বারীন ঘোষাল: ব্যক্তিস্মৃতি, শব্দস্মৃতি আর সমালোচনা নিয়ে কিছু কথা

অর্ক চট্টোপাধ্যায়





মৃত্যু এমন একটা ঘটনা যেটা ঘটলেই চারিদিক থেকে শব্দ ধেয়ে আসে। কিছু শব্দ আক্রমণ করে। কিছু শব্দ লেহন। কিছু শব্দ প্রশংসা রেখে যায়। কিছু শব্দ সমালোচনা করে, যার মানে বিশ্লেষণ। জীবিত মানুষদের চারপাশে থাকে বিভিন্ন ধরণের মানুষের বলয় আর মৃত মানুষদের আশেপাশে অনুরূপে শব্দের বলয় তৈরী হয়। বারীন ঘোষাল বাংলা কবিতায় কি কি নতুন বাঁক তৈরী করেছেন তার মূল্যায়ন এখানে করবো না কারণ এই ব্যক্তিস্মৃতির মেদুর পরিসরে তা বেমানান। সে মূল্যায়ন সময় এবং নিবিড় পাঠ দাবি করে যারা একে অপরের পরিপূরক। বারীনদার ব্যক্তিঅস্তিত্বের টেন্স বদলের পর ততটা সময়ও যায়নি। ততটা নিবিড় হয়নি আমার পঠন। এই লেখা তাই ইতিউতি কিছু চিন্তা, কিছু ক্রিয়া, কিছু প্রতিক্রিয়া, মৃত্যু-পরবর্তীতে নির্মিত এবং প্রতিনির্মিত শব্দ বলয়গুলির স্বাপেক্ষে।

এখানে ব্যক্তিস্মৃতিকে শব্দস্মৃতির দিকে ঠেলে দেবার একটা ছোট্ট চেষ্টা করবো যাতে বিশ্লেষণী পরিসরে পৃথকীকরণ সম্ভব হয় ব্যক্তি বারীন ঘোষাল আর লেখক বারীন ঘোষালের। যাতে ব্যক্তিগত অসূয়া বিশ্লেষণে না আসে, ঠিক যেমন ব্যক্তিগত ভালোবাসাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হয় সমালোচনার ক্ষেত্রে। কিন্তু আমরা মানুষ, অটোমেটন নই, তাই হয়তো নৈব্যক্তিকতা দুরূহ হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের রেশ থেকে যায় সমালোচনায়। তবে সেই রেশ যেন অতিপ্রশংসা বা অতিনিন্দা না তৈরী করে এটুকু তো খেয়াল রাখা যায়। কবিতা বোধ হয় ট্রলিং বা পেট্রলিং কোনোটাই পছন্দ করে না। লেখা ব্যক্তিকে অতিক্রম করে আবার ব্যক্তিও লেখাকে অতিক্রম করে যায়। কখনো কখনো ব্যক্তি নিজেই লেখা হয়ে যায়। তার উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে থাকে মৃত্যু যে প্রশংসা বা নিন্দা কোনোটাই দাবি করে না। সে উদাসীন অথচ উজাগর।
আমরা বারীনদার টেক্সটের, তাঁর লেখকীয় প্র্যাকটিসের বা তাঁর নান্দনিক বোধের সমালোচনা করতে পারি কিন্তু এসব কিছুর বাইরে একজন মানুষ বারীন ঘোষাল রয়েছেন যাঁর সমালোচনা করার অধিকার অভিজ্ঞতা থেকে অর্জন করতে হয় আর আমার অন্তত সে অধিকার নেই। এক্ষেত্রে কেন জানি না সমালোচনা শব্দের অর্থ কুৎসার দিকে চলে যায়, যেখানে একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজনের কঠিন জ্যামিতিক বোঝাপড়া এসে 'ইন্টারেস্ট' শব্দটাকে উস্কে দেয়। আমি ছাড়া আর যাদের সেই সমালোচনার ব্যক্তিক অধিকার নেই অথচ কুৎসা অর্থে সমালোচনার চোনার দিকে যারা এগিয়ে যান, তারা আর যাই হোক বিশ্লেষণী সমালোচক নন। বিশ্লেষণী সমালোচনা মানে কখনো কখনো তথ্যের সংশোধন হলেও তা সর্বাত্মকভাবে সংশোধনবাদী হতে পারে না। বারীনদা তাত্ত্বিক চিন্তক নন। তিনি একজন প্র্যাকটিসিং পোয়েট যিনি পোয়েট্রি নিয়ে লিখেছেন। তাই তাকে হঠাৎ দার্শনিক দেরিদা কিম্বা ফুকো, মনোবিশ্লেষক লাকাঁ কিম্বা কবিতাতাত্ত্বিক হ্যারল্ড ব্লুমের সঙ্গে একই থিওরেটিকাল রেজিস্টারে রাখা যাবে না। সে রাখার থেকে না রাখা ভালো। উদাহরণ হিসাবে বলছি, বরঞ্চ তুলনা, প্রতিতুলনা হতে পারে মার্কিন কবি ওয়ালাস স্টিভেন্সের সঙ্গে, যিনি ১৯৫১ সালে লিখেছিলেন The Necessary Angels: Essaays on Reality and the Imagination নামক কবিতাতত্ত্বের গ্রন্থ।

বারীনদা আমার অগ্রজ সাহিত্যিক। তাঁকে আমি চিনতাম অনুজ সহলেখক হিসাবে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে অন্তত সেই সম্পর্ক আনুগত্যের মোড় নেয়নি। আমার লেখা নিয়ে ওঁর প্রাথমিক পর্বের সমালোচনাকে আমি অভিসন্ধিমূলক প্রণোদনা হিসাবেই দেখেছি। যত আলাপ বেড়েছে, কিছু মতান্তরকে মনান্তর মনে করার ভুল ভেঙেছে দুপক্ষেই। আমি দেখেছি বড়ো মনের এক সহাস্য 'বৃষ্টিমুখ'কে যে কিনা কবিতার মত স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে। বইমেলা থেকে বইমেলা। জামশেদপুর থেকে অস্ট্রেলিয়া। নানা জায়গায় নানা প্রেক্ষিতে দেখা হয়েছে। নৈকট্য বেড়েছে। আমার ভারতে ফেরার পর বইমেলায় শেষ কথা হয়েছে। একবার দেখা করতে যাবার কথা ছিল কিন্তু সে আর হয়ে ওঠেনি। তবে এই সব মিসড কল নিয়েই তো জীবন। আর এসবকিছুর অবসান মৃত্যু, যার পর আর কোনো কলও নেই, কোনো মিসড কলও নেই।

যাক, যা বলছিলাম ব্যক্তিস্মৃতিকে শব্দস্মৃতির দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা। লেখক মানুষটি নেই মানে তিনি তাঁর শব্দের সঙ্গে সমার্থক হয়ে গেলেন। শব্দের বাইরের পৃথিবী থেকে শব্দের পৃথিবীতে সামগ্রিক প্রবেশ--এভাবে দেখা যেতে পারে একজন লিখনকর্মীর মৃত্যুকে। বারীনদার মৃত্যুকে যদি এভাবে দেখি, তবে ব্যক্তিস্মৃতিকে এবার শব্দস্মৃতির দিকে ঠেলে দেবার সময় হয়েছে।
'বোরখাল্যান্ড থেকে' বইয়ের শেষ কবিতায় বারীনদা লিখেছেন:

ভালোবাসার গানগুলো আমরা জানি
তাই ভালোবাসি অজানা গান
একটা কথাও আর নয়
মৃতরাই প্রকাশিত হয়

এখন সম্ভবত মৃতদের প্রকাশ হবার সময়। বারীনদার ব্যক্তিমৃত্যু থেকে তাঁর শব্দের জন্মান্তরে যাবার সময়। বারীনদা 'মাউসনামা' বইয়ে যাকে বলেছেন 'শব্দতাঁত', এখন সেই শব্দতাঁত চলার সময়। ব্যক্তি এখন লিখিত শব্দ। তাই সাহিত্যসমালোচনা হোক সেই শব্দের। সাহিত্যসমালোচনার স্বরূপ কি বিরূপ সমালোচনা? বিরূপ সমালোচনা করে এক ধরণের ক্ষমতাতান্ত্রিক আনন্দ তৈরী হতে পারে কি? জানি না। আমার কাছে সমালোচনা মানে শুধুই বিশ্লেষণ যেখানে একটি টেক্সটকে ঘিরে একটা আর্গুমেন্ট গড়তে হয় আর এই গড়ার কাজটা আসলে সৃজনশীল। এখানে সৃজন আর সমালোচনা একাকার হয়ে যেতে পারে। হোক না। সাহিত্য সমালোচনা মানে আমার কাছে অন্তত সাহিত্যের ব্যাখ্যা নয়। সাহিত্য সমালোচনা মানে এক একটি টেক্সটের বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি সৃজনী প্রতর্ক সৃষ্টি করা। যেমন ধরা যাক 'মাউসনামা' বইটিতে বারীনদা কতরকমভাবে 'মাউস' এর কেন্দ্রীয় রূপকটিকে ব্যবহার করেছেন? কিভাবে অর্থ থেকে অর্থান্তরে গেছে এই রূপক? প্রযুক্তির পরিসরটিকে কিভাবে চিহ্নিত করেছে 'মাউসনামা' নামক এই নিওলজিজম? এইসব বিশ্লেষণী প্রশ্নকে ব্যাখ্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। কারণ এই বিশ্লেষণ কখনোই কোন চূড়ান্ত অর্থ-কাঠামোয় স্থিরীকৃত করবে না কোনো টেক্সটকে। বরং অর্থ থেকে অর্থান্তরের এই খেলা অন্তহীনভাবে চলতে থাকবে। সমালোচনা শুধু এই খেলাটাকে উস্কে দেবে মাত্র। সেটা না করে ব্যক্তিপ্রশংসা বা ব্যক্তিনিন্দা করলে বারীনদার কবিতা উত্তর দেবে:

ঘর নেই কোন
আমাদের আর কোন দেওয়াল নেই
খিলা
ফোটো
হতে চায় না কেউ কফিন মিস্তিরি

মৃতলেখকের কফিন যদি তার লেখা হয় তবে সেই কফিন সারানো বা সারাতে গিয়ে সারাতে না পেরে ফেলে দেওয়া, এটা হয়, হয়ে এসেছে, হতেই পারে। কিন্তু ব্যক্তিমতের উর্দ্ধে থাক না এই টেক্সচুয়াল কাটাছেঁড়া? অন্যের জীবন নিয়ে কাঁটাছেঁড়া করার আমরা কে? নাকি আমরা ব্যক্তিজীবন নিয়ে কাটাছেঁড়া করি লেখার 'কফিন মিস্তিরি' হতে চাই না বলেই?

'মাউসনামা' বইয়ের শেষ এসে দেখি বারীন ঘোষালের ভাষ্য: "পায়ের ছাপ মোছার খেলায় মুছে যাচ্ছে নিজের পায়ের ছাপ"। আমরা কেন অন্যের পায়ের ছাপ মুছবো? কেন অংশ নেব এই অহংদৃপ্ত ক্রীড়ায় যাতে মুছে যাবে নিজের পায়ের ছাপ? অনেক পায়ের ছাপের মধ্যেই থাক না আমাদের সবার ছোট ছোট পায়ের ছাপ? নিজের বাইরে বেরিয়ে এরিয়াল শটে দেখতে পারলে জীবন অনেক বড়। মৃত্যু, যাকে দেখা যায় না, সে হয়তো আরো বড় বলেই নজরে আসে না। এই ক্ষুদ্র মানবজীবনের বাইরে কত বড় প্রাণপৃথিবী। আরো বড় বস্তুপৃথিবী। মহাকাল। মহাকাশ। কে আমরা? কি আমাদের প্রশংসার তাৎপর্য? ঠিক কতটা বড় ছায়া পড়ে আমাদের নিন্দার?


-------------------------------------------