চলে গেলেন বাংলা কবিতার ভিলেন

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল



[১]
বাংলা ভাষার ‘যুক্তাক্ষর’কে আমি দুই বাংলার প্রতীক মনে করি। এই নিয়ে একবার একটি কবিতাও লিখেছিলাম। আর সেটা ছাপা হয়েছিলো ‘কৌরবে’। যা সত্তর-আশি দশকে এক অসাধারণ লিটল ম্যাগাজিন। পরে‘কৌরবে’ প্রকাশনী হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করে। এখনো ‘কৌরব’ বের হয়, অনলাইনে। এটি বাংলা পত্রিকা প্রকাশনা হলেও এর দপ্তর ছিলো- ঝাড়খণ্ড রাজ্যের অন্যতম বৃহত্তম শহর জামশেদপুরে। সেখানে কমল দাথাকতেন। ‘কমল চক্রবর্তী মানে একটা দর্শণ। কমল চক্রবর্তী = ভালোপাহাড়। কমল চক্রবর্তীর অন্য নাম কৌরব । শহর থেকে অনেক দূরে, বাণিজ্যিক প্রচারের আলোর থেকে বিপরীতে কমল চক্রবর্তীর বেঁচে থাকা’...।আর সাথে যুক্ত হন বারীন ঘোষাল। তাঁরা দু’জনে মিলে সত্তর শুরু করেন এই কাগজটি। কিন্তু প্রথম দিকে সম্পাদক হিসেবে কারো নাম ছাপা হতোনা! আর আমরা যুক্ত হই কবি হিসেবে। তারপর আমাদের বন্ধুত্ব।

আমাদের তুলনায় পশ্চিম বঙ্গের সত্তর দশকের কবিতা একটু বেশী বয়স্ক। ফলে কমল দা, ধুর্জটি দা, বারীন দা, তপন দা, নির্মল দা, শংকর দা, গৌতম, জয়, মৃদুল, শ্যামল এরা আমাদের বয়সে কিছুটা অগ্রজ। যদিও বন্ধুত্ববয়স দিয়ে বিচার্য্য নয়।

কলকাতার লেখদের মধ্য দু’টি ধারা। একটি ধারা প্রতিষ্ঠানমুখি, অন্যটি প্রতিষ্ঠান বিরোধী। জয় গোস্বামীরা বাজারের গ্রুপের আর মৃদুলেরা ভিন্ন ধারার অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান বিরোধী। পশ্চিম বঙ্গের প্রায় সকল লিটল ম্যাগাজিনপ্রতিষ্ঠান বিরোধী আন্দোলনে মানে- ‘শত জল ঝর্ণার ধ্বণি’ নামে। তাদের সম্মেলন হয় কৃষ্ণ নগরে। সেই সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে যোগ দেই আমি, ফরিদ কবির, বিশ্বজিত চৌধুরী, দারা মাহমুদ, হারুণ রশিদ। পরেআমরাও ঢাকার বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে ‘এই সব স্রোতের বিরুদ্ধে’ অনুষ্ঠান করি। সেখানে যোগ দেয় মৃদুল-গৌতম-প্রসূণেরা। এভাবেই আমাদের সময়ে আমরা সাহিত্যের সেঁতু গড়ে তুলি।

২]
এখানকার মতো ইন্টারনেট বা অন লাইনের যোগাযোগ ছিলোনা। ফলে আমাদের মধ্যে পত্র যোগাযোগ ছিলো। সেই সূত্রে বারীন দা’র বেশ কিছু চিঠি আছে। তার মধ্যে একটি চিঠির কথা খুব মনে পড়ছে। আমরা দুইবাংলার ‘সত্তর দশকের কবি’ সম্মেলন করি ঢাকায়। এতে কলকাতার অনেক কবি যোগ দেন; তার মধ্যে ছিলেন কমল দা। তিনি আমার বাসায় ক’দিন ছিলেন। ফিরে ঢাকার আড্ডা আর আমাদের বাসার গল্প লোভনীয়করে তুলে ধরেছিলেন বারীন দা’র কাছে। বারীন দা খুব ইচ্ছে ছিলো বাংলাদেশে যাবেন, ঘুরবেন আর থাকবেন আমার বাসায়। কিন্তু বাংলাদেশে আর তাঁর যাওয়া হলোনা।

পরে ফেইসবুকের মাধ্যমে আবার আমাদের যোগাযোগ। প্রায় প্রতিদিন নানা বিষয়ে কথাবার্তা, কবিতা, আড্ডা। এই মজার মানুষটি বাউন্ডেলে। চষে বাড়ান সারা পশ্চিম বঙ্গের, ঘুরে বাড়ান ঝাড়খণ্ড, দূরে যান দিল্লি, এমনকি দূরদেশেও। সর্বশেষ গেলেন অষ্ট্রেলিয়ায়। সেখানে গিয়ে এবাকেডো খেয়ে মুগ্ধ। যেহেতু এর ভেতরের বিচিটা বড়। তাই তিনি রসিকতা করে নাম দিয়েছেন- অন্ডকোষ ফল! অষ্ট্রেলিয়ার পর তিনি কানাডায় আসতেচেয়েছিলেন। হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘হুম যাবো, কানাডিয়ান অন্ডকোষ খাবো’।

কিন্তু তাঁর সাথে আর দেখা হলোনা। একবারই দেখা হয়েছিলো, ২০০৪ সালে কলকাতার বইমেলায়, কৌরব ষ্টলে। নাম বলতেই বুকে জড়িয়ে নিলেন। সেই উষ্ণতা যেনো আজো টের পাই।

আলাপচারিতায় জানালেন, তাঁর জন্ম জন্মস্থান আগরতলায়। তাই তিনি মজা করে বলতেন, আমি তো তোমাদের আগরতলা ষড়যন্ত্রের আসামী!
তিনি নিজেকে সম্পর্কে বলতেন, আমি এন্ট্রি কবি। আমি বাংলা কবিতাকে ডিরেইল করতে এসেছি। আমি কবিতার ভিলেন।

৩]
ফেইসবুকে পবিত্র সরকার, ময়ল রায় চৌধুরী, বারীণ দা’র সাথে নিয়মিত পাই। তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি, সাতদিনের জন্য। দু’দিন ধরে তা খুঁজে পেলাম না। কি ভাবে যেনো ডিলিট হয়ে গেছে। সর্বশেষ তাঁর সাথেইনবক্সে যে কথোপকথন হয়েছে, তা তুলে ধরছি।

- দাদা, আমি আপনার গদ্যের ভক্ত।
-তাই। তাহলে কবিতা লেখা ছেড়ে দেব?
-না দাদা। সে কি বলেন।
-তুমিই তো বললে যে...
-তার মানে এই নয় যে...
-কবিতাই ফরজ। আর গদ্যটা নফল।
- বাহ, আপনি ‘ফরজ, সুন্নত, নফল’ও জানেন?
-তুমি কোন গদ্য পড়ে এই কথা বললে?
-আপনার স্মৃতিকথা। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো- আপনার পিছু পিছু হাঁটছি। পেছনে ফেলে আসা জীবনটা কি ভাবে যেনো মিলে যায়। মুগ্ধ হয়ে যাই। নিজেকেই খুঁজে পাই।
-আমার পিছে পিছে হাঁটছো?
চলে গেলেন বাংলা কবিতার ভিলেন। আজ মনে হচ্ছে, আসলেই যেনো বারীন দা’র পথ অনুসরণ করছি, এগিয়ে যাচ্ছি মৃত্যুর দিকে!

নভেম্বর ০৬, ২০১৭, টরন্টো।