রিন বা রিন আমার বারীন

সব্যসাচী হাজরা



কামালদর্শীদের এই ঘর পাখিবৃন্তের দিকে
বারীনের নিবেদনে আগামী বারীন

হ্যাঁ এভাবেই আগামীর জন্য ছটপটানি। তোলপাড়। টের পাচ্ছি বাবু। আমি আগামীকাল। দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি। এসো এসো আমার বুকে এসো। বসিয়ে দাও অথবা জড়িয়ে ধরো।

এইতো সেদিন। বারীন দা। যে আমার নরীবা চিনেছিলো। দেখে অবাক হয়েছিলো পিয়ম অবধি। ওয়েলভা ওয়েলভা ছিট ছিট ছিট তির তির তির তৃতীয় ভাওয়েলে। চমকে উঠেছিলো। পোস্টকার্ডে সেই চিঠি...

সব্যসাচী আর কৃষ্ণেন্দু দুজনের আলাপ ২০০৫ এ । সেই আলাপে ওদের ভূগোল জানা গ্যালো। স্থানে ও কালে এসে ওরা পাত্র হোলো। সেই থেকে ২০১০ এর জানুয়ারি। দু-একটা অখ্যাত পত্রিকা ছাড়া তাদের কিছু নাইরে নাই। দুজনের আড্ডা দুজনের বাড়ি।

বারীন দা কখন উঠেছো?
অনেক্ষণ। হেঁটে এলাম।
এত ভোরে?
ভোরকেইতো দেখতে গেছিলাম।
এত পাখি!
ওরাইতো জানান দিচ্ছে এটা ভোর।কফি খাবি?

শুধু অরকুট। হ্যাঁ এই মাধ্যমেই লেখালিখি জগতের কিছু মানুষের সাথে পরিচয়। আমাদের অভিযান। বই প্রকাশ যৌথ ‘তৃতীয় ফ্লাওয়ার শো/লভ্য লিরিকে’। পাশেই কৌরব। প্রকাশক বললো তোমাদের যৌথ বইটি ওনাকে অবশ্যই দিও। স্টলের সামনে একটা চেয়ারে গাঁট্টাগোট্টা সেই লোক। অনেক মানুষ। যতনা স্টলের ভেতরে, বাইরে বেশি। হাত মেলাচ্ছে। বই দিচ্ছে। বই কিনে সই চলছে।

কৃষ্ণেন্দু: ওনাকে বই দিবি?
সব্যসাচী: ঠিক ইচ্ছে করছে না। কিরকম একটা লাগছে।
কৃষ্ণেন্দু: চল ফেরত যাই।
সব্যসাচী: আর কাউকেতো চিনিনা। কাউকেতো দিতে হবে। এসেছি যখন দিয়ে দিই
কৃষ্ণেন্দু: চল দে তাহলে।
সব্যসাচী: বারীন দা আমার নাম সব্যসাচী ও কৃষ্ণেন্দু
বারীন: হ্যাঁ বলো
কৃষ্ণেন্দু: আমরা একটা যৌথ বই করেছি। এই যে।
[কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে ]
বারীন: বাহ! দুদিক দিয়ে দুজনার!
সব্যসাচী: হ্যাঁ
বারীন: ভেতরে ঠিকানা, ফোন নম্বর আছে?
সব্যসাচী: হ্যাঁ।
বারীন: আচ্ছা জানাবো।

দুজনের ফেরা। বই প্রকাশের আনন্দ নিয়ে। ওটুকুই। ওই প্রথম। সামান্য দেখা। ২০০৫ থেকে ২০০৯ প্রায় পাঁচবছর। আমাদের যৌথ ওয়ার্কশপের ফসল। বারীনের হাতে। সম্পূর্ণ অচেনা দুজন। কে জানে এরপর কি!

তারপর যা হবার তাই। সে চিঠি পাবার আনন্দ লিখবো কি করে?

আমাদের পথ। আমাদের পাগলামিগুলো। ডুবে যাই বারবার। সে সফলের নয় সে ফসলের। হাতড়ে লেংড়ে ঘুরি। খুঁজি। তবুও নিজের হাত। নিজের পা। যে পথে বেরিয়েছি সে স্বেচ্ছার। সে মৃত্যুর? সে ভাবনা কই? ছুটছি, থামছি, নিজেদের দেখছি। কি করছি অবশ্য তা আমরা জানি। আমরা তাই চেয়েছি।

কবিতা পড়ছি একদিন বারীনদা’র বাড়িতে। আড্ডায়। বারীনদা পাশের চেয়ারে। হঠাৎ ঝুঁকে বললো “তোর পা-টা কোথায় দে”। তখন ‘পসিবিলিটি ও টিলিবিসিপ’ প্রকাশিত। আমি বললাম “কি করছ?”। বললো “তোর নয় তোর কবিতার পা ছুঁচ্ছি।”

অবাক হোতাম যখন কেউ ফোন করে বলতো “আমরা অমুক পত্রিকা করি। বারীন দা জানালো আপনি অন্যরকম লেখালিখি করেন। আপনার লেখা চাই”। আরও অবাক হতাম কোনো কবিতা পাঠের আসরে শেষে ঠিক আমার লেখা নিয়ে দু-চার কথা বলতো।

নতুন নাম। কবিতা। সম্ভাবনা। খোঁজ খোঁজ। লেখা পড়িও। বই পাওয়া। চিঠি দেওয়া। প্রত্যেকটা লাইন দাগ দিয়ে দিয়ে… বলতো সব্য ওগুলো হয়ে গ্যাছে। দ্যাখ এগুলো বাকি।
আমি বলি উৎসাহ ও সাহসের নাম বারীন ঘোষাল।

বড়বড় বক্তৃতা নয়। বাইরের রূপপুর নয় মানুষের মধুপুর তার বড়ো প্রিয়। ছুঁয়ে দেখতো শুনে বুঝতো তার চাওয়াগুলো কি কি।

মাঝেমধ্যেই মজা করে কাউকে দেখিয়ে বলতো “দ্যাখ সব্য ওর পিঠে ভার আছে”। ঠিক তাই কিছুদিন পরেই দেখতাম কাজ নয় সে নাম নিয়ে ছুটছে। হয়তো কোনো তরুণ সচেতন নয় তার কবিতার ব্যতিক্রমী জায়গাটা কি, বা দুর্বলতা কোথায়। বারীন-আয়নায় সে দেখতে পেতো। তখন সে সাজতো তার মতো করে।

ট্যাক্সি চলছে সব্যসাচীর হাত ধরে বসে আছে বারীন

বারীন:সব্য শোন
সব্যসাচী: বলো
বারীন:কবিতা নিয়ে এত পরিশ্রম করছিস-
সব্যসাচী: থামলে কেন?
বারীন: শুধু পরীক্ষা নয় নিরীক্ষার পথও খোলা রাখিস।

ওহ! শুধুই এই বলার জন্য সারাজীবন কাউকে নিজের ভাবা যায়। কোনোদিন বারীনদা বলেনি সব্য এই ভাবে ভাব, এই ভাবে লেখ। আমার লেখা থেকে তার পাওয়ার জায়গাও য্যামন জানিয়েছে ত্যামন তার মতে দুর্বলতার জায়গাও। কারণ আমি আর কৃষ্ণেন্দু সচেতন ভাবে লেখালিখি শুরু করার বছর পাঁচ ছয় পরে কবিজগতের সংস্পর্শে আসি। সেদিক থেকে আমাদের পথ আমরা নির্দিষ্ট করেছিলাম। আমাদের প্রথম যৌথ বই প্রকাশের দিন ২০১০ এর সেই বইমেলায় প্রথম আলাপ বারীনদা’র সাথে। আর ধীরে ধীরে এই কয়েকবছরে সম্পর্কের, ভালোবাসার গভীরতায়।

“তুই যে পথ বেছেছিস তা বড়ো কঠিন। একা এত বড় কাজে প্রাণ দিবি কি করে?” এ প্রশ্ন ভালোপাহাড়ে একদিন করেছিলে আড়ালে। তোমার উৎসাহে ভালোবাসায় সে প্রাণ দেওয়ার চেষ্টা আজও করে যাচ্ছি। আসলে বারীন ঘোষাল নামটাই ভিন্ন ভাবনার এক স্পর্ধা। গিমিক নয় সৎ উচ্চারণ তার পছন্দের। বলতো “সব্য এত আলাদা আলাদা উচ্চারণ এত আলাদা আলাদা লেখা ক্যানো জানিস? কারণ আমাদের ধারণা পৃথিবী সম্পর্কে আলাদা আলাদা”। এ কথা তার ‘অতিচেতনার কথা’ বইতেও আছে।

শুধু মাথা নাড়া নয় প্রশ্ন শোনা ও তাকে নিজের মতো করে উত্তর দেওয়াও ছিলো বারীনদা’র এক মস্ত গুণ। আমাকে জিজ্ঞাসা করতো উত্তর পছন্দ হোলো না তাইতো? কবিতার পংক্তির স্মরণযোগ্যতা নিয়েতো একদিন বেশ তর্কই হোলো। বিশ্বাস করতো তরুণের হাতেই কবিতার নতুন পথ রচিত হবে। একটা বই-তে লিখে দিলো “সব্য তুই না থাকলে আমি নেই”।

প্রত্যেক সৃষ্টিশীল মানুষই তাঁর চিন্তা, ভাবনা ও প্রকাশের ক্ষমতা অনুযায়ী সৃষ্টি করেন। সেদিক থেকে কবি বারীন ঘোষাল তার কাজ করেছে। তার মূল্যায়ন বা অমূল্যায়ন চলছে চলবে। কিন্তু পাঠক বারীন ঘোষাল? হ্যাঁ একথা বললেই হাজার হাজার উত্তর জমা হবে। হয়তো কবি ঘোষালকে ছাপিয়ে যাবে পাঠক ঘোষাল। এ হয়তো যেকেউ মানবে। এক এক সময় বলেছে “জানিস বই পড়ার সময় প্রত্যেক পাতায় কিছু শব্দে লিখে রাখি সেই পর্যন্ত প্রতিক্রিয়া। এমন কেউ আছে যার বই বারীনদা’র হাতে পৌঁছনোর পর তার কাছে চিঠি আসেনি? এত বড় আকাশ! এত বিস্তৃতি। প্রত্যন্ত গ্রামের একটি ছেলের নতুন বইও যে যত্ন নিয়ে পড়েছে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটির ক্ষেত্রেও তাই। তুলে এনেছে তার লেখার গুণাগুণ। বলতো “জানিস আমি সবসময় চেষ্টা করি একটা লেখার কিছু ভালো দিক তুলে ধরতে যাতে যে লিখেছে সে য্যানো লেখায় থাকে, বিকশিত হয়”।

বারীন: তুই কোথায়?
সব্যসাচী: এইতো আসছি।
বারীন:শোন আমি তুই একঘরে থাকবো। ওদের বলে রেখেছি।

পুরুলিয়া লিটিলম্যাগ মেলা। দুজনে রইলাম একটা পরিবারের সাথে একই ঘরে। দেখেছি অত বই নিয়ে কৌরবের টেবিল সামলাচ্ছে বারীন ঘোষাল। পত্রিকার তরফ থেকে একা। তার সাথে আমি। পুরো মেলা আলো করে বসে আছে। কত মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। আর নিজের স্বভাবগুণেই বলে চললো “ ওর নাম সব্যসাচী হাজরা। ওর বই বেরিয়েছে ‘পসিবিলিটি ও টলিবিসিপ’। কতরাত পর্যন্ত আড্ডা। দেখেছি একজন মানুষ কবিতার জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে পারে। কবিতার জন্য সে সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত।

এই আলো তার। এ তার অর্জনের। উৎসের। কবিতার পুনর্জাগরণে তার প্রকাশ।

সৌমিত্র দা’র বাড়িতে একদিন কবিতা পাঠের সময় হঠাৎ বললো “সব্য তোর পরের বই-এর ভূমিকা আমি লিখবো”। এ যে আমার কাছে কি আনন্দের ছিলো!বারীন দা’র লেখা ভূমিকায় প্রকাশিত হোলো ‘উটবিকার’। এই বারীনদা যে প্রথম বই থেকে আমার সব লেখার পাঠক। আমার লেখার বাঁক বদলের সাক্ষী। আমার পাগলামোর প্রশ্রয়দাতা।

আমি আর বাবা দুজনেই ডাকতাম বারীনদা। আমাদের বাড়িতে এসেই মাকে বলতো দিদি কচুর শাক খাবো। আমাদের ঘরের মানুষদের সাথে যখন কথা বলতো তখন মনে হোতো বারীনদার মতো পারিবারিক কেউ নেই। প্রত্যেকের সাথে তার রেঞ্জে চলতো গল্প, আড্ডা। এই অভিজ্ঞতা আমাদের মতো অনেকের। তাই স্বজন হারানোর ব্যাথাও।

মুখবুক ভাসিয়ে চলেছে। মঞ্চ নেই, মিডিয়া নেই। শুধু রিন বা রিন শুধু বারীন। অবাক হয়েছি। জানতাম জনসংযোগ কিন্তু জনে জনে এতো যোগাযোগ। এত পোস্ট! এত মানুষের ভালোবাসা! শুধু কবিতার জন্য! অনেক আলোকিত নাম। আমাদের ছেড়ে চলে গ্যাছে কিন্তু আমি এরকম দেখিনি। কি ছিলে তুমি বারীন দা?

‘উটবিকার’ এর ভূমিকা শুধু নয়। আবার একটা চিঠি লিখলে তুমি সেখানে অনেক কথার মাঝে আবার সেই কথা “নতুন কবিতার কোন মডেল হয় না, আমরা বলেছিলাম। তাই আমাদের নতুন কবিতায় সবার আলাদা ডাইমেনশন। আমরা একসাথে ১০ বছর ধরে লড়েছি এটা নির্মানের জন্য। সেখানে তুই এলি কোন ট্রেনিং ছাড়া একেবারে তৈরি হয়ে আরো একটা নতুন ডাইমেনশন নিয়ে।”

এই সাহস এই ভালোবাসা আর কে দেবে বারীনদা?কোনো প্রবন্ধ নয়, গদ্যও নয়। যা কিছু এলোমেলো মনে এলো তাই লিখে ফেললাম। তোমার সাথে সম্পর্কের এত গভীরতা এত অভিজ্ঞতা সে কি গুছিয়ে লেখা যায়?

শুধু বলি স্পর্ধা, সাহস, আত্মসম্মান, স্থির লক্ষ্য আর গভীর ভালোবাসার নাম বারীন ঘোষাল। আমার বারীনদা।বাজালাম রিন রিন করে।