শাশ্বত কবিতা

অরিন্দম গুপ্ত




আমার আজনমের বন্ধু, বারীন ঘোষাল চলে গ্যাছে। কোথায় গ্যাছে আমি জানিনা। কেউ জানেনা। অনুজ কবিরা কাঁদছে। ফেসবুকের দেওয়ালে দেওয়ালে সেঁটে আছে হাহাকার।হেমন্তের সান্ধ্য আকাশে উড়ছে সহস্র কবিতার হাউই। রঙবেরঙের কবিতা আতসবাজি হয়ে উড়াল দিচ্ছে সিনসিনাটি থেকে বাংলাদেশ।আগরতলা থেকে দিল্লি, মুম্বাই। কেবল কবির ডেস্কটপ থেকে নয় ; হাজামের ক্ষুর থেকে, ওস্তাগড়ের ববিন থেকে, টেলকোর চিমনি থেকে, আগুন ওগড়ানো বেসিমার কনভার্টারের রক্তিম আভায়,ছাপাখানার কালিতে, লিটল ম্যাগের বাহন বুকপোস্টের গালায় লেপ্টে আছে তুমুল শোক! শোকে মুহ্যমান কবি, কবিপত্নী, কবিপুত্র, কবিকন্যা, বন্ধু, শত্রু, আত্মীয়, অনাত্মীয়, সাহিত্যিক, না-সাহিত্যিক, শিশু, বুড়ো, যুবা! এক অভূতপূর্ব কান্ড ঘটে যাচ্ছে রোজ। একদা কবি বন্ধুরা গোবর কুড়িয়ে থেপে দিচ্ছেন ফেবু দেওয়ালে। দেখা হলে(দেখা তো হবেই)বারীনকে বলব এসব। ওর ঘনিষ্ঠ যারা, মানবেন, বারীন উদাসীন ভাবে বলবে, বলবেই --- বাদ দে। ছোটো করে একটা ঢাল!

ভাবতে চেষ্টা করি কেন এই হাহাকার রব, এই শোকধ্বনিতে হেমন্তের বাতাস ভারী! বারীণ লিটল ম্যাগের কবি।পুরস্কারের মুকুট নেই মাথায়, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কাছাকাছি কোনোদিনই না বাংলা কবিতার এই স্বঘোষিত 'ভিলেন'। বলতো --- শিল্পের বারোটা বাজিয়ে শুরু করতে হয়। অনেকের মতে বাজিয়েও ছিল। একাই। ওঁর উত্তরকালের কবিতাগুলো সম্পর্কে ফেবুতে এক তরুণ কবি লিখেছেন --- 'শব্দের ব্যবহারে মনে হত চালের কাঁকর পড়েছে মুখে।'
অবাক লাগে সেই কবির হৃদয়েও জমেছে কান্না।কেন? বারীণ চলে গিয়ে এই 'কেন'-র উত্তর দিয়ে গেল। ভালবাসা! আহা প্রেম! বানোয়ারির মত নয়, ব্রহ্মার মত! শিবের মত! আগলে রেখে, আঁকড়ে ধরে, ষাট ষাট --- বারীনের স্নেহ! শেষের দিকে বারীণ ভীষণ রকমের হার্দ্য। প্রণয়, আস্কারা, বন্ধুতা দিয়ে অনুজ কবিদের কাছে হয়ে উঠেছিল চিরকালীন কবিতা, অগ্রজ কবি নয়!

আড্ডায় এক তরুণ কবিকে বলতে শুনেছি --- আমি বারী্ন খাই। ইদানীং কচি কচি কবিরা ওকে বাবার মত ভালবাসতো। তাদের বাবারা যদিও বারীনের থেকে বয়সে অনেক ছোটো। বাবা ছেলে একসাথে গেলাস হাতে --- উল্লাস! উভয়ে ডাকত --- বারীনদা। এক তীব্র নেশার মত ছিল এই বারীনপ্রীতি। বারীন খাই, বারীন ঘুমোই, বারীন পান করি ---। ফলত একটা সময় এল --- বারীন লিখি। কবি আদর করে ডাকছে --- স্যান্টাক্লস! কবিদের এই ভালবাসায় টইটম্বুর বারীন গৃহে আর তিষ্ঠোতে পারে না। প্রতিদিনই তার ইচ্ছে করে ভোরের ট্রেনে চেপে সকাল সকাল কলকাতা চলে আসতে। শহর ও শহরতলীর কবিরাও আহ্লাদে আটখানা। কেউ আনে মাছ ভাজা, কেউ পাঁইট, কেউ ফাইল, কেউ বাদাম ছোলা, চিপস্। শুরু হয় তুং তাং কবিতা, কথা, অনুযোগ, অভিযোগ, সেলফি!একদা সাত চড়ে 'রা' না কারা বারীনের মুখে পপকর্ণ ফোটে। ভালো লাগতো। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের সঙ্গ বারীন উপভোগ করছে। বারীন হাসছে। হলুদ সর্ষে খেত দুলে দুলে হাসছে। বুকের ব্যথা অনুভূত হচ্ছেনা। কল্পনা এই দৃশ্যে নেই। পরের দৃশ্যেই আবার এন্ট্রি নেবে। রাতের চামড়া পুড়িয়ে কবিদের বাইক চলে যায়। এন্ট্রি নেয় কল্পনা। বারীনের দুচোখে hesitating tears !

★ বারীন কুমার ঘোষাল
★ মেধাবী ছাত্র
★ এঞ্জিনিয়র,উচ্চপদে চাকরী।
★ বিয়ে : ১৪ই আগস্ট, ১৯৭৩
★ পাত্রী : কল্পনা,মেধাবী ছাত্রী,
উচ্চশিক্ষিতা, সুন্দরী,
সদা হাস্যময়ী, বুদ্ধিদীপ্তিতে উজ্জ্বল।
★ ডিসেম্বর, ১৯৭৭ : কন্যার জন্ম ও মৃত্যু।
★ ডিসেম্বর, ১৯৮৩ : ছেলে শুকের জন্ম
★ ১৯৮৪ : কল্পনার ক্যান্সার।
বারীন গোপন করে,
কল্পনাকে জানায় না।

★ ডাক্তারের উপদেশে কল্পনার ডায়েট হল সেদ্ধভাত, নিরামিষ।
বারীনও সব ছেড়ে সেদ্ধভাত, নিরামিষ।
চাকরীর পাহাড়প্রমাণ দায়িত্ব সামলে দিন রাত কল্পনার সেবা। কল্পনা জানে ওর তেমন কিছু হয়নি,অচিরেই সেরে উঠবে। বারীন জানে একটু একটু করে এগিয়ে আসছে শ্যামকল্যান।

★ ১৯৮৫ : চলে গেল কল্পনা।
ঘর অন্ধকার রেখে বাইশ দিন নাগাড়ে কারখানায় বারীন। Shut down-এর কাজ চলছে --- বলেছিল বারীন। তিন হপ্তা স্নান করেনি, দাঁত মাজেনি, ঘুমোয়নি।

★ শোবার ঘরে কল্পনার ছবি। ঘরে ফিরলো বারীন।
কোথাও সাকিন নেই, প্রেম নেই, শান্তি নেই, নিরানন্দ এই চরাচর।

★জীবনের এই বাঁকে বারীন ঘোষাল "মা নিষাদ" বলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন কবিতাসাগরে।

কবিতা কবিতা কবিতা ! কবিতা এখন দুখের সাগরে ভেসে থাকার ভেলা,বেঁচে থাকার অক্সিজেন। কল্পনার কোলে ঘুমিয়ে আছে ওর মেয়ে,বড় মায়াময় মুখ --- কবিতা, স্কচ অন দ্য রকস্! দেড় বছরের ছেলেকে বুকে করে নিয়ে গ্যাছে মামী --- কবিতা, মহুয়া ! কল্পনার ঘ্রাণ বারীণের শোবার ঘরে --- কবিতা, রাম ! ছেলে বড় হয়, বাবাকে চেনেনা --- কবিতা, হুইস্কি ! কবিতাকে ভাঙো, ভেঙে ফেলো তার রূপ, ন্যাংটো করো, চাবকাও ! "কোমরে ব্লেড ঘুরিয়ে দুহাতে গেঞ্জি খোলো চামড়ার।" কবিতার ওপর এত অত্যাচার ! "তুমি গালাজ দেবে তাকে, সোহাগ কর যাকে।" কেউ বলে সুন্দর এই নির্মেদ কবিতা। কেউবলে সর্বনাশ ! আমি অকবি মহামূর্খ, বুঝে উঠতে পারিনা কিছুই। কেবল উপলব্ধি করি ভালোমানুষ কবির নিঃসঙ্গতা।
সদা কবিতা যাপনেও একা। ভীষণ একা। কবি ও কবিতার সঙ্গ ছাড়া অসহ্য এই স্মৃতিমেদুর জীবন। বারীণ একা থাকলে আমার ভয় করে। পাঁচ পেগের পর --- আর এক পেগ ঢাল ! আমার কান্না পায়। মুখ ঝুলে পড়ছে গভীর রাতের গহ্বরে। বুঝে উঠতে পারিনা মদে কোন শান্তি সত্যিই আছে কি না। পুরোনো কৌরব নিয়ে আসি। ওর স্নিগ্ধ কবিতা পাঠ করি। একটার পর একটা। সারাক্ষণের কবির শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে। অন্যদিকে মুখ ঘোরায়। ঝুল বারান্দায় গিয়ে বসে।

রাত বাড়লে টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিই। ওর প্রিয় তোপসে মাছ, ট্যাংরার ঝাল। খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে কবি। খুবই সামান্য খেয়ে ঢেকুর তুলতে থাকে। জল খেয়ে উঠে পড়ে । বেচাল কদমে এগিয়ে যায় শোবার ঘরে। অদূরে শেষরাতের ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে চলে যায় । ওর প্লেটে এঁটো খাবার একতলায় অপেক্ষারত বেড়ালদের দিয়ে এসে দেখি বিছানায় পড়ে আছে এক মূল ওপড়ানো গাছ। আমি বারীনকে খুঁজি। খুঁজে পাইনা কবিকে। পাই এক শাশ্বত কবিতাকে ।