মুখোমুখি বসিবার

ধীমান চক্রবর্তী




সালটা ১৯৯০। অল্পস্বল্প শীতের বইমেলা। সেখানে প্রথম কবি বারীন ঘোষালের সঙ্গে আমার পরিচয়। ‘আলাপ’ পত্রিকার টেবিলে তখন প্রণব পাল আর আমি। অভীদা, কবি অভি সেনগুপ্ত সেখানে এসেছিলেন, সঙ্গে বারীনদা। সেই প্রথম পরিচয়। সে বছরের এপ্রিল মাসে বারীনদা এবং কবি আর্যনীল মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে আমার প্রথম জামশেদপুর যাওয়া। পরদিন অনেকে মিলে হইহই করতে করতে সুবর্ণরেখার পাশে ‘জয়দা’ বলে এক স্থানে পৌঁছই। সেই শুরু। বারীনদার সাথে কবিতাকে সঙ্গে নিয়ে পরিভ্রমণ এবং ঘুরে ঘুরে বেড়ানো। হয়ত তাতে কবিতার জগৎ, অন্তত আমার, কখনো আলোকিত হয়েছে। কখনো বা অন্ধকারের ভোরে যেটুকু আলো তাই সামনে এসেছে।
সেই অন্ধকার ও আলো, সময় ও পরিসর, দীর্ঘকাল ধরে খেলে বেড়াচ্ছে চেতনায়। সামনের টেবিলে, ছোট্ট ছাদের দিকে মুখ করে বারীনদা বলে উঠল,- দেখ ধীমান তুই চেতনার বদলে ‘সম্প্রসারিত চেতনায়’ শব্দটা ব্যবহার কর। Ok, সেটাই বোধহয় ঠিক হবে। কেননা তোমার চিন্তায়, মননে, কবিতায় সবসময়ে সেই সম্প্রসারণ তো লেগেই থাকে।
মনে আছে সেই ‘সাঁতাকেন’ শব্দটা। শব্দটা তোমার তৈরি করা নিজস্ব শব্দ। যা নিয়ে আমাদের আলোচনায় তুমুল হইচই। যেখানে উচ্চারণকেই তুমি প্রাধান্য দিতে চেয়েছিলে। শব্দের অর্থকে একপাশে সরিয়ে রেখে বা স্থগিত রেখে কবিতার ভাললাগাকে বা বেঁচে ওঠাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে দেওয়া হয়েছিল। এই স্বরচিত শব্দের পেছনে ছিল সাঁতার কেন্দ্র দু’টি শব্দ। এভাবেই একজন কবি যখন চালু আর প্রচলিত শব্দে তাঁর কবিতা আর প্রকাশ করতে চান না, তখন তাঁকে নিজস্ব শব্দ সৃষ্টি করে নিতে হয়। ওই খেলা তোমার খুব প্রিয় ছিল। কত নতুন শব্দ নির্মাণ করে তুমি সারাজীবন এই খেলা চালিয়ে গিয়েছ। অর্থের উপস্থিতিকে মুলতুবি রেখে তারা খালি পিছলে গিয়েছে যাতে স্বাধীনভাবে গতিশীল হয়ে ওঠে। টেবিলের দু’পাশে বসে আছ তুমি আর আমি। এসো, শব্দগুলোকে পরস্পরের দিকে ঠেলে দিয়ে দেখি তারা কিরকম নিজস্ব আলোয় ঝলসে ওঠে। ভাষার অর্থযুক্ত চিহ্ন স্বাধীনভাবে পৃথিবীর এমাথা থেকে ওমাথা দৌড়ে যেতে চায় সদাসর্বদা, তাদের যাবতীয় সম্ভাবনা নিয়ে আমরা খেলতে দিই। এই অবিনির্মাণ, তোমার হাতের মুঠো খুললেই গড়াতে শুরু করে দেবে পাঠককে লক্ষ্য করে। ওই শোনো, মানেবিষয়ক যাবতীয় প্রাচীন স্থবিরতা আঘাত পেতে পেতে কেমন কেঁদে উঠছে।
‘বিষয়’ নিয়ে কত জায়গায়, কত রকম পরিস্থিতিতে আমাদের কত কথা হলো। সেই ‘হাশিস তরণী’ বইটার কথা মনে পড়ছে? ১৯৯০ সালে পরিচয় হওয়ার পর বেশ কয়েক বছর কলকাতায় এলে তুমি আমার বাড়িতে থাকতে। সেই চিলেকোঠার ঘর। তোমার জন্যই রাখা থাকত। সেখানেই ‘হাশিস তরণী’র কবিতা তুমি লিখেছিলে। বিষয় নিয়ে কথাবার্তার সেখানেই শুরু। বরঞ্চ, বিষয় নিয়ে তোমার কিছু লেখালিখি পড়ে নেওয়া যাক-
‘...ধরুন একজন সেতার বাজাচ্ছে। এখানে মানুষটি সেতারটি অবস্থানটি সময়, আঙুলগুলো, মেজরাব, তারতন্ত্র এবং ধ্বনিতরঙ্গ- এই সবই এক একটি বিষয়। এর মধ্যে কিছু কিছু বিষয়বস্তু- যেমন সময়, ধ্বনিতরঙ্গ, বাতাস, মেজাজ, তরঙ্গের স্পন্দন, কর্ণপটাহ, স্নায়ুতন্ত্র, ইলেকট্রনিক চার্জ, মগজের পূর্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল, মিলন, অমিলন এই সমস্ত অদৃশ্য অবস্তু বা অলীক বিষয় সম্মিলিত হয়ে একটি বাজনার ঘটনা সংগঠিত হবার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আসলে অনেকগুলো বিষয় মিলে একটা বিষয় হল। মূল বিষয়ের চর্চায় অন্তর্গত ক্ষুদ্র বিষয়গুলি আলোচিত হয় না। এইসব ক্ষুদ্র বিষয়গুলির ভেতরে আছে আরো বহু ক্ষুদ্রতর বিষয় এবং তাদের নানা সংগঠন, তাহলে বিষয় বা বিষয়েতরোত্তর কোনো বিষয়ের কথা ভাবা হচ্ছে। বাস্তবে কি কবিতার এইসব বিষয়? আসলে বস্তু সম্পর্কে আছে বিষয়, এবং সম্পর্কহীন বস্তুরা সবই অবিষয়। এই একবিংশ শতাব্দীতে বিষয়ের অতীত রয়ে গেছে, ইতিহাস রয়ে গেছে, কোন অক্ষত নবীন ভবিষ্যৎ বিষয় নেই যাকে সমগ্র বলা যাবে। তাই কোনো কবিতাই বিষয় হয়ে উঠতে পারে না, বা কোনো বিষয় সম্পূর্ণ কবিতাকে গ্রাস করতে পারে না।’
বারংবারই আমাদের আলোচনায় এ কথা বেরিয়ে এসেছে যে, কবিতাকে তুমি ‘বাককেন্দ্রিকতা’ থেকে মুক্ত করতে চেয়েছ। ফলতঃ তোমার কবিতা বিষয়হীন হয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে। সত্য এবং যুক্তি তুমি সচেতনভাবেই বর্জন করতে চেয়েছ। বিশ্বাস করতে কবিতা সংগঠনে বাক্যের যা ভূমিকা সেখানে সত্য ও যুক্তির কোনই স্থান নেই। তোমার কবিতার মনোযোগী পাঠকের এটা বুঝতে অসুবিধে হয়না, যে সেখানে বিষয় যেন একমাত্র মুছে যাওয়ার প্রতিক্ষায় সদাচঞ্চল। আসলে কবিতার অনুভূতি আর ভালোলাগাটাই তো সব। এভাবেই তোমার কবিতা সবসময়েই মুক্ত আর অবাধ। তোমার কবিতা সামনে নিয়ে সবসময়েই আমাকে দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতে হয়। আর সেই নীরবতার ভেতরে যে নীরবতা তা থেকে আলো আর অন্ধকার খুঁজে নিতে হয়।
আরে...আরে তুমি উঠে যাচ্ছ কেন? আমাদের কত কথাবার্তা এখনও বাকি। এরপর আমরা আলোচনা করব- শব্দ একটা প্রতীক মাত্র। যার কোনও মানে নেই। কিংবা, কবির শব্দবিন্যাস এবং তাঁর কবিতা হয়ে উঠবে বইরৈখিক ও বহুত্ববাদী কিংবা সম্ভাবনার অপার সম্ভাবনা নিয়ে। আরো আরো বহুকিছু আছে, আর এসময়েই তুমি চলে যাচ্ছ! তা কেমন করে হয়? উঠে ছোট ছাদটার দিকেই যাবে আমি জানি। আরে যেতে যেতে পুরানো বায়োস্কোপের মতো ক্রমশ ফেড-আউট হয়ে যাচ্ছ যে। আমি একটা কবিতা লিখেছি, সেটা অন্তত শুনে যাও-
তোমার ছায়া বারবার জড়িয়ে রাখে আমাদের।
নতুন দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে।
প্রতিদিন সকালে চারপাশের কত কি
পালটে ফেলে হাড়ের উপর লেগে থাকে
বর্ষা ও মুচকি হাসি।
ভাঙা টুকরোগুলোর জীবন নিয়ে গাইছে
সুলতা আর রাণুর নাদান।
ভোর হলেই পাখিরা ডেকে যাচ্ছে বারীন...বারীন...।
চাইলেও লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না কিছুই।
আলো ও অন্ধকার থেকে অনেক বড় একটা নিঃশ্বাস,
ছড়িয়ে পড়ছে বাংলা কবিতা জুড়ে।
উলটো দিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা
একজন দেবদারু গাছ, ধুলো ঝাড়ছে
দ্বিতীয় পৃথিবীর।

আমার অন্ধ ছায়া।
খালি চীৎকার করছে,-
দেখি কতদূর যেতে পারো তুমি আমাকে ফেলে...