আলো-হরকরার পুনর্জন্ম

ফেরদৌস নাহার



সারাদিন মেঘ, মাঝে মাঝে ঝুমঝুম বৃষ্টি। ঘোলা আকাশ। মন খারাপের মন্ত্রণায় একাকার চারদিক। টরন্টো শীতকে নেবে বলে তৈরি হচ্ছে। তাপমাত্রা নামছে উষ্ণতা থেকে ক্রমশ নিচের দিকে। এমন দিনে মন আপনাতেই খারাপ হয়ে যায়। অকারণ ভালো না লাগা, অগোছালো বাতাসের ঘোড়ায় চেপে হো হো করে ধেয়ে আসতে থাকে।
হঠাৎ সন্ধ্যায় বারীন ঘোষালের না থাকা সংবাদ! হিম বিরানতা থামিয়ে দিলো চলাচল। বাইরের বৃষ্টি পাওয়া বাতাসটা যেন একটু বেশিই হু হু করে ছুটতে থাকল। আমি কী করব এখন! এই খবর মাথায় করে বয়ে নিয়ে বেড়ানোর কষ্টটা শুরু হল। যেতে হবে অনেক দূর। যে শহরে বসবাস করি, সেখানে বাংলা ভাষাভাষী কোনো কবির চলে যাওয়া ঘোর ধরায় না কোথাও। শুধু গুটি কয়েক মানুষের ভেতরের দীর্ঘশ্বাস রুদ্ধ হয়ে যাবার উপক্রম। আঁধার করে আসা নীরবতা।
ফেসবুক খুলে দুটো দিন বারীনদাতে ঝুঁকে থাকি। দেখছি, কত কত ভালোবাসা তাঁকে ঘিরে। উজাড় করে দেয়া হারানো কষ্ট-লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। পড়ি। আমার কেবলই ঘুরে ঘুরে মনে হতে থাকে, বারীনদা খুব ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন। ঘুরতে ঘুরতে কোথায় যেন চলে গেছেন, সেখান থেকে আর কখনই আমরা তার ফিরে আসা দেখব না! ফিস ফিস স্বগতোক্তি করি, বারীনদা তুমি কি জানতে, একদিন এমন অপেক্ষায় রেখে যাবে! যদিও সত্যি এই না-ফেরা, তবু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না।
তখন বাংলাদেশে, তখন টগবগে ছুটে চলা। ইন্টারনেটের জন্ম হলেও, তখনও আমাদের পর্যন্ত এসে পৌঁছায়নি। ফেসবুক তো আরও দূরের কথা। সেসময় ছুটির দিনে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীর পাতা আর লিটলম্যাগই ভরসা। থাকি ঢাকায়, কিন্তু লিখে বেড়াই সারা বাংলাদেশে জুরে। একদিন দেশের বেষ্টন পেরিয়ে চলে গেছি ওপার বাংলায়। সেখানে কত কত পত্র-পত্রিকা, লিটলম্যাগ, সাহিত্য সমাবেশ। সেখানেও লেখা পাঠাতে শুরু করলাম, যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে অনেকের সঙ্গে। মূলত চিঠিপত্রেই। ডাকঘর তখন আমার অন্যতম প্রিয় স্থান। এই আদান-প্রদানের ভেতরেই একদিন হাতে এলো কৌরবের একখানা সংখ্যা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম, পড়লাম। বেশ লাগছে। ঝরঝরে, নতুন-ধারার। প্রিন্টার্স লাইনে দুটি নাম কমল চক্রবর্তী ও বারীন ঘোষাল। ঠিকানা, ২৫এ এগ্রিকো বাগান, জামশেদপুর। ওখান থেকেই প্রকাশিত হয় এই কৌরব। একদিন ঠিক ঠিক ওই ঠিকানায় কবিতা পাঠিয়ে দিলাম। প্রকাশিত হল। প্রথম কবিতা প্রকাশ হয়, কৌরব ৫৬, জুন ১৯৯০-এর সংখ্যায়। তারপর তো আরও। সংখ্যাগুলো নিয়মিত হাতে না পেলেও। ছাপা হবার খবর কিন্তু ঠিকই পেয়ে যেতাম। কমল চক্রবর্তী, বারীন ঘোষাল ততদিনে আমার কাছে পরিচিত নাম। কিছুটা আপন, কিছুটা ঘোর লাগা, কিছুটা না দেখা দূরের।
চলতে চলতে ২০০২-এ ঢাকার এক কবিতা উৎসবে দেখা হয়ে গেল কমল চক্রবর্তীর সঙ্গে। অনেক কথা হল। বারীনদা আসেননি। পরে জেনেছি, তখন তিনি হাসপাতালে এক বন্ধুর প্রাণের জন্য লড়াই করছিলেন, তাই সেবার আর বাংলাদেশে আসা হয়নি তাঁর। বারীনদার সঙ্গে দেখা হল না। তো ঘুরে বেড়ানোর ঝোঁকে জমশেদপুর যেতে চেয়েছিলাম। তাঁরাও বলেছিলেন, এসো এসো! কিন্তু সেখানেও যাওয়া হয়নি। হাজার হাজার কিলোমিটার পারি দিয়ে, উড়ে গেলাম পুব থেকে উত্তর। কিন্তু বাড়ির পাশে জামশেদপুর কিংবা কৌরব কারো কাছেই আর যাওয়া হল না। তবু কবিতায় বসবাস করার কারণে, কবিতা সংলগ্ন মানুষগুলোর কাছে বারবার ফিরে এসেছি, প্রকারান্তরে কবিতা-পৃথিবীর সকলের কাছেই যাওয়া হয় আমার, সংযোগ হয়েই যায়। এভাবে একসময় ইন্টারনেট, ইমেইল, ফেসবুক হাতের কাছে এনে দিলো পুরো পৃথিবী। কত না হারানো স্বজন, কবি, লেখক, বন্ধুদেরকে ফিরে পেলাম এর মাধ্যমে।
এবার, বন্ধু কথাসাহিত্যিক ও বর্তমান কৌরবের অন্যতম সম্পাদক এবং বাহান্ন প্রকাশের কর্ণধার সুদেষ্ণা মজুমদারের কারণে আবারও কৌরবের কাছাকাছি হলাম। এখন কৌরব কলকাতার ঠিকানায়। বারীন ঘোষাল আছেন, পত্রিকার ভার তুলে দিয়েছেন নতুনদের হাতে। তবে বারীনদা এখনও আছেন পুরোমাত্রায় লেখালিখি আর ঘুরে বেড়ানোতে। ফেসবুকের কল্যাণে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয় ২০১১র জানুয়ারি থেকে। হারানো কিছু ফিরে পাবার মতো উচ্ছ্বাস ও আনন্দ পেয়ে বসে। আবারও ঘনিষ্ঠতা ঝালাই, আবারও অন্তরঙ্গতা।
একদিন কথা হচ্ছিল, ঘুরে বাড়ানো নিয়ে। জানালাম, আজও নিজেকে বোহেমিয়ান ভাবি, ঘুরে বেড়ানোর প্রশ্নে এখনও আমার ভালো লাগা সবকিছুর শীর্ষে। শুনে বারীনদা জানালেন, ‘অবাক হলাম, অধুনা উবে যাওয়া প্রাক বিংশ শতাব্দীর বোহেমিয়ান পরম্পরা এখনো কেউ কেউ এনজয় করে। লাভলি’... এই ছিলেন তিনি। এখন কী লিখছি, কোথায় আছি সব যত্ন করে জানতে চেয়েছেন।
কবি বারীন ঘোষালের প্রশ্রয়ে ২০১৫-তে কৌরব প্রকাশনী থেকে কলকাতা বইমেলায় প্রকাশ পেল আমার কবিতার বই ‘পাখিদের ধর্মগ্রন্থ’। কিন্তু মেলায় আমার নিজের উপস্থিত থাকা হল না। ৩৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমবারের মতো এই বইমেলায় নিজের একটি কবিতার বই প্রকাশিত হল, অথচ না থাকা কষ্ট নিয়ে মন চনমন করেছে, অস্থিরতা নিয়ে বারবার ভাবি, আহা যদি থাকতে পেতাম, তাহলে তো ‘পাখিদের ধর্মগ্রন্থ’র জন্মটা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারতাম! দূর থেকেই প্রতিদিন অপেক্ষা করেছি মেলার খবর, বন্ধুদের খবর এবং ‘পাখিদের ধর্মগ্রন্থ’র খবর জানার। বইটি যেদিন মেলায় প্রথম পা রাখে সেদিন সারারাত ঘুম হল না। ফোনে কথা বললাম, যার হাত দিয়ে বইটি পৃথিবীর আলো দেখল, সেই কৌরব কর্ণধার সুদেষ্ণা মজুমদারের সঙ্গে। কথা বললাম, প্রথম যিনি বইটির দুই কপি কিনে আমাকে ঋণী করেছেন, সেই সমীর রায়ের সঙ্গে। কথা বললাম, যার প্রশ্রয়ে বইটি প্রকাশের সাহস পেয়েছিলাম, সেই কবি ও কথা সাহিত্যিক বারীন ঘোষাল সঙ্গে। বারীনদা অভিনন্দন জানালেন। বইমেলায় উপস্থিত হতে না পারার জন্য বারবার আফসোস করলেন। বললেন, ‘খুব সুন্দর বই হয়েছে তোমার। এলে না ফেরদৌস, তুমি এলে খুব ভালো লাগত আমাদের।’ আমার কণ্ঠ ধরে আসে। রাতের গভীরতা স্বরকে আরও ব্যথা-ঘন করে তুলতে চায়। বারীনদা আমার ইমোশনকে উস্কে না দিয়ে বললেন, ‘তোমার কথা এত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে যে, মনে হচ্ছে তুমি কলকাতা থেকেই কথা বলছ। ভালো থেকো, দেখা হবে।’
সেবছরর এপ্রিলেই পেলাম ‘পাখিদের ধর্মগ্রন্থ’ নিয়ে বারীনদার একটি পাঠ-প্রতিক্রিয়া। এযেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! কোনও অনুরোধের ধার-ধারেননি, নিজে থেকেই বইটি পড়েছেন, লিখেছেন। অপ্রত্যাশিত এই পাওয়ায় স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। লেখাটি পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা তোমার সম্পত্তি এখন। যথেচ্ছ প্রকাশ করতে পারো।’ কী অপার স্বাধীনতা! এমন কবি ও মানুষ ক’জন আছেন এই জগতে! অবাক বিস্ময় ও শ্রদ্ধায় মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের কটি লাইন,এই-তো তোমার প্রেম, ওগো হৃদয়হরণ,/ এই-যে পাতায় আলো নাচে সোনার বরন.../ আমার হৃদয় আজ ছুঁয়েছে তোমারি চরণ’।
বারীনদার সঙ্গে দেখা হল, সেই ২০১৫-এর মাঝামাঝি বাহান্ন প্রকাশের প্রকাশনা উৎসবে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারভাঙা হলে। প্রথম দেখাতেই বলেছিলেন, ‘ফেরদৌস তোমার সঙ্গে দেখা হতে এত বছর লাগল!’ তাতো লাগলই। এমন কাছের মানুষ, এমন দূরত্বে। এই তো বিধির লেখন। বারীনদার সঙ্গে কেটে গেল একটি পরিপূর্ণ দিন। সেদিনের সেই অনুষ্ঠানের পর, আবারও আমরা মিলেছিলাম ঘরোয়া কবিতা পাঠের আসরে খোদ কলকাতা শহরে। সে আসরে বারীনদা আমাকে ‘পাখিদের ধর্মগ্রন্থ’ থেকে কবিতা পড়ে শুনাতে বলেছিলেন। যখন দেখা হয়নি ফোনে কথা হয়েছে। সেবার টানটান যোগাযোগে ভর-ভরন্ত মেঘ বারবার বৃষ্টি ঢেলে দিয়েছে পারস্পরিক আঙ্গিনায়।
বারীনদা নেই। এই বোধটা গাঢ় হতে সময় পেরিয়ে গেল। গত দুদিন তাঁর প্রোফাইলে পড়ে রয়েছি। দেখছি কত ছবি, কত আপনজনের সঙ্গে। বিভিন্ন বইমেলায় হাতে ধরে রাখা অসংখ্য কবি লেখকের বইয়ের উন্মোচনের ছবি। বারীন ঘোষাল সবার। তিনি ছড়িয়ে আছেন সৃষ্টির হাত ধরে। একটি সার্বভৌম আলোকিত মিছিলের পুরোভাগে।
ভেবেছিলাম, মন হয়তো এভাবে বিষণ্ন থেকে থেকেই একসময় ফিরে আসবে নিত্যদিনের কাছে। কিন্তু না, তা হল না। দীর্ঘ ‘বারীন ঘোষাল পরিভ্রমণ’-এর একপর্যায়ে, বিকেলের ক্ষয়িষ্ণু আলো ফুরিয়ে যাবার ক্ষণে হঠাৎ অনুভব করলাম, একাকী নির্জন আমার এই দূরবাস ঘরের ব্যালকোনিতে দাঁড়িয়ে আমি কাঁদছি...। তাঁর চলে যাবার দুদিনের মাথায়। অঝর ধারায়...।