স্বল্পায়ু মাছের আদর

শিমন রায়হান




মাছবাজারে, এক বিস্তীর্ণ মাছবাজারে এসে পড়েছি আমরা। বিবিধ মাছেদের মুদ্রা আর ভাষা যেসব নির্নিমেষ চোখে আটকে আছে সেই সব চোখের বাজারে এসে পড়েছি। বিলীয়মান শোকের প্রান্তরে এসে পড়েছি। জলের জগৎ থেকে হঠাৎ গুম করে যে এক প্রতিজগতে তুলে আনা হয়েছে তার মধ্য দিয়ে হয়তো একটা নবায়নের গল্প শুরু হবে। হয়তো জন্মান্তরের দরোজায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে এক মিহিন প্রস্তাবে।

কবিমাছ কিংবা মাছকবি মাছবাজারের ঝাঁকায় কাৎ হয়ে এইসব ভাবে। জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর কথা ভাবে। শ্যাওলামাটির বুকে লিখে আসা কবিতার কথা ভাবে। ভাবে বাপ-মা, বউ, বাচ্চাকাচ্চাদের কপালে রেখে আসা চুমুর কথা। চুমু রেখে আসা যায়, চুমু লিখে আসা যায়। চুমুর কী বহুবিধ গতায়াত! হেসে ওঠে কবিমাছ। মাছবাজারের কোলাহলে সে হাসি শ্রবণোত্তর।

আদরও মেয়াদোত্তীর্ণ হয় অবশেষে, ওষুধের মতো। তখন সে আদর আর কাজ করে না, গুনে গুনে তিনচামচ খেলেও। তাইতো ঘর বদলালে পুরোনো ঘরের ছবি লুকিয়ে যায়। ম্যাজিক! আদতে আদর লুকিয়ে যায়। মেয়াদোত্তীর্ণ আদর না লুকিয়ে পারেই না। শেয়ালের মতো দিনের আলো থেকে স্বমেহনে লুকোতে থাকে সে।

আর স্বমেহন তো এক প্রকার ঈশ্বর-সাক্ষাৎ। নিরাকারের গায়ে আদর রেখে আসা। প্রেমের শীতার্ত মণ্ডপে রেখে আসা স্বল্পায়ু মাছের নৈবেদ্য। সেই যে সুবিনয় মুস্তফীর কথা উল্লেখ করে গেছেন জন্মান্তরের কবি; একই সঙ্গে বিড়াল ও বিড়ালের মুখে ধরা শিকারকে হাসাতে সমান দক্ষতা ছিল যে ভূয়োদর্শী যুবার। তাঁর তো জানা আছে বিবিধ জন্মে হাসির উপায়। ভূত-ভবিষ্যতের চরিত্রে যুগপৎ অভিনয়ে তাঁর চেয়ে বেশি পটু কে-বা আর! সুবিনয় মুস্তফী সেই কবিমাছ যে জন্মান্তরের প্রান্তরে আদরমন্ত্রে ফেলে যায় অনিঃশেষ লোকজাদু।

নিজের অঙ্গ হিশেবেই মানুষকে মেরামতের জাদু দেখায় জগৎ। যেভাবে ক্ষত ঢাকে বৃক্ষ কিংবা প্রাণী শরীর। শুধু দাগ থেকে যায়। এমনকি বড়ও হয় দাগ। বেদনার বিনিময়ে সবুজ পাতা জাগে-ফুল ফোটে, পোকার শরীর পায় অমিয় মধু, নির্বাণ প্রায় আত্মা। মহানন্দে মেরামত হয় সমর্পিত প্রাণ, স্বল্পায়ু মাছের পরম্পরা যেকোনও বিয়োগের উপকণ্ঠে।

বারীন দা, আপনাকে পড়েছি এপারের 'প্রতিশিল্প', 'জঙশন'-এ, ওপারের উল্লেখযোগ্য প্রায় সব ওয়েবম্যাগ ও নানা ছোটকাগজে। আপনি তরুণতর। বছর পাঁচেক আগে যখন কলকাতায় একটু আধটু প্রকাশিত হতে শুরু করেছি, মূলত ওয়েবম্যাগগুলোতে, পেয়েছি আপনার কল্পনাতীত মনোযোগ, আন্তরিক বিশ্লেষণ, সৌহার্দ্য। আমাদের কণ্ঠবিনিময় হয়নি কখনও। বিভিন্ন প্রয়োজনে আন্তর্জালিক বার্তাবদলই হয়েছে কেবল। আমার কাছে আন্তর্জাল মারফতেই পৌঁছেছে আপনার কবিতাযাপন। শারীরিক ভাবে অসুস্থ থাকায় লেখা দিতে পারেননি 'সতীর্থ'র পঞ্চম সংখ্যার জন্য। অবশ্য সংখ্যাটি হয়নি এখনও, হবে একদিন, আপনার লেখা পেলাম না।

প্রবাদ বলে- 'কাপড় ছিড়লে হয় কাঁথা, মানুষ মরলে থাকে কথা'। তবে কবির শরীরি মৃত্যুতে কী থাকে! প্রতিকথা, অতিকথা? অতিকথার পরের কথা? পরমকথা? নাকি মহাজাগতিক নৈঃশব্দ্যের বিপরীতে তাক করা চূড়ান্ত অ্যানার্কি…