‘আলোর ইকো’

সুদীপ চট্টোপাধ্যায়



বারীনদা নেই। গত ২৯-শে অক্টোবর সকালে স্বপনদা ইনবক্স করলেন। কবি স্বপন রায়। আমি তখন বোলপুর শান্তিনিকেতনে। মোবাইল হাতে ধরে বসে রইলাম, কিছুক্ষণের জন্য মাথা শূন্য কোনও কাজ করছে না, মোবাইলস্ক্রিনের আলো যতক্ষণ না নিভে গেল, স্বপনদার পাঠানো দুটো শব্দ, “বারীনদা নেই”, ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। তার আগে শুনেছিলাম বারীনদা ইনটেনসিভ ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে, অবস্থা ভালো নয়। কয়েকমাস আগে ফোনে কথা হয়েছিল, বেশীক্ষণ কথা বলতে পারেননি, খোঁজ নিলেন লেখালেখির, বললেন, শরীর তো ভালো নয়, তাই আর বাঁকুড়া যাওয়া হবে না। তারপরেই কাশতে শুরু করলেন। আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, বারীনদা আর কথা বলতে হবে না, আপনি সুস্থ হোন, পরে কথা হবে। বারীনদার শারিরীক অবস্থা নিয়ে কথা হত সব্যর সাথে, সব্যসাচী হাজরা। এর আগে একবার বারীনদা বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ায় একদিন সব্য কলেজস্ট্রিটে বলেছিল, দেখ সুদীপদা, বারীনদা ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবেন, ওঁর প্রাণশক্তি খুব বেশি। হ্যাঁ, সব্যর কথাই সত্যি হয়েছিল, বারীনদা তার স্বভাবসিদ্ধ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ফিরে এসেছিলেন প্রায় মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে। বারীনদা তো মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারতেন, নুয়ে-পড়া আর্তনাদের সঙ্গে তাঁর কোনও আত্মীয়তা ছিল না।
বাংলা কবিতা জগতের এই সো কলড ভিলেনের সাথে আমার সরাসরি সাক্ষাৎ দু-হাজার ষোলো-তে। তার কবিতা ও গদ্যের সাথে বহু আগে থেকে পরিচয়। পড়েছি ‘মায়াবী সীসুম’, ‘হাশিস তরণী’, ‘মায়াবী হাশিস’-এর মতো কবিতার বই, পড়েছি মাটাম ও উদোমডাঙা-র মতো উপন্যাস এবং অবশ্যই অতিচেতনার কথা। শেষোক্ত প্রবন্ধের বইটি আমার এক বন্ধু পড়তে নিয়ে আর ফেরত দেয়নি, সোজা চলে যায় ত্রিপুরায় তার দেশের বাড়ি, আমার সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করে, শুধু একটা বইয়ের জন্য। এবং প্রকৃতভাবে আমিও বেশ কিছুদিন নিজেকে অনাথ মনে করেছি শুধুমাত্র একটা বইয়ের অভাবে। এই বইটি নিয়ে প্রথমদিকে আমার ছিল অনেক অভিযোগ, যেমন প্রবন্ধের বাক্যগঠন এত ইনকমপ্লিট হবে কেন! উপন্যাসের ক্ষেত্রে তা একটা বৈশিষ্ট্য হতে পারে, কবিতার ক্ষেত্রে তো অন্যতম প্রধান শর্তই অসম্পূর্ণতা, কিন্তু প্রবন্ধে তো সিনট্যাক্সের কারিকুরি বড় কথা নয়, বরং ভাষার খোলস থেকে বেরিয়ে পাঠকের সঙ্গে কতখানি কমিউনিকেট করা গেল তত্ত্ব ও তথ্যের মাধ্যমে, পাঠক কতটা ধরতে পারলেন প্রাবন্ধিকের চিন্তাতরঙ্গ— তাই তো প্রধান হওয়া উচিত। এই বইয়ের একটি পরিচ্ছেদ যেখানে আছে ছাব্বিশদফা প্রতারণার কথা, তা নিয়েও ছিল আমার বিস্তর অভিযোগ। মনে হয়েছিল স্ববিরোধী বক্তব্যে ভরা। পরবর্তীকালে বুঝেছি পাঠককেও দীক্ষিত হতে হয়, যে কোনও কলমকেই সে অনায়াসে জয় করতে পারবে, অনুশীলনহীন সে পেয়ে যাবে যে কোনও চিন্তকের দরজার গোপন চাবিকাঠি, তা তো হতে পারে না।
কলকাতা লিটিলম্যাগাজিন মেলায় তরুণ কবি পরিবেষ্টিত তাঁকে দেখেছি, দেখেছি কলকাতা বইমেলায় কৌরবের স্টলে সহাস্য আলাপরত। কিন্তু কখনওই তাঁর কাছে যাইনি এক ভয়মিশ্রিত সম্ভ্রম থেকে। তাঁর কবিতা নিয়ে, গদ্য নিয়ে কল্পনায় অনেক তর্ক করেছি তাঁর সঙ্গে। তবে বাংলা সাহিত্যে তাঁর যে একটি স্বতন্ত্র স্থান আছে, আছে বৌদ্ধিক অধিকার—তাঁকে প্রথম পাঠেই আমার মনে হয়েছিল। এ হেন একজন মানুষের সাথে আমার সরাসরি সাক্ষাৎ দুহাজার ষোলোর অগাস্ট মাসে ভালো পাহাড়ে, তাঁরই আমন্ত্রণে। গতবছর কলকাতা লিটিল ম্যাগাজিন মেলা এবং কলকাতা বইমেলায় পরপর আমার দুটি কবিতার বই যথাক্রমে ‘আলফাটোন’(চৌষোট্টি পাতার) এবং ‘মুজরিমপুর’(ষোলো পাতার)প্রকাশিত হয়। এই দুটি বই আমি বারীনদার ঠিকানায় পাঠাই এবং কিছুদিনের মধ্যে তিনি ওই দুটি বই পড়ে একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া আমাকে ফেসবুকে ইনবক্স করেন। মূলত ‘মুজরিমপুর’ পড়ে উনি অত্যন্ত খুশি হন। সেই সংক্ষিপ্ত অথচ আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান পাঠপ্রতিক্রিয়াটি এখানে তুলে দিলাম—
“ মুজরিমপুর
সুদীপ, তোমার দুটো বইয়ের মধ্যে সহজতর ভেবে এই চ্যাটবুকটা প্রথমে খুললাম। খুলে চোখ বোলাতে গিয়ে দেখি এ তো মহাদেশ। চোখের ভ্রমণ শেষই হচ্ছে না। এতদিন তো বসে ছিলাম তোমারই কবিতার জন্য। এই হল নতুন কবিতা, যাতে মূলধারা কবিতার গন্ধমাত্র নেই‘...দ্রাঘিমা ঘুমিয়ে গেলে তুমিও কি জলবায়ু ... তারপর শীত আসে আকার জাগিয়ে ... বন্ধু নেই একলা খেলার মাঠে’ --- সিন্ট্যাক্স আর সেমান্টিক্স প্রতিস্থাপনের যে নির্মিতি তুমি আয়ত্ব করেছো তাতে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। কী অসাধারণ কবিতার এই পংক্তিগুলো --- ‘ধ্বনি কাঁপে – এটুকু কসুর /নাদান হরফ ভেবে ঘাতক হয়েছি’ --- ‘দেলকেতাব’, ‘আকাশবৃত্তি’, ‘লেখাজীবী’, ‘আড়ালপ্রহার’, ‘গণিতগাছ’, ‘পুষ্পআঁধার’ --- এই সব শব্দবন্ধ অবাক করে। ‘... মৃদুল মৃদুল – এমন ধ্বনির কাছে লিরিকপুকুর’ --- । এসব ট্রিগার করে আমাকে, জানো সুদীপ, মনে হয় তুমি আমার কবিতাটাই লিখছো। আমার কি মজা ! এবার আর কবিতা না লিখলেও চলে। যদি তুমি তোমার কবিতাগুলি আমাকে পড়াতে থাকো তাহলে কৃতজ্ঞ থাকি। আহাহা ‘... বুকের যুবতি খুলে ঘুম দেখে পুরোনো বকুল’ --- ‘আহা পতন। তোমার পুরোনো নাম পকেটে রেখেছি’ --- ‘আশ্চর্য ভ্রমণ ফুটেছে’। ...'মেলে রাখা শীতের আকার’ --- এইসব বীজ ছড়িয়ে রেখেছো কবিতার। সুদীপ, তোমাকে আমি আগে জানিনি কেন ?
তুলনায় আলফাটোন বাকমুক্ত কবিতার এরেনা। এতে আছে বাক্যের প্রসার। “কথা-কবিতা”র ধরণে। উচ্চারণ সুললিত করার জন্য লিরিকের উপযুক্ত ব্যবহার করেছো। বিষয়বস্তু গড়ে উঠেছে মনোলগে, ডায়ালগে, মুজরিমপুরে যে নির্মাণ ছিল তা যেন খুলে ফেলা হয়েছে, তরলতর হয়েছে। পড়তে ভাল লেগেছে এই কবিতাগুলো --- ধৈবত, ত্রিপিটক, ছায়াছবি, মনসুন, দাওয়াত, কমফোর্ট জোন, ইত্যাদি।
তবে আমার পছন্দ মুজরিমপুর। তোমার পছন্দও তাই। দুটো বইয়ের কবিতাগুলো আলাদা করার যে ভাবনা তোমার, আমিও সহমত। তুমি সুদীপ মন্ডলকে চেনো দেখলাম। বাঁকুড়ার কোথায় তোমার বাড়ি ? ১৯-২০-২১-২২ আগস্ট ভালোপাহাড়ে কবিতার ক্যাম্প হবে। অনিন্দ্য, কৃষ্ণেন্দু পাত্র, সুপ্রকাশ দাস --- এদের জিজ্ঞাসা কোরো। ওরা এসেছিল। আমি চাই তুমিও আসো। ভাল লাগবে আমাদের।
আমার শুভেচ্ছা জেনো। সৃজনে থাকো।
বারীনদা।”
এরপর ফেসবুক মেসেনজারে তাঁর সাথে চলত টুকরো টুকরো কথা। অবশেষে সাক্ষাৎ হল ভালোপাহাড়ে। বাঁকুড়া থেকে বাইকে করে আমি আর শমীক ষাণ্ণিগ্রাহী পৌঁছলাম ভালো পাহাড়। বারীনদার নেতৃত্বে চলল কবিতা পাঠ। শুনলেন আমার কবিতা ভাবনা। অসীম স্নেহে হাতে তুলে দিলেন তাঁর কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ, তার মধ্যে অন্যতম ‘পুব আর ফুরোয় না’। প্রথম পাতায় লিখে দিলেন, ‘সুদীপকে বলি পুবে চলো দেখি আমার সাথে’।
বারীনদার কবিতা নিয়ে, তার পুবের পথ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে অপরাপর কবিদের মধ্যে, আছে ভিন্ন মত। সে তো থাকাই স্বাভাবিক, এভাবেই তো ত্বরান্বিত হয় কবিতার জগৎ। কমলকুমার মজুমদার একদা বলেছিলেন, যে লেখক ভাষাকে আক্রমণ করেন, তিনিই সেই ভাষাকে বাঁচান। বারীনদাও প্রথাগত স্রোতহীন কবিতাকে ঠিক সেইভাবেই আক্রমণ করতে চেয়েছিলেন। নবীনতা প্রদানের লক্ষ্যে। এই সামান্য একবছরের আলাপে বারীনদাকে আমার একজন আপাদমস্তক কবি বলে মনে হয়েছে। তাঁর আক্ষেপ ছিল, আমাকে তিনি আগে জানেনি কেন। আমারও আক্ষেপ রয়ে গেল তাঁর সঙ্গে যদি আরও আগে আলাপ হত, তাঁর গভীর মননের সঙ্গে যদি সরাসরি পরিচয় হত লেখালেখির প্রথম দিনগুলোতে, তাহলে হয়তো আমার ভাবনায় যোগ হত আরও অনেক রঙের তরঙ্গ।