ভুলের ডিভিডেন্ট

সুবল দত্ত

রাজ্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছোট অফিসঘরটি এখন অদ্ভুদ রকমের শান্ত । এমনই নিস্তব্ধতা যে উপস্থিত একটিই মাত্র মানুষটির শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ ঘরের প্রতিটি কোণায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এই মানুষটির নাম বি পাঠক । দিন পাঁচেক আগে এখানে জনতার রোষ চরমে ।
ভাঙচুর । চেয়ার টেবিল ভাঙ্গা,কাঁচভাঙ্গা কাগজপত্র ফাইল পোড়ানো । তারপর থেকে এখানে কারো আসাযাওয়া নেই শুধু এই ছ ফুট লম্বা মানুষটি একটি চেয়ারে কুঁকড়ে ছোট হয়ে রোজ সকাল থেকে সন্ধে বসে থাকেন। নিজেকে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখার এক অন্তর্মুখী শোক। মাত্র এক বছর হলো রাজ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রীর পদভার গ্রহন করে তাঁর আদর্শ পুরুষ রাজ্যের জনগণের সেবার কাজে মন প্রাণ লাগিয়ে স্বাস্থ্য দপ্তরের নাম শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন। বহুদিন ধরে পাঠকজী তাঁর সাথে সেবার কাজে ঘর সংসার সব ছেড়ে ছুড়ে লেগে রয়েছেন। কিন্তু রাজ্যের সুরক্ষা ও প্রশাসন বিভাগ এতই দুর্বল যে এই রাজ্য জুড়ে প্রায় রোজই ধর্ষণ খুন লুঠমারের ঘটনা খবরের কাগজের হেডলাইনে । মাসদুই আগে বসন্তকালীন রাজ্যসভা অধিবেশনে পাঠকজীর গুরু স্বাস্থ্যমন্ত্রী অপরাধমূলক সংগঠনগুলিকে সনাক্ত করা ও তাদের দুষ্কর্ম বন্ধ করার বিজ্ঞান সম্মত উপায় বলছিলেন,কিন্তু কে কার কথা শোনে? তুমুল হট্টগোল এবং স্বার্থান্বেষী পক্ষ বিপক্ষ । শেষমেষ দুই দলেই একটি বিষয়ে একমত হলেন । যেহেতু অসামাজিক বিকৃতকামী মানুষের বোধ শক্তি কম,তাই তাদের ভিতরে ধর্ষণ ও খুনের প্রবণতা বেশি। এবং এটা বাড়ছে গণিকা গমনে । সুতরাং গণিকাবৃত্তি অপরাধমূলক কাজ বলে ঘোষণা করা হোক । উনি একটু মৃদু আপত্তি করেছিলেন বটে কিন্তু প্রচুর তর্ক বিতর্ক আর হট্টগোলে বিলটি পাস হল ।বিলটির খসড়া গুরুজি করেছিলেন , টাইপ করেছিলেন পাঠকজী । প্রধান সিগনেটরি উনিই হলেন।কিন্তু কার্যকরী হওয়া উনি দেখে যেতে পারলেন না ।আজ দিন পনের আগে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় উনি পরলোক গমন করেছেন।
চেয়ারে বসা নিথর মানুষটির দীর্ঘশ্বাস কেঁপে কেঁপে ছড়িয়ে পড়ল অফিস ঘরটিতে ।গুরুজি না দেখেছেন ভালই হয়েছে । কম সে কম গুরুর নজরে তো আমি হীন হইনি ! আত্মগ্লানিতে ভুগছি , এ তো আমার প্রায়শ্চিত্ত ! উনি বেঁচে থাকতে ওনার অপমান আমি কী সহ্য করতে পারতাম ? যার কারণ এই আমি ? পাঠকজী টেবিলে মাথা ঠুকতে লাগলেন ।অদৃষ্টের পরিহাস । নাহলে বিলটি টাইপ করার সময় আমি গাধার মতন উনি যা ডিকটেট করলেন ভাল করে না শুনে , মানে না বুঝে আমি টাইপ করে দিলাম? ইংরেজিতে the criminalized prostitution এর বদলে decriminalized prostitution হয়ে গিয়ে সম্পুর্ণ বিপরীত সরকারি প্রশাসনিক আদেশ বলবত্‍ হয়ে গেল !
পাঠকজী উঠে দাঁড়ালেন । সন্ধে হয়ে আসছে। ঘর ফিরতি পাখিদের কিচির মিচির আওয়াজ । উনি তাঁর কর্মস্থানের চারপাশ শেষবারের মতো দেখে নিলেন । ধীর পায়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লেন ।
এরপর ছয়মাস কেটে গেছে । স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অফিস নতুন বিল্ডিংএ স্থানান্তরিত হয়েছে । কার্যভারে নতুন
মন্ত্রী । সেক্রেটারিও নতুন । বি . পাঠকের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি । কিন্তু অতি আশ্চর্যের ব্যাপার , ওই ভুল বিলটি পাস হওয়ার এবং কার্যকরী হওয়ার পর রাজ্যে বিষ্ময়করভাবে ধর্ষণ ও খুন কমে গেছে । রাজ্যে আইন শৃংখলা ফিরে এসেছে ।