ফেরার জন্য ফেরার

অনির্বাণ বটব্যাল



বিরতি থেকে ফিরতি
জমাট দশ বছর কতটা নিরেট তা ফাঁকা দিয়ে মাপতে ইচ্ছে হল। আরতো লিখিনা ... আর কাউকে লেখা গুঁজে দেওয়ার কোনো ইচ্ছে কক্ষনোই ছিল না ... আজও নেই ... তাহলে আর দশটা বছরের অজ্ঞাতবাসে পেন্ডুলাম রাখব কেন ? এত অসহ্য আমার আশে পাশে পড়ে থাকতে দেখেছি ... মরার পড়ে শ্বাস প্রশ্বাসের আন্তরিকতা বড় প্রিয় মনে হল... সেই ২০০১-০২ থেকে আজ ২০১৩... অন্ধকারের নির্জলা যাপন শৈলীতে একটু চকমকি মেরে দেখি ... একটু উঁকি দেইই... উফফফ সেই গোঙানি বুকে নিয়ে কফিহাউস ... কবিতার বাহবা বাণিজ্য থেকে একটু বাঁ দিকে ঘুরে সোজা এগিয়ে গেলাম। গুনে গুনে পাঁচ পা... ঝটতি ডান দিকে ঘুরেই বসে পড়লাম ... একেবারে মুখোমুখি - “বারীন দা চিনতে পারছো ?”
বারীন দা তাকিয়ে আছে ... দুটো চকচকে চোখ... কী স্বচ্ছ ... কোনোকালেই জটিলতার সাহস হয়নি। এ চোখের কোলে তার কোনো অলিগলি নেই ... “শিশু নেই তো কি / শিশু চোখেই সবটা দেখা / স্বরলিপি শোনা / কানের দেয়ালা কি জয়য় ...” আমি তো থ। তবে কি ... ভুল হল আমার ... নাকি সেই জলের মধ্যে তেষ্টায় নাকানিচোবানি ... “ যত চূড়ো / তাদের বরফ নিচু হয়ে পড়ে দেখলাম/ তখনি হিমাচল হয়ে উঠলো / আমরা পিপাসা পেলাম ...” আমাকে কেঊ একটু জল দাও গো ...
- এখোনো বেঁচে আছিস অনি ?
- বারীন দা চিনতে পেরেছ! বারীন দা ... আমি ...
- হুম্ম ...রামকিশোরের সঙ্গে এসেছিলি কয়েকবার ...
দশটা বছরকে টোকা মেরে ঝেড়ে ফেলে দিল লোকটা ... কিছুই হয়নি ... এমন একটা হাসি ... কোন রাগ নেই... কারোর উপররাগ নেই ... হতেই পারে ... শুধু আবার লেখা শুরু কর ...

কবি তার ক্যাম্পে
অতঃপর জীর্ণ সাঁকোর উপরেও পুনরায় লেনদেন । অ যে চলাচল নেশা... আমি জানতাম এই বিপন্নতার আদ্র জলবায়ু বড় আরামদায়ক। দূরবীনে চোখ রাখা শেখো হে ... বারীন ডাঙা জেগে উঠলে তুমি হারিয়ে যাবে... এমন মিথ তোমাকে জাদু দ্যাখাবে... ভেল্কি নাচাবে... অথচ ডুবুরী নামাও নিজেতে দ্যাখো – “ ঘরের ভেতরেই যাদু ছিল/ জানালায় গর্ভফুলের হলুদ ত্রিকোনমিতি/ এবং পলাতক গন্ধটা / ভ্যাবাচাকা রং গোটানো ছুঁইয়ে বলতাম যাদুঘর /আর দুঃখ পেতাম জায়গা পাইনি বলে...” ।
লেখালেখি করছিস ?
- নাঃ
- এবছর অবশ্যই আসবি ভালোপাহাড়, কবিতার ক্যাম্পে... ।
- ইচ্ছে আছে বারীন দা
- না না ... আসবি আসবি ...
আমিই তো ফিরতে চেয়েছি। অনেক তো পতঙ্গ উড়ান হল... এবার আগুনের যোগ্যতা জাচাই হোক... অগত্যা সে বছর ভালো পাহাড় । কিছুটা পুরোনো তুলে রেখেছিলাম ভিতরে । পেড়ে আনলাম কিছু জোনাকি যদি দরজা খুঁজে পায় ... আলোর দরজা গোপন ফসফরাসে । আমি তার এক কোনে বসে দেখছি – “ এক চাঁদ দূরের কবিতা এলো
নমো নমো করে প্রায় দূর নয়ান যেদিন কাছে এসেছে
কোণের দিকে আর তাকালাম না
মন খারাপ হয়ে গেল আকাশে বৃষ্টি পড়া দেখে
আমায় ছুঁলো আমি আর পারাম কই
আমার হাবা সন্তানটি যে কোণায় বসে আছে
তাকে ঘিরে কবিতা নাচন বিশ্বাস হয় না
অবাক হওয়া শিখি”
এরপর ... কতবার “আমাদের মধ্যে আমরা সময় ছেড়ে বেরোই” ... আমিতো নিজেকে ছেড়েও তর্ক ছড়িয়ে দিয়েছি আর বুদবুদের মতো সেসব তার খেলাধুলো। একবার হাতের কব্জিতে লাল সুতো দেখিয়ে বারীন দা বলল – “এটা কি বেঁধেছিস-?”
- বিপদতারিনী
- কতটা তাড়ালি ?
- ওইইই মা ...
- হল না ... তোর দ্বারা নতুন কবিতা হল না ...
- কেন?
- অই যে বেঁধে রেখেছিস
- ধুস এই কটা সুতোর জন্য কবিতা লিখতে পারব না ! ওটা তো নিজেকে গন্ডি পরানো ... মাথায় না থাকলেই হল ...
- হা হা ওখানেই তো বিপদ বেশী তাড়ানো কঠিন ... ওটাই তো বলছি ...
মিটি মিটি হাসছে বারীন দা ... আমি দেখছি কি ভাবে বিষয়, উপমা, রূপক ,অলংকার অবান্তর হয়ে যায়। চেতনায় সচল হয়ে ওঠে তোমার বিস্ময়। তুমি অক্ষর বেয়ে ওঠো... গেয়ে ওঠো... তুমি বললে একটা লালনের গান কর – আমি ধরলাম –“ একটা বদ হাওয়া লেগে খাঁচায় , পাখি কখন জানি উড়ে যায়...”

ফেরার জন্য ফেরার ...
পাখি তো প্রতিদিনের অভ্যাস তোমার। সে জামশেদপুর হোক বা ভালো পাহাড় ... তোমার সাথে নিত্যদিনের কথোপকথন আমিও বোঝার চেষ্টা করেছি দুবার ... ওটা কি পাখি বলতো ? আমি পাখি দ্যাখার থেকে সদ্য আলোকে আলাদা করতে পারতাম না ... ওরা বেলা বেড়ে এলে ফিরে যেত ... আর একটা আদ্যপান্ত কবিতা মানুষ ফিরে যেত প্রাথমিক বিন্দুতে... যার প্রতিদিন শুধু চলাচল আর শেষে শুরুর কাছে ফেরা ...যার কাছে ফেরা একএকটা শুরুর বিশ্বাস মাত্র... একটা গতিময়তার খোরাকি ...
“কবি বাড়ি ফিরছে
বাড়িও ফিরছে শুরু আর শেষের মাঝখানে
ঘড়িটা চলছে
হৃদয়
আর পায়ের প্রণামগুলো
সময় নেই কোথাও ময়তাও নেই
সে সব হাততালির দেয়াল
মঞ্চসজ্জায় দাঁড়ানো একজন কাগজের ছবি ...”

খুব খুউব কম এ দেখাশোনার বাইরেটা আরো বিরাট। বারীন দা ... কথা রাখিনি... জানি তুমি রাগ করো না কখনও শুধু মনে হয় আমি তো ফিরেছি ... তুমি কি ফিরে আসবে ? নাকি ফিরে গেলে ? ফেরার জন্য প্রত্যেকেই আজীবন ফেরার । শুধু –
“যারা মৃত্যুকে দেখতে পাও না
যারা উনুনে চাঁদের পা
চন্দ্রভাগা
অভাগা এই গেল তো সেই গেল
ক্রাচ দেখালাম
জয়পুর কাঠের পা
প্রজাপতি এবং ওই তারাটা
প্লেনের চলে যাওয়াও দেখো
ছায়া ফুরোনো মানুষটার দু চোখ ভরা ......”