তুমি রবে নীরবে

কাজল সেন




আরও অনেকের মতোই আমিও একদা গড়ের মাঠে আয়োজিত কলকাতা বইমেলার অন্যতম প্রায়-নিয়মিত পর্যটক ছিলাম। তা সে প্রায় বছর আঠাশ- ঊনত্রিশ হলো। আর সেই বইমেলায় যাবার অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘কৌরব’এর স্টল। কেননা সেই স্টলে সেই সময় যাঁরা বিরাজ করতেন, কমল চক্রবর্তী-বারীন ঘোষাল-দেবজ্যোতি দত্ত-দীপক চট্টোপাধ্যায়, তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য একদিকে যেমন আসতেন বাংলা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকরা, তেমনি অন্যদিকে আসতেন বাংলা সাহিত্যের নতুন ধারার লেখক ও পাঠকেরা। আর এই সূত্রেই তাঁদের অনেকের সঙ্গেই আলাপ-পরিচয়ের সুযোগ ও সৌভাগ্য হতো আমার। এবং এই ব্যাপারে যাঁর মুখ্য ভূমিকা ছিল, তিনি হচ্ছেন আমাদের সবার প্রিয় বারীনদা। আমি তো তখন ছিলাম নিতান্তই অখ্যাত ‘কালিমাটি’ পত্রিকার সম্পাদক ও যৎসামান্য কবি ও গদ্যলেখক। সাহিত্যের পরীক্ষা-নীরিক্ষামূলক নতুন ধারার সঙ্গে খুবই অল্প পরিচিত। সেই তখন থেকেই বারীনদা একদিকে যেমন নতুন ধারার সাহিত্যের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, অন্যদিকে তেমনি নতুন ধারার সাহিত্যের স্রষ্টাদের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। ‘কৌরব’ স্টলে সেরকম কেউ এসে উপস্থিত হলেই বারীনদা আমাকে ডেকে আলাপ করিয়ে দিতেন – তুমি কি চেনো কাজল? প্রতিবারই আমি নীরবে মাথা নেড়ে ‘না’ বলতাম। বারীনদা তাঁদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলতেন – ‘এর নাম কাজল সেন। জামশেদপুরে থাকে। ‘কালিমাটি’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করে। জানেন তো, জামশেদপুরের আদিনাম কালিমাটি! আমিও লিখি কাজলের ‘কালিমাটি’তে’। বারীনদাকে সবাই যেমন শ্রদ্ধা করতেন, তেমনি তাঁর কথার মর্যাদা দিতেন। আর তাই বারীনদা যেখানে নিজে উদ্যোগী হয়ে আমাকে এভাবে কারও সামনে উপস্থাপিত করতেন, সেখানে তাঁরাও আমাকে কিছুটা হলেও গুরুত্ব দিতেন। আমার মনে পড়ে উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, সুবিমল বসাক, অমিতাভ দাশগুপ্ত, পার্বতী মুখোপাধ্যায়, পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়, হিরণ মিত্র – আরও অনেক অনেকের সঙ্গেই বারীনদা প্রথম পরিচয়টা ঘটিয়ে দিয়েছিলেন, যা আমার সাহিত্যজীবনকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছিল। আবার বারীনদার সুত্রেই আমি পরিচিত হয়েছিলাম ‘কবিতা ক্যাম্পাস’ পত্রিকার অলোক বিশ্বাস, ধীমান চক্রবর্তী, রঞ্জন মৈত্র, স্বপন রায়, প্রণব পালের সঙ্গে। এরা সবাই আমাকে সাহিত্যচর্চায় এক নতুন পথের সন্ধান দিয়েছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং বারীনদা। আমি এর আগে বিভিন্ন আলোচনা সূত্রে লিখেছি যে, আমার সাহিত্যজীবন যে দুজনের প্রভাবে ও সাহচর্যে গড়ে উঠেছিল, তাঁরা হচ্ছেন শ্রদ্ধেয় স্বদেশ সেন ও সমীর রায়চৌধুরী। কিন্তু এর পাশাপাশি যদি বারীনদা না থাকতেন, তাহলে আমার সাহিত্যজীবনে কিছু অপূর্ণতা থেকেই যেত। আজ আমার মাথার ওপর স্বদেশদা নেই, সমীরদা নেই, বারীনদাও চলে গেলেন। আমি এজন্য কিছুটা অসহায় বোধ করছি ঠিকই, কিন্তু সেইসঙ্গে একথাও তো ঠিক, তাঁদের সান্নিধ্যে ও সাহচর্যে এসে যতটা শিক্ষিত হবার দুর্লভ সৌভাগ্য লাভ করেছি, তা আমাকে পরবর্তী পর্যায়েও পথ চলতে উজ্জীবিত করবে ও সহযোগিতা করবে।