যে বিষাদ লেখা যায় না...

মিলন চট্টোপাধ্যায়




সম্ভবত ২০১২ সালের কলকাতা বইমেলা। শেষ দুপুরের হলদে আলোয় একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম এমাথা- সেমাথা। বন্ধুদের কারো পাত্তা নেই, এদিকে আমারও ভয় ভয় লাগতে শুরু করেছে - যদি কেউ না আসে! তবে তো রাতে বাড়ি ফিরতে কালঘাম ছুটে যাবে গেঁয়ো তরুণের। মনে অস্বস্তি নিয়ে বই ঘেঁটেও সুখ পাচ্ছি না। এমন সময় ঢুকে পড়লাম ‘কৌরবে’র স্টলে। এক ভদ্রলোক বসে ছিলেন। আমাকে দেখে আমারই নাম করে জানতে চাইলেন আমিই সে কিনা! অবাক হয়ে সম্মতি জানাতেই এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন –“আমার নাম বারীন ঘোষাল।” চমকে উঠলাম। ইনিই বিখ্যাত কৌরব বারীন ঘোষাল! কোনও মানুষ কেবলমাত্র ভার্চুয়াল আলাপেই সামনাসামনি চিনে নিতে পারেন কোনও সদ্য লিখতে আসা তরুণকে এটা দেখে আশ্চর্য হওয়ারই কথা। বাকি সময়ের অনেকটাই কেটে গেল আড্ডা দিয়ে এবং সেই আড্ডায় একবারের জন্যও বুঝতে পারলাম না বারীন ঘোষাল আমার বয়সী নন! লুকিয়ে একজন নিয়ে এলেন তরল আগুন। পান করতে করতে যতক্ষণ কথা হল, খেয়াল করলাম বারীনদা নতুন লিখতে আসা প্রায় সকলের লেখাই খুঁটিয়ে পড়েছেন। সচরাচর অগ্রজ কবিদের মধ্যে যে ব্যাপারটি খুব একটা দেখিনি।

এরপর আরও দুদিন আড্ডা হল। পরেরবার থেকে বইমেলা গেলেই কিছুটা সময় কৌরবে বারীনদার সঙ্গে আড্ডা দেওয়াটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল। বহু সদ্য লিখতে আসা কবি সেখানে এসেছেন। সকলের লেখা নিয়েই লিখিত কিংবা মৌখিক আলোচনা করতে দেখেছি বারীনদাকে। বইমেলা ছাড়াও বহুবার তিনি আমাকে ফোন করেছেন, আমিও তাঁকে। ফেসবুকে একটি গ্রুপে, ব্লগজিনে তিনি অনেকবার লেখা দিয়েছেন আমার অনুরোধে। ভালোপাহাড় যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করেছেন বারংবার, আর আমিও স্বভাবগত আলস্যে গিয়ে উঠতে পারিনি। অনির্বাণ (বটব্যাল) এর বাড়িতে গিয়ে যাব ঠিক করেও ভালোপাহাড় না যেতে পারার খেদ আমার আজীবন থেকে যাবে।

বারীন ঘোষাল যে কবিতা ভাবনায় বিশ্বাস রাখতেন সেই ভাবনার সঙ্গে আমার কবিতা ভাবনার মিল নেই। তা সত্ত্বেও কখনো মনে হয়নি কবিতা নিয়ে কথা বলা যাবে না। তাঁর সঙ্গে বিস্তর তর্ক করার চেষ্টা করেও প্রতিবার রণে ভঙ্গ দিয়েছি তাঁর অসামান্য সহিষ্ণুতার জন্য। বারীনদা একবার আমাকে বলেছিলেন– “কবিতা লিখতে এসে আবদ্ধ হোস্‌ না। বরং স্রোতের মত বয়ে যা।” এর থেকে বড় উপদেশ আমি পাইনি। কবিতা অনেকেই লেখেন, কিন্তু সকলেই শিক্ষক হতে পারেন না। এই কথাটির জন্য আমি বারীনদাকে আমার শিক্ষক বলেই মনে করি। তিনি ক্রমশ হয়ে উঠেছিলেন আমার আত্মীয়। শুধু আমারই কেন, আমাদের প্রজন্মের অনেকেই বারীনদাকে আত্মীয় মনে করেন একথা আমি হলফ করে বলতে পারি। আমার ক্ষেত্রে মনে হয়েছে - সম্পূর্ণ অন্য কবিতাভাবনার একজন তরুণকে অকৃপণ ভালোবাসা দিতে হৃদয়ের যে উদারতা তাঁর মধ্যে দেখেছি তা আজকাল বিরল। পরবর্তী পাঁচ বছরের কিছু বেশি সময় ধরে তাঁর সঙ্গ পেয়েছি অনেক। তাঁর সঙ্গে আড্ডা, ভুঁড়িতে হাত বোলানো আমার খুব পছন্দের ছিল।

২০১৬ সালের কলকাতা বইমেলায় দেখা হল শেষবার। কৌরবের ‘খালাসীটোলা’ সংখ্যাটি বহু খুঁজেও পাইনি বলে তিনি সে সংখ্যা আমাকে যোগাড় করে দিলেন। তারপর তাঁর নতুন প্রকাশিত কবিতার বইটিতে দু-কলম লিখে আমাকে দিয়ে বললেন– “পড়িস। কেমন লাগল জানাস।” কিছুদিন আগেই চরম শারীরিক অসুস্থতা কাটিয়েই বইমেলায় এসেছেন সেটাও বললেন। এরপর বেশ কয়েকবার অত্যন্ত অসুস্থতা কাটিয়েও তিনি আবার লিখেছেন। ফিরে এসেছেন প্রিয় জায়গাগুলিতে। আড্ডা দিয়েছেন। এবারেও যখন শুনলাম অসুস্থ, নিশ্চিত ছিলাম আবার সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন। বইমেলায় দেখা হবে। গল্প হবে। ফিরে আসবেন মৃত্যুকে হারিয়ে। ভুল জেনেছিলাম। দিল্লীনিবাসী কবি পীযূষ বিশ্বাস যখন মেসেজ করে জানালেন –“দ্রোণাচার্য নেই।” তখন প্রবল অবিশ্বাসে একটিমাত্র ‘বিস্ময়বোধক চিহ্ন’ ফিরতি বার্তায় পাঠিয়েছিলাম। দুদিন আগেই চিলাপাতার জঙ্গলে একান্নটি ঐরাবতের সঙ্গে পাড়ি জমিয়েছিলেন আরেক প্রিয় মানুষ পুন্যশ্লোক দাশগুপ্ত। তারপর বারীনদার চলে যাওয়া মেনে নিতে পারিনি।

তাঁর কবিতা নিয়ে বলার জায়গায় আমি নেই। আসলে কবিতা নিয়ে অন্য কবিতা লিখিয়ের বলতে যাওয়াও ঠিক নয় বলেই মনে হয় আমার। সে কথা বলুক পরবর্তী প্রজন্ম, পাঠক। সে কথা বলবে সময়। পাঠকের অনুভবে শুধু এটুকু বলতে পারি তাঁর কবিতার আপাত দুর্বোধ্যতার আড়ালে আমি খুঁজে পেয়েছি ‘পরের ম্যাট্রিক্স’। কবি বারীন ঘোষাল বেঁচে থাকবেন পাঠকের মাঝে। আমার কাছে চির জাগরূক হয়ে থাকবেন শালগমের মত টুপি পরা, আমুদে, হাসিমুখের একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ- আমার বারীন'দা। শুধু যদি বইমেলায় যাই, কৌরবের স্টলে গেলেই ভিজে উঠবে মন।

‘প্রণয়ধ্বনির সফটওয়্যার’ আর ইন্সটল হবে না বইমেলায়!