বারীন-হৃদয়

চিত্রালী ভট্টাচার্য



“এমন একান্ত করে চাওয়া, এও সত্য যত
এমন একান্ত ছেড়ে যাওয়া, সেও সেইমত।
এ দুয়ের মাঝে তবু কোনখানে আছে কোনো মিল
নহিলে নিখিল এতবড় প্রবঞ্চনা, কিছুতেই
এতকাল সহিতে পারিত না ,
সব তার আলো ,কীটে-কাটা পুষ্পসম
এতদিনে হয়ে যেত কালো”।
এ অমোঘ সত্য আমরা সকলেই মানি কিন্তু কোনো শোক কী এই সত্যে স্বস্তি পায়? যিনি চলে গেলেন ,তাঁর সযত্নে রাখে যাওয়া অজস্র স্মৃতি সর্বক্ষণই এ সত্যের ওপর আছড়ে পড়ে কাঁদে না নাকি , বিশেষত সে মানুষটির নাম যদি বারীন ঘোষাল হয়!
আসলে বারীন ঘোষাল আমার কাছে তো কোনো ব্যক্তিবিশেষের নাম নয় বরং এক অদ্ভুত হৃদয়ের নাম । তাঁর কবি সত্ত্বা, লেখক সত্বা, কৌরবের সঙ্গে তাঁর অফুরান পথচলা, তাঁর অসাধারণ অফবিট লেখালেখি সেসব নিয়ে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আমার নেই ,সেসব তোলা থাক বিশিষ্টজনেদের জন্য । আমি শুধু বলতে চাই তাঁর সমস্ত লেখার মধ্যে থেকে যে বন্ধু মানুষটি দু হাত বাড়িয়ে আমাদের ডেকে নিত লিটল ম্যাগাজিনের আসরে , তাঁর কথা।
এই মুখ আর মুখোশের দুনিয়ায় বারীনদা যেন একটা প্রতিবাদ। তাঁকে খুব সহজেই চেনা যায় ,খুব গভীর জলের ভেতর যেমন সবকিছুই স্বচ্ছ স্ফটিকের মত ,ঠিক সেইরকম ।
ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সাথে পরিচয়ের আগেই তাঁর লেখার সঙ্গে আমার খুব নিবিড় একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে কারণ অবশ্যই তাঁর লেখার প্রাণময়তা । অসম্ভব সুন্দর করে সেইসব মানুষের কথা লিখতে পারতেন যাদের নিয়ে লেখার কথা অনেকেই ভাবেন না। সেইসব প্রান্তিক মানুষ, তাদের আনন্দ- দুঃখ ,চাওয়া- পাওয়া কী জীবন্ত হয়ে উঠত তাঁর লেখার গুনে। আর কবিতা! কী দক্ষ হাত ছিল! কৌরবে প্রকাশিত লেখা পড়তে পড়তে তাঁর সাথে পরিচিত হওয়ার বাসনা তীব্র হল। তারপর যেদিন শুনলাম উনি আমার দাদার বিশেষ পরিচিত, তখন আর দেরী করিনি।
কৌরবের স্টলে যেদিন প্রথম আলাপ, -আমি আমাদের একখানি শীর্ন ম্যাগাজিন বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলাম- বারীনদা আপনার জন্য। পড়লে ভালোলাগবে।
উনি বলেছিলেন –“নিশ্চই পড়ব। তোমরা এভাবে এগিয়ে আসছ দেখে খুব ভালো লাগছে।চালিয়ে যাও। আমি আছি’।
ভেবেছিলাম এ বোধহয় কথার কথা। কিন্তু এর ঠিক দিন দশেক পর একখানা পোষ্টকার্ডে ফিরে এলেন বারীনদা। অসম্ভবউৎসাহ- ব্যাঞ্জক সে চিঠিখানা আজও আমার কাছে সযত্নে রাখা । এক নতুন সম্পাদকের কাছে সৌজন্য সংখ্যা বিতরণ এবং বিনিময়ে অপর পক্ষের অখণ্ড উদাসীনতা যখন প্রায় নিয়তি নির্ধারিত হয়ে গেছিল সেই অবস্থায় এ পোষ্টকার্ডখানি তো উজ্জ্বল উদ্ধার ! আর এখানেই বারীনদা অন্য সকলকে ছাপিয়ে গেলেন। উনি জানতেন শুধু আত্মপ্রচার নয়, লিটল ম্যাগাজিনকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে দরকার আরো নতুন নতুন সংযোজন, আরো নতুন ধরনের লেখা, আরো নিবিড় বন্ধুত্ব, আরো আত্মনিবেদন।
লিটল ম্যাগাজিনের যা করনীয় তা বাজারের কাছে বিকিয়ে গেছে কিনা তা তর্কসাপেক্ষ কিন্তু সুদূর জামশেদপুরের এক সহৃদয় সাহিত্যিক যে আন্তরিকভাবেই লিটল ম্যাগাজিনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। নবীনেরা জানত আর কেউ না থাকুক তাদের পাশে বারীনদা থাকবেন। এই বিকায়ু সময়ে দাঁড়িয়ে বারীনদার মত একজন মুখোশহীন মানুষকে হারানো যে কতখানি বিপর্যয়-সূচক তা শুধু আমার মত অসংখ্য শোকস্তব্ধেরাই সাম্যক বুঝবেন।
তবে বারীনদা কখনই হারিয়ে যাবেন না আমরা তো আমৃত্যু প্রতিটা হৃদয় ছেনে খোঁজ করে যাব সেই বারীন-হৃদয়ের যে আমাদের পাশে ছায়ার মত এসে দাঁড়াবে, বলবে শোন –
“ কারো কারো বন্ধুর নাম বিজন
যদি ছেলেবেলা থাকে বিজন হয়ে ওঠে বন্ধু
আর ওলড্‌ হোমের সিঁড়ি থেকে
গড়িয়ে দেয় শূন্য প্যারাম্বুলেটার
এক্‌সিডেন্টের জবাকুসুমে টোটায় তার জড়ানো সংসার

সুইচ নিভিয়ে একজন জানলার শিক ধরে দাঁড়িয়ে
দেখছে বিজনের ছেলে বিজন তার ছেলে বিজনকে
বাসে অফিসে গোপালপুরে কোথাও গিয়ে স্বস্তি নেই
উদাসীন এবং স্মৃতিহীন এবং স্থানকাল ভোলা
এমনকি বাজ পড়েছে সেই বিদ্যুৎ- কাঁথাও
টলাতে পারেনি বন্ধুত্ব
কারো কারো বন্ধুর নাম বিজন
তবে বিজনের আলোবাতাসের নামও বিজন।
এই হচ্ছেন আমাদের প্রিয় বারোনদা।