যিত্‌নে পাত্তে উন্‌কে হাত মে হোতে থে, উত্‌নে হি পাত্তে উন্‌কে আস্তিন মে ভি থা

শুভ আঢ্য




“আজ খুশ তো বহুত হোঙ্গে তুম?” এ ডায়লগ হবার কথা আদপেই কোনো ভিলেনের। যার পকেটে পকেটে ছুরি, নাইন এম এম... কখন কোন তুরুপ কা’কে টেক্কা দিয়ে যাবে তা কোনো জোকারও শালা জানে না... তবে হ্যাঁ এতটাও ফিল্মি নয়, এতটাও অপরিকল্পিত নয় যে তার বাঁ হাত জানতে পারবে না ডান হাত কি লিখছে... বরং অনেক পরিকল্পনা, খুনের আগে পরিসর ঘুরে দেখা সেভাবে, কোনো অছিলায় নয়, সটান... যেভাবে একজন গোয়েন্দা দেখেন খুনের পর মোটিভ... তিনি আগে দেখতেন। শুধু বাংলা কবিতার পরিসর সরেজমিন তদন্ত নয়, তার ভেতরে ঢুকে পড়ে দেখতেন কিভাবে শব্দরা টেবিলে একইভাবে সিকোয়েন্সে বসেছে, খেয়ে যাচ্ছে সমান মাপে, তাদের প্লেটে একবারেই সমপরিমাণ খাবারের কণা আর কারও ক্ষেত্রে তো খাদ্যের ক্যালরিমূল্যও এক। এসব সত্তরের পলেস্তারার পিছনে বসে একসাথে খাওয়া সিনেমার ছবি।
ওই, জল আর জংলা পাহাড়, বাইসন, তার পাশে নদী। বিপরীত দিকে সঙ্গম থেকে উৎসে যাচ্ছে... শব্দেরা সৃষ্টির গোমুখ থেকে ব্ল্যাকহোলের দিকে খুঁজছে তাদের বাপ-মা। এভাবেই দেখা হয়ে থাকে। এভাবেই ফিতাকৃমির মত চিন্তারা মাথার ভেতর নিউরোনের সাথে প্যাঁচ খেলে। সেখানেই ভিলেনের ডেন। যাবতীয় স্তব্ধ লেকের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে রক্তাক্ত সারস, সেখানে পেণ্ডুলাম সাজিয়ে রেখেছেন বারীন দা। সেখানে স্কচের বোতলের সাথে কম্পাঙ্ক মাপার যন্ত্র। সেখানে বারীন দা একাই। সেভাবে বললে সেখানে কোনো কবিতাও নেই, কোনো শব্দও নেই। আছে দৃশ্য। কান নয়, মনে হয় চোখের দৃষ্টি, যা সাধারণভাবে আমাদের ভোঁতা হয়ে উঠছে, তিনি সচেতন ভাবে তা সজাগ রাখতেন (মত ব্যক্তিগত)। আসলে মনে হয়, সবকটা ইন্দ্রিয় সজোরে তাঁর ওই একটি ইন্দ্রিয়েই আঘাত করত।
নাহ্‌, এভাবে বারীন ঘোষাল হওয়া যায় না। চেতনার বাইরে না গেলে, কী করে বুঝে ওঠা যাবে একজন ভিলেন কী করে ভিলেন হয়ে উঠছেন! আসলে মনে হয়, তাঁর গোটা জীবনটাই একজন ভিলেন তৈরী হয়ে ওঠার কারখানা, কীভাবে কি কাঁচামালে, কত পরিমাণ মিশ্রণে শব্দ, চেতনা আর বোধ মেশালে একজন ভিলেনের রেডিয়াস, আলনা তোইরী হয়ে উঠবে তার হিসেব তাঁর নখদর্পণে। ধরা যাক, সেখানে একটি সাদা গিলে করা আদ্দির ফিন্‌ফিনে পাঞ্জাবি চড়ানো হল, মানে আলনায় আর কি, এবার ধরা যাক, সেখান থেকে বেইইইইল ফুলের সুগন্ধ বেশ্যাপাড়া অব্দি চলে গেছে। এবার ধরা যাক, বারীন দা কি দেখে থাকতে পারেন, দেখলেন – একটি কালো লেদার জ্যাকেট সেখানে চাপানো আছে, তাঁর পকেটে স্প্লিন্টার, লোহাচূর... এসব দিয়েই তিনি কবিতা বানিয়েছেন। অথবা এ’ও হতে পারে সসেখানে এক কার্পাস বাগানে শ’য়ে শ’য়ে কবিতা শুকোতে দেকোয়া হয়েছে, বারীন দা একা সেখানে হাঁটছেন, ইচ্ছেমতো তুলে গা’য়ে চাপাচ্ছেন আর সেগুলো থেকে একটা গোটা শুঁয়োপোকা বেরিয়ে আসছে, যা কাপড়ের আদি ও অকৃত্রিম অবস্থা।
এতদূর অবধি কোনো মতে ঠিক আছে... আসলে বারীন দা’র সাথে পরিচিতি খুব সামান্যই। মানে স্যাকারিন, চিনি যে সেভাবে তা না। আর কেলাস হবার কথা তো নয়ই। তবে এই ভিলেনকে কে’ই বা না চেনে! এমন বেতাজ বাদশা, বইমেলায় বাঘের মত ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কৌরবের স্টলে বসে আছেন, লিটিল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে বই দেখে শুধু নয়, সামান্য হলেও পড়ে যাচ্ছেন, তার গন্ধ খুব বেশী করে ছোঁয়াচে। আর লেখা তো ডেন্ড্রাইটের নেশার মত, চিন্তাশক্তি অবশ করে দেওয়া একজন অন্ধকার জাদুকর গা’য়ে কালো শালু আর মাথায় টুপির বদলে ঝোলায় বই রেখেছেন, এই যা। মগজের মাত্র কিয়দংশ ঝোলায় করে নিয়ে পরিচিত সেই বেঁটেখাটো মানুষটি চলে যাচ্ছেন। তবুও লোক তিনি খুব সুবিধের নন। হ্যামলিন টাইপ।
জিনিষটা হল, তাঁকে সামনে দেখে তাঁর ভিলেন হওয়া বোঝা যায় না। তিনি কী কবিতা লিখে গেছেন, তার মূল্যায়ন বাঁ আলোচনা করে পরপারের পাপ আর না’ই বা বাড়ালুম! ওঁর ব্যাপার আমার কাছে একটা অরা, যেটা আদপেই কোনো রাস্তা ছিল না, যা ছিল জঙ্গল; যে শব্দ পরপর সাজালে তা সুস্থতার প্রশ্ন তুলে দিত বাংলা বাজারে বাঁ সাজানো যে যায় এমন আঁক যে আমরা করিইনি, ফল-পাকুড় হলে কীটনাশক স্প্রে-ও করেছেন দরকারমতো। সারাটা জীবনই মনে হয় এই পরিচর্যায় কাটিয়ে দিলেন এবং রক্ত পড়ল, তা কবিতা হয়ে উঠল। ওই স্বার্থপর দৈত্যের গল্পের মত, তফাৎ এই, তিনি সে বাগান খুলে দিয়েছেন সকলের জন্য, তার দলিল-দস্তাবেজ নিয়ে যখ হয়ে ওঠেননি। পরের প্রজন্মকে হাতে ধরে চিনিয়ে দিয়েছেন বাগানের সেই ঘাঁতঘোত, আবার অনেক এমন রাস্তাও তিনি জাস্ট দেখিয়ে দিয়েছেন, যা কম্পিউটর গেমে হয়ে থাকে। আপাতভাবে রাস্তা নেই, তবে লেভেল পেরোবার জন্য বোধহয় ওখানেই হিট করতে হয়।
বাকি কিছু ব্যক্তিগত। সামনাসামনি দেখা বলতে কফিহাউসে একবার, আর লিটিল ম্যাগাজিন বা বইমেলায় বহুবার। ওঁর একটি বই পড়তে দিয়েছিলেন, আমার একটি বই ওকে দেবার পর আশাতীতভাবে মেইলে ওঁর পাঠ-প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলাম অল্প কিছুদিনের মধ্যেই। এখন তমাল দা, স্বপন দা, রঞ্জন দা’র কথা থেকে বা তার পরে তাঁর সাথে দু’একবার দেখা হওয়ার সুযোগ থেকে জানতে পারি বারীন দা মানুষটা এইরকমই। ‘আশাতীত’ শব্দের প্রয়োগ হবে না ও’টা।
আসলে বারীন ঘোষাল এভাবে হওয়া যায় না। এত সহজে ভিলেন হবার স্কুলে অ্যাডমিশন হয় না। শুধু ওই রেডিয়াস আলনাটুকুই বারীন ঘোষাল নন, শুধু গ্লাসের ভেতর সোনালী সূর্যাস্ত বারীন ঘোষাল নন, তার জন্য সর্বোপরি একটা কল্‌জে লাগে যা বাঘের মত বুনো আর হাসের মত সাদা। প্রয়োজন পকেটে পকেটে স্প্লিন্টার নিয়ে ঘোরার কল্‌জে, মাথার ভেতর ঢুকে চেতনাকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর কল্‌জে। পথের বাইরে ঘুরতে ঘুরতে কম্পিউটর গেম্‌স আই-ভিউ, আর একজন খনি শ্রমিকের মত শ্রম আর জেদ, যা মাটির তলায় থাকার কথা ছিল চিরকাল, তাঁকে তুলে আনার কল্‌জে।

বারীন দা’কে

জল থামছে জেগে উঠছে বারীনডাঙ্গা
এত নিভু নিভ জল আর জলজ ছায়া
কোথায় কবেকার বড় ছোটো স্মৃতি তাদেরও পা
হচ্ছে... আজকের ছোটো কবিতা গদ্যও
থামছে ভেঙ্গে উঠছে পাহাড় আর ভালোর আস্তানা
#
অথচ চেতনারহিত থামছে, পল্‌ পল্‌ তুলোটে ছবি
ফ্রেমহীন জলের ওপর ছায়া তার
বাটে যায় অতি বাহিত হয়ে জলে বারীনডাঙ্গা
জেগেছে সেখানে, শব্দের মাটিতে এগোয় প্রতি শব্দ
ধ্বনিতে মেশে, মেশা তার বারীনডাঙ্গায়

(ঋণ – বারীন ঘোষাল)

à votre santé বারীন দা!