প্রণয় ধ্বনির সফটওয়্যার মেকার

বিদ্যুৎলেখা ঘোষ


সব অন্ত্যমিলের গুঁড়ো আমরা । ঐ যেভাবে এমত পাগলামির মা নিষাদ হয় আর কি । অন্ত্যমিল তাল তেহাই সেভাবে আমারও ইস্কুলের খাতায় ব্রাউন পেপারের মলাটের ভিতরে বন্দি মোটা কভারের উপরে লেগে থাকা সাদাটুকুতে । ' কেউ যেন না দেখে কেউ যেন না ছোঁয় ' এ অচ্ছুৎ রুগীকে । কেউ যেন না সন্ধান পায় এ রোগের । সাম্মানিক স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পাঠে বেছে নিয়েছি এই রোগের অভিধান ব্যাকরণ বাংলাভাষা ও সাহিত্যকেই । সুনীলে এসে থমকে গিয়েছিলাম , " জামবাটির মতো স্তন " মুদ্গর হেন পাছা " ছ্যাঃ এ কেমন লেখা রে ভাই ! কী অসভ্য কী নোংরা ! উপমা রূপক প্রতীকের কি অভাব পড়েছে ! তখন তো মলয় রায়চৌধুরী, হাংরি এসব কোনোটাই সিলেবাসে পাইনি , তাহলে যে ভিরমি খেতাম এতে অন্তত সন্দেহ নেই । সুনীল শক্তি শঙ্খ এঁদের উল্লেখটুকু আছে ব্যাস ঐ পর্যন্তই । এখন যখন সেই আমার কলেজ ইউনিভার্সিটিবেলার কথা ভাবি আর হাসি পেয়ে যায় , দুগ্ধপোষ্যের মুখে কেউ যদি মাধ্বী ঢেলে দেয় সেরকম ব্যাপারটা । শিক্ষক পরিবারে জন্মে যাবতীয় বিশুদ্ধ চেতনা নিয়ে অ-শরীরী লেখার মধ্যেই চলাফেরা করেছি তখন । বাৎস্যায়নবাবুর থেকে শৃঙ্গার এবং দাম্পত্যের টিপস্ নেওয়া ছাড়া আর অন্যকিছুতে একেবারে কল্কে পেতে দিইনি তাকে । 2012 তে ফেসবুকে এলাম । টুকটাক প্রবন্ধ, কবিতা প্রকাশ হয়ে গেছে কলেজবেলা থেকে কাছাকাছি পরিচিত অল্প কিছু পত্রিকায় । ফেসবুকে এসে অপেক্ষা করেছি তিন মাস আমারি মতো রুগী কৌমের । এক এক করে বিভিন্ন পত্রিকার সঙ্গে পরিচয় লেখা প্রকাশ সূত্রে যোগাযোগ হল ঐহিকের সঙ্গে, লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে । এর আন্দোলনের ধারা ইতিহাস শৈলীর সংস্পর্শে যত এসেছি বেড়েছে মুগ্ধবোধ, বিস্মিত হয়েছি..এ কোন আলো লাগলো চোখে ! কী আশ্চর্য সব চেতনা বীজ একত্র এখানে যুক্তিফুলের মতো ! জড়ানো প্যাঁচানো অনন্ত রহস্য যে যেভাবে খুঁজবে পাবে আলো নয়তো প্রগাঢ় অন্ধকার । মন মনন মগজে অপর্ণা ঘোর । দেখতে পাচ্ছি বারীন ঘোষাল উমাপদ কর ধীমান চক্রবর্তী রঞ্জন মৈত্র স্বপন রায়দের সাদাকালোয় অঘোর ধুনি । মহুল মহুল আঁচ লাগে কেন এঁদের লেখালেখির সামনে এলেই ! গতানুগতিক স্বতঃস্ফূর্ততা শুধু আমার আর এদিকে মহাকাশে নতুন গ্রহ তারা খুঁজে পাওয়ার মতো অনু-প্রতি-অপর-নতুন-অতি েতনার খোঁজ পেয়ে এদের সঙ্গে প্রাণের খেলা । এ খেলা শিখতে হবে, জানতে হবে । পরিচিত হওয়ার ও কয়েকমাস পর সবে লিখছি ঐহিকে , আলাপ হল বারীন ঘোষালের সঙ্গে । কে বারীন ঘোষাল ? বাংলা কবিতার স্বঘোষিত ভিলেন বারীন ঘোষাল - সব নতুন নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে কবিতায় চলতি ইজম, কনসাসনেসকে ভেঙে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে দেখা ও দেখানোর জন্য ছেলেধরা বারীন ঘোষাল - ' বারীন ডাঙা'র বারীন ঘোষাল , যে ডাঙায় জন্ম নিয়েছে কত শত লিটল ম্যাগাজিন , ' কৌরব ' যাদের মধ্যে বিস্তীর্ণ বারীন ডাঙা অধিকার করে রয়েছে । ' অতিচেতনার কথা ' বারীন ঘোষালের এই বইটার কথা শুনছি । সাহিত্য প্রকরণে চেতনা প্রবাহ চেনা স্রোতের সঙ্গে পরিচয় আছে কিন্তু অতিচেতনা কী সে ? স্বয়ং লেখককে গিয়ে জিজ্ঞাসা করার মতো সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি তখনও । প্রাথমিক আলাপে অল্প কথায় গল্প কথা সেরে নিতে দেখেছি ওঁকে । ঐহিক ওয়েবে হারিয়ে যাওয়া অনুষঙ্গকে থিম করে ' লি @ নিরুদ্দিষ্টের প্রতি ' সংখ্যা করা হয়েছিলো । একটা পত্র কবিতা লিখেছিলাম তাতে । ফেসবুকে সেই লেখা পড়ে তিনি কমেন্ট করলেন " এর মধ্যে কবিতা খুঁজে পেলাম না " । আমার তো আক্কেল গুড়ুম । বলেন কী ? পত্র কবিতা কাব্য প্রকরণের মধ্যে এক মোহনীয় সৃষ্টি । পত্রাকারে কোনো বিষয়কে উপস্থাপন করা । খুব একটা খারাপ তো লিখেছি বলে মনে হয়নি আমার নিজের কাছে । তাহলে কি ব্যাপারটা ? তিনি কবিতার দিদিমা , বড় মা'কে অস্বীকার করতে চাইছেন !
কবিতার ভিলেনকে দেখতে হচ্ছে এবার ভালো করে । যদিও এই লেখাতে তাড়াহুড়োয় ন্যূনতমই বলতে পারবো । যাইহোক, অতিচেতনা আমাকে আন্দোলিত করলো । ইতিমধ্যে মাঝেমাঝেই ফেসবুকে কোনো কিছু তার অপছন্দের বিষয় হলেই খিস্তোনো পোস্ট দেখতে পাই আর ভাবি এতবড় একজন সাহিত্যিক , প্রচুর ভালোবাসেন তাঁকে সমসাময়িক সব বয়সের লেখকরা । তিনি এভাবে খিস্তি মেরে ভুত ভাগান কেন ? দুঁদে সাংবাদিক বন্ধু অরুণ চক্রবর্তীর সঙ্গে অরুণ> <বারীন চাপান উতর চলে প্রায় সকালেই । দুই বুড়োর দুষ্টুমি বুদ্ধি দিয়ে তৈরি করা ফাঁদে যে পা দিয়েছে নাকাল হতেও দেখেছি বেচারিকে । পড়ছি ' অতিচেতনার কথা ' বইটা । এখানে সামান্য একটু বলে নিই ' চেতনা প্রবাহরীতি 'তে মনলোকে বর্তমানের অভিজ্ঞতা, অতীতের স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের কল্পনা একসঙ্গে প্রবাহিত হয় এবং Monologue এই রীতির প্রধানতম বৈশিষ্ট্য । জেমস জয়েসের ' ইউলিসিস ' , সতীনাথ ভাদুড়ির ' ঢোঁড়াই চরিতমানস ' চেতনা প্রবাহরীতির উপন্যাস । এ তো গেল আমাদের সাহিত্যের পুঁথিগত ' আছি বাদে'র হাত ধরে খাতা দেখে গানের কথা । বারীন ঘোষাল মহাশয় অতিচেতনা কিভাবে লাভ করলেন ? কি পাবো সেখানে ? এই বইয়ের ' মুখোমুখি বসিবার ' অংশ থেকে কোট করছি -- "...আমি কার জন্য কবিতা লিখি, তা কি ভাববো না ? আমার পাঠক কে ?...ঋত্বিকের সিনেমা যার ভালো লাগে সে সুখেনকেও ভালো বলবে, তা কি করে হয় ? তা বলে এটা ভুললে চলবে কেন যে , সুখেনের দর্শকই বেশি । এসব নিয়ে আমাদের চিন্তা করার দরকার নেই । আমরা চাই কবিতাকে শিল্পিত করা ও বিশিল্পিত করা অথবা নির্মাণ ও বিনির্মাণ করা, এই দ্বি ' চি ' ও ' চ্যাঙ '- এর মধ্যে অসিলেশন , নিজেকে এই দোলন ও দোলকের মধ্যে অনাস্থায়ী সময়ে পরীক্ষা করতে । কবিতার সম্পর্ক, কেন্দ্র, বিকেন্দ্র ও মানসিকতার মধ্যে মিল অমিল টেস্ট করার টেকনিক গ্রহণ, অভ্যাস ও বর্জন প্রবণতাকে জ্বালিয়ে তুলতে চাই ।...ইউরোপীয় অবচেতনা বা পরাবাস্তব আজ থেকে নব্বই বছর আগের এ ধরনের চিন্তা ভাবনারই ফসল । কেন্দ্রাতিগ সেই চলন , তার উত্থান, শিখর দর্শন ও অনিবার্য পতনের মধ্যে দিয়ে চক্র সম্পন্ন করেছে । বাংলার কাল কেন থেমে থাকবে ? তা কি আমরা অলস বলেই ? এরই বিরোধিতা করার জন্য আমি এক কেন্দ্রাতিগ চলনের কথা বললাম । নাম দিলাম অতিচেতনা । বস্তু, বিষয়, ঘটনার ধারণা, এ সবের কেন্দ্র থেকে ভাবনা শুরু করে ছড়িয়ে পড়া, অন্ধকারে আলোকযাত্রা, বস্তুর বাইরের স্পেসে অন্ধকার পেরিয়ে যাওয়া আলোর কিরণের মতো । " এ কী পড়লাম আমি ! বারীন ঘোষালের একটা অতিচেতনার কবিতা অনুসরণে বলি...এরপর " দীর্ঘ তাকিয়ে আছি " আবার ও উল্টে যাচ্ছি পাতার পর পাতা । " আলো তাই ঘন হয়ে উঠছে " । ক্ষীর বসছে আমার নাদানে । বুঝতে পারছি কোথায় আমার খামতি ।
তবু দূর থেকেই শ্রদ্ধা, কুশল বিনিময় । বারীন ঘোষাল লক্ষ্য করছেন কুণ্ঠিত আমি দূরে থাকছি । এরপর আমার লেখালেখি ( সিংহভাগই ঐহিকে প্রকাশিত ) । খুঁটিয়ে পড়ছেন , অল্প কথায় ধরিয়ে দিচ্ছেন সমৃদ্ধির পথ । ফুটবল সংখ্যায় গল্প লিখলাম ' থ্রো-ইন ' । প্র্যাকটিক্যালি তখন থেকেই এই বাংলা অঘোরী বারীন ঘোষালকে বারীন দা বলে ডাকার , তার স্নেহের আঙুলটা ধরার যোগ্যতা অর্জন করেছি । ওদিকে ফেবুতে সকালের তাঁর পোস্টে সব উদ্ভট আবার অদ্ভুত জ্ঞানগর্ভ প্রশ্ন করা চলছে শেষে আবেদন " উত্তরটা বলে দাও না " । দিনের শেষে দেখা যায় অদ্ভুত উদ্ভট নয় মোটেই । আসলে তিনি আমাদের ভাবা প্র্যাকটিস করিয়ে চলেছেন নিত্য নতুন কৌশল করে । 2016 তে হাতে পেলাম বারীন দা'র আত্মকথন ' হারাতে হারাতে একা ' । পড়ছি বারীন মা-বাবা-ভাই-বোন..বারীন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছেন বড় হওয়ার কাছে..স্কুল..ব্যায়াম..ব েপাড়ার ছেলেদের হিড়িক থেকে পাড়ার মেয়েদের রক্ষা..প্রেম-পরকীয়া না বোঝার না পোষানোর স্বীকারোক্তি..কবিতা ছড়া না-পসন্দ হওয়া..প্রথম সিগারেট..প্রথম মাস্টারবেশান -- " আমাকে সিগারেট খাওয়া শিখিয়েছিল তাপু দা , সবিতা আমাকে শরীর চিনিয়েছিল...তাপু দা সিগারেট খাবে, আমি দেখছি, পাছে বলে ফেলি, আমাকেও একটা ধরিয়ে দিয়ে টানতে বললো । আমি কাশছি । বাথরুমে দরজা দিয়ে ভেতর থেকে বললো তুই টানতে থাক, আমি একটা ম্যাজিক করছি দেখ...কি সব বেরোচ্ছে গা কাঁপিয়ে, আমি জানতামই না, জোরে জোরে টেনে সিগারেটটা ফুরিয়ে ফেললাম । জীবনের সেই প্রথম স্বমেহনের কাল শুরু হল হাইস্কুল থেকে । আর নীল বাক্সের স্টার সিগারেট । আজ তাপু দা কোথায় জানি না , সবিতাকে হারিয়েছি কবেই..." । বায়োগ্রাফি বেশ কিছু পড়েছি । সেসবই গতানুগতিক আমি এই পৃথিবীতে এলিয়নরকম শ্রেষ্ঠতম টাইপ । ' হারাতে হারাতে একা'র জোয়ার আমার চিন্তা চেতনার সমস্ত ঢাকা চাপা ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল । ব্রহ্ম আলোচনা সভায় নগ্ন দেহ পুলস্ত , ক্রতু ইত্যাদি ব্রহ্মর্ষীদের সামনে আলোচনা রত নগ্না ব্রহ্মর্ষিকা গার্গী ঘোষা অপালা মৈত্রেয়ীদের মতোই একজন হয়ে প্রত্যক্ষ করছি বারীন আত্মকথনে যা যা বলে চলেছেন । কোথায় গেল লজ্জা ঘৃণা ভয় ! কে নিয়ে এলো আমাকে এই ঋষিকাদের পাশে ! নোংরা ভাষা কোনটা ! খিস্তি কোনটা eternal consciousness এ ! এই তাহলে লেখকদের ব্রহ্মার মতো নিস্পৃহ দ্রষ্টা থেকে স্রষ্টা হয়ে ওঠা ! পাহাড় খুঁজে দেখতে গিয়ে দেখলাম রামধনু পাহাড় । পাশাপাশি বারীন দা আর তাঁর অনুভবলেখর রঙিলা বিচ্ছুরণ । লিখলাম ' একলা অথবা হাতে হাত রেখেছে যারা ' । বারীন দা পুবে যেতে ডাকলেন আমাকে ।
2017 বইমেলায় ঐহিক প্রকাশ করলো বারীন দার জিন্দাবাদ খালকো গল্পবইটির পরিবর্ধিত নতুন ও তৃতীয় সংস্করণ । প্রতিটি গল্পের কাহিনী চরিত্র প্লট এত নিশ্ছিদ্র বুনন যেখানে অপেক্ষা থাকে জার্কটা শুরুতে মাঝখানে শেষে যেখানেই থাক , কখন কীভাবে এসে পাঠককে টেনে নিয়ে যাবে বিস্ময়ভরা আগামীর দিকে । Story telling technique অসামান্য । অক্ষরে অক্ষরে অনন্য অনুভবের সমাবেশে ব্রিলিয়ান্ট এক একটা সার্কিট ডায়াগ্রাম মনে হয়েছে আমার । পেশাগত জীবনে ইঞ্জিনিয়ার বারীন দা সাহিত্যের এত গভীরে গোপনে ডুবেছেন তাঁর সঙ্গ যে না পেয়েছে তাঁর বইগুলি না পড়েছে তার পক্ষে অনন্ত উড়াল দেওয়া সম্ভব নয় ।
জিন্দাবাদ খালকো গল্প বইটির উৎসর্গপত্রে রয়েছে আমারও নাম ।

তবু মনে রেখো উপহার দিয়ে গেলে বারীন দা ! যাবো বলেও যাওয়া হয়নি তোমার কাছে । এসব ভেবে যখন কান্না জমে পাথর..পুব আর ফুরোয় না থেকে তোমার হাত সেই পাথর গলিয়ে নদীতে ভাসান দেয় । এক নৌকা আয়ন শব্দ , মুখস্ত ডালিম , লু আর তুমি আমি...

হ্যাঁ ? কি বলছো ? এভাবে ফিঁৎ ফিঁৎ করতে না ? জানি তো আমাদের মাঝেই আছো । কলেজের ছাত্র সঙ্গীত হিসেবে রামপ্রসাদী সুরে দাদরা ঠেকায় তোমার কবিতার মা নিষাদ পড়ে নিতে বলছো ? আচ্ছা, ভালো থেকো...।