ম্যাপ , ভুলভুলাইয়া ও স্বাধীনতা

মিলন চট্টোপাধ্যায়

ভুল । এই ভুল নিয়ে বিস্তর কথা হয়েছে সাহিত্যের পাতায় । কবিতায় - ' অধরে অধর রাখি' থেকে শুরু করে অতল জলের আহ্বান , পটলচেরা চোখ - নানান রকম ।জল অতল হয়এসব ভুলের ব্যাখ্যা দিয়ে লেখাটাকে কেজো লেখা করতে চাইনা । জীবনে কি কি ভুল করেছি, কে ব্যবহার করেছে সে ভুলের সুযোগে -- সেসব লেখার মত ' হরিদাস পাল ' - ও হইনি এখনও । বরং এমন এক ভুলকে তুলে ধরা যাক যা বিশ্বে আর একটিও আছে কিনা জানা নেই । এটাকে ইতিহাসের ,
না ভূগোলের নাকি বোঝার - কোন্‌ তালিকায় রাখা উচিত সেটা না হয় আপনারাই ঠিক করবেন ।


আজ থেকে প্রায় ২৫৭ বছর আগে আমাদের দেশ আমরাই চালাতাম । হ্যাঁ, হয়তো সেই অর্থে আমরা চালাতাম ,
এ কথাটাও ভুল কারণ বেশীরভাগ সময়েই বহিরাগত শক্তিই চালনা করেছে আমাদের । কিতু তবুও যারা এসেছেন তারা দেশটাকে আপন করেই চালাতে চেয়েছেন । মাঝে মাঝে কিছু আক্রমণ হয়েছে , লুণ্ঠন হয়েছে তবে সে সব বেশিদিনের জন্য না । আমাদের স্বাধীনতা সূর্য অস্ত যায় ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের ২৩ শে জুন পলাশীর মাঠে ইংরেজদের কাছে সিরাজের হারের সঙ্গে সঙ্গে । আশ্চর্যের ব্যাপার , নদীয়ার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র এই যুদ্ধে ইংরেজ পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন বলে কথিত আছে ! এরপর থেকেই শুরু হয় অন্ধকারের ইতিহাস ।

এর প্রায় একশো বছর পর ১৮৫৪ সালে চালু হয় নদীয়া বিভাগ । যার প্রধান কার্যালয় হয় কৃষ্ণনগর । কিন্তু কমিশনার কৃষ্ণনগরে না থাকতে চাননি ফলে নদীয়া বিভাগের প্রধান কার্যালয় সরানো হয় আলিপুরে । এর মধ্যে চূর্ণী দিয়ে বয়ে যায় সময়ের স্রোত ।

এরপর শুরু হয় স্বাধীনতার জন্য লড়াই আর আত্মত্যাগের দিন । দিনের পর দিন লড়াই , ক্রমাগত রক্তপাত । ১৯৪৪ সালের ২৭ শে জুলাই মহাত্মা গান্ধী তৎকালীন বড়লাট ওয়াভেলকে চিঠিতে জানান তারা সরকারকে সাহায্য করবেন যদি যুদ্ধের শেষে ভারতকে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় । ততদিনে যুদ্ধের গতি নির্ধারিত হয়ে গেছে , ফলে গান্ধীর চিঠি গুরুত্ব হারায় ।এর ভিতরেই ১৯৪২ সালের ২০ শে আগস্ট মুসলিম লীগ সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের কাছে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের আবেদন করেছিল । যাকে সমর্থণ করেছিলেন গান্ধী তথা কংগ্রেস !

নিশ্চিত পূর্ণ স্বাধীনতাকে খণ্ডিত করার জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটেলি ১৯৪৬ সালের ২ রা সেপ্টেম্বর লর্ড ওয়াভেলের মাধ্যমে জওহরলালকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী করা হয় । এরপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ভিতরেই আসে সেই মহার্ঘ্য দিনের ঘোষণা । ১৯৪৭ সালের ১৪ ই আগস্ট বিকেলে কৃষ্ণনগর কলেজস্টিটের জেলা কংগ্রেস কার্যালয়ের এক সভায় স্বাধীনতা দিবস কীভাবে পালন করা হবে তা স্থির করা হয় ।


এমন সময় সন্ধ্যার রেডিওবার্তায় ঘোষণা করা হয় নদিয়া , ২৪ পরগনা , মালদা ,মুর্শিদাবাদ চূড়ান্ত ঘোষণা সাপেক্ষে পাকিস্থানের অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং খুলনা অস্থায়ীভাবে ভারতের মধ্যে থাকবে । এরপরই ১৫ ই আগস্ট নদীয়া জেলায় পাকিস্থান দিবস পালনের তোড়জোড় শুরু হয় । কৃষ্ণনগর শহরে তারকদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে পাকিস্থানের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করানো হয় এবং চাকদহের পৌরসভায় পৌরপিতা কমল ভট্টাচার্য পতাকা না তোলায় সহপৌরপিতা কাজী আবুতইয়ব সালেহ পাকিস্থানের পতাকা তোলেন । এরফলে দেশ জুড়ে দেখা দেয় প্রচণ্ড বিতর্ক । শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ,লক্মীকান্ত মৈত্র সহ নেতৃবৃন্দের চাপে অবিভক্ত নদীয়া জেলার তিনটি মহকুমা - কুষ্টিয়া ,মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা , পূর্ব পাকিস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং বাকি দুটি মহকুমা -- কৃষ্ণনগর ও রাণাঘাট প্রথমে 'নবদ্বীপ জেলা' নামে ভারতের সাথে যুক্ত হয় । এই অন্তর্ভুক্তিতে তিনদিন সময় লাগায় ১৮ই আগস্ট সোমবার নবদ্বীপ তথা নদীয়া স্বাধীন ভারতের মানচিত্রে স্থান পায় ।

১৫ থেকে ১৮ ই আগস্ট মাত্র তিনটি দিন আর তাতেই নদীয়া জেলার দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘ হয় । যারা চেয়েছিলেন ভারতে থাকতে তাদের ঠাঁই হয় পাকিস্থানে ।


শুধু নদীয়াই নয় দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বনগাঁও ম্যাপের ভুলে পাকিস্থানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছিল । শুরু হয়েছিল সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস ও ' খেদাও অভিযান ' । যদিও ১৭ই আগস্ট রেডিওবার্তায় বনগাঁর মানুষ জানতে পারেন এটা ম্যাপের ভুল । ১৮ই আগস্ট বনগাঁয় পতপত করে ওড়ানো হয় স্বাধীন ভারতের তেরঙ্গা পতাকা । সেই থেকেই বনগাঁর স্বাধীনতা পালিত হয় ১৮ ই আগস্ট। এখনও বনগাঁর আইনজীবীরা এই দিনটি মহাসমারোহে
পালন করেন ।


ইতিহাস বলে ভুলটা ছিল র্যা ডক্লিফের ম্যাপে , তিনিই তৈরি করেন খণ্ডিত ভারতের প্রথম মানচিত্র । আর তাতেই রাণাঘাট ও বনগাঁ মহকুমা চলে যায় পাকিস্থানে !
আজও ১৮ই আগস্ট নদীয়ার রাণাঘাট ও কৃষ্ণনগরে পালিত হয় স্বাধীনতা দিবস ।

ভুলের এমন ভুলভুলাইয়া আর কোনো দেশে আছে কিনা জানা নেই । ভুলের যে বাতাস এই তিনটি দিনে বয়ে গেছিল রাণাঘাট ও বনগাঁ মহকুমার ওপর দিয়ে তারফলে বড় অঘটন ঘটতেই পারতো , নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারতো কিছু অমূল্য প্রাণ । প্রবীণ নাগরিকরা বলেন রাণাঘাটের যে অংশে আজ বেশি ধূমধাম সেখানেই সৃষ্টি হয়েছিল দাঙ্গার পরিবেশ ।

ইতিহাসকে অগ্রাহ্য করা উচিৎ না হলেও বৃহত্তর স্বার্থে ও সম্প্রীতির লক্ষ্যে একটি দেশেই দুটি স্বাধীনতা দিবস পালন করা কি উচিৎ ?

ঠিক না ভুল -- এর উত্তর পাঠকের জন্যই ছেড়ে রাখলাম ।




তথ্যসূত্র : -

রাণাঘাটের সেকাল একাল
বিপ্লবী যুগান্তরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম
নদিয়া স্বাধীনতার সংখ্যা
১৮ই আগস্ট নদিয়ার স্বাধীনতা ।