প্রসঙ্গ : বারীন ঘোষাল ও কবিতায় ‘অতিচেতনা’

পার্থসারথি ভৌমিক



‘‘যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে রইবো কত আর ? ’’
- শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বারীন – দা , তোমাকে লিখতে গিয়ে উপরের উদ্ধৃতি কি দেওয়া চলে ? বারীন – দা , তুমি কি খুব রেগে গেলে ? বলে উঠলে ‘‘ পার্থ তুই তো দেখছি গোড়ায় গলদ করছিস ! ” না গো , এটা তো আমি আমার লেখা লিখছি ! দ্যাখো না শুরুয়াৎ এমন রেখেও তোমাকে লিখতে পারি কি না !

কি হারিয়ে যায় বারীন –দা ? যা ছিল ? নাকি যা ছিল না ? যা ছিল না , তা হারাবে কি করে ? আসলে উপরের রবীন্দ্রকাব্যগীতির অংশবিশেষ পড়ে ‘ যা ছিল ’ তার হারিয়ে যাওয়ার কথা না ভেবে , আমার ব্যাক্তিগত ভুবনে ছিটকে ফিরে এসে আমি ভাবছি ‘ যা ছিল না ’ তার হারিয়ে যাওয়ার কথা । যা ‘ছিল না’ তা হারিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে গেলেই তো চিন্তা - চেতনার স্বাভাবিক গতি – প্রকৃতির বাইরে গিয়ে ভাবার চেষ্টা করতে হবে । হ্যাঁ । যা ছিল , তা হারানোর কথা ভাবতে , গভীর একাগ্রতার প্রয়োজন নেই । জলকে প্রসঙ্গে এনে আমাকে কিছু বলতে দাও । আমি কিন্তু ‘Lateral Thinking ’ –এর কথা বলবো না । কারণ--- “জল যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং যতদূর যায় গ্রাস করে উপলব্ধিকে প্রশস্ত করে এই চিন্তাধারাটিকে বলা হয় ল্যাটারাল থিংকিং এবং যুক্তিকে ফাজি লজিক । ’’ ---- এখানে একরকম ধরেই নেওয়া হয়েছে যে জলকে সমতলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে । জলের সমোচ্চশীলতা ধর্ম – কে অস্বীকার করা হয় নি । আবার ‘‘If you add one rock to another you get two rocks. But if you add water to water you do not get two waters. Poetry is based on water logic. In poetry we add layer after layer of words images metaphors and other vehicles of perception. It all builds up into one holistic perception.’’ Edward De Bono at ‘I am right you are wrong.’--- এখানেও জলের সমোচ্চশীলতা ধর্ম নিয়ে কিছু বলা হয় নি । কিন্তু জল যদি ধর্মচ্যুত হয়, তবে কেমন হতে পারে ? যে কোন তল ( Level ) থেকে যে কোন তলে , যে কোন সময় , যে কোন দিক বেছে নিয়ে সে হাঁটা দিতে পারে । তলের ভ্রূক্ষেপ না করে , শুধু দিক ভালোবেসে , তার পুব আর নাও ফুরোতে পারে , তাই তো ? সে তখন , ধর্মত্যাগের মতো গর্হিত কর্মটি ক’রে পাপাচারী । অথবা কোন বৃদ্ধ হাতের লাঠি বাড়িয়ে দিলে , জল তা বেয়ে উপরে উঠে বৃদ্ধের তৃষ্ণা মিটিয়ে পুণ্যার্জনও করতে পারে ( রক লজিকের কথা বলছি না )।

উপসর্গ । লক্ষণ । ডাক্তাররা রোগীর উপসর্গ দেখে রোগ নির্ণয়ের পথে হাঁটেন । আর বাংলা ব্যকরণে উপসর্গ কুড়ি - টা । প্র , পরা , অপ , সম , নি , অব , অনু , নির , দূর বি , অধি , সু , উৎ , পরি , প্রতি , অতি , অভি , অপি , উপ , আ । ষষ্ঠদশতম উপসর্গ – টি তোমাতে দেখা দিয়েছিল ? বসে গিয়েছিল তোমার ‘চেতনা’র আগে ? গতানুগতিক কবিতাতে কলম মেলাতে না পেরে তুমি ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়েছিলে বারীন –দা ? ‘ অতিচেতনা ’-য় আক্রান্ত হয়েছিলে ? ১৯৯৬ সালে তুমি লিখলে ‘ অতিচেতনার কথা ’। ২০০৪ সালে তা আবার পরিবর্ধিত করলে । তোমার উদ্দেশ্য ছিল বাংলা কবিতাকে একটা নতুন দিশা দেখানো । যে কবিতা আগে লেখা হয়নি , তেমন কবিতা লিখতে হলে কিভাবে শুরু করা যেতে পারে , তুমি তার একটা নির্দেশিকা তৈরি করার কথা ভাবলে । তুমি নিজেই বলেছ , ‘‘ অতিচেতনা শব্দটা ক্যাজুয়ালি অনেকে ব্যবহার করেছেন, যেমন বিনয় মজুমদারের একটা সাক্ষাতকারেই আছে, কিন্ত কেউ তার বিস্তার বা প্রয়োগ করেননি । ’’ অর্থাৎ অতিচেতনার কবিতা আগে থেকেই লেখা হয়ে আসছে এটা তুমি কোথাও অস্বীকার করোনি , এবং প্রকৃতই অনেক তরুণ কবিও ওই নির্দেশিকা হাতে পাওয়ার আগেই তেমন কবিতা লিখছিল , এখনও লিখছে । দ্বিমাসিক ও বহুভাষিক ওয়েব ম্যাগাজিন , ইন্ডিয়ারীর , অক্টোবর ২০১৫ সংখ্যায় আমার লেখা ‘অভিসারিকা’ কবিতা পড়ে তুমি মন্তব্য লিখেছিলে ‘‘পার্থসারথির কবিতাটা ভালো ।’’ আমি অবাক হয়েছিলাম প্রথমতঃ এই কারণে যে , তোমাকে আমি জেনে থাকলেও তুমি আমাকে চেনা তো দূর অস্ত , নামও শোননি । দ্বিতীয়তঃ ওটা তোমার মতে অতিচেতনার কবিতা ছিল কিনা তা আমি আজ অবধি জানি না । তৃতীয়তঃ , তখনও আমি তোমার ‘অতিচেতনার কথা’ পড়ে উঠিনি । আসলে তুমি কাউকে তোমার অতিচেতনার কথা চাপিয়ে দিতে তো চাওইনি বরং তোমাকে না জেনে কেউ কোথাও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তোমার ভালোলাগা কবিতা লিখে থাকলে , তাকে উৎসাহ দিতে তোমার কোন কুণ্ঠাই ছিল না । তুমি কেবল আগ্রহী হয়েছিলে ‘অতিচেতনা’র কবিতা লেখার জন্যে যদি একটা নির্দেশিকা প্রস্তুত করা যায় । এবং তা করেছিলে ব্যাক্তিগত উদ্যোগ থেকে বাংলা কবিতাকে ভিন্নতর নির্দিষ্ট মাত্রায় ধারাবাহিক করার জন্যে । তুমি ‘ধর্মচ্যুত’ হয়ে পড়লে । ‘পাপ’ করলে । ‘পুণ্য’-ও । একসাথে । হ্যাঁ , ‘সমোচ্চশীলতাধর্মত্যা গীজল’- এর মতো । বাংলাকবিতা সৃজনে ‘ নতুন কবিতা ’ সামনে নিয়ে আসায় , একই সময়ে তাকে স্বীকার ও অস্বীকারের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে এলো তোমার কারণে । কিন্তু ‘অতিচেতনা’র প্রসঙ্গে তুমি যা বললে , সেটা কবিসমাজের , পাঠকসমাজের , বিদ্বজনসমাজের , সমালোচকসমাজের একটি বিজ্ঞানসম্মত সত্য হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে বেজে উঠলো কি ?

সতর্ক এবং সক্রিয় মস্তিষ্কের নিউরাল দোলনের (Neural Oscillation ) প্রবণতা (Tendency) থাকে , যা ০.৫ হার্জ থেকে ৭০ হার্জ কম্পাঙ্কের বলে জানা গেছে । এই পাঁচটি মস্তিষ্ক - তরঙ্গের নাম ক্রমবর্ধমান ভাবে সাজালে , তা হোলও ডেলটা , থিটা , আলফা , বিটা ও গামা । ১৯৯০ সালে প্রকাশিত , Towards a Neurobiological Theory of Consciousness -এ নিউরোবিজ্ঞানী ফ্র্যান্সিস ক্রিক (১৯৬২ সালে নিউক্লিক অ্যাসিডের আনবিক গঠন এবং প্রানীদেহে তথ্য সরবরাহে তার ভূমিকা নিয়ে জেমস ওয়াটসন ও মরিস উইলকিন্সের সাথে নোবেল প্রাইজ প্রাপক , ডি.এন.এ. র দ্বি –সর্পিল ঘোরানো সিঁড়ি বা Double Helix গঠনের আবিষ্কারক । ) আর ক্রিস্টফ কচ তাদের হাইপোথিসিস - এ বলেন , নিউরাল দোলনের কম্পাঙ্ক যখন ৪০ হার্জ থেকে ৭০ হার্জ (অর্থাৎ গামা মস্তিষ্ক-তরঙ্গ ) , সেই দশায় আমরা সর্বাপেক্ষা অধিক সময় ব্যেপে আমাদের সংগৃহীত তথ্য ( information ) ধরে রাখার সুযোগ পাই । যেহেতু তুমি বলেছ , ‘‘ছন্দ , ভাষা , অলংকার , আবেগ , উপমা , প্রতীক , রূপক , বর্ণনা , ইতিহাস , গল্প , নাটক , সংবাদ , মন্তব্য , বক্তৃতা , স্লোগান , সারাংশ বা মরাল , মিথ , পুরাণ , বিষয় , দর্শন , ভবিষ্যৎ , শব্দার্থ , বক্তব্য , এবং অতিশয়োক্তি ও আবৃত্তিযোগ্যতা বাদ দিয়ে দিলে পুরনো কবিতাকে চেনার উপায় থাকবে না ’’ , তাহলে ‘ নতুন কবিতা ’ লিখতে গেলে অবশ্যই গামা তরঙ্গের নিউরাল দোলনের মধ্যে মস্তিস্কের সতর্কতা এবং সক্রিয়তা কাজ করবে ।
‘‘সাধারণত কথা, গল্প, রূপক, প্রতীক, উপমা, উপদেশ, দর্শন, বিপ্লব, রাজনীতি, সংসার, বাজার নিয়ে ব্যাখ্যা বা সারাংশ - সম্ভব কবিতা যা তুমি অহরহ চারপাশে লিখিত পঠিত উচ্চারিত হতে দেখো, সেসব সাধারণের বিশ্বাসের কবিতা। অথচ তার মধ্যে আমার কবিতা নেই। কবিতা আছে কবির অনুভবে এবং সেখানেই থেকে যায়, এমনকি লিখিত হবার পরেও।’’ এখানে কি কোথাও অনুভবের স্মৃতি ( Memory of Feelings ) আর স্মৃতিশক্তি ( Memory Power) সম্পর্কিত হয়ে পড়ছে বারীন –দা ?
তাত্ত্বিক মলিকুলার বায়োলজিস্ট , ফ্র্যান্সিস ক্রিক ‘Central Dogma ’ বলে যে ধারনার সারসংক্ষেপ করেন , তা হোলও নিউক্লিক অ্যাসিড ( ডি.এন.এ বা আর.এন.এ ) থেকে তথ্য ( Information ) একবার প্রোটিনে স্থানান্তরিত হলে , তার আর নিউক্লিক অ্যাসিডে ফিরে আসা সম্ভব নয় । ‘নতুন কবিতা ’ লেখার জন্যে তোমার বক্তব্য ছিল চেতনার কেন্দ্রাভিগ ভাবনা না হয়ে কেন্দ্রাতিগ ভাবনা । ‘‘আমি চেতনা - অবচেতনার পাকে পড়ে কেন্দ্রাভিগ চেতনার বদলে কেন্দ্রাতিগ চেতনা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। যাই ভাবি না কেন তা অন্তর্মুখী না হয়ে বহির্মুখী হোক । ’’ এই খানে আমি Central Dogma র সাথে ‘ অতিচেতনা’ র একটা একদিকধর্মী যাত্রার সাদৃশ্য খুঁজে পাই ।
‘‘এই বিশ্বে অতিচেতনা দিয়ে খুঁজি আমার কবিতা । জল বাতাস আলো বিদ্যুৎ চেতনা হাই পোটেন্সিয়াল থেকে লো পোটেন্সিয়ালের দিকে এগোয়, ছড়িয়ে পড়ে। আমার কবিতা ভাবনাও তেমনি আলো থেকে অন্ধকারের দিকে এগোবে, কোয়ার্কের দিকে, এই বিশ্বসংসারে ৯৯%-ই তো অন্ধকার, আমার চেতনার স্পর্শ সেই সব অন্ধকারকে উজ্জ্বল করুক। এটাই আমার ‘অতিচেতনার কথা’। আমাদের শরীরে আবর্তিত হয় বিদ্যুৎ এবং তাই আমরা বেঁচে থাকি। ইলেক্ট্রিক কারেন্টে করোনা তৈরি হয় যা বলয়াকারে ছড়িয়ে পড়ে । যখন আমার অতিকেন্দ্রিক চেতনার ভাবনা সেই করোনাকে স্পর্শ করে, ভাবনাটা নিমেষে উজ্জ্বল হয়। এটাকেই বলেছি অন্ধকার থেকে আলোয় যাওয়া। সেই ভাবনা অপার্থিব কবিতার আভাস দেয়। কবিতা গড়ে উঠতে চায়। কালি কলম আর সময়ের প্রশ্রয়ে কবিতা প্রকাশিত হয় যা ভিন্ন ভাষার, নতুন নির্মাণ । এই আমার অতিচেতনার কবিতা ।’’
উপরোক্ত ক্ষেত্রেও ‘ অতিচেতনা ’ ভেক্টর হয়ে পড়ে যা শুধু ‘মান’ নয় ‘ দিক ’-ও নির্দেশ করছে ।
চেতনার গানিতিক পরিমাপ (Mathematical Measurement of Consciousness ) নিয়ে উত্তরোত্তর গবেষণা চলছে । যেহেতু এই চেতনা থেকে উৎসারিত হয়েই কবির ‘কবিতা’ লেখা হয়ে থাকে এবং ‘অতিচেতনা’র কথা বললে , নিউরাল দোলনের গামা তরঙ্গের দশা ( phase) অনিবার্য হয়ে পড়ে তাহলে বলা যেতে পারে , অতিচেতনায় পৌঁছতে কোন ব্যাক্তির ( বা কবির ) নিউরাল দোলনের কম্পাঙ্ক বৃদ্ধি পায় ।

চেতনা কি ? বস্তু নিশ্চয়ই নয় । তরঙ্গ (Wave) বলা চলে । ‘‘Probably one of the more important and profound understanding that comes from looking at the equivalence of energy and consciousness is the wave particle nature of energy consciousness. Since energy and consciousness are different aspects of the same material of creation/Creation, what needs to be understood is that in the same way energy lies within the essence of all matter, consciousness similarly lies within all matter. In the same way energy has a wave particle nature and can exist as a wave or a particle, so does consciousness. Both energy consciousness and consciousness exist in a wave - particle duality. That is, both energy consciousness and consciousness, like energy, can each exist in a non - localized wave like form or a localized particle like form.’’ – Ken Ferlic.
তাহলে কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর অন্যতম প্রবক্তা হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি (Uncertainty principle) - কে চেতনা (consciousness) – র ধর্ম মান্যতা দেবে । আমি সরাসরি এবার আরউইন শ্রোডিঙ্গার ( Erwin Schrödinger ) - এর চিন্তন - পরীক্ষার কথায় চলে যাব । তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত হলে শ্রোডিঙ্গারের বিড়ালটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা অনুযায়ী একই সময়ে জীবিত এবং মৃত দুটো অবস্থায় থাকতে পারে কিন্তু বাক্সটি ভাঙলে জানা যাবে , বিড়ালটি হয় জীবিত নতুবা মৃত –--- ‘নতুন কবিতা ’–র নির্দেশিকা তৈরি করে তুমি বাংলা কবিতার নায়ক না খলনায়ক ( তুমি নিজেকে বাংলা কবিতার ‘ভিলেন’ বলেছ , এটা আমার কথা নয় ) । কিন্তু সেখানে তো তোমার কোন দায় নেই । তোমার উদ্দেশ্য সৎ , আন্তরিক । এই সুযোগে যে সকল কবি বা পত্রিকার সম্পাদক বা কবি –সম্পাদক বাংলা কবিতার এগিয়ে যাওয়ার জন্যে কাজ করছেন , তাদের আমার শ্রদ্ধা , ভালোবাসা জানিয়ে রাখি। ১৯৭১ সাল থেকে কৌরব পত্রিকাকে জড়িয়ে তুমি , ১৯৮৬ সালের পর তোমার কবিতার জন্যে কাজ অন্য মাত্রা নিয়েছিল , বারীন –দা । শ্রোডিঙ্গারের পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিড়ালটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে , বাক্স ভাঙার পর , জীবিত না মৃত তা নির্ভরশীল হয়ে পড়তো দর্শক ( Observer ) –এর ওপর । তোমার ক্ষেত্রে বাংলা কবিতা বদলে দেওয়ার প্রয়াস অভিনন্দিত হবে না নিন্দিত , তা নির্ভরশীল হয়ে রইলো পাঠক (Reader) –এর ওপর ।

তুমি ষষ্ঠদশতম উপসর্গ , অতি –তে আসীন । বয়সে তরুণ কোন কবি যদি প্রাচীন বা প্রাচীনতর ধারায় লিখতে গিয়ে বৃদ্ধদশা প্রাপ্ত হচ্ছে বলে ক্লিষ্ট হয়ে পড়ে , তাহলে ওই কল্পিত দশায় তাদের হাতের লাঠি বেয়ে ধর্মচ্যুত জল , তুমি উঠে এসে তাদের চেতনার অতি-তে পৌঁছতে উদ্দীপ্ত করবে । আগেও করেছো , এখনো করছো , ভবিষ্যতেও করতে থাকবে , উল্লম্ব সময় ধরে ।

আমার ব্যাক্তিগত মতানুসারে , কোন কবি তার কবিতা লিখতে গিয়ে অন্য কবির দ্বারা প্রভাবিত হতেই পারেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও প্রথম জীবনে বিহারীলাল চক্রবর্তীর প্রভাবে কিছু কবিতা সৃষ্টি করেছেন । কিন্তু আপন লক্ষ্যে পৌঁছতে যে কোন কবি নিজের চূড়ান্ত পথটি নিজে রচনা করেন । তোমার ‘অতিচেতনার কথা ’ যে কোন কবির আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠলে , তা কেমনভাবে তার মধ্যে আত্তীকৃত হবে তা অন্য কেউ বলতে পারেন না । তবে শেষাবধি নিরপেক্ষভাবে তার আপন কবিসত্ত্বা , নিজস্বতার প্রাখর্য –ই যে তার পরিচয় হয়ে উঠবে , এর অন্যথা হবার নয় ।
প্রারম্ভেই রবীন্দ্রনাথের যে কাব্যগীতির অংশ উল্লেখ করে আমি বলেছিলাম – ‘যা ছিল’ , তা হারিয়ে যাওয়ার কথা না ভেবে , ‘যা ছিল না’ তার হারিয়ে যাওয়ার কথা আমি ভাবছি , তাতে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করা তো হয়ই না , বরং ওই মুহূর্তে আমি নিশ্চিতভাবে ওই পঙক্তিটির কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ি । যদি , ‘যা ছিল না’ , তার হারিয়ে যাওয়ার অনুভব , কবিতা-ভাবনা তৈরি করে এবং একটি কবিতাসৃষ্টির দিকে আমার যাত্রা শুরু হয় , সেই ঋণভার বহন করেই আমার চলা হতে থাকবে । কিন্তু সৃষ্টি সম্পূর্ণ হওয়ার পর-ই কেবল জানা সম্ভব , আমি তখনও ঋণগ্রস্ত নাকি আমার সৃষ্টি অনন্য একটি ঋণমুক্ত সৃষ্টিতে উত্তীর্ণ হয়েছে । দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তখন ‘ঋণ’ শব্দের পরিবর্তে ‘অনুপ্রাণন ’ শব্দটি স্থান লাভ করে ।