ধ্রুবচেতনার কলম্বাসঃএকটি সমুদ্রযাত্রা

পীযূষকান্তি বিশ্বাস




বারীন ঘোষাল আর নেই । আছে বললেও মিথ্যা হয় না । চেতনা, মননে, কাজে, কবিতায় তিনি আছেন । যতদিন আমাদের দিল্লি হাটার্স আছে, আমরা দিল্লি বসে তার নামের সঙ্গেই জড়িয়ে আছি । বারীনদা আছেন , তা একটা বিশ্বাস । বারীনদাও বোধহয় বিশ্বাসে বিশ্বাস করতেন । নিজস্ব মার্গ আর দিগদর্শনের ধ্রুব বিশ্বাস । আমার কাছে বারীনদা কি ছিলেন ? বারীন ঘোষাল কবি, নতুন কবিতার প্রবর্তক, কৌরব, কাহিনীকার, চিন্তাবিদ , মুক্ত গদ্যকার, অতিচেতনার কবি - এই সমস্ত আলোচনা শোনার আগেই যখন তাঁর সঙ্গে আমার পরিচিতি ঘটে । এইসমস্ত বিশেষণ পরিমাপ করার যোগ্যতা না থাকার কারনে কোনদিন তাঁকে প্রশ্ন করতে পারিনি । আর বিপরীতে তাঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, কন্ঠস্বর, ব্যক্তিত্ব, চিন্তা প্রভাব, দৃঢ়তা, বিশ্বাসবোধকেই চিনেছিলাম । এইটুকুই চিনেছিলাম কাছ-দূরত্বের ব্যবধান , অহংকারহীন আত্মবিশ্বাস । বাংলার বুকে যে বহুদিনব্যাপী দাপিয়ে কবিতা লিখছেন, কবিতা সম্পর্কে তার অগাধ জ্ঞান এই সমস্ত আমি শুনেছিলাম, কিন্তু সেইসবের প্রত্যক্ষ পরিচয় তখনো আমার হয় নাই । যেসব শুনে দেখে একটা বিশ্বাস জাগে বটে, কিন্তু যেচে দেখার, ছুঁয়ে দেখার একটা ইচ্ছা তো প্রত্যেক নবীন কবির মনে জাগেই । অগ্রজ কবির সংগে কথোপকথনের আলাদা স্বাদই । ব্যক্তিগত ভাবে কবিতা যে কি জিনিস অথবা কবিতা সম্পর্কে বারীন ঘোষাল কি ভাবেন তার একটা পরিচয় তার মুখ থেকেই জানার একটা সাধ ছিলো । সেই রকম পরিচয়ের জন্য বিশেষ পরিসর লাগে । তাঁর কবিতা ভাবনা বোঝার জন্য ছোট্ট একটা কাহিনী এই রকম ।



সেবার বারীনদা দিল্লি এলেন । দিল্লি থেকে প্রকাশিত পত্রিকা 'আত্মজা'র সম্পাদক রিমা দাশ, কালকাজীতে তার বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজে বারীনদা কে নিমন্ত্রন করেন । সেই সময় রিমা দাশের সংগে আমার কোন পরিচয়ই ছিলো না । কিন্তু উক্ত অনুষ্ঠানে যাওয়া আমার প্রচন্ড ইচ্ছা । কোথাও থেকে নাম্বার জোগাড় করে রিমা দাশকে ফোন করলাম । জোর করে নিমন্ত্রণ নেবার এই বোধহয় আমার জীবনের প্রথম ঘটনা । [লিংকঃ][https://www.facebook.com/rima.das.545/post s/967628489934767] বারীনদা যেখানে উপস্থিত সেখানে আশা করি কবিতা সম্পর্কিত কিছু জ্ঞান গম্মি আদান প্রদান হবে । যেদিন উপস্থিত হলাম, নানারকম রন্ধনপ্রনালী ও ভারতীয় খাদ্যসম্ভারের বিস্তারিত আলোচনার মাঝখানে আমাদের তেমন কোন কবিতা আলোচনা হলো না । পোনা মাছের পাতুরী খেয়ে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে এইটুকু বুঝলাম রান্নার প্রত্যেকটি রসিপি একটা কবিতা ।


এই রেসিপি আর কবিতার সম্পর্ক নিয়েও আর একদিন আড্ডা হচ্ছিলো । আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো কবিতা মানে রাইট টাইমে রাইট আইটেম মিশিয়ে দিয়ে রাইট পাক দিলে উত্তম কানা প্রস্তুত হয় । মাঝে মাঝে কড়াই তেতে যায় কিনা, কোন ইনগ্রিডিয়েন্ট বেশী বা কম হয়ে যায় কিনা, আঁচ কমানো বাড়ানো এইগুলো হলো শিল্পীদের নজরের মতো । কবি যেভাবে শব্দ চয়ন করে, নানান আবেগ ও অনুভূতি মিশিয়ে বাক্যবন্ধন করে, কেটেকুটে টেনেছিঁড়ে লাইন মেরামত করে । গ্রেভির উপর লেয়ারে লেয়ারে নানান রং মিশিয়ে ভোজ্যকে লোভনীয় করে তোলে । রক্ত ঘাম মেধা মিশিয়ে এক অভিনব প্রক্রিয়ায় প্লেট সাজিয়ে রসনা-রসিক পাঠকের সামনে উপস্থাপন করে । তো, এইভাবে হামবড়া ভাব নিয়ে সেই আড্ডায় নিজের কবিতা ভাবনার কথা বলেই ফেললাম । বারীনদা শুনলেন । খানিকটা মনে মনে হয়তো অবাক বা বিরক্ত । এ আবার কোন কবিতা ? কোন নতুনত্ব ? তৎক্ষনাৎ শুধরে দিয়ে বললেন 'যুত করে খাওয়াও কম কবিতা নয়' । আর কিছুই না । কোন তিরস্কার নয়, জ্ঞানপ্রদান নয় । সমঝদার কে লিয়ে ইশারাই কাফি হে ।


এইটুকুই বুঝলাম , কিছুই এবসল্যুট নয় । কেউ না । গুরুও না । শিষ্যও না । বারীনদার কাছে আমি সেই দাবী নিয়ে যাইওনি । তার কবিতা যেটুকু পড়েছি, বুঝিনি । অর্থের অনর্থের কথা বারীনদা নিজেও স্বীকার করেছেন । সেখান থেকে শিখে নেবার কথা ভেবেছি । কিন্তু বাজারে প্রচলিত 'মানে' বইগুলি সেই শিক্ষা প্রদান করে না । যেসব পান্ডিত্যের আকর্ষণে আমরা বিভিন্ন কবিতা আড্ডা বা সাহিত্য সভায় যাই, সেখানে সাহিত্য-দানা গুলি অবসকিউরড থাকে, অনেক আড্ডার মাঝে খুঁজে নিতে হয় কোনটা জল আর কোনটা দুধের অণু । সাহিত্য চিন্তাধারা কোন বাইনারী ফাইল নয় যা পেন ড্রাইভে 'সেভ' করে রাখা যায় আর গুরু তার শিষ্যকে ট্রান্সফার করে দেন । আর একটা ঘটনা মনে পড়ে যায় । একদিন কলকাতা বইমেলা ঘুরতে ঘুরতে কৌরবের স্টলের সামনে এসে পৌঁছালাম । গেটে দাঁড়িয়ে গদগদ ভাবে বারীনদা ডাকলেন । মানে ওয়ার্ম ওয়েলকাম । দিল্লি থেকে এসেছি, নিজেকে বেশ ভি-আইপি, ভি-আইপি লাগছিলো । বারীনদা ফটো নেওয়ার জন্য কাঁধে হাত রেখে সেই ভূবন ভোলানো হাসিও দিলেন । আমার কবিতা যাপনের বন-আদাড়-কানাচ-ভাগাড় সবই বারীনদার ততদিনে নখদর্পণে । বললেন । "তুই-অতিচেতনার কথা বইটা পড়েছিস ?" । সত্যি, তো পড়িনি । কিনে নিলাম । পরের দিন বারীনদা ফেসবুকে বড় করে পোস্ট দিলেন । 'অবশেষে গতকাল অতিচেতনার কথা নি: শেষ হয়ে গেল। লাস্ট কপিটি কিনলো দিল্লীর কবি পীযূষ বিশ্বাস। ' [লিংকঃ][https://www.facebook.com/1283496341667587] এই ঘটনার ভিতর আমি যে সম্পর্ক দেখতে পেলাম তা বোধহয় গুরু শিষ্য সম্পর্ক দিয়ে ডিফাইন করা যায় না । জল, বাতাস, ধুলো, বালি, কুয়াশা সব কিছু মিলেই একটা বীজের অংকুরোদ্গোম হতে থাকে । সেইভাবে দিল্লির যে কটা সাহিত্য আড্ডায় বারীনদাকে পেয়েছি, বলা যায় অনন্যসুন্দর অভিজ্ঞতায় নিজের ঋদ্ধ করেছি । বিকশিত হবার চেষ্টা করেছি । কিছুই যদিও তার ডকুমেন্টেড নাই ।


দিল্লিতে বারীন ঘোষাল দিল্লি হাটার্স গ্রুপের সাথে বিশেষ ওঠাবসা করতেন । আমি দিল্লি হাটার্সে অনেক পরে যোগদান করি । দিল্লি হাটার্সে আমাকে নিয়ে আসেন দিল্লির আর এক কবি জয়শ্রী রায়। ততদিন , দিল্লি হাটার্স প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা ও গ্রুপ । আমার সময়ে এহেন দিল্লি হাটে অনেক এক্টি‌ভিটি কম হয়ে আসায় আমি একদিন দিল্লি হাটার্স নিয়ে অনেক গলা ফাটাচ্ছি । সেই শুনে এক সাহিত্য রসিক বললেন, 'কি যে ভাই কবিতা লেখো তোমরা ? কিছুই তার মাথামুন্ডু বোঝা যায় না । আর দিল্লি হাটার্স কেন ? দিল্লি হাটে যদিই যাবে, তবে হাটুরে হবে ।' এটাই স্বাভাবিক । আমার কাছে এর উত্তর জানা নেই । একদিন সেই উত্তরের খোঁজে সম্পাদক দিলীপ ফৌজদারের বাড়ি উপস্থিত হলাম । উনি ব্যাখ্যা দিলেন । দিল্লি হাটে অনেকদিন ধরে সাহিত্য আড্ডা চলছে । প্রাণজি বসাক, রবীন্দ্র গুহ, দীপংকর দত্ত, গৌতম দাশগুপ্ত প্রমুখ কবিরা আড্ডা দেন, কবিতা নিয়ে নানান টানা ছেঁড়া করেন । এদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের অনেক সাহিত্যিক, জামসেদপুরের কবিদের পত্রালাপ হয় । তখন বারীন ঘোষালের লেখা চিঠিগুলো দিল্লি হাটের আড্ডাতে নিয়মিত আগ্রহের সঙ্গে পড়া হতো । সেই চিঠিগুলো সম্ভাষণ করা হতো 'প্রিয় দিল্লি হাটার্স' দিয়ে । পরবর্তীকালে যখন দিল্লি হাটের, এই আড্ডার নিজস্ব পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত হয়, তার নামকরণ নিয়ে নানান আলোচনা হয় । বারীনদার দেওয়া 'দিল্লি হাটার্স' নামটা তখন এক কয়েনেজ । সমষ্টিগত ভাবে সেই নামেই পত্রিকা করার সিদ্ধান্ত করেন । পত্রিকার সাথে সাথে গ্রুপের আড্ডার নামকরণ ও দিল্লি হাটার্স বলে পরিচিত হতে থাকে । বারীনদাও ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে যান দিল্লির বাংলা সাহিত্যের চর্চার সাথে ।


দিল্লিতে বারীনদা এলে কোথাও না কোথাও আড্ডা হতোই । তা ছিলো একটা ক্রেজ । ব্যক্তিগত ভাবেও তিনি নিমন্ত্রিত হয়েছেন বহুবার । এই সব ব্যাপারে আমার এন্ট্রি অনেক পরে । আমি তখন থাকি মহাবীর এনক্লেভের এক ফ্লাটে । গ্রাউন্ড ফ্লোরে ঘর । বারীনদাকে আমন্ত্রণ জানানোতে , উনি আমার বাড়িতে একদিন মধ্যাহ্ন ভোজে এলেন । তখনো অব্দি বারীনদা কি খেতে ভালোবাসেন বা ভেজ বা ননভেজ কি খাবেন এই সম্পর্কে আমার ভালো ধারনা নেই । দিল্লির আর এক কবি ভাস্বতী গোস্বামীর সাথে যোগাযোগ করলাম । তারও ওই একধারনা । শেষমেষ বারীনদাকেই ফোন করলাম । বারীনদা, হো হো করে হেসে উঠলেন । কিছু জিজ্ঞাসা বা বলার অপেক্ষা থাকলো না । উক্ত অনুষ্ঠানে [লিংক][https://www.facebook.com/10205003345496885] । বারীনদা দীর্ঘদিনের বন্ধু ও দিল্লি হাটার্সের সভাপতি মিহিররায় চৌধুরী, দিল্লির এক শক্তিশালী কবি দেবব্রত (দেবুদা)সরকার, দিল্লি হাটার্সে প্রতিষ্ঠাতা প্রাণজি বসাক, যিনি দিল্লির হাটার্সদের সংগে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সেই কবি জয়শ্রী রায় ও ভাস্বতী গোস্বামী উপস্থিত ছিলেন । মধ্যাহ্নভোজের পর যথারীতি কবিতার কথা ওঠে । জয়শ্রী রায় জিজ্ঞাসা করেন আপনারা কি সব কবিতা লেখেন ? যার কোন বিষয় নেই ?


তখনো অব্দি আমার নতুন কবিতা সম্পর্কে কোন আইডিয়া নেই । এই নিয়ে আমি কোনদিন জিজ্ঞাসা করার সাহসও পাইনি । কিন্তু তা প্রশ্নাকারে সবসময় জমা থাকে না । বারীনদা বললেন । 'বিষয় নেই কোথায় ? বিষয় তো থাকবেই । বিষয় সর্বস্ব থাকবে না।' নতুন কবিতা আগে বোঝো । তার আলাদা কবিতা ভাবনা রয়েছে । বিষয়কে ধরে রাখায় কবিতা আর কবিতা থাকছে না । 'বিষয়কে ফেলে দিতে হবে ।' । ঠিক এই কথাটাই উচ্চারণ করেছিলেন । আমার কাছে রেকর্ড করা নেই যদিও । এই কথারই কিছুটা ধ্বনিপ্রতিফলন পাই আমি যখন আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থটি বারীনদাকে পড়তে দিই কলকাতার এই বইমেলাতে । এমনিতেই বারীনদা বলতেন, আমাকে কেউ বই দিও না । অনেক বোঝাই হয়ে যায় । জামসেদপুর অব্দি বয়ে বয়ে নিয়ে ঘাড় ব্যথা হয়ে যায় । কিন্তু আমার বইটি ছিলো এক ফর্মার বই । উনি না করলেন না । আমার ইমেল আড্রেস নিয়ে রাখলেন । একদুমাস পরে আমাকে ইমেলে বইটি পড়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া জানান । তাতে লিখলেন 'প্রথম কয়েকটি কবিতাতে কোন কবিতা নেই ।' আসলে বারীনদা যেটা আগেও আমাদেরকে বারবার হাবেভাবে জানিয়েছেন, কিন্তু আমরা সেইমত লিখিনাই, বা লিখতে পারি নাই। কিন্তু উনি সুঝাও দিলেন। ভালো কবিতাটা প্রথমে আনার কথাও বললেন । উৎসাহও দিলেন কিন্তু এইপর্যন্ত আসা কোন আসাই নয় সেই কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন । এই হলেন বারীন ঘোষাল ।


সমস্তটাই যে পজিটিভ এরকম হবেন , এই রকম ব্যক্তি বিরল । ব্যক্তি বিশেষে তার তারতম্যও লক্ষ্য করা যায় । বারীনদা দিল্লি এলে তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া ছিলো আমাদের একটা রুটিন, আর যদি পানসহ কোন কবিতা পার্টি করা যায় । আমার বাড়িতে সেইসবের সমস্যা ছিলো, কিন্তু কবি দিলীপ ফৌজদারের বাড়িতে কবিতা আমরা তার ভরপুর ফায়দা তুলতাম । [লিংক] [ https://www.facebook.com/1571513069787176 ] [https://www.facebook.com/10205145889740402] । সেই থেকে 'কবিতা পার্টি' ও একটি কয়েনেজ হয়ে দাঁড়ায় । বেশ কয়েকটি জায়গায় সাংবাদিক ও সম্পাদক অরুণ চক্রবর্তী এই কথাটির উল্লেখ করেন । অরুণ চক্রবর্তী ও বারীন ঘোষালকে আমি অবশ্য দিল্লিতে একপার্টিতে দেখি নাই । কিন্তু দীপংকর দত্ত, কৃষ্ণামিশ্র ভট্টাচার্য, প্রশান্ত বারিক, অগ্নি রায়, দিলীপ ফৌজদার, অস্তনির্জন দত্তকে বিভিন্ন 'কবিতা পার্টিতে' দেখেছি । বারীনদা কে ঘিরে আমাদের কবিতা পার্টি ছিলো ভয়ংকর রকমের আবেগের । তাতে ভয়, ভালোবাসা, হিংসা, ক্রন্দন, অট্টহাসি, প্রেম , ঘৃণা অনেক ফ্লেভার ছিলো । সে বার বারীনদা দিল্লিতে এসেছে । সাজ সাজ, হৈ হৈ ব্যাপার । কবিতা পার্টি হাই ভল্যুমে চলছে । সবাই কবিতা পড়ছে । উচ্চস্বরে আবার পড়ুন, পরের লাইন ইত্যাদি । বারীনদা গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে তার মজা নিচ্ছেন । কবিতা পড়ার পালা এলো কবি দীপংকর দত্তের । সেই সময় কাউকে খাবার দিতে দিলীপ ফৌজদার গেলেন রান্না ঘরে । দীপংকর দত্তের গুসসা হয়ে গেল । আমি বা আমার মত সামান্য কবিরাও যখন কবিতা পড়ে গেলো দিলীপ ফৌজদার সহ সবাই শুনলেন, আর দীপংকর দত্তের কবিতা পড়ার সময় দিলীপ ফৌজদার অনুপস্থিত ? বেঁধে গেলো মহাভারত । মহাভারতের পাশা ক্রীড়ায় পিতামহ ভীষ্মের যে রোল ছিলো, অনেকটা সেই সেই রোলে বারীনদা গ্যাট হয়ে দেখলেন । না সমর্থন না প্রতিবাদ, মায়ের নামে প্রতিজ্ঞা করে 'এই বাড়ি আর কোনদিন আসবনা ' বলে দীপংকর দত্ত না খেয়ে পার্টি থেকে বাড়ি চলে গেলেন । আমরাও কেউ কেউ নানান ভাবে রিএক্ট করি । দিলীপ ফৌজদার আর দীপংকর দত্ত মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দিলেন । অস্তনির্জন দত্ত দিল্লির সমস্ত কবিকে আনফ্রেন্ড করে দিলেন ইত্যাদি । দীপংকর দত্ত ঠিক এই বছরই জানুয়ারীতে হৃদরোগে মারা গেলে পরে অনেক কবি বন্ধু দীপংকর দত্ত ও দিলীপ ফৌজদারের এই তিক্ত সম্পর্কের কথা ফলাও করে ফেসবুকে আলোচনা করেন, কিন্তু কি ঘটনা ঘটেছিলো সেইটা বারীনদা সচক্ষে দেখেছিলেন । উনি কোনদিন কিছু উচ্চবাচ্চ করলেন না, তো আমরাও চুপ থেকে গেলাম ।


শেষ কবছর বারীনদা শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না । শেষবার দিল্লি আসেন মার্চ-এপ্রিল ২০১৬ । ওই সময় কথা হচ্ছিল দিল্লির বাংলা বইমেলাটা হবে । দিল্লির বই মেলায় বারীনদাকে একটি আলোচনায় রাখা হয়েছিল । প্রতিবছরের মতো আমি যথারীতি সি আর পার্কে গিয়ে দেখা করে এলাম । বারীনদা আমাকে উপহার দিলেন 'প্রণয়ধ্বনির সফটওয়ার' । ব্যক্তিগত কারনে দীপংকর দত্ত বা দিলীপ ফৌজদার এবার আর দেখা করতে এলেন না । জানিনা আগের বছরের সেই প্রকান্ড মহাভারত সেই কারনে দায়ী কিনা । বারীনদাও তেমন উৎফুল্ল ছিলো না । [লিংক][https://www.facebook.com/10207590342650197] । উনি আমাকে বললেন 'তোর আকাশচুম্বন বইটা দে' । আমার মনে সংকোচ ছিলো যে বারীনদা আমার কবিতা পছন্দ করেন না কিংবা আমার লেখাগুলি কবিতা হয়ে ওঠেনি যেটা উনি আগের বইটি সম্পর্কে বলেছিলেন । আমি কবিতাগুলো লিখতাম বা এখনো লিখি একটা বিশ্বাস থেকে । আমার সঠিক ভাবে অতিচেতনা বোধটি হয়তো নেই । আমার সেই বিশ্বাসটি হলো ধ্রুব যা কোন প্রভাবে পালটায় না । আমার যে চেতনা তা হলো কনস্ট্যান্ট । তা সেই বিশ্বাস বা ভাবনায় অটল থাকার প্রয়াস । এটাই আমার রুট । যেখানে আমি আমাকে ছুঁয়ে দেখতে পারি । আমি ঝুলি থেকে বইটি তার হাতে তুলে দিলাম । আমার সাথে সেলফি তুলে বারীনদা কিছু দরকারী খোঁজ খবর করলেন । দিল্লি বইমেলা এটেন্ড না করেই বারীনদা জামসেদপুর ফিরে গেলেন ।


মাসখানেক বাদে বারীনদার ইমেল এলো । 'আকাশচুম্বন' কাব্যগ্রন্থের পাঠ প্রতিক্রিয়া । "আকাশচুম্বন পড়লাম আজ। তারিয়ে তারিয়ে। কী লিখেছিস ভাই।তোর ভেতর অনেক কথা জমে আছে। কবিতা লিখতে বসে সেই সব কথার ফুলঝুরি বেরিয়ে আসে কালারফুল তুবড়ির মতো। সুন্দর, তপ্ত, ধোঁয়াটে, তোর আশে পাশের পৃথিবীর গেট খুলে যায়। পোস্টমডার্ন টেন্ডেন্সি এটা। তবে অ্যাপ্রেসিয়েটিভ না ক্রিটিকাল। রেঞ্জ দেখে অবাক হই।" [লিংক][https://www.facebook.com/1364084043607556] আমি প্রথমে বোঝার চেষ্টা করলাম যে এটা কি কোন প্রশংসার কথা নাকি তিরস্কারের কথা । যেটা বুঝলাম এইটা হলো ভালোবাসার কথা । কবিতা ভালো লিখতে পারি এমন দাবী আমি করিনি । কিন্তু প্রণম্য কবিদের ভালোবাসা পাওয়ার চেষ্টা অবশ্যই করেছি । বারীনদার ভালোবাসা পেয়েছি এইটা আজ আর প্রমাণ করার মত বিষয় নয় ।

তবে এইটা প্রমাণ করা যায় বারীন ঘোষাল ইন্ডিয়া আবিষ্কার করেন নি । আমেরিকাও না । এই নিয়ে নানান মতামত ও দর্শন আছে । বিতর্ক আছে । নানান মুনির নানা মত । এক দেশে জন্ম নিয়ে, অন্যদেশে মানুষ হয়েও কলম্বাস যেটা প্রমাণ করতে পেরেছিলো স্থির বিশ্বাস আর ধ্রুব চেতনা থাকলে গন্তব্যে পৌঁছানো যায় । পৃথিবীযে গোল সেটা ছিলো তাঁর স্থির বিশ্বাস আর আটলান্টিক ধরে জাহাজ পশ্চিম দিকে চলতে থাকলে একদিন না একদিন সে ইন্ডিয়ায় এসে পৌঁছাবে এইটা ছিলো তার ধ্রুব চেতনা । যা ঠিক প্রমাণ হলো ৭২ দিন সমুদ্রযাত্রার পর । কেউ বললো ভুল জায়গা । কেউ বলল ইন্ডিয়ার পশ্চিম প্রান্ত । কেউ নাম দিলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ , কেউ বলল এটা আমেরিকা । কিন্তু সমুদ্রযাত্রার যে সাহস, বিশ্বাসের ধ্রুবতা , চেতনার দৃঢ়তা, নিজস্ব রুটের অবস্থান যা এই সম্পূর্ন যাত্রার পথে আবিষ্কৃত হয়েছে , তার প্রমাণ দেওয়া যায় কি ? সাহিত্যচর্চায় যে অজানায় আমরা প্রতিদিন পাড়ি দিচ্ছি - অজানা কম্পাস, অজানা মানচিত্র নিয়ে , তার গন্তব্য আমাদের কি জানা আছে ? শুধু এইটাই জানি কবিতা লিখতে গিয়ে যে স্বপ্ন বারীন ঘোষাল আমাদের দেখতে শিখিয়েছে সেই অতিচেতনার কথা আমরা না হয় প্রমাণ বাদ দিয়েই আজ একটু পড়ি । বিশেষ্য নয়, বিশেষণের জন্য এইভাবে কবিতায় বেঁচে থাক কবি বারীন ঘোষাল ।