তুমি নিয়ে চল ছায়ামরিচের বনে...

পিয়াল রায়





তুমি নিয়ে চল ছায়ামরিচের বনে...
[ শক্তি চট্টোপাধ্যায় ]




অজস্র কালো ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে শোক
শোক... শুধু ব্যক্তিগত হোক


এই প্রথম লেখার জন্য কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কথা হারিয়ে যেতে পারে দুটি কারনে,
এক যদি কেউ অত্যন্ত স্মৃতি ভারাক্রান্ত হয়ে থাকেন অথবা
দুই যদি কারো স্মৃতির ভান্ডার তেমন সমৃদ্ধ না হয়ে থাকে অথচ ব্যক্তির প্রতি থাকে অবিচল ভালোবাসা।
আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা দ্বিতীয় শ্রেণীতেই পড়ে। বারীনদাকে ভালো তো বাসি কিন্তু কাছাকাছি আসার তেমন সুযোগ পেলাম পেলাম না বলে কলম থেমে যাচ্ছে বারবার। আনন্দ বা বেদনার নিজস্ব চলন আমার আর বারীনদার মধ্যে তেমন ভাবে শুরু হওয়ার আগেই যেন শেষ হয়ে গেল, স্মৃতিকথা জমানো আর হয়ে উঠলো না। তবুও কিছু কথা তারই মধ্যে কাতর করে তোলে। যখনই ভাবি এসব আর ফিরে পাবো না কোনোদিন ততবারই কাতর হয়ে ওঠে মন। খননে উঠে আসে একটা থেমে যাওয়া গ্র্যান্ডফাদার ক্লক। সময়ের অনিন্দ্য দলিল নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। না, কারো অপেক্ষায় নয়, নিজস্ব স্মৃতিতেই মশগুল হয়ে। যার কোনো নিন্দা নেই, প্রশংসারও পরোয়া করে না। যা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও পারস্পরিক ; এইমাত্র জীবিতের সাথে কথোপকথন এই আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া কথাতোরঙ্গ। একইসঙ্গে উদ্দাম ও সংযত। বারীনদা তো এমনই উজ্জ্বল, শানিত অথচ খিলানের ভিতর থেকে বয়ে আসা বাতাসের মতোই স্নিগ্ধ এক ব্যক্তিত্বের নাম।


বারীনদার সঙ্গে আমার কথোপকথন কোন্ তরফ থেকে শুরু হয়েছিল আর মনে নেই, শুধু এটুকু মনে আছে সে আলাপ ছিল বহু পুরোনো দুই পরিচিত মানুষের যেন। কখনো মনে হয় নি জীবনে প্রথমবার কথা বলছি বারীনদার মতো দ্যুতিমান ব্যক্তিত্বের সাথে। এমনই তাঁর আপনবোধ। এ কথা অবশ্য সকলেই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে যারাই তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন তারাই আত্মীয়তার নিবিড় সুখ ভোগ করেছেন। তো যাইহোক আমাদের কথাবার্তা চলছিল ইনবক্সে। ক্রমে ক্রমে তা চলে আসে হোয়াটস অ্যাপে। সক্কাল হলেই পিয়াল তরুর ডালপালায় যেন একঝাঁক পাখি এসে বসতে শুরু করতো। আর সেই পাখিদের মাঝে বসে তাদের সাথে খুনসুটি করতো পাখিমানব। হ্যাঁ, এই নামটাই দিয়েছিলাম আমি বারীনদাকে। কবিতার খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করলে বলতেন, এসব জানতে হলে মুখোমুখি বসা দরকার। যেহেতু কবিতাকে আমি কখনই কোনো ধাঁচের মধ্যে আমি ভাবিনি, ফলে কবিতা সংক্রান্ত কৌতুহল অসীম। ২০১৫ সালের আগস্টে ( সম্ভবত) ভালো পাহাড়ে কবিতাক্লাশে আমাকে ডাক পাঠালেন বারীনদা। দুর্ভাগ্যবশত যেতে পারিনি। সেখানে যাবার আমার উৎসাহ যত না কবিতাকে জানার জন্য ছিল, তার চেয়েও বেশি ছিল মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে ব্যক্তি বারীনদাকে আবিষ্কারের। এরপরের মিটিং অবশ্য আর মিস করিনি। সেটা ছিল দুর্গাপুরে। আমার স্পষ্ট মনে আছে বারীনদা ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস আপডেট দিয়ে ট্যাগ করেছিলেন আমাকে এবং দুর্গাপুরের আরো কয়েকজনকে। তারপর ফোনে কথা হল। ঠিক হল দেখা করতে যাবো। সে দিনটা আমার কাছে দুটো বিশেষ কারনে স্মৃতিময় হয়ে থাকবে আজীবন। তারমধ্যে একটা হল বারীনদার সঙ্গে দেখা হওয়া। সারাদিন আকাশ মেঘলা। ঝিরঝির বৃষ্টি সারাদিন। প্রথমে ঠিক ছিল সিটি সেন্টারে দেখা হবে। পরে তা চেঞ্জ হয়ে অন্যত্র করা হয়। শুনেছিলাম বারীনদার সাথে ধীমান চট্টোপাধ্যায়, উমাপদ কর, ব্রজকুমার সরকার, সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়, রমিত দে এবং প্রদীপ চক্রবর্তী থাকবেন। ব্রজ সরকার,উমাপদ কর আর সুপ্রিয় ছাড়া কেউই তেমন পরিচিত হয়ে ওঠেনি তখনো। যাইহোক, আমি আর আমার এক বন্ধু যখন গিয়ে পৌঁছলাম নির্দিষ্ট জায়গায়, তখনো সেখানে কেউ ছিল না। পরে রমিত আর প্রদীপ ছাড়া সকলেই এক এক করে এসে জুটলো। আড্ডা যা হয়েছিল তা নিতান্তই ঘরোয়া।কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার অবসরই ছিল না। আমি সবাইকে তখন একটু একটু করে চিনে নিচ্ছিলাম। মনে মনে তৈরী হচ্ছিলাম এই মানুষগুলোর সাথে অনেকটা পথ হেঁটে যাওয়ার। কবিতাবোধ একেকজনের একেক রকম হতে পারে, কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের এই যে আত্মীক বন্ধন প্রথম দর্শনেই তৈরী হয়ে যায়, তা থেকে আমি আর বেরিয়ে যেতে পারি না। ফলে সে বন্ধন দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়ে ওঠে।

এরপর থেকে বারীনদা প্রায় অসুস্থ থাকতে শুরু করেন। যদিও কলকাতায় এসেছেন অনেকবার, ডেকেছেনও কিন্তু আমার আর সুযোগ হয়ে ওঠেনি। আমাদের দ্বিতীয় এবং শেষ মোলাকাত কলকাতা বইমেলা (২০১৭)। বেশ বুঝতে পারছিলাম খুবই কষ্ট হচ্ছে মানুষটার। তবু যখন বললাম তোমার ' হারাতে হারাতে একা' কিনতে এসেছি তখন নিজেই উঠে এসে তাক থেকে বই পেড়ে দিলেন। নিজেই বললেন ' জিন্দাবাদ খালকো ও অন্যান্য গল্প' পড়ে ফেলতে। নিয়ে এসেছিলাম দুটি বইই। আজ যারা 'মৃতের প্রতি' সামান্য সৌজন্যটুকুও প্রকাশে অনীহা দেখান, তাদের কাছে অনুরোধ, আগে পাঠককে কীভাবে মর্যাদা দিতে হয় সেটুকু শিখুন। একজন মানুষ মৃত্যুর পরেও কীভাবে অলোকলোকে উত্তরিত হন,কীভাবে সমস্ত সমালোচনার ঊর্ধে উঠে যান, তাহলেই একমাত্র বুঝতে পারবেন। শুধু বই বিক্রি নয়, অনুজ পাঠকের কাছে বই পড়ানোর ব্যাপারে কতখানি আন্তরিক হতে হয় তা বারীনদাকে যারা না দেখেছেন তারা কোনোদিনই ধারনা করতে পারবেন না। আমার গদ্য লেখার জন্য যে দুজনের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা কোনোদিনই শেষ হওয়ার নয় তার একজন হলেন তমাল রায় অন্যজন বারীন ঘোষাল। একজন লিখিয়ে নিয়েছেন অন্যজন তাকে এগিয়ে দিয়েছেন। উৎসাহ উভয় তরফেই সমান ছিল। মানুষ তো নিজ স্বভাবেই সর্বজনগৃহীত বা নিন্দিত হয়ে থাকে, তাই বারীন ঘোষালের রক্ত মাংস চামড়ার দেহ পৃথিবীতে থাকলো বা না থাকলো তাতে কী আসে যায়? ভেলভেট পোকার ট্রেনে চেপে একা একা হারানোর জন্য চলে গেছেন বারীনদা। কিন্তু আমরা তো লুকোচুরির এক্সপার্ট খেলোয়ার--- একদিন ঠিক খুঁজে বার করবোই তারপর শুনতে বসবো হারাতে হারাতে একা হওয়ার নতুন এক গল্প।


" তর্জনীর শব্দ
শুধু তর্জনীর শব্দ
মাউস নামের ইঁদুরটি
চাপা প'ড়ে যায়
প'ড়ে যায়
থাকে শুধু সেইসব
মাউসনামারা "