যাকিছু পেয়েছি, সে আমার সঞ্চয়...

নীতা বিশ্বাস


তাঁকে নিয়ে লেখা যায় এক-বিশ্ব। সে এক বিস্ময়-দ্বীপ। কিন্তু দ্বীপবাসী হয়েও বিচ্ছিন্ন নন বরং ছোট বড় সকলের হৃদয়ের সঙ্গে আনন্দসুখে জড়িয়ে থাকতে ভালোবাসেন যে মানুষটি, তাঁর নাম বারীন ঘোষাল। লিখতে বসলে লেখা আর ফুরোয় না, কথা আর ফুরোয় না, পূব আর ফুরোয় না। অথচ এই মানুষটি কথা বলতেন ধীরে ধীরে। ‘বলতেন’ লিখতে বলপেনের নারাজগি। আমাকে টেন্স শুধরে নেবার নোটিশ দিলো। পারলে সে নিজেই শুধরে দেয়! কেঁপে গেলো বলপয়েন্ট, সেখানে ক’ফোঁটা জল। টলটল! কলম রে, তুইও! আজ সব্বাই। আজ সব্বাই।

বারীনদার সৃষ্টি নিয়ে আজ কত কবি, কত বিস্ময় লিখবেন। আমি আজ লিখবো ব্যাক্তি বারীন ঘোষালের কথা! কেমন! আর লিখতে লিখতে প্রাণ ভরে খানিক কাঁদবো। কান্নায় থাকবে প্রিয় বারীনদার কাছে আমার পাওয়া ও শেখার স্মৃতিলেখা।
...কিন্তু সে তো আমাদের ড্রইংরুমের নির্দিষ্ট সোফাটিতে বসে আছে স্মিত হাঁসিটি নিয়ে! সব সময় তরতাজা! সবসময় উৎসাহী! যার মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছে তাকে উৎসাহ দিয়েছে। তাই বলে সবসময়ই ‘আহা’ ‘বাহা’ নয়। স্তোক দেওয়া নয়। শান্ত সুন্দর ভঙ্গীতে তার সাথে আলোচনা...,হ্যাঁ সে ধৈর্য দেখেছি বারীনদার মধ্যে। একটা নতুনকে ভাবিয়ে তোলার এষণা, নতুন ভাবে চোখ চাইতে শেখার প্রেরণা। এসব আমার সঙ্গে হয়েছে বলেই আমি জানি। লিখতে বসে বুঝতে পারছি ব্যাক্তি বারীনের সাথে লেখক কবি বারীনকে পৃথক করতে পারছি না। যা কিছু সব লেখার সুত্রেই। বারীন ঘোষাল এক নয়া ও গভীর ও মোড়ফেরা বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার নাম। কবি লেখককে লেখার সাথে সাথে নম্র স্নেহশীল হতে হয়, বারীনদা কে দেখেই জেনেছি। নিজের ঘরে যেমন, ভালোপাহাড়ের কবিতা ক্যাম্পেও বারীনদার এই স্বভাবটি দেখেছি।

একই শহরে থাকি আমি কমলদা, দেবজ্যোতিদা (দত্ত) আর বারীনদা। কমলদা দেবজ্যোতিদার সঙ্গে পরিচয় আমার কলেজ জীবনেই। বারীনদা কে আমি পেয়েছি আরো কিছু পরে। কৌরব পত্রিকার সঙ্গে এরা তিনজন কি ভীষণ ভাবে জড়িয়ে আছে। সেই তারাই আমার পরিচিত! এ আনন্দ আমি রাখি কোথায়! আনন্দ কেন? না, এই কবিগোষ্ঠির নাম কৌরব। পান্ডব নয়। নামের মধ্যেই তাদের অন্য ভাবনা, অন্যতর সাহিত্য সৃষ্টির আততী আমাকে ধাক্কা দিয়েছে।
ভয় আর সঙ্কোচের দূরত্ব থেকে একটু একটু করে সাহস সঞ্চয় করে বারীনদার কাছে এগোচ্ছি। কৌরব পত্রিকায় প্রকাশিত ভিন্ন স্বাদের গদ্য, কবিতা বার বার পড়ছি (দেবজ্যোতিদার কল্যাণে কৌরব পত্রিকা আমার হাতে আসছে)। কুয়াশায় আছি। অনেক প্রশ্ন একটা একটা করে জমা হচ্ছে।
...সেবার কলকাতা বইমেলায় ‘অতিচেতনার কথা’ প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। কৌরবের স্টলে বারীনদা, কমলদা। বইটা কিনতে চাইলাম। নিজের হাতে বইটা বের করে আমার হাতে দিয়ে স্মিত হাঁসির বারীনদা বললো, এ বইটা এবার বেরিয়েছে তুমি জানতে? সাক্ষর দিয়েছিলো বইটাতে বারীনদা। পড়ে জানাতে বললো। আমি বলেছিলাম যেখানে বুঝতে পারবোনা, আমি কিন্তু জিজ্ঞাসা রাখবো। নিশ্চয়ই রাখবে। খুশি হয়ে বলেছিলো বারীনদা। আমাকে! হ্যাঁ আমাকে! আমি একটা পুঁটিমাছ, তায় এক্কেবারে চুনো! সেই আন্তরিক বারীনদা কে কোনোদিন ভুলবো না আমি। কোনোদিনও না।
সে বই যে কতবার পড়েছি আমি। ক-ত-বা-র। আর ভেবেছি এভাবেও ভাবা যায়! তখনও মোবাইল ফোন বাজারে আসেনি। যখন দেখা হয়েছে, প্রশ্নের ব্যাগ উপুড় করেছি। একটুও বিরক্তি নেই, বরং প্রশ্ন গুলো উপভোগ করার প্রসন্নতা তার মুখে। মূর্খ আমি একবার বলেছিলাম, কৌরবের এই বাঁকফেরা নতুন আশ্চর্য শব্দাক্ষর ও ভাষাবিণ্যাস মুগ্ধ হয়ে পড়ি। সবটাই যে বুঝতে পারি এমন দাবি করবো না। বুঝতে পারোনা তবুও পড় কেনো? উত্তর দিতে গিয়ে আমি থতমত! বলেছি, ভালো লাগে খুব। কোথায় যেন টান অনুভব করি। এই গল্প কবিতা যে ভাবতে শেখায় নতুন উপস্থাপনার দূরন্তকে, ভাষাবিণ্যাসের আশ্চর্যকে, অভিধানভির্ভূত শব্দকে,-- কৌরব পত্রিকা না পড়লে জানতে পারতুমনা এমন করে! কেমন নেশা নেশা লাগে, তাই পড়ি। এই নেশা নেশা, এই যে ভালোলাগা, এখান থেকেই বোঝা যায় তুমি তোমার মধ্যে বদল চাইছো কোথাও। মুর্খ আমি কথার পিঠে বলেছি, বদলাতে চাইছি মানেই কি তোমার মত লিখতে হবে আমাকে? আমি তো তা লিখবোনা বারীনদা! পারবোও না লিখতে। কথা কেড়ে নিয়ে বারীনদা বলেছে, একদম না নীতা। কেউ কারো মত লিখতে পারেনা। লিখবেই বা কেন! তাহলে আর পরিবর্তণ কোথায়? লেখাতে কোনো ‘মতো’র স্থান নেই। তবে জেনো, শুধু ভাষা বদলালেই বদলের কবিতা হয়না। বদল চাই অনুভবের। বদল চাই চেতনার। প্রত্যেকের নিজস্ব চেতনার। চেতনা কে সম্প্রসারিত করে, দেখার ওপারে আরো কিছু দেখতে পাওয়া। সেই দেখতে পাওয়া প্রত্যেকের ভিন্ন। আর চেতনাকেশ ঋদ্ধ করতে চাই অর্জন। অর্জন থেকে নতুন কিছু ভাবতে শেখা। এইবার তাকে নিজের বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা। এরকম ভাবে কে শেখায়! বারীনদা ছাড়া! কে সময় দেয়! বারীনদা ছাড়া! আজ এত তরুণ কবিদের মিলিত সংসারে সেই প্রশ্রয়ের হাসিমুখটি নিয়ে বারীনদা আছেন এবং আছেন এবং আছেন। প্রচল থেকে অন্য ভাবনায় কবিতাধারার মুক্তি আনতে চেয়েছে যে একদল কবি, এদের প্রত্যেকের লেখার ধরণ তাদের নিজস্ব। কমন যা আছে তা স্রোতের বিপরীতে ভাবতে চাওয়ার নতুন। কোনো অনুকরণের স্থান যদি থাকে তবে একটি ‘স্থা’ তৈরি হয়। তার শাসন আবার প্রবল হয়ে ওঠে। এখান থেকে বেরিয়ে আসার কথাই বারীনদার ভাবনায়। যা ছিল কমন তা নিজ অনুভব কে লিপিবদ্ধ করতে সঠিক শব্দটি নিজের মত করে গড়ে নেওয়া। তাজাশব্দ, নতুন আঙ্গিক, নতুন স্টাইল, নতুন উপস্থাপনা এবং নতুনতর হয়ে ওঠার এক ক্রমোন্নত ধারাবাহিক। এক নতুন
কবিতাভুবন। গল্পের সাহসী আঙ্গীক, যা প্রথাভাঙার দূরন্ত। যা ‘জিন্দাবাদ খালকো’।
বিস্ময়ের এই খোলাখুলি আলোচনায় পেয়েছি কবি-গল্পকার-প্রাবন্ধি বারীন ঘোষালকে।
প্রত্যেক কবিপ্রত্যাশীর নতুন ভাবনা কে সম্মাণ দিয়েছে সে। প্রত্যেকের কবিতার বই পড়ে নিজের মতামত জানানোর মতো পরিশ্রম করতেন ভালোবেসে। নতুন চেতনাঋদ্ধ কবিদের সাদরে বুকে টেনে নিয়েছেন ভালোবেসে। কবিতার যে কোন শব্দ-অভিধান হয়না, বারীনদার কবিতা থেকেই শিখেছি। এই স্থাবিরোধী বুকের পাটাটির জন্য আমার জেহাদি সেলাম। স্তাবকতায় বিশ্বাসী নয় বারীন ঘোষাল নামক মানুষটি।

তোমার মধ্যে যে নিত্যবহমান নতুন,-- আমার স্থির বিশ্বাস, এই বহমানতার স্বচ্ছতে থাকা সমস্ত তরুণ কবিসৈনিক দের তুমি অদৃশ্য থেকে সাবাসি দিচ্ছো। জিন্দাবাদ দিচ্ছো। এইখানেই আমার শ্রদ্ধা এসে তোমার কাছে নত হয় বারবার, প্রিয় বারীনদা!


“বাকসারা এখন তারই ধুয়ো
কেকালয় থেকে
চশমার ওপরে চশমা তবে দেখা
মরি তো বর্ণে বর্ণে
শোনার জন্য শুনো ভান্ডার ভাঙা হচ্ছে
চিনো গলাকাটার দাগ ও রেশরেখা
হায় ধুয়ো কায়মন কায়োমনে
আর কেউ খবর চাইতে আসবেনা এই শান্তি

কথার কোন কারণ নেই এগুলো কথা নয়
ঘুরিয়ে পরা পায়ের পাতায় মরীচিকা জমছে
মরুবোনা হয়েছে কেকালয়ের সাক্ষাৎ নিচে
আর উচ্চময়ূরী ডিমে ফতেমার তা’ দেওয়া দেখছে
শগুনের দোয়ায় ওজু-সারা জল গড়ালো
ন্ডা এখন চুষতে পারে পুণ্য

যেমন যেন বর্ণে
মরতে হলে স্বপ্নে যেন মরি
কাকে পুষতে গিয়ে চালু
তোলে গল্পধ্বনি
দোহাই ধরে ও ধুয়ো
সংঘসন্ত মণি”
--বারীন ঘোষাল (পুব আর ফুরোয় না)।