‘কী ছবি দেখছ, কত পাতায়?’

অনির্বাণ ভট্টাচার্য



ওমা, দেখো এখনো কি টাটকা। দাদুর সঙ্গে জামালপুর পাহাড়ে হাঁটছি। কালি পাহাড়ি...। কিংবা মুঙ্গেরের কেল্লায়। পীর শাহ নুফার সমাধি, কষ্টহারিণী ঘাট, গঙ্গা ...। ওখানে খুব খিদে হয় জানো। আর তখনো অত তো লোক ছিল না। আর খুব হিম পড়ত। পাহাড়টা শেষ হচ্ছে না। দাদু হাঁফাচ্ছেনা, আমিই শুধু...। খুব দূরে একটা পাখি ডেকে যাচ্ছে। যার নাম, ঠিকানা, বা ডাকটার প্রণয়ধ্বনির কোনরকম সফটওয়্যার আমি তখনো বানাইনি। এখনো কি...? ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যেত। আকাশের তলায় অচেনা লাগত নিজেদের। ওখানে একটা একা লোক বিড়ি খাচ্ছে এমনিই। যেন ‘হারাতে হারাতে একা’। জোছনা। ‘নীলচাঁদের দিনে অলবিকাশ একলা কী করছে...?’ উপরে তাকিয়ে দেখতাম ‘কলাই করা চাঁদ বিক্রি হচ্ছে খুব’। দুজনেই কেউ কথা বলতাম না। ‘জলের কাছে চুপ, তারার কাছে চুপ’। এখনো আমি ‘নির্জনতা বললে বয়স্কটিকে পছন্দ করি’। সেই মানুষটাই যখন ঘরে ফিরত অন্য লোক। বাজার, টাকাপয়সা আর দেওয়াল ঘেঁষে বসে থাকার অদ্ভুত কথাময়তা। স্মৃতি বলতেই এইসব প্রাগৈতিহাসিক মানুষ মানুষীরা ঘিরে ধরে। ঠাকুমার বোনা উল। ক্রুশ। বড় কাঁটা। ছোট কাঁটা। এক একটা ঘড়ি যেন। নিজেদের বয়সের মতো। কোথায় যেন লুকোচ্ছে। ‘একঘর উল্টো আর একঘর সোজা, এত সোজা বোনা, কার মন তোমার সোয়েটারে?’। এই মানুষগুলো যখন ছিল, একটা অহঙ্কারে ছিলাম। আমার ভেতর কিছু তো আছে। বন্ধুদের অনেকের নেই। অনেকের এক এক করে চলে যাচ্ছে। আমার আছে, থাকবে, যাবে না, দেখো ...। তারপর মৃত্যু আসে। বুঝতে পারি, স্ট্রোক মানে কী। কোনটা সেরিব্রাল আর কোনটা হার্টের। অবশ্য অ্যাটাকটা ভেতর থেকেই আসবে। কান্না, মৃত্যু, স্মৃতি, দৃশ্য ...। অথচ আমিই নিপাট বেঁচে আছি, জাস্ট বেঁচে আছি। তবে জীবনবদল করার ইচ্ছে মাঝে মধ্যেই চেপে যে বসে না, তা না। অনেক তো হল, ‘এখন মৃতদেহ জায়গা বদল করার সময়...’। তারা অনেকদিন ঘুমলেন, জাগুন, এসময়ে আমি, আমরা, ঘুমোই। কারণ আমি কোনও কাজেই লাগছিনা। আমার জীবন, পড়াশুনো, অতিচেতনার গল্পগুলো আমার কোনও পাতায় জায়গা পাচ্ছে না। ‘কান্না সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেও, মৃত্যু সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেও, আমার কোনো কাজেই যে লাগছে না এসব’। তখন জুতো লুকোনোর বয়স পেরিয়ে এসছি। ওমা, সেসব কথা বলিনি না? তখন তো একান্নবর্তী। একই মুখ, ঝগড়া, পড়াশুনো, সন্ধের মরবিড আসাযাওয়া। যখন কেউ আসত, আর দুদিন পরেই ...। যাওয়ার সময়ে জুতোগুলো বেছে বেছে লুকোতাম। যেন ‘যেতে বললেই চলে যাই, থাকতে বললেই থাকি’। অবশ্য লাভ হত না কিছু। তবু, চেষ্টাটা, হাত ধরাধরিটার তো কোনও দোষ ছিল না। একদিন এসব হঠাৎ করেই শেষ। নিজেও ঠাণ্ডা হয়ে গেলাম। এখন যেতে বললেও যাই না, থাকতে বললে ঘড়ি দেখি, ক্যালেন্ডারও ...। জানি, বয়স পেরিয়ে, সময় পেরিয়ে যখন একটা ঠাণ্ডা অন্ধকার ঘরে ঘুম ভাঙবে। ‘সুইচ নিভিয়ে একজন জানলার শিক ধরে দাঁড়িয়ে’। অনেকটা ভাস্করবাবুর গলা। শুধু একজন মানুষ, আজ সমস্তরাত, খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকবে। পাশের বাড়ির বিদেহী বউটি অন্ধকারে দেখে শিউরে উঠবে। বেড়ালগুলো খিদের জ্বালায় ডাকতে গিয়েও পালাবে। নির্বাসন, একদিন নয়, দুদিন নয়, হাজার হাজার বছরের নির্বাসন। আর তার ‘দ্বিতীয় দিনেই টের পেলাম চাঁদে বৃষ্টিপাত’। কয়েকটা গিনিপিগ মুখ ভ্যাংচাতে ভ্যাংচাতে লাফিয়ে নামল সামনের বাড়ির পাঁচিল থেকে। পাখিগুলো অদ্ভুতভাবে চুপ। ডেকে ওঠো, প্লিস ডেকে ওঠো। ‘ডেকে ওঠো কফিমোড়, কফিমোড় ...’। অনেক পরে বুঝলাম অন্ধকার দুরকম হয়। একটা, যেটা সুইচ নিভিয়ে দিলে ঘরে জমাট বাঁধে। লোডশেডিং, ‘মনশেডিং...’। আর একটা, যেটা অন্যরকম। যেমন ধরা যাক, একঘর লোকের মাঝে একজন নারী তোমার দিকে চেয়ে। একটি শিশু তোমার হাতের চেয়ে বেশী উষ্ণ আর কাউকে ভাবছে না। একদল বন্ধু তোমার কাঁধের পাশপাশি তৈরি করছে ল্যাম্পশেড। তখনো অন্ধকার নামতে পারে। বুঝেছি, সে অন্ধকার আরো বিপজ্জনক। তখন মারাত্মক একা লাগে। ‘গাছের গোড়ায় জল ঢালবার সময়ে একা, মাটিটা নরম করে দেবার সময়ে বিষণ্ণ...’। বন্ধুহীন। আর বন্ধু বলতেই আমার মনে পড়ে যাবে ‘কারো কারো বন্ধুর নাম বিজন, তবে, বিজনের আলোবাতাসের নামও বিজন’। প্রেম নেই, আলো নেই, জল নেই, বাতাস নেই, আলোবাতাস নেই। ঠিক যেমন ‘টাকাপয়সা নেই, প্রেস নেই, বিজ্ঞাপন নেই, গডফাদার নেই...’। তবু, ‘কৌরব...’। আচ্ছা, বিজনেরও তো এসব নেই? তাহলে আলোবাতাস থাকল কিকরে? বন্ধুকে বিজন বলে ডাকি। প্রেমিকাকেও। ‘বিজনের কলকণ্ঠ শুনতে চেয়ে ফোন করি তোমাকে, তুমি কল খোলো, নদী, জল নেই, রঙ...’। আসলে ‘নেই শেষ কথা নয়। শেষ কথা হল হ্যাঁ’। কিন্তু হ্যাঁ এর বয়স, বা লোকবল কোনটাই তো বেশী না। অবিশ্বাসী চোখমুখ। ধর্ম, সন্দেহ আরও অন্যান্য সেডিশন। অচেনা পাখি ডাকে না, অচেনা জ্বর আসে বছরে একবার করে, নিয়ে চলে যায় ডাকবাক্সের পিওনহাতের মতো...। আর বাকি সময়টা ‘এক ভারতীয় শীত’। ‘কাকে বিশ্বাস করব গো, আলাদা শোভায় দুলদুল করে ধর্মযাজকের গাড়ি আর পাগড়ি’। যৌথবাহিনী, এনকাউন্টার, খতম...। একটা মরে যাওয়া তিতির পাখির দেহ। যার ‘গন্ধে গন্ধে প্রতিগন্ধীরা মানুষমারা জঙ্গলের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে’। যেসময়ে ‘প্রগতি এক মহিষের নাম, রাজার বাগান ভেবে বেড়া ভেঙে খেয়ে গেছে ঘাস...’। প্রতিরোধ নিয়ে কথা বলার জো নেই, চাকরি। শরীর নিয়ে কথা বোলার জো নেই, আগে ছিল বড়রা, এখন সারাক্ষণ সামনে সামনে ছোটরা। আর তাছাড়া ‘শুক্র, ভিনাস বা যৌনতা নিয়ে কথা বললে কানে আসে শোরের বাচ্চা’। তারপর জনান্তিকে বলা, ‘তোমাকে আরো বেশী করে পাই, যাদুঘর ভিজে গেলে ...’। অথচ সবকিছুর পরও শেষ কথা হল হ্যাঁ?’ মরে যাওয়ার শেষ কথা কিভাবে হ্যাঁ হয়? মরণের ওপারে কোথায় থাকে সেই নিরাকার ধ্বনিচেতনা, আছে, সবই আছে ...? পেয়ারাকে কবিফল ডাকতে বড় ইচ্ছে হয় যে। চাইবাসা, চক্রধরপুর, বাঁকুড়া, ভালোপাহাড়, পালামৌ, সিংভূম, জামসেদপুর, তোমার জামসেদপুর ...। সেই যেখানে বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে বৃষ্টি পড়ে। সেই যেখানে ঝর্ণা, রমণী আর তার পুরুষ বন্ধু, যেখানে মহুয়া, অচেনা পাখির ডাক, ‘মুখস্থ ডালিম’, হলুদ শিমূল আর সাদা পলাশ ...। যেখানে পুব আর ফুরোবে না। যেখানে হাশিশ তরণীর দেদোল দেদোল। যেখানে ‘নাক আর কানের ইন্দ্রিয় কিছুটা জিভে ...’। রাগ, ঘোষণা, নীলচাঁদ, গান, উচ্চারণ ...। ‘কারণ কবি খুব ম্যাজিক জানে, আলাদীনও জানত, এক কলম দুই কলম কলম করা জীবনে কলম কথায় কী রাগ!’
আচ্ছা, এসব কবিতা নিয়ে, এসব ম্যাজিক নিয়ে, এসব চাঁদের প্রতিচ্ছবি নিয়ে ‘একটা হাতও কি কাঁধে রাখা রাখা যায় না, বলা যায় না – ধন্যবাদ, কী ছবি দেখছ, কত পাতায়?’