় বারীনদার চেয়ার একজায়গায় আটকে আছে। তার পাশে দুই বাংলার নানান লোক, ছেলে, মেয়ে আসছে বসছে। চেয়ার সরিয়ে দিচ্ছে। চেয়ার ঘুরিয়ে রাখছে। স্থূলকায় মানুষটির মুখে তেমন ভাব নেই। চোখে অন্যরকমের রঙ। চোখটি কেমন মায়ায় থকথকে । তাতে পা আটকে যায়। বারীনদা যখন চলে গেলেন, চেন্নাই থেকে নীলিমা দেব লেখেন "সমুদ্র পারে কবিতা যাপন , নীলিমার কিচেনের রান্না" যা বারীনদা কথা দিয়েছিলেন, হয় নি! চন্দ্রা দাস রায় লেখেন "ও বারীন দা এভাবে আদর করে আর কে কাছে টেনে নেবে ?? কে দেবে বাবার মত প্রশ্রয় ?? কে আবদার করবে একটু লইট্যা বা শুঁটকি মাছ রেঁধে খাওয়াবি... কে মাথায় হাত রাখবে রোগের সাথে লড়াই করার জন্যে"। দেব জীবনকেত লেখেন "তুমি কোথায় বারীন দা? মা কচুরশাক রান্না করেছে তুমি আসবে না?" এনারা কারা আমি জানি না। আমি শুধু দেখি কি সুবিশাল অঞ্চল জুড়ে বারীন ঘোষাল মানুষের মানুষের শিকল বানিয়েছেন, কত বাড়ির কত ঘরের একান্ত তিনি। কেমন করে?

বারীনদা কবি কি না তাই নিয়ে কে যেন কটাক্ষ করলেন। বহু মানুষ তার প্রতিবাদ করলেন। আমি দিলাম নীচের পংক্তিগুলো, বারীনদার লেখা।




নাঃ। আমার কোন অনুভব হয় নি। আমি কিচ্ছু বুঝি নি এই কবিতাটা পড়ে । যদি না জানতাম এগুলো ওনার লাইন, আমি পড়তাম না দু প্যারাগ্রাফের পরে। ইন্দ্রনীল ঘোষের পোস্ট থেকে পড়লাম তাঁর আরেক কবিতা।
উফফ। কি হতবাক। কি মুগ্ধ।
তিনি কবি, অকবি, না অতিকবি? কে বিচার করবে? কী যায় আসে? কী আসে যায়? বারীনবাবুর মৃত্যুর পরে আজকের বাংলা কবিতা কিছু বিব্রত হয়েছে। বসে ছিল সে নিশ্চিন্তে এক চিলেকোঠায়। আধো ঘুমে। তাকে কত মানুষ খাওয়াতো। কত মানুষ এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে নিয়ে যেত। কত মানুষ চেয়ার পেতে দিতো তার, যখন সে বেঘোর নেশায় গিয়ে বসতো এর তার বুক ফেয়ারের স্টলে। বাংলা কবিতার নূপুরের কয়েকটা সোনার বল বারীন ঘোষালের দেয়া। তার জটাজুট চুলে কিছু আসা যাওয়া করা উকুনও কি তাঁরই সংযোজন? কিন্তু এই যে তার বাসাখানা? যেখানে সে পরম আরামে ঘুমোচ্ছিল, জাগছিল। এ বাড়ি তো ঘোষাল মশাইএর। তার যে ভালোপাহাড়ের টিকিট কাটা ছিল এই কমাস বাদে। বাংলা কবিতা যখন ঘুমের মধ্যে বেভুল বকতো, তার সেই কাঁপা কাঁপা স্বপ্ন নোট করা থাকতো এনাদের ডায়েরিতে।
বাংলা কবিতাকে জায়গা দিন। বারীন ঘোষাল মরে গিয়ে তার শহরের যখনতখনের বাসাখানা গেছে। সে আবার খিদে পেলে দরজায় টোকা দেবে। ভালোপাহাড়ের জঙ্গলে কতরকম পাখি উড়বে। সাঁওতাল বাচ্চারা যখন ফুটবল খেলবে স্কুলের পরে। তখন বাংলা কবিতা ওখানে থম মেরে বসে বসে দেখবে কিছুক্ষণ। আমি প্রবাসী। বারীন ঘোষালকে পড়বো মাঝে মধ্যে। নতুন করে চিনবো তাঁদের। আমি আর প্রজ্ঞা আর আরো কেউ কেউ হয়তো ভালো পাহাড়ে যাবো। যা কিনা বারীনদার কথায় এক পাহাড় স্বপ্ন। আমরা আরো কিছু মেয়ে কবি অকবি বন্ধুদের নেবো। ওখানে নাকি কবি না হলেও যাওয়া যায়! কি বাঁচোয়া! বারীনদা! আমরা ওখানে গাছ লাগাবো কিছু? আমরা আরো কিছু করবো বারীনদা। কিছু কিছু করবো। বারীনদা, আপনার আমার কবিতা ভালো লাগে নি তেমন। তাতে কি আসে যায়? কী আসে যায়? সেই যে পায়েস খেতে চেয়েছিলেন! সেই আনন্দে সুজাতা বিভোর!