আমাদের বারীন দা

বিশ্বজিৎ লায়েক



বারীনদার কবিতার ভিতর আমি যতবার ঢুকতে চেয়েছি ততবারই মাছ পাকাল হয়ে গেছে। রাত্রি চরাচর বিস্তৃত হয়ে ছিঁড়ে গেছে ধুধুমার। না, আমি ধরতে পারিনি। কিন্তু এই চেষ্টা কখনও বিরাম নেয়নি। কিন্তু কেন! এই কেন'র উত্তর একমাত্র তিনিই জানেন যিনি তাঁর নক্ষত্রের আলোয় সামান্য হলেও কখনও না কখনও ভিজেছেন। ক্ষণিক হলেই ডুব দিয়ে দেখেছেন সেই অতল জলে যেখানে কবিতা যাপন এক ও একমাত্র পাসওয়ার্ড।
তিনি নশ্বর থেকে অবিনশ্বরে চলে যাবার পর আমার কয়েকজন অতি পরিচিত কবিতা চর্চার মানুষ আমাকে বলেছিল,বারীনদা পড়তে তোর ভাল লাগে! আমি তাদের যে যে ভাবে উত্তর দিতে পারতাম---
এক. হ্যা, ভাল লাগে কিন্তু কেন তোকে তা বলব না।
দুই. না, লাগে না। কারণ বারীন পড়তে যা লাগে তা আমার নেই।
তিন. জ্যোৎস্নার রাত টুকু যদি উপভোগ করতে চাস তাহলে এটা ভাবিস না যে শালা চাঁদের নিজের আলো নেই। আর যদি তা আগেই ভেবে রাখিস তাহলে চন্দ্রালোকিত আলো তোর জন্য নয়। তুই টিউব লাইট জ্বেলে ঘুমিয়ে পড়।
আমি কিন্তু কোনো উত্তরই দিইনি। কেননা পৃথিবীতে এত রকমের মানুষ থাকতে পারে, এত রকমের উদ্ভিদ থাকতে পারে কিন্তু কবিতা থাকবে শুধু আমার মতোই এই বিশ্বাস থেকে যে বেরিয়ে আসতে পারেনি তাকে আর কি বলা যায়!
রাত তার পারদ ছড়িয়ে দিচ্ছে হাড় কাঁপিয়ে সাত অথবা আটে। তিনি প্রায় অটল ঋষি অঢেল পানেও টলেননি এক বিন্দু। শুনছেন আমাদের বহুরৈখিক কালো অক্ষরের মুদ্রিত অমুদ্রিত জলযানের মহারোল। বলছেন, কোথায় কীভাবে লুকিয়ে আছে ক্ষীণ, উজ্জ্বল আলো অথবা সুদীর্ঘ পরমায়ু। মাঝে মাঝে চুপচাপ কোনো কথা নেই। কথা যেন বাহুল্য।
ভোরে উঠে দেখছি সেই তিনিই আবার মশগুল পুরুলিয়ার আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার মানুষটির সঙ্গে। খোঁজ নিচ্ছেন আঞ্চলিক ভাষায় কারা লিখছেন। জেরক্স করে সেই লেখাও পাঠাতে হচ্ছে। গতরাতেই বারীনদা ফোনে বলছেন, বিশু যেভাবে হোক পাঠিয়ে দে।
মেলার মাঠে তিনি ঘুরছেন এক স্টল থেকে আরেক স্টলে। বগল দাবা নতুন বই আর পত্রিকার গন্ধরস চুঁইয়ে পড়ছে এক ও একক মাত্রায়। ফুরোচ্ছে না কিছুই। যেন জন্ম নিচ্ছে আরো নতুন নতুন চরাচর। বিস্তৃত হচ্ছে এক বিন্দু থেকে অপসৃয়মান রঙের দ্যুতি।
পাশে পাশে ঘুরছে নতুন লিখতে আসা কচি কচি দুর্বা ঘাস। তাদের মনে লেগে আছে ভোরের শিশির। তিনি তা মুছে দিচ্ছেন না। লালন করছেন পরম মমতায়। কেজিদরে বেচেও দিচ্ছেন না নবীন কবির ধূসর ম্যাটার। বরং লিখছেন পোষ্টকার্ডে, খামে, ইনবক্সে। কে পাননি সেই অমৃত আখর!
কথা হচ্ছিল আমাদের পুরুলিয়ার একজন অগ্রজ কবির সঙ্গে। বলছিলেন, বারীনদার কবিতা আমার পছন্দ হয় কি না সে একেবারেই অন্য প্রসঙ্গ। আসল হল বাংলা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের যে পথ ও পরিক্রমা সেখানে তিনি উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। যাকে অস্বীকার করতে পারে একমাত্র গণ্ডমূর্খ অথবা গাণ্ডু। আর কবিতা তো এক চলমান বহমান শিল্প। গড়িয়ে যাচ্ছে নিরন্তর মহাকালে। আমরা কী করে বলব কোনটা টিকবে কোনটা টিকবে না, কোনটা জ্বলবে কোনটা নিভে যাবে! জানি না বলেই তো এই যাত্রা পথ আগামীর সম্ভাবনা।
এবারের পুরুলিয়া মেলা ২২ ডিসেম্বর শুরু হবে। ফেসবুকে সেই খবর পোষ্ট হয়েছে। এবারে তিনি লেখেননি বিশু আমার জন্য একটা সিট রাখবি, যাচ্ছি। তিনি কি জানতেন এবারে তিনি তার আগেই অন্য কোথাও অন্য কোনো খানে চলে যাবেন!
আমাদের মন খারাপ। ২০১৪ পর তিনি আর আসেননি। কিন্তু মেলায় তিনি থেকেছেন পরম উষ্ণতায়। এবারেও থাকবেন অন্য মায়ায় অন্য আঙ্গিকে।