মিসটেকনিক

শুভ্র চট্টোপাধ্যায়

ভগবানের মিসটেক নিয়ে আগে বলি।
তিনি এই অনন্ত মহাবিশ্বে একা একা একঘেয়ে জীবন কাটাচ্ছিলেন । একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বস্তু আর জীবের জগত বানালেন । এটাই তাঁর এক ও একমাত্র মিসটেক বলে আমার শক্ত বিশ্বাস । কিন্তু ন্যায় দর্শনে বিশ্বাস থাকলে আপনি বলবেন, ভগবান ছিলেন গোটাটাই একা । আলোচনা করার জন্য মনোবিদ পাননি । তাই একঘেয়েমি কাটানোর আর কোনও উপায় ছিল বলে তাঁর জানা ছিল না । জানা থাকা সম্ভবই ছিল না বলতে গেলে । সুতরাং তাঁর ব্যাপারটা ব্যতিক্রম হেতু মিসটেক নয় ।
ঠিকই তো ! ভগবান কেন মিসটেক করবেন ! তাহলে বিশ্বের প্রথম
মিসটেকটা কার ? এই প্রশ্ন শোনার পর এক তর্কবাগীশ উত্তর দিয়েছিলেন এই বলে যে , লজিকালি প্রথম মিসটেক করেছিল এমিবা । হাইড্রাও হতে পারে । তবে গাছেরা নয় । মিসটেক প্রাণীদের আবিষ্কার । আর সেই এককোষী প্রাণীদের আমলের ঘটনা বলে মানুষের জিনে তা মনুমেন্টের মতো বসে গেছে । মিসটেক না করা মানুষকে তাই এফ বি আই ভিনগ্রহী ভাবে । মহাপুরুষদের মিসটেক থেকেই তো বোঝা যায় তাঁরা হোমোসেপিয়েন্স ছিলেন ।
সুতরাং , মিসটেক মানুষ হওয়ার পক্ষে এক আবশ্যিক শর্ত । এই রকম একটা আবশ্যিক গুণ আমাদের সবার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও খুব কম মানুষ সেটা স্বীকার করে । এই গুণের অন্যতম পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হলো , গুণটিকে অন্যের মধ্যে বেশি করে দেখা । এটাই মানব জাতির মৌলিক মিসটেক । তবে মিসটেকান্তে লজ্জিত হওয়ার ব্যাপারটা সত্যযুগের পর থেকে বিরল হতে শুরু করেছিল । বর্তমানে এই রকম মনে করা হয় যে, দরকারে অন্যের প্রাণ নিয়ে নেব, তবুও মিসটেক স্বীকার করব না ।
সে - ই এমিবা থেকে ছিল বলেই মানুষ মিসটেককে তাঁর জিন - এ নিজের মত করে খোদাই করে ফেলেছে । ফলে এন্টি মিসটেক বানিয়ে নিয়ে ইচ্ছেমত তার ব্যবহার করছে । এন্টি মিসটেক হলো ইচ্ছাকৃত মিসটেক । এটা আছে বলেই না
সি বি আই -এর এত দরকার । এন্টি মিসটেকের পর ক্ষমা চাওয়াটা বোধহয় হালের এটিকেট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে এবং সেই ক্ষমা করতে আপনি বাধ্য । কারণ , সে বলবে , ‘ ফরগিভ মি ! ’ আর তার সুরটা হবে ‘ রেপ ইউ ’। আপনি তখন ক্ষমার মত পরম মানবিক ধর্মকে উপেক্ষা করে যাবেন কোথা ?
মিসটেক করার অধিকার ক্ষমতার সাথে সমানুপাতিক । মিসটেকের প্রধান মাধ্যম পুলিশ । পুলিশকে দিয়ে মিসটেক করানর মত আহ্লাদের বিষয় আর দুটো নেই । ব্যাকরণে অনতিবিলম্বে ‘ মিসটেক কর্তা ’ এবং ‘ মিসটেক করণ ’ নামক দুটো পদ যুক্ত করার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুরোধ করি । ‘ এম এল এ দ্বারা পরিচালিত হইয়া পুলিশ ধর্ষিতাকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করিল ’ --- এই বাক্যে পুলিশ হলো ‘ মিসটেক করণ কারক ’ -এ শূন্য বিভক্তি ।
ঠাট্টা থাক । নিজেকে জানি । রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে সারা দিনে ক-টা মিসটেক করলাম , তার তালিকা স্মরণ করুন । আপনি বুদ্ধিমান হলে একটাও খুঁজে পাবেন না । কিন্তু বিবেকের তাড়নায় নিরপেক্ষ মন নিয়ে যদি ভাবেন তবে আপনাকে কনকনে শীতের রাতেও এসি আর ফ্যান চালিয়ে আদুল গায়ে ঘুমোনর চেষ্টা করতে হবে । এরপরেও অবশ্যি ঘুমের গ্যারান্টি নেই । কারণ আপনি তখন জেনে যাচ্ছেন যে , জীবন হলো মিসটেকময় । শেষে , ভোর রাতে আপনি সিদ্ধান্তে এলেন যে , আগামীকাল থেকে আপনি শুরু করবেন নতুন এক জীবন । সে জীবনে মিসটেকের স্থান থাকবে না । কাল সকাল আটটায় ঘুম থেকে উঠেই শুরু হবে ধূমপানবীনা চা পান । তাই আপনি অবশেষে নির্ভার মনে ঘুমিয়ে পড়লেন । উঠলেন ন - টা বাজতে সাতে । এলার্ম দেওয়ার ব্যাপারে একটা মিসটেক
করেছিলেন কি না!
এরপর আপনি সারা দিনে বারো শতাংশ সিগারেট বেশি খাবেন এতে আর বিস্ময়ের কী আছে ! সে-ই সৃষ্টির আদতে ঈশ্বর মিসটেকের যেই কণা ছড়িয়েছিলেন তা পূর্ণত্ব লাভ করেছে মানুষের শরীরে । তাই বিস্ময়ের কিছু নেই ।
এখন প্রশ্ন হলো মিসটেক করায় সেরা কে ? নারী ? না পুরুষ ? উত্তরে একজন মোক্ষপ্রাপ্ত পুরুষ উদাস সুরে বললেন , ‘ মিসটেক মেয়েরা করায় আর ছেলেরা করে । শুনে তোমার হয় তো মনে হতে পারে যে , তবে মেয়েদের এড়িয়ে চলাই শ্রেয় । কিন্তু বাছা ! সেটা আরো বড় মিসটেক । ’
আমি সবিনয়ে বললাম , ‘ তাহলে ছেলেদেরকেই মিসটেক করার ব্যাপারে এগিয়ে রাখছেন ? ’
তিনি হতাশার নিশ্বাস ফেলে জানালেন , ‘ এতদিন তো তাইই জানতাম । কিন্তু পরিবর্তনের পর ....’
আমি আর শুনলাম না। কথায় কথায় রাজনৈতিক হয়ে যাওয়াটা একটা বিরাট মিসটেক । সেটা না করে বরং সত্যিটা এড়িয়ে যাওয়াটাই সোজা ।
সেটাও কি মিসটেক ?
দুত্তোর ! একটু ইতিবাচক ভাবুন না !