‘স্বাভাবিকতার চেয়ে ব্যতিক্রম মৃত্যু হয়ে টানে’

অদ্বয় চৌধুরী



“আমার দেখা বেস্ট গ্ল্যাডিয়েটর স্পার্টাকিউস... মরণপণ দুই যোদ্ধার মধ্যে একজন হারবেই। সে নেমেই বুঝতে পারে আজ তার শেষ। এই শেষ হওয়াটা ঠেকিয়ে রাখতে, ‘মা-গো’ শব্দটা পিছিয়ে দিতে তার অনবরত পিছলে যাবার মনসংযোগ— প্রাণ ভিক্ষার দিকে না এগোতে পারা জিভ তার মুখে একটা আতঙ্ক লিখে দেয় যা অন্য পক্ষের নিষ্ঠুরতার চেয়ে গাঢ়।”

চল্লিশের দশক। সেপিয়া কলকাতা। ক্লাইড ওয়াডেলের ক্যামেরায় ধরা পড়া একটি ছবি নাগরিক আকুতির প্রতীকচিহ্নে রূপান্তরিত হয়ে ওঠে— সবার থেকে আগে উঠে বসার জায়গা নিশ্চিত করার প্রবল বাসনায় দুজন মানুষ একটি ট্রামের পিছনের জানলা বেয়ে উঠছে। ওই দুজন মানুষ কি তবে সেই নিষ্ঠুর গ্ল্যাডিয়েটর যারা জীবনের প্রাত্যহিক যুদ্ধ-আঙিনায় আবির্ভূত হয় কপালে অবশ্যম্ভাবী বিজয়ীর শিরোটিকা সহ? তাহলে যারা ওই দুজনের উলটো দিকে রয়েছে তারাই কি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্পার্টাকাস? অথবা, প্রশ্নটা এমনও হতে পারে— ওই দুজন মানুষই কি প্রকৃত স্পার্টাকাস, যারা মানুষ ও গাড়ির অসম অনুপাতের বিপক্ষে প্রতিবাদের স্থিরচিত্র? যারা নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে দেখিয়ে দিতে চায় এভাবে, ঠিক এভাবেই জিততে হয় এই অসম লড়াই?

“—এই যে জমিগুলো দেখছেন, কত টুকরো— এখানে বসে জমি দেখতে পাবেন না— শুধু আল। আল দিয়েই ইন্ডিয়ার এক পার্সেন্ট চাষ জমি আটকে আছে। আমি এসে এই আল ভেঙে কো-অপারেটিভ চাষ করতে চেয়েছিলাম। মাগনা। আমার কিছু নেই। কোনো স্বার্থ নেই।”

নাগরিক ধস্তাধস্তির পরিবৃত্তের বাইরে, ওই চল্লিশের দশকেই, আবির্ভূত হয়েছিলেন আমাদের খালকো। তাঁর গল্পের চরিত্ররাও, তাঁরই মতো, নাগরিক ধস্তাধস্তির বৃত্তের বাইরেই থেকেছে মূলত, কিন্তু আপোষহীন যুদ্ধ-বৃত্তের বাইরে থাকেনি। তারা প্রত্যেকেই এক-একজন গ্ল্যাডিয়েটর, মূলত স্পার্টাকাস, অনেকটা খালকোর মতোই, যার উইন্ডচিটারের পিঠে ‘উইন’ লেখা থাকত।

“চাষবাস সামান্যই। জায়গা কোথায়? তবে চাষের আগে দিতে হবে আল, তফাৎ করতে হবে প্রতিবেশীকে, সম্পত্তি ভাগ হয়ে যাওয়া ভাইকে— আমারটা আমার, তোমারটা তোমার। আল নামে শারীরিক বেড়াগুলো ভেঙে ফেলে কো-অপারেটিভ করতে আসা খালকো মার খেয়েছে প্রচুর। এ যেন দেয়াল ভেঙে ভেঙে ঘর বড় করা সহবাস কমিউনিটি। অথচ মানুষকে স্ববৃত্তের স্বার্থ শেখানো তো মানুষের স্বার্থে। সেখানে হঠাৎ একটা লোক এসে বেড়া ভেঙে দিতে চায়, বিরাদরিকে শেখায় বালক বয়সের কথা— তাকে তো আটকানোই উচিৎ। নয় কি?”

দোয়াতের কালিতে সদ্য গোঁফ আঁকা একজন, অন্য সবার মতোই, বইমেলার পর বইমেলা ধরে দৈনন্দিন দেখেছে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনের টেবিল বা ছোট্টো স্টলের বাইরে এক অভিভাবক বসে আছেন। স্পার্টাকাস— বৃদ্ধ, তবে অমলিন, অপরাজেয়।
“আমাদের পয়সা না থাকাটা কোনো গরিবী দেয়নি কখনো। বিরসা, লাধো, কান্ডিল, রোমু টির্কি এমনকি মোকতার, টপনো সবাই চলে এলো। মাটি পুজো করে যে যার আল কাটা শুরু করেছে। আমি সবার কাছে গিয়ে দু-চার ঘা কোদাল মেরে আসছি।”

লিটল ম্যাগাজিন আছে, আছে লিটল ম্যাগাজিন মেলা। কিন্তু সেই বৃদ্ধ অভিভাবকটি আর নেই। এই ঘোষণায় কি কোনো করুণ সুর বেজে উঠলো কোথাও? ওই বৃদ্ধ মানুষটি কি ‘ঘাটির অনেক ওপরের রাস্তা থেকে দেখা নীচের দৃশ্যের বালকের হাতের ড্রয়িং-এ ভেবে রাখা করুণ তুষুর সুর’? না! তুষু আত্মহত্যা করেছিল, স্পার্টাকাস জমি ছাড়েনি।
“বারোটার হুইসল বাজলো নতুন বাজীর। অভিমন্যুর মুখটা স্মরণ করে এগিয়ে গেলাম সাদা কম্বলটার দিকে। রাজেন বলেছিল— দুটো লাশই পাওয়া গিয়েছিল। বলুক। খালকোর লাশ হতে পারে না। ও শালা হেরে গেলেও হারে না। ওই তো বেটা মাঠে নেমে আল ভাঙছে। ভেঙে ছত্রাকার করে দিচ্ছে সুনাবেড়া, তার বিশাল হ্যাত্তেরি মার্কা আওয়াজে কেঁপে উঠছে সুনাবেড়ার মাঠে তুষু মেলার আয়োজন। চোখে কোথায় স্বপ্ন? শুধু আগুনে ভাঁটার মতো চোখ— এই আমার অভিমন্যু। জয় বাবা অভিমন্যু, খালকো, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।”

আমাদের খালকো আমাদের অভিমন্যু ছিল। আমাদের খালকো আমাদের স্পার্টাকাস ছিল। আমাদের খালকো আমাদের ছিল। আমাদের খালকো জিন্দাবাদ থাকবে।
***


নোট:
১) এই লেখাটিতে ব্যবহৃত যাবতীয় উদ্ধৃতি বারীন ঘোষালের ‘জিন্দাবাদ খালকো’ গল্পটি থেকে সংগৃহীত।
২) এই লেখাটির শিরোনাম মণীন্দ্র গুপ্তর ‘ব্যতিক্রম মৃত্যু হয়ে টানে’ কবিতাটির লাইন থেকে নেওয়া।