ভাল থেকো, বস

মুক্তি মণ্ডল




কবি বারীন ঘোষাল হঠাৎ করেই চলে গেলেন। তিনি রেখে গেলেন অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষাকৃত নতুন কবিতা। তাঁর লু, মায়াবী সীমূম, সৎকার, আয়নাশব্দ, মুখস্ত ডালিম, হাশিস তরণী - এসবের মধ্যে নতুন কবিতার নানা অনুষঙ্গ ও তরঙ্গ স্ফুরণ আছে। তাঁর নতুন কবিতা বিষয়ে আবহমান বাংলা কবিতার ধারাকে অস্বীকার করে নিজস্ব যে ধারণা তৈরি হয়েছিল পঠন-পাঠন এবং অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের সমন্বিত প্রয়াসে, সেটাকে তিনি কারো ওপোর চাপিয়ে দেননি, কখনও চাপিয়ে দিতেও চাননি। তিনি তাঁর নতুন কবিতাকে অসংখ্য পাঠকের সামনে উপস্থাপন যেমন করেছেন তেমনি অসংখ্য তরুণ কবিদের কবিতা পাঠ করে তার ভিতর নতুন কবিতার বৈশিষ্ট্যকে তিনি উদঘাটনও করেছেন। সেগুলোকে যতœ করে লিখিতভাবে জানিয়েছেনও।
এজন্যই আমার কাছে কবি বারীন ঘোষাল নতুন কবিতার শুধু কারিগরই ছিলেন না, ছিলেন নতুন কবিতার প্রসারে প্রচারে নিবেদিত এক প্রাণ। বাংলাদেশ ও ভারতের অসংখ্য তরুণ কবিকে নতুন কবিতা নির্মাণে তিনি উৎসাহ যুগিয়েছেন এবং নতুন কবিতা নির্মাণের শর্তগুলি কি কি তাও তিনি তরুণ কবিদের কবিতা পাঠ করে পাঠক্রিয়ার মাধ্যমে তা জানিয়েছেনও। এসবে তাঁর কোন ভণিতা ছিল না। থাকলেও আমি টের পাইনি। আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অনেকটা পিতা-পুত্রের মতো, তাঁকে খুব সম্মান করতাম। মন থেকে ভালও বাসতাম। ভার্চুয়ালী যখনই কবিতা নিয়ে আলাপ হতো তখনই তিনি অনেক পড়তে বলতেন। আমি কখনও আমার কবিতা নিয়ে তাঁকে পাঠক্রিয়া লিখতে বলি নাই। তবে আমার তিনটি কবিতার বই-ই বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হবার পরই তাঁকে পাঠিয়েছিলাম অন্য অনেক ধরনের বইয়ের সঙ্গে। তিনি নিজের মতো করে আমার তিনটি বইয়েরই পাঠক্রিয়া লিখে পাঠিয়েছিলেন। কৌরব থেকে প্রকাশিত প্রথম বইটিরও পাঠক্রিয়া তিনি লিখে পাঠিয়েছিলেন। এসবের বিনিময়ে তিনি আমার কাছে কিছুই চাননি। আমি একবার বলেছিলাম, তুমি পাঠক্রিয়া লিখে পাঠিয়ে আমার যে উপকার করলে এর বিনিময়ে আমার কিছুই দেবার নেই। তিনি বলেছিলেন, শুধু ভালবাস। তিনি পাঠক্রিয়ায় নেতিবাচক ও ইতিবাচক দুটো বিষয়কেই আলোচনার ভিতর চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। পাঠক্রিয়া পাঠানোর পর, প্রতিবারই তিনি বলতেন, বেশি করে ‘পড়’ আর বেশি করে ‘লেখ’। তাঁকে আমি ‘তুমি’ বলতাম, তিনি বলতেন ‘তুই’। অদ্ভূত একজন মানুষ। এরকম বয়সী আর কারো সঙ্গে আমার তুমি সম্পর্ক নেই।
কবি বারীন ঘোষাল কবিতাকে ভালবেসে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো কাজ করতেন। আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে আমি তাঁর মতো আর কাউকে দেখিনি। কবিতাকে তাঁর মতো আপন করে আর কাউকে ভালবাসতে দেখিনি। তাঁর কাছ থেকে কবিতাকে ভালবাসতে কতটুকু শিখেছি তা নিজের ঠাহরবিদ্যায় প্রকাশ করতে পারব না। তিনি বাংলা কবিতার আবহমান যে ধারা, সেই ধারার যে রচনা কৌশল, যে প্রকরণ প্রকৌশল; তার যে ব্যাকরণ; কৃত্রিম স্বীকৃত যে ছন্দরীতি; প্রচলিত যে কাব্যবোধ, এসবকে তিনি খুব সাবলীল ভাবে অস্বীকার করেছিলেন, এইসব বহুব্যবহৃত কৃৎকৌশল অস্বীকার করা খুব সহজ সাধ্য ছিল না। জীবনকে বাজি রেখে তিনি এসব করেছিলেন। তাঁর লেখাজোখা পাঠ করলে এসবের সত্যাসত্য অনুধাবনের পরিসরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে, এরকমই আমার ধারণা।
তিনি যে জীবনযাপন করে গেলেন তাঁর নিজস্ব সময়ের মধ্যে, সে সময়ের যে চিহ্ন তিনি রেখে গেলেন তাঁর লেখাজোখার মধ্যে, এসব যে সবার ভাল লাগবে তা নয়, কারণ, প্রচলিত সাহিত্যরীতিনীতির মধ্যে যারা সাহিত্য করছেন তাদের সবার মন জয় করার জন্য তিনি লেখেননি কিছুই, তবে তিনি তাঁর লেখার মধ্যে যে সমাজের নতুন মুখ নির্মাণের রেণু রেখে গেলেন, তা তাঁর নতুন কবিতার অবয়বে ঠিকই ফুটে উঠবে। তখন পূর্ববতী কবিতার আবহমান ধারার যে ছলচাতুরী ও প্রকরণকে তিনি অস্বীকার করেছিলেন তা মনে হবে যথাযথ। মনে হবে নতুন কবিতার জন্য এসব ছলচাতুরী ও প্রকরণ-প্রকৌশলকে অস্বীকার ও বিসর্জন করতেই হবে। নতুন কবিতার কারিগর, কবি বারীন ঘোষাল, তোমাকে সেলুট জানাই। ভাল থেকো, বস।