পৌঁছে একটা ফোন ক’রো

ইন্দ্রনীল ঘোষ



যেটা সবচেয়ে অবাক লাগত, মানুষটার গ্রহণ করার ক্ষমতা। নিজের কাজ, ভাবনা, সে সংক্রান্ত নিজস্ব মতামত তো ছিলই, কিন্তু অন্যের সাথে মেশার সময় সেসব বাধা হয়ে উঠত না। কোনও দল বা মত বারীনদা চিনতো না, যখন মানুষের প্রশ্ন উঠত।
আমি ভাবতাম, কখনও বা একটু বেশি উদ্ধত হয়ে বলেই ফেলতাম, “ও তো লিখতেই পারে না, অত পাত্তা দাও কেন?”
হয়ত কিছুক্ষণ স্থিরভাবে চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল – “লেখা বলতে তুই কী বুঝিস? তোর বোঝাটাই ওকে লিখতে হবে এমন কে বলেছে? সব রকম কবিতারই পাঠক আছে।”
– ওর কবিতার তুমি পাঠক?
– আমি তো সবার কবিতাই পড়ি।
কথার এই টেবিল-টেনিসে এবার বিরক্ত আমি হয়ত বললাম, – কি মুশকিল! যেটা বলছি বুঝতে পারছ তো!
– পারছি। দেখ ওকে আমি পছন্দ করি কবি হিসাবে নয়। মানুষ হিসাবে। ওর অনেক গুণ আছে যা খুব কম মানুষেই পাওয়া যায়।
এরপর বারীনদা একটা গুণের লিস্ট শুরু করবে... আর আমি চোখ মারতে থাকব থেমে যাওয়া মদের বোতলকে।

এই জায়গাটা বারবার আমায় ভাবিয়েছে। কারণ, আমার অবস্থান ছিল, ঠিক এর উলটো, বিশ্বাস করতাম তীক্ষ্ণ তুখোড় মেধায়। ভালো মানুষ – ঠিকাছে... কিন্তু ভালো কবি না হলে আমার কী কাজের? এ’ নিয়ে বহুবার তর্কও করেছি। বারীনদা বলত, - “দেখ মানুষকে ভালো না বাসতে পারলে, মিশে যেতে না পারলে; প্রতিভা মেধা বুদ্ধি এগুলোর অহংকার বাড়তে বাড়তে একসময় লোককে একা আর সিনিক ক’রে তোলে।” তখন কথাগুলো মানতে চাইতাম না। এখন উদাহরণ দেখতে পাই দিকে দিকে। মনে পড়ে, একবার বলছে, “তোর প্রতিপক্ষ কে? অন্য কেউ তোর প্রতিপক্ষ কেন হতে যাবে? সে তো তুই নিজেই। নিজেকে হারানোর চেষ্টা কর। তাহলেই সত্যিকার উত্তরণ হবে। গতকালকে হারিয়ে আজকের দিনটা বানা।”

এভাবেই সান্ধ্য আসরগুলো প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে নানা তর্ক আর আড্ডার মধ্যে দিয়ে কেটে যেত। প্রায় ষোল বছরের পরিচিতি। তার মধ্যে একই শহরে মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্বে থাকা... তাও প্রায় বারো বছর। এমন আড্ডা সত্যি খুব কম মনে পড়ে, যেদিন কোনও না কোনও বিষয় নিয়ে তর্ক করিনি। কারণ সেটা বারীনদার সাথে করা যেত। এত উদার, অন্যের মতামতকে মানা বা না মানার বাইরে একটা স্পেস দিয়ে কথা বলার মানুষ খুব কমই হয়। বিরুদ্ধ মতের জন্য রাগ করা তো দূরের কথা, নীরেন্দ্রনাথের লাইন কোট ক’রে বলত – “বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখ দ্বিতীয় বিদ্যায়।”

একটা ঘটনার কথা মনে প’ড়ে গেল। তখন ‘নতুন কবিতা’-র বিরুদ্ধে একটা গেরিলা হানার মতো জিনিষ শুরু হয়ে গেছে। যার কিছুটা রেশ এখনও দেখা যায়। যে কোনও সাহিত্য-আন্দোলনের সমালোচনা/বিরোধিতা শেষ অবদি সাহিত্যেরই অঙ্গ, তাই তার মধ্যে সেই সৌজন্যতাটুকু বজায় থাকলেই সমস্যা হয় না। যাই হোক যেটা বলছিলাম। একবার এক সিনিয়র দাদা, আমাকে তাঁর বাড়িতে ডাকলেন, চায়ের নেমন্তন্ন খাওয়াবেন। তো গেলাম। চায়ের সাথে সিঙাড়া নিমকি বাদেও তিনি বেশ মুখরোচক বারীন-বিরোধী কথা জমিয়ে রেখেছিলেন। আমিও উৎসাহী – সমালোচনা সব সময়ই খোলা মনে শুনতে হয়। হোক।
তো তিনি ব’লে চললেন,
– দেখ, বারীন বাঙলা ভাষার সর্বনাশ করেছে।
– কীরকম?
– বহু তরুণ কবিকে ভুল পথে চালিত করেছে।
– কীভাবে?
– এই নতুন কবিতার কথা ব’লে। এইসব লিখতে ব’লে।
আমার মনে পড়ছিল ২০০৫-এর আরেক সান্ধ্য আড্ডার কথা। তখনও আমার প্রথম বই ‘রাত্রে ডেকো না, প্লিজ’ বের হয়নি। বারীনদার টেবিলে কবিতা পড়ছিলাম। শোনার পর বলল, “তুই নতুন কবিতা লিখিস না ইন্দ্র, জানিস তো?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, জানি। কেন বলো তো?”
“লিখতে ইচ্ছা করে না?”
বলেছিলাম, “না। করে না। অন্যরকম কবিতা লিখতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কী আমার লেখায় থাকবে বা না থাকবে সেটা আমিই আমার প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিক করব। ওভাবে প্রিফিক্সড ওয়েতে লিখব না।”
বারীনদা হেসে বলেছিল, “আচ্ছা বেশ। তবে লেখাগুলো খুব ভালো হয়েছে।”
“রাত্রে ডেকো না...”-র সমালোচনা করতে গিয়েও এ’কথা বারীনদা লিখেছে। তারপরও সেই মানুষটার সাথে বারো বছর অসাধারণ আড্ডা, অনুভূতি বিনিময়। “নতুন কবিতা কেন লিখিস না, সম্পর্ক রাখব না” এ-হেন ছেলেমানুষি বাইনারির মানুষ বারীন ঘোষাল ছিলেন না।
তো চায়ের আসরে সেই অদ্ভুত অভিযোগ ও অভিসন্ধিমূলক কথাগুলো শুনতে শুনতে আমি বিরক্ত হলাম।
– বারীনদা তরুণদের ভুল পথে চালিত করেছে? তোমায় তরুণরা এসে এসব বলেওছে?
– হ্যাঁ। ওই যো নতুন কবিতার কথা ব’লে... অনেক তরুণই বলেছে।
– একটা জিনিষ বলো তো, বারীনদা কি বন্দুক ধ’রে কাউকে বলেছিল, তোমায় নতুন কবিতাই লিখতে হবে? বলেনি তো। কোনও কবিকে ভুল পথে চালিত করার অন্য কোনও কবি কে? যে মনে করে সে বারীনদার কথায় ভুল পথে চালিত হয়েছে, তার তো নিজস্ব কবিতা বোধ, নিজের ওপর, নিজের লেখার ওপর বিশ্বাসটুকুই তৈরি হয়নি; সে লিখতে এসেছে কেন?

সে’ রাত্রে বারীনদাকে যখন এই গল্প বলছিলাম, সে খালি হেসেই মাতোয়ারা। আর মদ…
এক মদ থেকে অন্য মদে – কয়েক সহস্র মদে যাতায়াত করত সে’ সব আড্ডার সন্ধেগুলো। অনেক রাতে – মদ্যপ – বাইক চালিয়ে বাড়ি ফিরতাম। বারীনদা গেট অবদি এসে দাঁড়িয়ে থাকত। বলত, “পৌঁছে একটা ফোন করিস...”
আর আমি প্রতিবার যথারীতি ফোন করতে ভুলে যেতাম। পরের বার গেল অভিমান ক’রে উঠত,
– এই হলো তোদের শূন্যদশক। অন্যের কথা খেয়ালও রাখিস না।
হাসতে হাসতে বলতাম – কী করব বলো, সত্তরের মূল্যবোধ ব’লে ব্যাপার। সহজে পাওয়া যায়!