সবুজ দ্বীপের রাজা

দেবাদৃতা বসু



পাহাড়ি পথে যেমন হয়, প্রত্যেক বাঁক একরকম, আবার সব আলাদা আলাদা। জিপ গাড়ির সরু হয়ে পরা হেডলাইট। ওই ডেপথ বরাবর যা কিছু দৃশ্যমান। যত এগোই নতুন পথ আবিষ্কৃত হয়। এমনিতে সব সমান, একদিকে ফার্ন, বার্চ, পাইনের জঙ্গল। অপরদিকে খাদ। একটা পাথর হঠাৎ ডিসলোকেট হতে পারে। ওই ধুলো হলুদের মধ্যে থেকে একটা শব্দ থেকে যায়, যতক্ষণ না নতুন শব্দ তাকে ডিসলোকেট করছে। তাই, প্রত্যেকটা পথ যেমন আবিস্কার, প্রত্যেক বাঁকের ওপারে যা আছে তাই কবিতা। আলোর গন্তব্য বাড়িয়ে বাড়িয়ে তাকে টের পাওয়া যায়।
আমার লেখালিখির একদম শুরুর দিকে ‘অতিচেতনার কথা’ বইটা হাতে তুলে দেয় এক বন্ধু। তারপর অনেক বছর পর কফি হাউসে আলাপ। আমি পাব্লিক ফিগারদের থেকে দুরেই থাকি, ভিড়ে আলাদা। তাই টেনে নিয়ে গিয়ে আলাপ না করালে, সেটা আর হতই না। ভালোই হয়েছিল। তখন বুঝিনি যে আমাকে বলেছিল, ‘কবিতা লিখিস?’ তার সাথে কত কবিতা সন্ধা কাটবে। মেলায়, মাঠে কখনো কখনো তারপর কথা হলেও সে নিতান্তই কুশল বিনিময়।
প্রথমবার জামশেদপুর গিয়ে অনেক রাত অবধি আড্ডা। সেবার প্রথম। সেবার ইন্দ্রনীলের বাড়ি। আলাপ হচ্ছে অস্তনির্জন দত্ত’র সাথে। অর্জুন কবিতা পড়ছে। প্ল্যান করছি, কাল তাহলে বারীনা দা’র বাড়ি যাব সকালে শুঁটকি মাছ রান্না করে নিয়ে। দুপুর রোদে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে উপস্থিত হলাম। আগে তো শুধুই কুশল বিনিময়। কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে ওঠা মাত্র যেন কবেকার চেনা। জড়িয়ে ধরল বুড়ো। তারপর পাঁচ মিনিটের মধ্যে গড়গড় করে বলে দিলো জামশেদপুরে কী কী দেখার আছে। তারপর আবার সন্ধেতে। ইতিমধ্যে বারীন দার প্রচুর গল্প আমি শুনে ফেলেছি। গল্পের চাক্ষুস হল রয়েলি। তারপর তো বহুবার। নিয়ম একটাই। কবিতা পড়ার আগে চোখ নরম করতে হবে। রাত হলে কখনও ইন্দ্রর বাড়ি ফিরে যাওয়া কখনো ওই ছোট্ট ঘরে শোয়ার ব্যাবস্থা। সকাল হলে বাজার যাওয়া, রান্নার তোড়জোড়। আমাকে তো প্রমান করতেই হবে, আমি কবিতা লেখা এখনো শিখছি সবে, কিন্তু রান্না যে আমার জন্য রয়েল এক চ্যালেঞ্জ। আমি হার মানি না। জামশেদপুর আমার কখন যে সেকেন্ড হোম হয়ে উঠল এভাবে। ওই ছাদ ঘেঁষা ঘর আমার কাছে নতুন একটা দ্বীপের মত। সবুজ, জ্যান্ত।
বারীন দা কে যতটা যেভাবে দেখেছি, তা লেখার মত জোর আমার কলমে নেই।একজন রাজার মেজাজের মানুষ । সে ও কিন্তু মিষ্টি বিস্কুট দিয়ে মদ খায় । আমাকে বারীন দা অনেকবার বলত, কিল মেমোরির কথা। কিন্তু এই যে এত মেমোরিকে আমি কিল করতে পারছি না, তার দায় আমার যতটা, তারও ততটাই। ইচ্ছা হলেই গাল টিপে আমি আদর করতাম। কিছুদিন আগে, তখন শরীর খারাপ। আমি ফেসবুকে জানতে চাইছি, কি খেলে? ওষুধ খেয়েছ? ইত্যাদি। আমাকে বলল, ‘তুই কি বাচ্চা ছেলের সাথে কথা বলছিস?’, আমি চুপ করে গেলাম। খানিক পরেই নিজে মেসেজ করল। ‘কিছু মনে করিস না রাই, ভালবাসিস’। এরপর তো কখনই মেমোরিকে কিল করতে না পারার দায় আমার একার ওপর বর্তায় না। কারন বারীন আমার অভিভাবক না, আমার বন্ধু। যাকে বইমেলায় ছুটে গিয়ে কানে কানে বলা যায়, ‘দেখো, ওই মেয়েটাকে আমার পছন্দ’ এবং বন্ধু বলেই সে বারবার উল্টোদিকের স্টলে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে আঙুল তুলে দেখায়, ‘কে, ওইটা?’, তারপর স্কুল পালানো দুষ্টু ছেলের মত হাসে। বন্ধু বলেই আমার বাবা যখন হাসপাতালে। আমি ঢুকতে পারছি না, ছেলেদের ওয়ার্ডের বাইরে ছটফট করছি, তখন দেখতে পাই, সামনের রাস্তায় ট্যাক্সি থেকে নামছে সউমিত্র দা, স্বপন না আর বারীন না। আর বন্ধু বলেই তো মেমোরিকে আঁকড়ে থাকি, হাতড়াই। কখন কোথায় কি কবিতা লুকিয়ে থাকে।