বারীন ও দিল্লি হাটার্স

দিলীপ ফৌজদার




সদ্যপ্রয়াত কাউকে নিয়ে কিছু বলা বা লেখা এমনিতেই এত দুরুহ একটা কাজ বিশেষ করে প্রয়াত জন যদি হন এক বড়সড় ব্যক্তিত্ব আর তার সঙ্গে সম্পর্কটা যদি হয় বন্ধুত্বের। বারীনের ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে এই কথাটা বিশ্বাসের আওতায় আনতে হচ্ছে যে সে আর নেই।
১৯৯৮ সালে বারীনকে প্রথম দেখলাম দিল্লিতে অরুণ চক্রবর্তী আমন্ত্রিত এক সাহিত্যসভায়। ‘প্রাংশু’ পত্রিকার ব্যানারে ডাকা এই সভার আয়োজন অরুণ করেছিলেন পত্রিকাটির জনক শশাঙ্ক মুখার্জীর বাড়ীতে, চিত্তরঞ্জন পার্কে, কবি বারীন ঘোষালকে দিল্লির সাহিত্যমনস্ক একটা গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচয় করানর কথাটা মনে রেখেই । এই আড্ডাতেই গৌতম দাসগুপ্তকে প্রথম দেখেছিলাম। রাগী। অপ্রতিরোধ্য। এখানে তার দাবীটা আমার চোখে তেমন কিছু অসঙ্গত লাগে নি, বা সেটা এমন কিছু অপারগও ছিল না যেটা মেনে নিলে আয়োজকের মাথা কাটা যেত। গৌতম চাইছিল বারীন ঘোষালের মত এতবড় কবি দিল্লিতে এসেছেন তাঁকে নিজের কবিতা পাঠ করে শোনাতে আর অরুণ চক্রবর্তীর ঐ আয়োজনে সেসবের কোন জায়গা ছিল না। এই সোজাসহজ কথাটা না অরুণ বোঝাতে পারছিলেন, না গৌতম সেটা বুঝতে চাইছিল। এই নিয়ে তকরার যেটা ছিল গলাবাজি ও হাতাহাতি এই দুইএর সমন্বয়ে প্রস্তুত এক অনন্য ককটেল- অবশ্যই তেমন জোরালো কিছু ছিল না। নাই বা হোল, দিল্লির মত বাংলা কবিতার নিস্তরঙ্গ মহলে রগড় তো একটা ছিলই । বারীন ঐ ঘটনার কয়েক বছর পরই, গৌতম কে নিয়ে যে দীর্ঘ কবিতাটি লিখেল (প্রথম লাইনঃ এ কবিতায় দিল্লি শব্দটা জরুরি) তাতে এই ঘটনাটির আঁচ ছিল। কবিতাটি “এঃ লুলু” কাব্যগ্রন্থেও জায়গা পেয়েছে।
আমি সে সময় ২৪ বছর পর কবিতায় ফিরে আসছি। ‘উন্মুক্ত উচ্ছ্বাস’ সকার সম্পাদক বিকাশ বিশ্বাস এই দিল্লিরই একটা ঘরোয়া আড্ডায় আমার কবিতা শুনে আমাকে ‘উন্মুক্ত উচ্ছ্বাস’ পত্রিকার খবর দেন ও তাতে লিখতেও বলেন। বারীন উপলক্ষে আয়োজিত এই সভাতেই চিত্তরঞ্জন পাকড়াশী জানালেন ‘উন্মুক্ত উচ্ছ্বাস’ পত্রিকার আগামী সংখ্যায় আমার কবিতাটি আসছে। এই সমস্ত নানা ধ্বনির সিম্ফনি মনে গেঁথে যাওয়ায় বারীনের সঙ্গে এই প্রথম মোলাকাত আমার কাছে নানাভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। চিত্তরঞ্জন পাকড়াশী পেশায় ছিলেন শিল্পী। এঁর করা অনেক কটিই ডাকটিকিটের ডিজাইন বিখ্যাত হয়েছিল। দিল্লি প্রবাসী বাঙ্গালীদের সম্পর্কে অনেক তথ্যমুলক খোঁজ খবর নিজের সংগ্রহে রেখেছিলেন। এ নিয়ে এঁর একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে একবছর আগে। বইটি প্রকাশ পাওয়ার সময়েই তিনি ইহলোক ছেড়ে চলেও যান।

এই দেখাসাক্ষাতের অল্পকাল পরেই, আমাদের, দিল্লির বসিন্দা কজন কবির একটা জটলা জমে উঠল দিল্লি হাটে। এর অনেকটাই ছিল স্বতস্ফূর্ত । এই কবিদেরি সমবেত স্বর থেকে উঠে আসা একটা আওয়াজ । তবে তারও একটা আরম্ভ থাকে। এই আড্ডাটি জমে ওঠার সেই আরম্ভটি ঘটিয়ে ছিলেন প্রাণ জি বসাক। দিল্লির এই কবিরা দিল্লি আই আই টিতে প্রাণগোবিন্দর (প্রাণ জি) বাড়ির আতিথ্যে প্রতি শনিবার একটা সাহিত্য আড্ডায় জড় হোতেন। এতে নিয়মিত আসতেন দিল্লির তিন কবি দীপঙ্কর দত্ত, অরূপ চৌধুরি ও গৌতম দাশগুপ্ত – এঁদেরই পত্রিকা ছিল ‘জিরো আওয়ার’। জিরো আওয়ারে সে সময় ওদের তিনজনের সঙ্গে রবীন্দ্র গুহর লেখাও থাকত, এরা ছাড়া পরিচিত অপরিচিত অন্য কারুর লেখা জিরো আওয়ারের পাতায় স্থান পেত না। প্রশান্ত বারিকও এই আড্ডার একজন ছিলেন যেমন ছিলেন কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্য । কৃষ্ণাও ঐ আই আই টির আহাতার ভেতরেই থাকতেন। রবীন্দ্র গুহ কোনোদিনই প্রাণ জির বাড়ীতে আয়োজিত কবিতা আড্ডায় আসেন নি। আমিও এলাম অনেক পরে কিন্তু দিল্লি হাটের যে আড্ডাটা গড়ে উঠল তার প্রথম দিন থেকেই যারা ছিলেন তাঁদের ভেতরে রবীন্দ্র গুহ ছিলেন প্রায় তার মধ্যমণি হয়ে। ওরকম কোন বোঝা পড়া না থাকলেও আড্ডাটা ঐ ভাবেই দাঁড়িয়ে গেছিল। মিহির রায় চৌধুরি জুড়েছিলেন আমারই সূত্রে। যদিও মিহির ছিল দিল্লির সাহিত্য মহলে খুব পরিচিত একটা নাম – দিল্লি ইউনিভার্সিটি তে বাংলা সাহিত্যর অধ্যাপনা আড্ডা সম্পর্কিত সকল রকমের নির্ণয় রবীন্দ্রই নিতেন। ১৯৬০-৭০ এর দশকে কোলকাতায় ছাত্র মিহির ‘সাময়িকী’ নামের একটা ক্ষুদে পত্রিকা চালাত। মিহিরের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বও ঐ ‘সাময়িকী’কে ধরেই। সে সময় কৃত্তিবাস এর কবিরা বাংলা কবিতার আসর সরগরম রেখেছিলেন যাঁদের সঙ্গে মিহিরের ভালই যোগাযোগ ছিল। আমি কলকাতার বাসিন্দা কোনোদিন ই ছিলাম না। আমার ছিল একটু আধটু। শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমাকে জানতেন চাইবাসার সূত্রে ও সেই সূত্রেই ঘনিষ্ঠতা ছিল সমীর রায়চৌধুরির সঙ্গে।
আমরা দিল্লি হাটে বসা আরম্ভ করি ১৯৯৯ এর থেকেই। দিল্লি হাটার্স পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশ পায় ২০০৩ সালে । ২০০০ সালেরই গ্রীষ্মে বারীনের সম্পর্ক জুড়ে গেল আমাদের সঙ্গে। এটা হতে হতেই
খুব সহজেই ও অতি অল্প সময়েই বারীনে আমাদের আপনজন হয়ে গেলো। ক্রমশ জানলাম আমাদের মতই সে ছিল আরও অনেক কবিগোষ্ঠির একজন। দিল্লির কবিরা বসত দিল্লি হাটের কংক্রীট চাতালে। বারীনের ভাল লাগত জমাট এই কবিআড্ডা। ফিরে গিয়ে চিঠি লিখত দিল্লি হাটার্সরা কেমন আছে? ছেলে (শুক) পডাশুনা করছিল দিল্লিতে। বছরে দুবার অন্তত থাকতই বেশ কিছুদিনের জন্য। 2003 সালে "দিল্লি হাটার্স" পত্রিকা নিয়ে জল্পনাকল্পনা চলছিল। পত্রিকার নাম কি রাখা হবে! তখন বারীণের দেওয়া ঐ নামটিকে আর কোন নাম অতিক্রম করতে পারল না।
বারীণের সঙ্গে আরও অনেক কবিতা আড্ডায থেকেছি। ভালোপাহাড়ে, জলপাইগুড়িতে। সবসময় দেখেছি কবি ও কবিতার প্রতি তার অপার নিষ্ঠা ও ভালবাসা। বারীণের চলে যাওয়াতে বাংলা কবিতার জগতে একটা শুন্য গহ্বর সৃষ্টি হবে।